জয়প্রকাশ থেকে জনসংঘ, গান্ধীবাদী সমাজতন্ত্র থেকে রামরাজ্য



Updated: 02 October, 2026 5:15 am IST

✍️ শ্রী সন্দীপ মুখোপাধ্যায়

ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে জয়প্রকাশ নারায়ণের জীবন এক বিস্ময়কর বৌদ্ধিক বিবর্তনের দলিল। যে মানুষটি একদা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় মার্কসবাদের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন, শ্রমিক আন্দোলনকে মুক্তির একমাত্র পথ বলে মনে করেছিলেন, তিনিই পরবর্তী জীবনে হয়ে উঠলেন গান্ধীবাদী সমাজতন্ত্রের সবচেয়ে প্রখর ভাষ্যকার। এই পরিবর্তন কোনো আকস্মিক মোহভঙ্গ নয়, ছিল গভীর উপলব্ধির ফসল।

তরুণ জয়প্রকাশ মার্কসবাদী ছিলেন ঠিকই, কিন্তু তিনি ছিলেন প্রচলিত অর্থে দলীয় মার্কসবাদী নন। তিনি দ্রুত বুঝেছিলেন, সোভিয়েত মডেলের রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত সমাজতন্ত্রে রাষ্ট্রই এক নতুন শোষকে পরিণত হয়। সেখানে ব্যক্তি স্বাধীনতা খর্ব হয়, ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয় একটি পার্টির হাতে। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Why Socialism’ এ তিনি স্পষ্ট লিখেছেন, অর্থনৈতিক সাম্য যদি নৈতিক স্বাধীনতাকে হত্যা করে, তবে সে সাম্য অর্থহীন। এই বোধই তাঁকে ধীরে ধীরে মহাত্মা গান্ধীর দিকে ঠেলে দেয়।

জয়প্রকাশের এই বৌদ্ধিক যাত্রার সমান্তরালেই আরেকটি যাত্রা চলছিল, যার কেন্দ্রে ছিলেন পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়। জয়প্রকাশ যেমন মার্কসবাদের ভেতর থেকে তার সীমাবদ্ধতা দেখেছিলেন, দীনদয়ালজি তেমনি বাইরে থেকে মার্কসবাদের দার্শনিক ভিত্তিকেই প্রশ্ন করেছিলেন। ১৯৬৫ সালে মুম্বাইয়ে প্রদত্ত তাঁর চারটি ঐতিহাসিক ভাষণ, যা পরে ‘একাত্ম মানববাদ’ গ্রন্থে সংকলিত হয়, সেখানে তিনি স্পষ্ট বলেন – মার্কসবাদ মানুষকে কেবল একটি অর্থনৈতিক জীব হিসেবে দেখে, তার আত্মা, সংস্কৃতি ও ধর্মকে অস্বীকার করে। তৎকালীন ‘Organiser’ এবং ‘Panchjanya’ পত্রিকায় তিনি লিখেছিলেন, মার্কসবাদের শ্রেণী-সংগ্রাম তত্ত্ব ভারতের জন্য প্রযোজ্য নয়, কারণ ভারতের সমাজ শ্রেণী-সংঘর্ষের নয়, শ্রেণী-সমন্বয়ের সমাজ।

গান্ধীবাদী দর্শনের মধ্যে জয়প্রকাশ যা খুঁজে পেয়েছিলেন, তা হলো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের এক মৌলিক দর্শন। মার্কসবাদ যেখানে শ্রেণী সংগ্রামের কথা বলে, গান্ধীবাদ সেখানে শ্রেণী সমন্বয়ের কথা বলে। জয়প্রকাশের কাছে স্বরাজ মানে কেবল ইংরেজদের তাড়ানো নয়, স্বরাজ মানে গ্রাম থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত প্রতিটি মানুষের স্বশাসনের অধিকার। তিনি গান্ধীর সর্বোদয় ধারণাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করলেন। সর্বোদয় মানে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের কল্যাণ নয়, অন্তিম ব্যক্তি থেকে শুরু করে সকলের উদয়। এই ধারণাই পরে তাঁর সমগ্র বিপ্লবের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

