✍️ শ্রী সন্দীপ মুখোপাধ্যায়
পঞ্চানন বর্মা জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮৬৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি, তৎকালীন কোচবিহার রাজ্যের মাথাভাঙ্গা মহকুমার খলিসামারি গ্রামে। এই অঞ্চলটি বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার অন্তর্গত। তাঁর পিতৃদত্ত নাম ছিল পঞ্চানন সরকার। পিতা খোশাল চন্দ্র সরকার ছিলেন একজন সম্ভ্রান্ত জোতদার এবং মাথাভাঙ্গা মহকুমা কাচারির একজন মোক্তার, আর মাতা ছিলেন চম্পলা দেবী। একটি কৃষিজীবী জোতদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও বাল্যকাল থেকেই তাঁর মধ্যে শিক্ষা ও আত্মমর্যাদা বোধ প্রবল ছিল। সেই সময়ে রাজবংশী সমাজ শিক্ষা-দীক্ষায় অনেক পিছিয়ে ছিল, উচ্চবর্ণের দ্বারা অবহেলিত ছিল, কিন্তু পঞ্চাননের পরিবার তাঁকে শিক্ষার পথে এগিয়ে দিতে কার্পণ্য করেনি। তাঁর শৈশবের এই গ্রামীণ পরিবেশই তাঁকে পরবর্তীকালে কৃষক ও দরিদ্র মানুষের বেদনা গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করেছিল।
তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় গ্রামের পাঠশালায়, পরে তিনি কোচবিহারের বিখ্যাত জেনকিন্স স্কুলে ভর্তি হন। সেখান থেকে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি কোচবিহার ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে এফ.এ পরীক্ষা পাস করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি কলকাতায় আসেন এবং বঙ্গবাসী কলেজ থেকে ১৮৯৩ সালে সংস্কৃত ভাষায় অনার্স সহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। রাজবংশী সম্প্রদায়ের মধ্যে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি স্নাতক হন। শুধু স্নাতকই নয়, তিনি থেমে থাকেননি। ১৮৯৬ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে মানসিক ও নৈতিক দর্শনে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীকালে ১৯০০ সালে রিপন কলেজ, যা বর্তমানে সুরেন্দ্রনাথ আইন কলেজ নামে পরিচিত, সেখান থেকে এল.এল.বি ডিগ্রি লাভ করেন। তিনিই ছিলেন রাজবংশী সমাজের প্রথম এম.এ এবং প্রথম আইনের স্নাতক।
শিক্ষাজীবন শেষ করার পর তিনি কোচবিহার রাজ্যে একটি সম্মানজনক চাকরি প্রার্থনা করেছিলেন, কিন্তু কোচবিহার রাজদরবার তাঁকে উপযুক্ত মর্যাদা দেয়নি। এই অবহেলা তাঁর মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। ফলে ১৯০১ সালে তিনি ব্রিটিশ বাংলার রংপুরে গিয়ে আইন ব্যবসা শুরু করেন। রংপুর আদালতে তিনি দ্রুত একজন মেধাবী ও সৎ আইনজীবী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। এখানেই তাঁর জীবনের একটি মোড় ঘোরানো ঘটনা ঘটে। একদিন আদালতে একজন উচ্চবর্ণের আইনজীবী পঞ্চানন বর্মার ব্যবহৃত টোগা বা আইনজীবীর গাউন পরতে অস্বীকার করেন, কারণ পঞ্চানন রাজবংশী সম্প্রদায়ের। এই জাতিগত অপমান তাঁকে ভিতর থেকে নাড়িয়ে দেয়। তিনি উপলব্ধি করেন যে ব্যক্তিগত শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠা দিয়ে সমাজের অপমান মোচন করা যাবে না, এর জন্য দরকার সমগ্র জাতির জাগরণ। এই ঘটনাই তাঁকে সমাজ সংস্কারের পথে ঠেলে দেয়।
রংপুরে আইন ব্যবসার পাশাপাশি তিনি সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে যুক্ত করেন। তিনি ছিলেন রংপুর সাহিত্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে একজন। এই পরিষদের মুখপত্র রংপুর সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব তিনি ১৩১৩ থেকে ১৩১৯ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত পালন করেন। এই পত্রিকায় তিনি বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ লিখেছিলেন। তাঁর লেখা ‘কামতাবিহারী সাহিত্য’ প্রবন্ধটি আজও গবেষকদের কাছে অমূল্য সম্পদ। এছাড়াও তিনি প্রাচীন পুঁথি সংগ্রহ ও গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন। তিনি ‘গোবিন্দ মিশ্রের গীতা’র পুঁথি আবিষ্কার করেন এবং দ্বিজ কমল লোচনের চণ্ডিকা বিজয় কাব্যের টীকা প্রকাশ করেন ১৯১৫ সালে। এই সাহিত্যচর্চা প্রমাণ করে যে তিনি কেবল একজন আইনজীবী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন প্রাবন্ধিক, গবেষক এবং ইতিহাস সচেতন মানুষ।