প্রসঙ্গ বইমেলা: ইজরায়েল এবং বামপন্থা



Updated: 09 September, 2026 11:12 am IST
ছবি: কলকাতা বইমেলায় ইজরায়েল থিম হওয়ায় ক্ষুব্ধ বামপন্থীরা(AI ছবি)
ছবি: কলকাতা বইমেলায় ইজরায়েল থিম হওয়ায় ক্ষুব্ধ বামপন্থীরা(AI ছবি)

✍️ শ্রী সন্দীপ মুখোপাধ্যায় 

কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার ইতিহাসে থিম নির্বাচন কোনোদিনই শুধুমাত্র সাহিত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি সবসময়ই ছিল একটি রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং কূটনৈতিক বার্তা। ১৯৯১ সাল থেকে থিমের প্রথা শুরু হওয়ার পর আমরা দেখেছি কীভাবে বিভিন্ন মতাদর্শের দেশকে সম্মান জানানো হয়েছে। ২০০৩ সালে যখন থিম ছিল কিউবা, তখন কেউ প্রশ্ন তোলেনি যে কিউবা একটি একদলীয় কমিউনিস্ট রাষ্ট্র, সেখানে বাকস্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বরং তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার গর্বের সাথে ফিদেল কাস্ত্রোর ছবি দিয়ে গেট সাজিয়েছিল। তখন বইমেলার মূল মঞ্চ থেকে মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিনের উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছিল। যদি কিউবার সমাজতন্ত্র বইমেলার থিম হতে পারে, তবে ইজরায়েলের গণতন্ত্র, তার স্টার্ট-আপ নেশন, তার নোবেলজয়ী সাহিত্য কেন থিম হতে পারবে না? এই দ্বিচারিতা আজকের বামপন্থী সমালোচকদের মুখোশ খুলে দেয়।

বামপন্থীদের অভিযোগ হল, ইজরায়েল একটি যুদ্ধরত রাষ্ট্র, তাই তাকে থিম করা যায় না। কিন্তু ইতিহাস কী বলে? ১৯৯৯, ২০১৩ এবং ২০২২ সালে তিনবার থিম হয়েছে বাংলাদেশ। ২০২২ সালেই বাংলাদেশ যখন থিম, তখন বাংলাদেশে দুর্গাপূজার সময় কী বীভৎস হিন্দু নির্যাতন হয়েছিল, তা আমরা ভুলে যাইনি। নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রামে মন্দির ভাঙচুর, প্রতিমা ভাঙচুর, হিন্দুদের ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই রক্তাক্ত প্রেক্ষাপটেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার এবং গিল্ড বাংলাদেশকে থিম হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, কারণ বইমেলা বিভেদের মঞ্চ নয়, সংযোগের মঞ্চ। যদি বাংলাদেশের মতো একটি দেশ, যেখানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃত, তাকে আমরা বইমেলায় সম্মান দিতে পারি, তাহলে ইজরায়েল, যা মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র পূর্ণ গণতন্ত্র, তাকে নিয়ে আপত্তি কেন?

বইমেলার থিম কখনোই কোনো দেশের সরকারের পররাষ্ট্র নীতিকে সমর্থন করার জন্য হয় না। থিম হয় সেই দেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান এবং সভ্যতার অবদানকে সম্মান জানাতে। ইজরায়েলের সাহিত্য কী? বিশ্বসাহিত্যে ইজরায়েলের অবদান অসামান্য। আমোস ওজ, ডেভিড গ্রসম্যান, এ.বি. ইয়েহোশুয়া, এবং নোবেলজয়ী এস.ওয়াই. অ্যাগনন – এঁরা আধুনিক হিব্রু সাহিত্যকে বিশ্ব দরবারে নিয়ে গেছেন। আমোস ওজের বিখ্যাত উক্তি, “The actual story of what will happen when the two states are established is not yet written, but it will be written by men and women who know how to imagine peace.” এই শান্তির কল্পনাই তো বইমেলার মূল কথা। ইজরায়েলকে বাদ দিয়ে বিশ্ব সাহিত্যের আলোচনা অসম্পূর্ণ।

