✍️ শ্রী সন্দীপ মুখোপাধ্যায়
বেদকে যখন আমরা আদি জ্ঞানের উৎস বলে মানি, তখন বেদের মধ্যেই গো শব্দের যে অর্থ ও মর্যাদা দেওয়া হয়েছে তা দেখলেই বোঝা যায় বিরোধীদের প্রচার কতটা ভিত্তিহীন। ঋগ্বেদে গো শব্দটি এক হাজারেরও বেশি বার এসেছে, কিন্তু কোথাও গো-হত্যা বা গো-মাংস ভক্ষণকে বিহিত কর্ম বলে বলা হয়নি। বরং ঋগ্বেদের ৮.১০১.১৫ নং মন্ত্রে স্পষ্ট বলা হয়েছে –
`মাতা রুদ্রাণাং দুহিতা বসূনাং স্বসাদিত্যানামমৃতস্য নাভিঃ।
প্র নু বোচং চিকিতুষে জনায় মা গামনাগামদিতিং বধিষ্ট॥`
অর্থাৎ নিরপরাধ ও অদিতি স্বরূপা গাভীকে বধ করো না। এখানে গাভীকে অদিতি বলা হয়েছে, যার অর্থ যাকে খণ্ডন করা যায় না, যিনি অখণ্ডনীয়া।
ঋগ্বেদের ১০.৮৭.১৬ তে বলা হয়েছে –
`যঃ পৌরুষেয়েণ ক্রবিষা সমঙ্ক্তে যো অশ্ব্যেন পশুনা যাতুধানঃ।
যো অঘ্ন্যায়া ভরতি ক্ষীরমগ্নে তেষাং শীর্ষাণি হরসাপি বৃশ্চ॥`
অর্থাৎ যে যাতুধান মানুষের মাংস খায়, ঘোড়ার মাংস খায়, অঘ্ন্যা গাভীর দুধ হরণ করে এবং গাভীর মাংস খায়, হে অগ্নি তুমি তাদের মস্তক ছিন্ন করো। যদি বেদেই গো-মাংস খাওয়া বৈধ হতো, তাহলে বেদই কেন গো-মাংসভক্ষককে দণ্ডনীয় বলবে? এই একটিই মন্ত্র সমস্ত প্রক্ষিপ্ত তত্ত্বকে খণ্ডন করে দেয়।
*ঋগ্বেদের অঘ্ন্যা তত্ত্ব হলো গো-রক্ষার সবচেয়ে বড় বৈদিক প্রমাণ।* বেদে গাভীকে বারবার অঘ্ন্যা বলা হয়েছে। অঘ্ন্যা শব্দের অর্থ যাকে হনন করা যায় না। ঋগ্বেদ ১.১৬৪.৪০, ৮.১০১.১৫, যজুর্বেদ ১৩.৪৩ – সর্বত্র এই অঘ্ন্যা শব্দটি গাভীর বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। পাণিনির ব্যাকরণ অনুযায়ী ‘হন’ ধাতু থেকে অঘ্ন্যা শব্দের উৎপত্তি।
অথর্ববেদ ৪.২১.৩-এ বলা হয়েছে – “গাভী রুদ্রদের মাতা, বসুদের কন্যা, আদিত্যদের ভগিনী এবং ঘৃতের নাভি”। যে প্রাণীকে দেবতাদের মাতা, কন্যা, ভগিনী বলা হচ্ছে, তাকে খাদ্য হিসেবে কল্পনা করা বৈদিক চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীত।
*যজুর্বেদে গো-রক্ষার মন্ত্র আরও স্পষ্ট।* যজুর্বেদ ১৩.৪৯-এ বলা হয়েছে – “গাং মা হিংসীরাদিতিং বিরাজম” – গাভী যে অদিতি ও বিরাট স্বরূপা, তাকে হিংসা করো না। যজুর্বেদ ১৩.৫০-এ বলা হয়েছে – “ইমং সাহস্রং শতধারমুৎসং” অর্থাৎ এই গাভী সহস্র ধারায় দুধ দেয়।
বৈদিক যজ্ঞে পশুবলির যে প্রসঙ্গ আসে, সেখানে প্রকৃতপক্ষে ‘গো’ শব্দের অর্থ নিয়ে অপব্যাখ্যা করা হয়। বৈদিক সংস্কৃতে গো শব্দের ১০টিরও বেশি অর্থ আছে – গো মানে গাভী, গো মানে ইন্দ্রিয়, গো মানে বাক্য, গো মানে কিরণ, গো মানে পৃথিবী। নিরুক্ত ২.৫-এ যাস্কাচার্য বলেছেন, গো শব্দের বহু অর্থ। তাই কোথাও ‘গো-মেধ’ শব্দ থাকলেও তার অর্থ গাভী-মেধ নয়, তার অর্থ ইন্দ্রিয় সংযম, পৃথিবী শুদ্ধি। শতপথ ব্রাহ্মণ ৩.১.২.২১-এ বলা হয়েছে – “গৌর্বৈ অন্নম্” – গাভী অন্ন স্বরূপা।