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহাসিক কর্মকাণ্ড হল ক্ষত্রিয় আন্দোলন। তৎকালীন সময়ে রাজবংশীদের কোচ বা নিম্নবর্ণ হিসেবে দেখা হতো এবং তাদের ব্রাত্য ক্ষত্রিয় বলা হতো। পঞ্চানন বর্মা ইতিহাস ও শাস্ত্র ঘেঁটে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে রাজবংশীরা আসলে প্রাচীন কামতাপুর রাজ্যের ক্ষত্রিয় বংশধর, যারা বিভিন্ন কারণে ব্রাত্য হয়ে পড়েছে। এই আত্মপরিচয় ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি ১৯১০ সালের ১লা মে, বাংলা ১৩১৭ সালের ১৮ জ্যৈষ্ঠ রংপুরে প্রতিষ্ঠা করেন ক্ষত্রিয় সমিতি। এই সমিতির উদ্দেশ্য ছিল রাজবংশীদের মধ্যে ক্ষত্রিয় সংস্কার, শিক্ষা ও ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা। এই সমিতির মাধ্যমেই তিনি সমগ্র উত্তরবঙ্গ, অসম, এবং বিহারের পূর্ণিয়া অঞ্চলের রাজবংশীদের একত্রিত করেন।
ক্ষত্রিয় সমিতির কার্যক্রম কেবল আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর একটি বৈপ্লবিক দিক ছিল গণ-উপনয়ন। বাংলা ১৩১৯ সালের ২৭ মাঘ, পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে তিনি লক্ষাধিক রাজবংশী মানুষের এক বিশাল মিলনক্ষেত্র ও গণ-উপনয়নের আয়োজন করেন। সেখানে হাজার হাজার রাজবংশী যুবককে বৈদিক মন্ত্রে উপবীত ধারণ করানো হয় এবং তাদের ক্ষত্রিয় হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এটি ছিল ব্রিটিশ ভারতে একটি নীরব সামাজিক বিপ্লব। এর ফলে রাজবংশীদের মধ্যে আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত হয়, তারা আর নিজেদের ছোট মনে করত না। যদিও কোচবিহারের রাজা এই আন্দোলনকে কখনোই সমর্থন করেননি, বরং বিভিন্ন মিলনক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করেছিলেন, তবুও এই আন্দোলনকে দমানো যায়নি।
শিক্ষা বিস্তারের জন্য তাঁর অবদান ছিল অসামান্য। তিনি বুঝেছিলেন শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতির উন্নতি সম্ভব নয়। রংপুর জেলা স্কুলে রাজবংশী ছাত্ররা থাকার জায়গা পেত না, উচ্চবর্ণের ছাত্রাবাসে তাদের প্রবেশাধিকার ছিল না। এই সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি ১৯১৩ সালে রংপুরে ক্ষত্রিয় ছাত্রাবাস প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে তিনি কুচবিহার, জলপাইগুড়ি, দিনাজপুর সহ বিভিন্ন জায়গায় বহু ছাত্রাবাস ও হোস্টেল তৈরি করেন। তিনি নিজের অর্থ ব্যয় করে বহু দরিদ্র মেধাবী ছাত্রকে পড়াশোনার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। তাঁর আহ্বানে বহু রাজবংশী পরিবার তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে শুরু করে, যা আগে কল্পনাও করা যেত না।
অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই ছিল আজকের দিনের মাইক্রোফাইনান্সের অগ্রদূত। তিনি দেখেছিলেন যে গ্রামের গরিব কৃষকরা জোতদার ও মহাজনদের কাছে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যাচ্ছে। এই শোষণ থেকে মুক্তি দিতে তিনি একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নেন। তিনি বর্মা কোম্পানি নামে একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন এবং ১৯২০-২১ সালে কুড়িগ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন ক্ষত্রিয় ব্যাঙ্ক। এটি ছিল অবিভক্ত ভারতের প্রথম গ্রামীণ কৃষি ব্যাঙ্কগুলির মধ্যে একটি। এই ব্যাঙ্কের মূল উদ্দেশ্য ছিল কৃষকদের সহজ শর্তে ও কম সুদে ঋণ দেওয়া, যাতে তারা মহাজনদের হাত থেকে বাঁচতে পারে। আজ আমরা যাকে মাইক্রোক্রেডিট বলি, তা তিনি একশো বছর আগেই শুরু করেছিলেন।