কলকাতা বইমেলা বরাবরই মার্কসবাদী থিমকে প্রাধান্য দিয়েছে। ১৯৯৪ সালে জিম্বাবুয়ে, ২০০৩ সালে কিউবা, ২০০৪ সালে চিলি, যেখানে চে গেভারার প্রসঙ্গ টেনে আনা হয়েছিল, এমনকি ২০২০ সালে রাশিয়া যখন থিম হয়েছিল, তখনও মঞ্চে পুশকিনের চেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছিল অক্টোবর বিপ্লব। তখন কোনো দক্ষিণপন্থী সংগঠন বলেনি যে এই থিম বাতিল করতে হবে। তাহলে আজ যখন ইজরায়েল থিম হচ্ছে, তখন বামপন্থী সংগঠনগুলি কেন বলছে যে এটি সাম্রাজ্যবাদের প্রতীক? বইমেলা যদি সত্যিই মুক্তচিন্তার জায়গা হয়, তবে সেখানে কিউবা থাকলে ইজরায়েলও থাকবে, মার্কস থাকলে বেন-গুরিয়নও থাকবে। এটাই প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা।

ইজরায়েলের সংগ্রামের ইতিহাস বাঙালির সংগ্রামের ইতিহাসের সাথে কোথাও যেন মিলে যায়। ১৯৪৮ সালে দেশভাগের যন্ত্রণা আমরা দেখেছি, ইজরায়েলও দেখেছে। হলোকাস্টের পরে একটি জাতি কীভাবে মরুভূমির মধ্যে থেকে একটি উন্নত, বিজ্ঞানভিত্তিক, কৃষি-প্রধান রাষ্ট্র তৈরি করতে পারে, তার গল্প বাঙালি কৃষক এবং উদ্বাস্তু বাঙালির কাছে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ইজরায়েলের কিবুতজ আন্দোলন এবং বাংলার সমবায় আন্দোলনের মধ্যে অনেক মিল আছে। ড্রিপ ইরিগেশন, যা আজ ইজরায়েলের আবিষ্কার, তা আজ বাংলার কৃষককেও বাঁচাচ্ছে। এই প্রযুক্তি ও জীবন সংগ্রামের গল্প বইমেলায় আসা উচিত নয় কি?

সমালোচকরা বলছেন ইজরায়েল আগ্রাসী। কিন্তু ইতিহাস ভুলে গেলে চলবে না, ইজরায়েল বারবার আক্রান্ত হয়েছে। ১৯৪৮, ১৯৬৭, ১৯৭৩ এবং সাম্প্রতিক ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবরের বর্বরোচিত হামলা, যেখানে নিরীহ নাগরিক, শিশু, মহিলাদের হত্যা করা হয়েছে এবং অপহরণ করা হয়েছে, তা বিশ্ব দেখেছে। এই হামলার পর কোনো বামপন্থী সংগঠন কি নিন্দা করে বইমেলায় একটি প্রতিবাদী থিমের প্রস্তাব দিয়েছিল? দেয়নি। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকদের বাঁচানোর জন্য লড়াই করছে, তখন তাকে আগ্রাসী বলে দাগিয়ে দেওয়া হল চরম রাজনৈতিক ভণ্ডামি। আমরা যদি ইউক্রেনের পাশে দাঁড়াতে পারি রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, তবে ইজরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারের পাশেও আমাদের দাঁড়ানো উচিত।