এই প্রেক্ষিতেই দীনদয়ালজির একাত্ম মানববাদকে বুঝতে হবে। তিনি মার্কসবাদের তিনটি মূল স্তম্ভকে সরাসরি খণ্ডন করেন। প্রথমত, মার্কসবাদ ইতিহাসকে শুধু অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বের ইতিহাস বলে, দীনদয়ালজি বলেন ইতিহাস হলো ধর্ম, সংস্কৃতি ও পুরুষার্থের সমন্বয়ের ইতিহাস। দ্বিতীয়ত, মার্কসবাদ বলে ধর্ম হলো আফিম, দীনদয়ালজি বলেন ধর্ম হলো সেই নৈতিক ধারক যা অর্থ ও কামকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাঁর চতুর্বিধ পুরুষার্থ – ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ – এই ধারণা মার্কসবাদের একমুখী অর্থনৈতিক নির্ধারণবাদের সম্পূর্ণ বিপরীত। তৃতীয়ত, মার্কসবাদ চায় রাষ্ট্রের হাতে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করতে, একাত্ম মানববাদ চায় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, অর্থাৎ অন্ত্যোদয়। এই কারণেই তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক নেতা ড. রামমনোহর লোহিয়া, যিনি নিজেও মার্কসবাদের কঠোর সমালোচক ছিলেন, দীনদয়ালজির গ্রাম-কেন্দ্রিক চিন্তার সাথে সহমত পোষণ করতেন।

স্বাধীনতার পর কংগ্রেসের ক্ষমতা-কেন্দ্রিক রাজনীতি এবং নেহরু মডেলের কেন্দ্রীভূত পরিকল্পনায় জয়প্রকাশ হতাশ হন। তিনি মনে করতেন, দিল্লি থেকে পরিকল্পনা চাপিয়ে দিলে ভারতের আত্মা বাঁচবে না। তিনি সর্বোদয় আন্দোলনে যোগ দেন, ভূদান আন্দোলনের সঙ্গী হন। গ্রামে গ্রামে ঘুরে তিনি বোঝাতে চাইলেন, রাষ্ট্রের হাতে সব ক্ষমতা না দিয়ে, মানুষের হাতে ক্ষমতা দিতে হবে। এই ছিল তাঁর গান্ধীবাদী সমাজতন্ত্র।

এই গান্ধীবাদী সমাজতন্ত্রই ১৯৭৪ সালের সম্পূর্ণ বিপ্লবের জন্ম দেয়। তিনি যখন দেখলেন দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ চরমে পৌঁছেছে, তখন তিনি ছাত্র ও যুব সমাজকে আহ্বান জানালেন। সেই আন্দোলনই ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দেয়। ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থা সেই আন্দোলনকে এক ঐতিহাসিক পরিণতি দেয়।

জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ময়দানে এক অভূতপূর্ব সমন্বয় ঘটে। সমাজতন্ত্রী, গান্ধীবাদী, জনসঙ্ঘ, কংগ্রেস বিরোধী সকলে এক মঞ্চে আসেন। এই ঐক্য থেকেই ১৯৭৭ সালে জনতা পার্টির জন্ম। এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় জনসংঘ, যা পরবর্তীতে ভারতীয় জনতা পার্টি, তারা নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় বিসর্জন দিয়ে জনতা পার্টিতে বিলীন হয়ে যায়। এর কারণ ছিল জয়প্রকাশ নারায়ণের নৈতিক আস্থা। তিনি বিশ্বাস করতেন, জনসংঘের কর্মীরা গান্ধীবাদী সর্বোদয়ের সৈনিক হতে পারবে। এই সন্ধিক্ষণে জয়প্রকাশ ও দীনদয়াল – দুই ধারার মিলন ঘটে। সমাজতান্ত্রিক নেতা মধু লিময়ে তাঁর ‘Janata Party Experiment’ বইতে লিখেছেন, “জনসংঘের কর্মীদের শৃঙ্খলা ও নিঃস্বার্থতা ছাড়া সম্পূর্ণ বিপ্লব সফল হতো না।”

১৯৮০ সালে জনতা পার্টি ভেঙে যাওয়ার পর যখন ভারতীয় জনতা পার্টির জন্ম হয়, তখন তার সংবিধানে যে পাঁচটি মৌলিক নীতি গৃহীত হয়, তার মধ্যে দুটি হলো একাত্ম মানববাদ এবং গান্ধীবাদী সমাজতন্ত্র। এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। বিজেপির সংবিধানের ধারা ২-এ স্পষ্ট লেখা আছে – “Integral Humanism and Gandhian Socialism shall be the basic philosophy of the Party.” অর্থাৎ জয়প্রকাশের মার্কসবাদ-বিরোধী গান্ধীবাদী সমাজতন্ত্র এবং দীনদয়ালজির মার্কসবাদ-বিরোধী একাত্ম মানববাদ – দুটিই একসাথে দলের দার্শনিক ভিত্তি হয়ে গেল। এই বিষয়টিকে ‘নেহরুভিয়ান সমাজতন্ত্রের বিকল্প হিসেবে গান্ধী-দীনদয়াল মডেল’ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে।