নারী সুরক্ষা ও নারী ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে পঞ্চানন বর্মা ছিলেন তাঁর সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে। ১৯২৩ সালে রংপুর অঞ্চলে নারী অপহরণ ও ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে গিয়েছিল। সেই সময়ে সমাজ ধর্ষিতা নারীদের গ্রহণ করত না। কিন্তু পঞ্চানন বর্মা সাহসের সঙ্গে তাদের পাশে দাঁড়ান। তিনি নারী রক্ষা উপসমিতি এবং ক্ষত্রিয় সমিতির অধীনে নারী রক্ষা বিভাগ গঠন করেন। তিনি নারীদের জন্য আশ্রম তৈরি করেন, যেখানে তাদের লাঠি খেলা, তরোয়াল চালনা, কুস্তি এবং অন্যান্য আত্মরক্ষামূলক কৌশল শেখানো হতো। তিনি চেয়েছিলেন নারীরা নিজেরাই নিজেদের রক্ষা করতে শিখুক এবং স্বনির্ভর হোক। এই সময়ে তিনি কামতাপুরী ভাষায় তাঁর বিখ্যাত ও জ্বালাময়ী কবিতা ‘ডাংধরি মাও’ রচনা করেন, যার অর্থ হল লাঠিধারী মা। এই কবিতার মাধ্যমে তিনি যুবকদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
সাহিত্য ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ভোলার নয়। তিনি তাঁর সম্প্রদায়ের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ‘ক্ষত্রিয়’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করতেন। এই পত্রিকাটি ছিল রাজবংশীদের মুখপত্র। এছাড়াও তিনি কামতাপুরী ভাষায় বহু গল্প ও কবিতা লিখেছেন। তাঁর লেখা ‘নাদিম পুরামনিকের পাঠ’, ‘জগন্মোহিনী বিলা’ ইত্যাদি কামতাপুরী সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। তিনি বিশ্বাস করতেন যে মাতৃভাষায় শিক্ষা ও সাহিত্যচর্চা না হলে জাতির প্রকৃত জাগরণ হবে না। তাই তিনি সবসময় কামতাপুরী ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশে জোর দিতেন।
রাজনৈতিক জীবনেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সফল। তিনি চেয়েছিলেন রাজবংশীদের অধিকার আইনসভায় গিয়ে তুলে ধরতে। ১৯২০ সালে তিনি বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯২৩ এবং ১৯২৬ সালেও তিনি বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। আইন পরিষদের সদস্য হিসেবে তিনি বহু গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি ছিলেন বেঙ্গল টেনেন্সি অ্যাক্ট ১৮৮৫ সংশোধন কমিটি, বোর্ড অফ ইকোনমিক এনকোয়ারি ১৯৩০-৩১, বেঙ্গল মানি লেন্ডার অ্যাক্ট এবং ডেটর সেটেলমেন্ট বোর্ডের সদস্য। এই সমস্ত জায়গায় তিনি কৃষক ও দরিদ্র মানুষের স্বার্থে কথা বলতেন। তাঁর আইনি জ্ঞান এবং যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য ব্রিটিশ সরকারকেও ভাবতে বাধ্য করত।
তাঁর জনপ্রিয়তা এবং ক্ষত্রিয় আন্দোলনের তেজ দেখে কোচবিহার রাজ প্রশাসন ভয় পেয়ে যায়। তারা মনে করেছিল এই আন্দোলন রাজতন্ত্রের জন্য হুমকি। তাই ১৯২৬ সালে কোচবিহার রাজ্য থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয় এবং আদেশ জারি করা হয় যে বিশেষ অনুমতি ছাড়া তিনি কোচবিহার রাজ্যে প্রবেশ করতে পারবেন না। নিজের জন্মভূমি থেকেই তাঁকে নির্বাসিত করা হল। কিন্তু তাতেও তাঁর আন্দোলন থেমে থাকেনি। তিনি রংপুর এবং জলপাইগুড়ি থেকেই তাঁর কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান। এই বহিষ্কারই প্রমাণ করে যে তিনি কতটা শক্তিশালী সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা করেছিলেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ব্রিটিশ সরকারকে সাহায্য করার জন্য রাজবংশী যুবকদের নিয়ে একটি সৈন্যদল গঠন করেন। তিনি চেয়েছিলেন রাজবংশী যুবকরা সামরিক প্রশিক্ষণ পাক এবং তাদের মধ্যে বীরত্ব ও শৃঙ্খলাবোধ জাগ্রত হোক। তিনি পুরুষ ও মহিলা উভয়ের জন্যই শারীরিক শিক্ষা ও লাঠি-তরোয়াল খেলার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে একটি দুর্বল জাতি কখনোই নিজের অধিকার আদায় করতে পারে না, এর জন্য দরকার শারীরিক ও মানসিক শক্তি। তাঁর এই সৈনিকীকরণের চিন্তা পরবর্তীকালে বহু যুবককে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে অনুপ্রাণিত করেছিল।