কলকাতা বইমেলা সবসময়ই পশ্চিমবঙ্গের বুদ্ধিজীবী মহলে একটি আন্তর্জাতিকতাবাদের চর্চা করেছে। ফ্রান্স (১৯৯৭, ২০০৫, ২০১৮), গ্রেট ব্রিটেন (১৯৯৮, ২০১৫, ২০২৪), মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (২০১১), স্পেন (২০০৬, ২০২৩), জার্মানি (২০২৫) – এই দেশগুলি সবাই কোনো না কোনো সময়ে কোনো যুদ্ধে জড়িত ছিল। আমেরিকা ইরাক যুদ্ধে জড়িত ছিল বলে কি আমরা ২০১১ সালে আমেরিকাকে থিম করতে বাধা দিয়েছিলাম? দিইনি। ফ্রান্স ন্যাটোর সদস্য বলে কি ফ্রান্সকে বাতিল করেছি? করিনি। তাহলে শুধুমাত্র ইজরায়েলের ক্ষেত্রেই এই বিশুদ্ধতাবাদ কেন? এই নির্বাচিত প্রতিবাদ প্রমাণ করে যে আপত্তিটা যুদ্ধের বিরুদ্ধে নয়, আপত্তিটা ইজরায়েলের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলেও আমরা দেখেছি বইমেলাকে কীভাবে রাজনৈতিক সম্প্রীতির জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলাদেশের সাথে আমাদের ভাষাগত এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আছে বলেই তাকে বারবার থিম করা হয়েছে, যদিও ওপারে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার চলছে।তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নিজে বলেছেন, “ধর্ম যার যার, উৎসব সবার।” এই একই যুক্তিতে, ইজরায়েলের সাথে ভারতের সম্পর্ক আজ অত্যন্ত গভীর। প্রতিরক্ষা, কৃষি, জল ব্যবস্থাপনা, সাইবার সিকিউরিটিতে ভারত এবং ইজরায়েল আজ কৌশলগত অংশীদার। ভারতের পররাষ্ট্র নীতি আজ “de-hyphenation” নীতিতে চলে, যেখানে প্যালেস্টাইন এবং ইজরায়েল দুজনের সাথেই বন্ধুত্ব বজায় রাখা হয়। বইমেলার থিম সেই জাতীয় স্বার্থেরই প্রতিফলন হওয়া উচিত।

বইমেলা হল জানার জায়গা, অজানাকে জানার জায়গা। ইজরায়েল সম্পর্কে বাঙালি পাঠকের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত এবং তা মূলত পশ্চিমা মিডিয়ার একপেশে প্রচারের ওপর নির্ভরশীল। বইমেলায় ইজরায়েল প্যাভিলিয়ন হলে আমরা জানতে পারব তালমুদ কী, হিব্রু ভাষা কীভাবে মৃত ভাষা থেকে জীবিত হল, যা ভাষা আন্দোলনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল বাঙালির জন্য একটি বিরাট অনুপ্রেরণা। এলিয়েজার বেন-ইয়েহুদা কীভাবে একা একটি ভাষাকে পুনরুজ্জীবিত করলেন, তার গল্প রবীন্দ্রনাথের ভাষা চিন্তার সাথে মিলে যায়।

বামপন্থীদের এই প্রতিবাদ আসলে কলকাতার বইমেলার ঐতিহ্যের পরিপন্থী। কলকাতা বইমেলা কখনোই কোনো দেশকে বয়কট করেনি।আমেরিকা বয়কট হয়নি,বাংলাদেশ বয়কট হয়নি। বইমেলা বিশ্বাস করে, সরকারের কাজের জন্য একটি দেশের সাহিত্যকে শাস্তি দেওয়া যায় না। যদি এই যুক্তি সত্য হয়, তবে ইজরায়েলের সরকারের নীতির জন্য ইজরায়েলের কবি ইয়েহুদা আমিচাই-এর কবিতাকে কেন বয়কট করা হবে? আমিচাই লিখেছিলেন, “A man needs love and hate at the same time, to love one and to hate another.” এই মানবিক দ্বন্দ্বকে বোঝার জন্যই তো বইমেলা।