*অথর্ববেদের গো-সূক্ত সম্পূর্ণভাবে গাভীর মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছে।* অথর্ববেদ ৪.২১-এ সাতটি মন্ত্রে গাভীর স্তুতি আছে। সেখানে বলা হয়েছে “ধেনুঃ সদনং রয়ীণাম” – গাভী ধন ও ঐশ্বর্যের আবাস। “ঘৃতং দুহানামমৃতং” – গাভী অমৃত স্বরূপ ঘৃত দান করে। অথর্ববেদ ১০.৮.২৭-এ বলা হয়েছে গাভীর মধ্যে সমস্ত দেবতা বাস করেন। মহিষ বলি ও গো বলির পার্থক্য আছে। বৈদিক যজ্ঞে ‘মহিষ’ বলির উল্লেখ আছে, ‘অঘ্ন্যা গো’ বলির কথা নেই। কারণ মহিষ ছিল আসুরিক শক্তির প্রতীক, আর গো ছিল সাত্ত্বিক শক্তির প্রতীক।
*মনুসংহিতা নিয়ে যে অপপ্রচার হয়, তা প্রক্ষিপ্ত শ্লোকের ওপর ভিত্তি করে।* মনুসংহিতার পঞ্চম অধ্যায়ে খাদ্য-অখাদ্য বিচার আছে।
মনুসংহিতা ৫.৫১-তে স্পষ্ট বলা হয়েছে –
`অনুমন্তা বিশসিতা নিহন্তা ক্রয়বিক্রয়ী। সংস্কর্তা চোপহর্তা চ খাদকশ্চেতি ঘাতকাঃ॥`
অর্থাৎ মাংস ভক্ষণের অনুমতি দাতা, পশুকে বধকারী, মাংস ক্রয়-বিক্রয়কারী, রান্না করা ব্যক্তি, পরিবেশনকারী ও ভক্ষণকারী সকলেই ঘাতক।
মনুসংহিতা ৫.৫৩-তে বলা হয়েছে –
`যো বন্ধনবধক্লেশান্ প্রাণিনাং ন চিকীর্ষতি। স সর্বস্য হিতপ্রেপ্সুঃ সুখমত্যন্তমশ্নুতে॥`
মনুসংহিতা ৫.৪৮-তে বলা হয়েছে –
`মাং স ভক্ষয়িতামুত্র যস্য মাংসমিহাদ্ম্যহম্। এতন্মাংসস্য মাংসত্বং প্রবদন্তি মনীষিণঃ॥`
মনুসংহিতার গো-রক্ষার সরাসরি প্রমাণ হলো অষ্টম অধ্যায়ে। মনুসংহিতা ৮.২৯৮-এ গো-হত্যাকারীর জন্য কঠোর দণ্ডের বিধান দেওয়া হয়েছে। মনুসংহিতা ১১.৬০ ও ১১.১০৯-১১৬-তে গো-হত্যাকে মহাপাপ বলা হয়েছে এবং তার প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে গো-সেবার বিধান দেওয়া হয়েছে।
মনুসংহিতায় যে কয়েকটি শ্লোকে গো-মাংসের কথা বলা হয়েছে বলে প্রচার করা হয়, যেমন ৫.১৮ বা ৫.২৭, সেগুলি বহু গবেষকের মতে প্রক্ষিপ্ত। মহাভারতের অনুশাসন পর্ব ১১৫.৪০-এ বলা হয়েছে গাভীর মাংস কখনোই ভক্ষণযোগ্য নয়।
*বেদে ‘গোঘ্ন’ শব্দ নিয়েও অপব্যাখ্যা করা হয়।* প্রাচীন কোষে গোঘ্ন শব্দের অর্থ অতিথি, যার আগমনে গো-দান করা হতো। বৈদিক কালে অতিথি এলে তাকে গো-দান করা হতো, গো-বধ করে খাওয়ানো হতো না। আপস্তম্ব ধর্মসূত্র ১.৩.৯-এ বলা হয়েছে অতিথিকে মধুপর্ক দেওয়া হতো। ঋগ্বেদ ১০.৮৫-এ বিবাহ সূক্তে গাভীকে ধনের প্রতীক বলা হয়েছে, বধের প্রতীক নয়।
*ঋগ্বেদের দানস্তুতিতে গাভী দানের মহিমা বর্ণনা করা হয়েছে।* ঋগ্বেদ ৬.২৮ সম্পূর্ণ সূক্তটিই গাভীর প্রশংসায়। সেখানে বলা হয়েছে – “আ গাবো অগ্মন্নুত ভদ্রমক্রন্” – গাভীগণ এসেছে ও কল্যাণ করেছে। ঋগ্বেদ ৬.২৮.৩-এ বলা হয়েছে গাভীকে কখনো চোরের হাতে, কসাইয়ের হাতে যেতে দিও না। যজুর্বেদ ১২.৩২-এ বলা হয়েছে গাভী অদিতি, তাকে ছেদন করো না। অথর্ববেদ ১২.৪.৩৮-এ বলা হয়েছে যে গাভীকে হত্যা করে তার রক্ত-মাংসে নিজের অন্ন পুষ্ট করতে চায়, তাকে রাজা শূলে দণ্ড দেবেন।