তাঁর ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারের আরেকটি দিক ছিল ব্রাহ্মণ্য মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। তিনি চেয়েছিলেন রাজবংশীরা তাদের হিন্দু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সঠিকভাবে পালন করুক। তিনি অনেক শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতকে দিয়ে রাজবংশীদের ক্ষত্রিয়ত্বের শাস্ত্রীয় প্রমাণ সংগ্রহ করিয়েছিলেন। কাশী ও মিথিলার পণ্ডিতরা রাজবংশীদের ক্ষত্রিয় হিসেবে স্বীকৃতি দেন। এর ফলে রাজবংশীরা বৈদিক মতে বিবাহ, উপনয়ন এবং অন্যান্য সংস্কার পালন করার অধিকার ফিরে পায়। এটি তাদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে বিরাট ভূমিকা পালন করে।
তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল অত্যন্ত সাধারণ ও সৎ। তিনি প্রচুর অর্থ উপার্জন করলেও তার অধিকাংশই সমাজের কাজে ব্যয় করতেন। তিনি নিজে খদ্দরের ধুতি-পাঞ্জাবি পরতেন এবং অত্যন্ত সাদামাটা জীবনযাপন করতেন। তাঁর বাড়িতে সবসময় দরিদ্র ছাত্র এবং অসহায় মানুষের ভিড় লেগে থাকত। তিনি কখনো কাউকে ফিরিয়ে দিতেন না। তাঁর সততা ও নিষ্ঠার জন্য ব্রিটিশ সরকার তাঁকে রায় সাহেব উপাধি দেয়। পরবর্তীকালে মানুষ ভালোবেসে তাঁকে ঠাকুর পঞ্চানন বলে ডাকতে শুরু করে। ঠাকুর শব্দটি এখানে দেবতা অর্থে নয়, বরং শ্রদ্ধা ও গুরুর আসনে তাঁকে বসানো হয়েছিল।
১৯৩৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কলকাতায় এই মহান মনীষীর জীবনাবসান হয়। তাঁর মৃত্যুতে সমগ্র উত্তরবঙ্গ, অসম এবং রংপুর অঞ্চলে শোকের ছায়া নেমে আসে। তাঁর মৃতদেহ কলকাতা থেকে রংপুরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং সেখানে বহু মানুষের উপস্থিতিতে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। তাঁর মৃত্যুর পরেও তাঁর প্রতিষ্ঠিত ক্ষত্রিয় সমিতি বহু বছর ধরে কাজ চালিয়ে গেছে। তাঁর আদর্শ আজও রাজবংশী সমাজকে পথ দেখায়।
তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পরেও তাঁর অবদানকে স্মরণ করা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০১২ সালে কোচবিহারে তাঁর নামে কোচবিহার পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি তাঁর শিক্ষা বিস্তারের স্বপ্নকেই বাস্তবায়িত করছে। এছাড়াও উত্তরবঙ্গের বহু স্কুল, কলেজ, রাস্তা, এবং প্রতিষ্ঠানের নাম তাঁর নামে নামকরণ করা হয়েছে। ২০২০ সালের ১ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁর জন্মদিন, ১৩ ফেব্রুয়ারিকে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং প্রতিটি স্কুলে তাঁর জন্মজয়ন্তী পালনের নির্দেশ দিয়েছে।
পরিশেষে বলা যায় যে ঠাকুর পঞ্চানন বর্মা ছিলেন একজন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মানুষ। তিনি একাধারে ছিলেন আইনজীবী, সমাজ সংস্কারক, রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ এবং নারী মুক্তির অগ্রদূত। তিনি একটি পিছিয়ে পড়া, অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে আত্মমর্যাদা ও আত্মপরিচয় ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি শুধু রাজবংশী সমাজেরই নন, সমগ্র বাংলার নবজাগরণের একজন অন্যতম পথিকৃৎ। তাঁর অর্থনৈতিক সংস্কার, মাইক্রোফাইনান্সের ধারণা, নারী ক্ষমতায়নের চিন্তা আজকের দিনেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তাই তাঁকে শুধু রাজবংশী সমাজের জনক বললে ভুল হবে, তিনি ছিলেন সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের একজন আলোকিত মানুষ।