ইজরায়েল থিমের বিরোধিতা করে বামপন্থীরা আসলে বাংলার যুব সমাজকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় উদ্ভাবনী ইকোসিস্টেম থেকে দূরে রাখতে চাইছে। প্রতি বছর ইজরায়েল থেকে হাজার হাজার স্টার্ট-আপ তৈরি হয়। সাইবার সিকিউরিটি, কৃষি-প্রযুক্তি, মেডিকেল টেকনোলজিতে ইজরায়েল বিশ্বের শীর্ষে। কলকাতার যে ছেলেটি টেকনোলজি নিয়ে পড়ছে, তার জন্য ইজরায়েল প্যাভিলিয়নে গিয়ে ইজরায়েলি লেখকদের বিজ্ঞান বিষয়ক বই পড়া, তাদের উদ্ভাবনের গল্প জানা, একটি ভবিষ্যৎ তৈরি করবে। এটাকে আটকানো মানে বাংলার ভবিষ্যৎকে আটকানো।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখব, বাম আমলে বইমেলায় সোভিয়েত ইউনিয়নের বইয়ের রমরমা ছিল। রাদুগা প্রকাশনীর বই কম দামে বিক্রি হতো, যেখানে মার্কসবাদকে একমাত্র সত্য হিসেবে প্রচার করা হতো। তখন কেউ বলেনি যে এটি প্রোপাগান্ডা। আজ যদি ইজরায়েল তার বই নিয়ে আসে, যেখানে তার ইতিহাস, তার সংস্কৃতি, তার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কথা বলা হবে, তবে সেটাকে প্রোপাগান্ডা বলা হবে কেন? বইমেলায় সব মত থাকবে, পাঠক বিচার করবে। পাঠকের বিচারের ওপর ভরসা না রাখা হল ফ্যাসিবাদের লক্ষণ, যা বামপন্থীরা নিজেরাই সবসময় সমালোচনা করে।

ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা, যার আদলে কলকাতা বইমেলা তৈরি, সেখানে ২০২৩ সালে ইজরায়েলকে বিশেষ সম্মান দেওয়া হয়েছিল হামাসের হামলার পর। সারা বিশ্বের প্রকাশনা শিল্প ইজরায়েলের পাশে দাঁড়িয়েছিল। কলকাতা বইমেলা যদি নিজেকে আন্তর্জাতিক বলে দাবি করে, তবে সে কি বিশ্বের এই সংহতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে? কলকাতা সবসময়ই মানবতার পাশে দাঁড়িয়েছে। ইজরায়েলি নাগরিকদের ওপর হামলা মানবতার ওপর হামলা। তাই ইজরায়েলকে থিম করা মানে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বইমেলার অবস্থান ঘোষণা করা।

বাংলাদেশের প্রসঙ্গটি আরও একবার গভীরভাবে ভাবা দরকার। যখন বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার হয়, তখন এপার বাংলার বামপন্থীরা চুপ করে থাকে, কারণ তাদের কাছে এটি সংখ্যালঘু ইস্যু নয়, এটি ভোটব্যাঙ্কের ইস্যু। অথচ তারা ইজরায়েলের বেলায় মানবাধিকারের কথা বলে। এই দ্বিমুখী নীতি বাংলার মানুষ বোঝে। যদি মানবাধিকারই শেষ কথা হয়, তবে বাংলাদেশে হিন্দুদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে কেন বাংলাদেশকে থিম করা হল? আর যদি সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানই শেষ কথা হয়, তবে ইজরায়েলকে কেন বাদ দেওয়া হবে? উত্তর একটাই, সমালোচনাটি নীতিগত নয়, রাজনৈতিক।

ইজরায়েলের সাথে বাংলার একটি ঐতিহাসিক যোগ আছে, যা অনেকেই জানেন না। কলকাতায় একসময় একটি সমৃদ্ধ ইহুদি সম্প্রদায় ছিল। ম্যাগেন ডেভিড সিনাগগ, নেভে শালোম সিনাগগ আজও কলকাতার ঐতিহ্যের অংশ। কলকাতার ইহুদিরা, যেমন এজরা পরিবার, কলকাতার স্থাপত্য ও ব্যবসায় অবদান রেখেছেন। ইজরায়েলকে থিম করার মাধ্যমে আমরা কলকাতার সেই হারিয়ে যাওয়া ইহুদি ঐতিহ্যকে আবার স্মরণ করতে পারি। এটি কলকাতার বহুত্ববাদের উদযাপন। বামপন্থীরা কি কলকাতার নিজস্ব ইতিহাসকেও অস্বীকার করতে চায়?

