গণতন্ত্রে নির্বাচিত সরকারকে অস্বীকার করে যেকোন আন্দোলন অশনি সঙ্কেত



Updated: 29 July, 2026 9:42 am IST
ছবি: দিল্লীতে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন
ছবি: দিল্লীতে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন

© শ্রী রঞ্জন কুমার দে 

জেনজির হাত ধরে একটি নির্বাচিত সরকারকে উপড়ে ফেলে শর্টকাটে বিরোধী শক্তি অকালে ক্ষমতার স্বাদ নিতে চেয়েছিলো।সরকারকে নাস্তানুবাদ করতে বিরোধীরা যখন অপ্রাসঙ্গিক, একের পর এক রাজ্য কংগ্রেস সহ আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর হাতছাড়া হচ্ছে তখন কেন্দ্র সরকারকে বিঁধতে পেছনের দরজা দিয়ে ছাত্রসমাজকে উস্কানি দেওয়া হচ্ছিলো। বিদেশের মাটি থেকে বেশ কিছুদিন যাবৎ কিছু ইউটিউবার দেশের ছাত্র শক্তিকে উস্কানি দিয়ে আসছিল সেটা ধুরন্ধর সিনেমাই হোক বা দেশের যেকোন রাজনৈতিক ইস্যুতে। শুধু নিট কেন যেকোন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসই দুর্ভাগ্যজনক, হতাশাজনক এবং কঠিন বিচারের দাবিদার।কেন্দ্র সরকার তৎক্ষণাৎ নিটের প্রশ্ন ফাঁসে আন্দোলনকারীদের সাথে আলোচনা না করলেও প্রাথমিকভাবে একটা তদন্ত কমিটি বানিয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে পুনরায় পরীক্ষা নিয়ে সুষ্ঠভাবে ফলাফলও ঘোষণা করে দেয়। তাছাড়া এই প্রশ্ন ফাঁস উদ্ঘাটনে সিবিআইকে দায়িত্ব দিয়ে কয়েকজন তৎক্ষণাৎ আটক এবং চাকরি থেকে নিলম্বিতও করা হয়। কিন্ত প্রথম থেকেই কিছু আঁচ করা যাচ্ছিলো যে নিট পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসকে ইস্যু করে একটা গোপন শক্তি প্রকৃতভাবে বাংলাদেশ, নেপালের মতো সরকারের পতন ঘটিয়ে একটা উশৃঙ্খল পরিস্থিতি বানানোর ষড়যন্ত্র করছে।

যত সময় ঘনিয়ে এসেছে এটা পরিষ্কার হয়েছে যে এই আন্দোলন শুধু বাচ্চাদের ভবিষ্যতে সীমাবদ্ধ নয় বরং সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণীত।বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি এই সুযোগে ছাত্রদের স্বার্থ থেকে নিজেদের ভাগ্য চমকানোর একটা সুযোগ লুফে নিতে চেয়েছিলেন।একই সাথে এটাও উঠে এসেছে যে একটা অনশন মঞ্চে কীভাবে কিছু বিকৃত রাজনৈতিক আদর্শের ব্যক্তি সার্বজনীনভাবে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করার। আমরা দেখেছি আন্দোলনে উপস্থিত কিছু জনতার হাতে প্লেকার্ডে লেখা “ব্রাহ্মণবাদ মুরদাবাদ, হিন্দুধর্ম মুর্দাবাদ।”,”কাশ্মীর চায় আজাদী, মনুবাদ সে আজাদী।” কৌতুক অভিনেতারা ভরা মঞ্চে প্রভু শ্রী রামকে অবমাননা করে উপস্থিত নির্লজ্জদের হাঁসির দাঁতের ফাঁকে সহজেই কুড়িয়েছেন বাহবা। অথচ একই মঞ্চে গাওয়া হল পাকিস্তানি কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের “লাজিম হ্যায় কি হাম ভি দেখেঙ্গে” যার মধ্যে ‘বাস নাম রাহেগা আল্লাহ কা’ লাইনটিও রয়েছে। হিন্দু ধর্মগুরু প্রেমানন্দ মহারাজকে উদ্দেশ্য করেও বলা হয়েছে কটু কথা। বামপন্থীরা চিরাচরিতভাবে নিজেদের ফর্মে ছিলো, তাদের স্লোগান ছিলো,”আমার লিঙ আমার আজাদী”,”ইয়ে আজাদী জোটা হ্যায়” প্রভৃতি।