*পঞ্চগব্যের ধারণা।* বেদ ও স্মৃতিতে গাভীর পঞ্চগব্য – দুধ, দই, ঘৃত, গোময়, গোমূত্রকে পবিত্র ও শুদ্ধিকারক বলা হয়েছে, মাংসকে নয়। আয়ুর্বেদের চরক সংহিতা সূত্রস্থান ২৭-এ গব্য ঘৃতকে শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে।
শতপথ ব্রাহ্মণ, ঐতরেয় ব্রাহ্মণ, তৈত্তিরীয় সংহিতায় গো-রক্ষার কথা আছে। শতপথ ব্রাহ্মণ ৩.১.২.২১-এ বলা হয়েছে – “গৌর্বৈ অন্নম্”। ঐতরেয় ব্রাহ্মণে বলা হয়েছে গাভী যজ্ঞের প্রাণ।
উপনিষদেও একই কথা। বৃহদারণ্যক উপনিষদ ৫.৮.১-এ বলা হয়েছে গাভী হলো সমস্ত সম্পদের মূল। ছান্দোগ্য উপনিষদে সত্যকাম জাবালের কাহিনীতে গো-সেবার মাধ্যমে ব্রহ্মজ্ঞান লাভের কথা বলা হয়েছে। মহাভারতের অনুশাসন পর্ব ৫১-তে ভীষ্ম বলছেন – “গাবো মাতা চ জগতঃ” – গাভী জগতের মাতা। ভাগবত পুরাণ ১১.১১.৪৩-এ শ্রীকৃষ্ণ বলছেন গো-রক্ষা বৈশ্য ধর্মের প্রধান কর্তব্য। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজে গোপাল, গো-রক্ষক।
বেদে ‘অঘ্ন্যা’ ছাড়াও গাভীর আরেকটি নাম ‘অদিতি’ ও ‘মহী’। অথর্ববেদ ১১.১.৩৪-এ বলা হয়েছে গাভীর দুধ, ঘৃত, দধি মানুষকে পুষ্টি দেয়। বেদে যে ‘উক্ষা’ ও ‘বশা’ শব্দ আছে, তার অর্থ বৃষ ও বন্ধ্যা গাভী, কিন্তু বন্ধ্যা গাভীকেও বধ করার বিধান বেদে নেই, তারও সেবার বিধান আছে।
বেদের অনুবাদ নিয়ে যে ষড়যন্ত্র হয়েছে তা বোঝা দরকার। ম্যাক্সমুলার, গ্রিফিথ, উইলসনের মতো বিদেশি পণ্ডিতরা বেদের ভুল অনুবাদ করেছেন। সায়ণাচার্য, মহীধরের মতো প্রাচীন ভারতীয় ভাষ্যকাররা কখনোই বেদে গো-মাংসের সমর্থন করেননি। সায়ণাচার্য ঋগ্বেদ ১০.৮৭.১৬-এর ভাষ্যে স্পষ্ট বলেছেন গো-মাংসভক্ষক দণ্ডনীয়।
অথর্ববেদ ৮.৩.১৫-তে বলা হয়েছে – যে ব্যক্তি গাভীকে হত্যা করে, তার হৃদয়ে বজ্রাঘাত হোক। ঋগ্বেদ ১০.১৬৯-এ গাভীর প্রতি মঙ্গলকামনা করা হয়েছে – “মা বো মৃগঃ আয়াত, মা বো দস্যুঃ” – তোমাদের কাছে যেন বাঘ না আসে, দস্যু না আসে।
পুরাণ ও স্মৃতিতে গো-দানের ফল অসীম বলা হয়েছে। পদ্মপুরাণ সৃষ্টি খণ্ড ৫৭.১৮৪-তে বলা হয়েছে একটি গাভী দান করলে পৃথিবী দানের ফল হয়। স্কন্দপুরাণে বলা হয়েছে গাভীর সেবা করলে সমস্ত তীর্থের ফল হয়।
শেষ কথা হলো – বেদ, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক, উপনিষদ, মনুসংহিতা, মহাভারত, পুরাণ – সমস্ত শাস্ত্রে একই সুর – “মাতরঃ সর্বভূতানাং গাবঃ” – গাভী সকল প্রাণীর মাতা। মাতাকে কেউ হত্যা করে খায় না, মাতার সেবা করে। তাই বেদে গো-মাংসের রীতি ছিল – এই ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত, প্রক্ষিপ্ত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপব্যাখ্যা।