বইমেলার গেটের ডিজাইন সবসময়ই থিম দেশের স্থাপত্যের আদলে হয়। কিউবার সময় চে-র ছবি, ফ্রান্সের সময় আইফেল টাওয়ার, বাংলাদেশের সময় শহীদ মিনার। ইজরায়েল থিম হলে আমরা দেখতে পাব জেরুজালেমের ওয়েস্টার্ন ওয়াল, তেল আভিভের আধুনিক স্থাপত্য, এবং মরুভূমিতে ফোটা ফুলের প্রতীক। এটি দৃষ্টিনন্দন হবে। ছাত্রছাত্রীরা জানতে পারবে ২০০০ বছরের পুরনো একটি সভ্যতা কীভাবে আধুনিক হয়েছে। এই শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা কি বইমেলার উদ্দেশ্য হতে পারে?

বইমেলা শুধু বই বিক্রির জায়গা নয়, এটি ব্যবসায়িক যোগাযোগের জায়গা। ইজরায়েলের প্রকাশনা শিল্প অত্যন্ত উন্নত। হিব্রু ভাষায় প্রকাশিত বইয়ের অনুবাদ ইংরেজি ও বাংলায় হলে বাংলার প্রকাশকরা লাভবান হবেন। ইজরায়েলের সাথে যৌথ প্রকাশনার সম্ভাবনা তৈরি হবে। বামপন্থীরা সবসময় সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলে, কিন্তু তারা ভুলে যায় যে বইমেলা নিজেই একটি বাণিজ্য মেলা। এখানে জার্মানি, ফ্রান্স, আমেরিকার মতো বড় পুঁজিবাদী দেশগুলি কোটি কোটি টাকার বই বিক্রি করে। তখন তাদের আপত্তি থাকে না, কিন্তু ইজরায়েল এলেই তাদের আপত্তি।

ইজরায়েলের বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার চালানো হয়, তার একটি বড় অংশ হল ভুল তথ্য। অনেকেই মনে করেন ইজরায়েল মানেই যুদ্ধ। কিন্তু ইজরায়েলের সাহিত্য পড়লে দেখা যায়, ইজরায়েলের সবচেয়ে বড় লেখকরাই সবচেয়ে বড় শান্তিবাদী। ডেভিড গ্রসম্যান, যার ছেলে যুদ্ধে মারা গেছে, তিনি আজও শান্তির পক্ষে লিখে চলেছেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি, “Peace is not made by heroes, but by ordinary people who refuse to be enemies.” এই সাধারণ মানুষের শান্তির আকাঙ্ক্ষাকে বইমেলায় তুলে ধরা উচিত। ইজরায়েলকে থিম করা মানে যুদ্ধকে সমর্থন করা নয়, শান্তির জন্য ইজরায়েলের ভেতরের যে লড়াই চলছে, তাকে সমর্থন করা।

কলকাতার বুদ্ধিজীবী মহলের একটি অংশের মধ্যে ইজরায়েল-বিরোধিতা একটি ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। তারা মনে করে প্যালেস্টাইনের পক্ষে কথা বললেই প্রগতিশীল হওয়া যায়। কিন্তু প্রগতিশীলতা মানে একপেশে হওয়া নয়। প্রগতিশীলতা মানে উভয় পক্ষের যন্ত্রণা বোঝা। ইজরায়েলে যে কিবুতজে ৭ই অক্টোবর হত্যালীলা হয়েছিল, সেখানে বামপন্থী, শান্তিবাদী ইজরায়েলিরাই থাকত, যারা প্যালেস্টাইনের মানুষের জন্য কাজ করত। তাদের হত্যা কি প্রগতিশীলতার পরিচয়? বইমেলা যদি সত্যিই প্রগতিশীল হয়, তবে তার উচিত এই জটিলতাকে তুলে ধরা, শুধুমাত্র স্লোগান সর্বস্ব প্রতিবাদ নয়।