সরকারকে যখন বিশেষ কোন স্পর্শকাতর ইস্যুতে টনক নড়ানোর সময় আসে, তখন নিশ্চিত অনশনের মতো অহিংস আন্দোলনের কোন বিকল্প নেই। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামী মোহনচাঁদ করমচাঁদ গান্ধী পুরো রাজনৈতিক জীবনে ১৯১৮ সাল থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত মোট ১৫ বার অনশন ধর্মঘট করেন, যার মধ্য সর্বোচ্চ অনশন টানা ২১দিন ছিলো।গান্ধীজির ভাষায়, “উপবাস হলো সেই শেষ প্রন্থা যার মাধ্যমে এক ব্যক্তি তলোয়ারের বিকল্প বেছে নেন। “উনার অনশন ছিলো সাম্প্রদায়িক হিংসা,জাতিগত বিভেদ ও প্রতিহিংসামূলক রাজনীতি এর বিপক্ষে। নিঃসন্দেহে গান্ধীজির অহিংসা আন্দোলন ব্রিটিশ শাসনের ভিত অনেকটা নাড়িয়ে দিতে পেরেছিলো এবং উনার অনেক দাবিদাওয়ার কাছে তারা নত মস্তক হতে বাধ্য হয়েছিলো, কিন্তু মুসলিম লিগ কর্তৃক সাম্প্রদায়িক হিংসায় উনার অনশন মোটেও মৌলবাদীদের চেতনায় কোন ইতিবাচক সাড়া জাগাতে পারে নি। এভাবেই উনার জীবনের শেষ অনশনটি ভারাক্রান্ত মনে ইতি ঘটে। যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীরা যে সংবিধানের বই বুকে নিয়ে প্রতিবাদ করেছেন, সেই সংবিধান প্রণেতা ডক্টর বি.আর.আম্বেদকর অনশন ধর্মঘট নিয়ে বিপরীত অবস্থান নিয়েছিলেন। ১৯৪৯ সালে প্রদত্ত এক ঐতিহাসিক ভাষণে আম্বেদকর বলেছিলেন যে, সংবিধানের আওতায় মতামত প্রকাশ ও ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ যখন বিদ্যমান, তখন অনশন ও আইন অমান্য আন্দোলনের মতো পদ্ধতির পরিবর্তে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ারই আশ্রয় নেওয়া উচিত।তিনি সতর্ক করেছিলেন যে, এমনটা না ঘটলে এই পদ্ধতিগুলো ‘নৈরাজ্যের ব্যাকরণ’ হয়ে উঠবে।