এখানেই রামরাজ্যের ধারণাটি নতুনভাবে বুঝতে হবে। রামরাজ্যকে যারা কেবল ধর্মীয় স্লোগান বলে মনে করেন, তারা গান্ধীকে পড়েননি। গান্ধীজি তাঁর ‘হিন্দ স্বরাজ’ গ্রন্থে রামরাজ্য বলতে বুঝিয়েছেন এমন এক আদর্শ রাষ্ট্র, যেখানে কোনো বৈষম্য থাকবে না, যেখানে শেষ ব্যক্তিটিও ন্যায় পাবে। গান্ধীর রামরাজ্য মানে ছিল সাম্য, ন্যায় এবং নৈতিকতার শাসন।

এই ধারাবাহিকতা আজকের নীতিতে কীভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে, তা দেখা প্রয়োজন। ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাস, সবকা প্রয়াস’ – এই মন্ত্রটি আপাতদৃষ্টিতে আধুনিক মনে হলেও, এর দার্শনিক ভিত্তি গভীরভাবে সর্বোদয় ও অন্ত্যোদয়ের মধ্যেই নিহিত। সর্বোদয় মানে সকলের উদয়, অন্ত্যোদয় মানে অন্তিম ব্যক্তির উদয়। সবকা সাথ মানে সেই সর্বোদয়কেই আধুনিক ভাষায় প্রকাশ করা।

এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো নারীর অধিকার। গান্ধীজি এবং জয়প্রকাশ উভয়েই মনে করতেন, নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া স্বরাজ অসম্পূর্ণ। গান্ধীজি তাঁর আশ্রমে নারী-পুরুষের সমান মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জয়প্রকাশ সম্পূর্ণ বিপ্লবেও নারীদের সামনের সারিতে এনেছিলেন। আজ যখন সংসদে তেত্রিশ শতাংশ নারী সংরক্ষণ বিল পাশ হয়, তখন তা সেই গান্ধীবাদী রামরাজ্যেরই আইনি রূপ।

একইভাবে সামাজিক সাম্যের প্রশ্নটিও দেখতে হবে। বিজেপির নীতিতে সকলের জন্য সমান সুযোগের কথা বলা হয়। জনধন যোজনা থেকে আবাস যোজনা, কোনো প্রকল্পেই জাত বা ধর্ম দেখা হয় না। এটি মার্কসবাদের শ্রেণী-বিভাজনের বিপরীত, এটি গান্ধীবাদের সর্বোদয়ের পথ, যেখানে রাষ্ট্র সকলের জন্য মা-এর মতো কাজ করে।

আজকের প্রজন্মের কাছে এই ইতিহাস জানা জরুরি। একজন কংগ্রেস সমর্থক যখন গান্ধীবাদী সমাজতন্ত্রের কথা বলেন, তখন তিনি জয়প্রকাশের উত্তরাধিকারী। আবার একজন বিজেপি সমর্থক যখন রামরাজ্য ও অন্ত্যোদয়ের কথা বলেন, তিনিও সেই একই উত্তরাধিকারের অংশীদার। দুটি ধারা আপাতদৃষ্টিতে আলাদা মনে হলেও, উভয়ের উৎস এক – ভারতীয় চিন্তার সেই সমন্বয়বাদী দর্শন।

অতএব, জয়প্রকাশ নারায়ণের মার্কসবাদ থেকে গান্ধীবাদের দিকে যাত্রা এবং দীনদয়াল উপাধ্যায়ের পাশ্চাত্য বাদ থেকে ভারতীয় একাত্ম মানববাদের দিকে যাত্রা – দুটি যাত্রা কোনো ব্যক্তিগত যাত্রা ছিল না, তা ছিল ভারতের রাজনৈতিক দর্শনের এক বৃহত্তর যাত্রা। সেই যাত্রা জনতা পার্টি হয়ে ভারতীয় জনতা পার্টির সংবিধানে স্থান পেয়েছে এবং আজ সবকা সাথ, সবকা বিকাশের মতো নীতির মধ্যে দিয়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে। রামরাজ্য তাই কোনো অতীতের স্বপ্ন নয়, তা হলো সর্বোদয়ের আধুনিক নাম।

ভারতীয় জনতা পার্টি ইতিহাসকে স্মরণ করে গান্ধী সংকল্প যাত্রা করে,গান্ধীবাদ তাই আজও প্রাসঙ্গিক।

(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)