ভারত সরকার সবসময়ই দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের পক্ষে। ভারত প্যালেস্টাইনকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম অ-আরব দেশগুলির মধ্যে একটি, আবার ইজরায়েলের সাথেও তার গভীর বন্ধুত্ব। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বন্ধুত্ব সর্বজনবিদিত, আবার ভারত প্যালেস্টাইনে সাহায্যও পাঠায়। এই ভারসাম্যের নীতিই হল ভারতীয় পররাষ্ট্র নীতির সৌন্দর্য। বইমেলায় ইজরায়েলকে থিম করা মানে এই ভারসাম্যকে সম্মান জানানো, ভারতের জাতীয় স্বার্থকে সম্মান জানানো। বামপন্থীরা কি ভারতের জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে?

বামপন্থীদের মনে রাখা উচিত যে তাদের প্রিয় কিউবা এবং ইজরায়েলের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক আছে। কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো প্রথম দিকে ইজরায়েলকে সমর্থন করেছিলেন। চে গেভারা নিজে ইজরায়েলের কিবুতজ ব্যবস্থার প্রশংসা করেছিলেন। ইতিহাস এত সরল নয়, যতটা বামপন্থীরা দেখাতে চায়।কলকাতা বইমেলা আজ আর শুধু কলকাতার নয়, এটি আন্তর্জাতিক। এখানে জার্মানি, ফ্রান্স, আমেরিকা, জাপান, রাশিয়া সবাই আসে। এই আন্তর্জাতিকতাকে যদি সত্যিই ধরে রাখতে হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র গণতন্ত্রকে বাদ দেওয়া যায় না।ইজরায়েলে ২০% আরব মুসলিম নাগরিক বসবাস করে, যারা ইজরায়েলের সংসদে প্রতিনিধিত্ব করে। ইজরায়েলকে মুসলিম-বিরোধী দেখানোর আগে সেই তথ্য তুলে ধরা উচিত।বইমেলার থিম নির্বাচন করে পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ড। তারা ব্যবসায়িক এবং সাংস্কৃতিক দিক বিবেচনা করে থিম নির্বাচন করে। ইজরায়েলের প্রকাশনা শিল্পের সাথে ভারতের প্রকাশনা শিল্পের যৌথ উদ্যোগে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা হতে পারে। ইজরায়েলের হিব্রু বইয়ের বাংলা অনুবাদ, বাংলার বইয়ের হিব্রু অনুবাদ – একটি নতুন বাজার তৈরি হবে। বামপন্থীরা কি চায় না যে বাংলার প্রকাশকরা লাভবান হোক? নাকি তারা চায় বাংলা প্রকাশনা শিল্প শুধুমাত্র রাশিয়ান বইয়ের অনুবাদের ওপর নির্ভর করে থাকুক, যেমনটা বাম আমলে হতো? বামপন্থী সংগঠনগুলির উচিত ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া। তারা যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন তারা কিউবা, রাশিয়া, ভিয়েতনামকে থিম করে তাদের মতাদর্শ প্রচার করেছে। আজ যখন অন্য একটি দেশ, যে দেশটি গণতন্ত্র, বিজ্ঞান এবং সাহিত্যে উন্নত, তাকে থিম করা হচ্ছে, তখন তাদের উচিত উদারতা দেখানো। যদি বাংলাদেশ থাকতে পারে হিন্দু নির্যাতনের পরেও, যদি কিউবা থাকতে পারে একদলীয় শাসনের পরেও, তবে ইজরায়েলও থাকতে পারে এবং থাকবে।ইজরায়েলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়ন বলেছিলেন, “In Israel, in order to be a realist, you must believe in miracles.” কলকাতা বইমেলাও একটি মিরাকল। ময়দান থেকে সল্টলেক, ১৯৭৬ থেকে ২০২৬, এই মিরাকলটি টিকে আছে কারণ এটি সবসময় নতুনকে গ্রহণ করেছে। ইজরায়েল থিম সেই মিরাকলেরই পরবর্তী অধ্যায়।