তিনি আরো বলেছিলেন,“যত তাড়াতাড়ি এগুলো পরিত্যাগ করা হবে, আমাদের জন্য ততই মঙ্গল হবে।” ভাগ্যিস এখন আম্বেদকর জি বেঁচে নেই,নাহলে হয়তো উনাকেও আজ এইসব বলার জন্য অন্ধভক্ত, আরএসএসের দালাল আখ্যায়িত করতো তথাকথিত এই সেকুলাররা। ২০২৬ সালে এসে আম্বেদকরের ভবিষৎবাণী যে কতটুকু নিখুঁত ছিলো তা বিস্তর ও খালি চোখে বিদ্যমান।অনশন ধর্মঘট সম্পূর্ণ অহিংস এবং ইতিবাচক,এতে বিন্দুমাত্র কোন সন্দেহ নেই।কিন্ত এই অনশনের ঢালে সরকারকে বন্দি করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা যাদের জনগণ ভোটের মাধ্যমে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে নিয়েছিলো আজ নিজেদের রাজনৈতিক আদর্শ, এজেন্ডা অনশনস্থলে এসে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। আমরা দেখেছি কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা এসে দাবি করছেন তাদের রাজ্যের পূর্ণমর্যদা এবং অনুচ্ছেদ ৩৭০ ফিরিয়ে দেওয়ার, কারো হাতে প্ল্যাকার্ড “ফ্রি উমর খালিদ”। প্রায় প্রত্যেকটি রাজ্যে কংগ্রেস সহ আঞ্চলিক দলগুলির প্রধান প্রতিপক্ষ বিজেপি, যার জন্য তাহারা ক্ষমতার আশপাশেও যেতে পারছে না। তাই এই সুযোগে প্রায় সব কয়টি বিরোধী রাজনৈতিক দলের মধ্য একটা অঘোষিত প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গিয়েছিলো নরেন্দ্র মোদির কেন্দ্র সরকারকে বেকায়দায় ফেলার। তেলাপোকা পার্টির সদস্যরা যখন নিজেদের কেজরিওয়ালের আপের সমর্থক দাবি করছেন,ঠিক সেই সময়ে ভাইবোন রাহুল প্রিয়াঙ্কা মোদির বাসভবনে ধর্নায় বসে একদফা বেশি প্রতিবাদের নজির গড়তে চান, যার দরুণ আপ নেতা সঞ্জয় সিং কংগ্রেসের উপর ক্ষুদ্ধ হয়ে বলেন রাহুল গান্ধীরা আন্দোলন কমজোর করছেন।ছাত্র আন্দোলনকে ঢাল বানিয়ে সবাই নিজেদের পুরানো ধান্ধা বাস্তবায়িত করতে চাইছিলো, ইন্ডো মার্কিন ট্রেড সমঝোতার প্রতিবাদে পাঞ্জাবের খালিস্তানি শক্তিও সামিল হয় এই ছাত্র আন্দোলনে। পশ্চিমবঙ্গে জনরায়ে হেরেও যে মমতা পদত্যাগ করেন নি, সেই দলের নেতা নেত্রীরা আন্দোলনে সামিল হয়ে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ চাইলেন। সোনম ওয়াংচুক ছাত্রদের সমর্থনে টানা ২৬ দিন ভোগ অনশনে ছিলেন ঠিকই কিন্ত ক্রমশঃ সেই আন্দোলনকে হাইজ্যাক করার ষড়যন্ত্র চলছিলো বিভিন্ন অপশক্তির দ্বারা সেটা সহজেই অনুমান করা যাচ্ছিলো। তাই সোনম ওয়াংচুর স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো বলতে বাধ্য হন কংগ্রেসের এহেন আচরণ আসলে কুটিল রাজনীতি। নেতাদের উচিত ছিল যন্তর মন্তরে গিয়ে পড়ুয়াদের পাশে দাঁড়ানো। ২৬ দিনের ভোগ অনশন ভাঙ্গার জন্য খোদ সোনাম ওয়াংচুককেও কেন্দ্রের সঙ্গে সমঝোতার অপবাদ দেওয়া হয়, প্রকৃতপক্ষে এরা সোনমজির জীবনকে বাজি রেখে দেশে এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি কায়েম করতে চেয়েছিলো।

শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা দেশজুড়ে বিস্তৃত DEEP STATE এর অংশীদাররা নিঃসন্দেহে বেকায়দায় পড়ে গেলো, ভেস্তে গেলো তাদের নীল নকশা। কারণ একই কায়দায় বাংলাদেশে স্থিতিশীল একটা সরকারের পতন ঘটানো হয়েছিলো, ভারতের এই জেনজি আন্দোলনে বাংলাদেশের মৌলবাদী গোষ্ঠী দু হাত তুলে সমর্থন জানিয়েছিল। ২১শে জুলাই ২০২৬-তে বাংলাদেশ জামাত ইসলামী তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে প্রকাশিত একটি খোলা চিঠিতে ভারতের ছাত্র আন্দোলনের প্রতি তাহারা পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করে। চরম ভারত বিদ্বেষী সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চ শাহবাগে ককরোচ মুভমেন্টের সমর্থনে মশাল মিছিল বের করে। পাকিস্তানপন্থী সংগঠন এনসিপির নেতা সারজিস আলম লে যে ঢাকা থেকে শুরু হওয়া বারুদ ছড়িয়ে পড়ুক পুরো দক্ষিণ এশিয়ায়।ভারতের এই ছাত্র আন্দোলনে ইন্ধন দেওয়া পাকিস্তানের ৪০০ এরও বেশি সোশ্যাল মিডিয়া একাউন্ট ডিএক্টিভ করা হয়। কেন্দ্র সরকার বিচক্ষণতায় একটি বড়সড় চক্রান্ত ভেস্তে দিলেও অনুমান করা যাচ্ছে আগামীতে আরো এইরকম আন্দোলন একই ধাঁচে সংগঠিত হবে সরকারকে জিম্মি করে দাবি আদায়ের। আন্দোলন গণতন্ত্রের সৌন্দর্য তবে বারংবার যদি এভাবে নির্বাচিত একটি সরকারকে আন্দোলনের নামে বিশেষ কোন উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে সেটা নিঃসন্দেহে বৃহত্তর গণতন্ত্রের জন্য একটি অশনি সঙ্কেত।
(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)