খেলার মাঠ ও ধৰ্ম বিদ্বেষের চর্চা: বিশেষ উদ্দেশ্যে মহম্মদ শামীকে আক্রমণ

0
70

© শ্রী রঞ্জন কুমার দে

শেষ হলো ক্রিকেট টি-টুয়েন্টি ২০২১ ওয়ার্ল্ড কাপ,নিশ্চয় এইবারের টি টুয়েন্টি মোটেই সুখকর হয় নি ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য।পাকিস্থানের কাছে পর্যুদস্ত হয়ে বিরাট বাহিনী আর ঘুরে দাঁড়াতে পারে নি।পাকিস্তান টুর্নামেন্টে অপ্রতিরোধ্য থাকলেও সেমিফাইনালে বাবর আজমদের বিরুদ্ধে অজিরা ১ ওভার বাকি থাকতেই জয় উঠিয়ে নেয়।কিন্তু নেট দুনিয়ায় পাকদের হারের জন্য কাঠগড়ায় খাড়া করা হয় সতীর্থ হাসান আলীকে।কারণ ১৯ তম ওভারে ম্যাথু ওয়েডের একটি সহজ ক্যাচ ছেড়ে দেন হাসান এবং এই জীবন দানের পর পরই তিনটা ছক্কার সাহায্যে এই ওভারেই অজিরা লক্ষ্যস্তরে সহজে পৌঁছে যায়। ট্রলাররা হাসান আলীর স্ত্রী সামিয়া আরজুকেও কটাক্ষ করতে ছাড়ে নি কারণ সামিয়া ভারতীয় এবং ভারতকে খুশি রাখতেই নাকি হাসানের ক্যাচ মিস।

আরেকটি কারণ হলো হাসান আলী শিয়া মুসলিম।একটা ক্যাচ মিস বা একটি হার খেলার মানদণ্ড ঠিক করতে পারে না, পাকরা সত্যি এই টুর্নামেন্টে খুব ছন্দে ছিলো এবং ট্রফির ছিলো শক্ত দাবিদার। পাকদের হারেও সিনিয়র ক্রিকেটাররা তাঁদের প্রশংসার ফুলঝুড়িতে ভাসিয়ে দিয়েছেন, ভারতীয় ফ্যানরা হাসান আলীকে সমর্থন জানিয়ে লিখেছে #indwithhasanali ।হাসান আলীর অনিচ্ছাকৃত এরকম একটা ক্যাচ মিস ক্রিকেট বিশ্বকাপে অতীতেও অনেক ঘটেছে।

১৯৯২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক গ্রাহাম গোচ পাক অধিনায়ক ইমরান খানের ক্যাচ ফেলে দিলে মেলবোর্নে ইংরেজরা হারের মুখ দেখে।তেমনিভাবে ১৯৯৯ এর বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার স্টিভ ওয়ার ক্যাচ মিস হয়েছিলো আফ্রিকার হার্সেল গিবসের ,তখন স্টিভ গিভসের কাছে গিয়ে বলেছিলেন,”মেট ইউ হ্যাভজ্যাস্ট ড্রপড দ্যা ওয়ার্ল্ড কাপ”।সত্যি হয়েছিলোও তাই।২০০৩ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে পাকিস্তানি অল রাউন্ডার আব্দুল রাজ্জাক মিড অফ থেকে একটু এগিয়ে আসায় মাষ্টার ব্লাস্টার শচীন টেন্ডুলকারের ক্যাচ মিস করলে পাকিস্তানি বোলার ও অধিনায়ক ওয়াসিম আক্রাম রাজ্জাককে অগ্নিমূর্তি হয়ে বলতে শোনা যায়,”তোঝে পাতা হ্যা তোনে কিসক্যা ক্যাচ ছোড়া হ্যা”,অবশ্যই পাকিস্তানকে এর খেসারত গুনতে হয়েছিলো।এরকম অনেক স্মরণীয় ঘটনা প্রায় প্রত্যেক বড় ক্রিকেট আসরেই ঘটে আসছে তাই হাসান আলীর এই ক্যাচ মিস নতুন কিচ্ছু নয়, ক্রিকেটের অবিচ্ছিন্ন একটা অঙ্গ মাত্র এবং একটা দুঃস্বপ্ন।

এবারের টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপে হাসান আলীর আগে ব্যয় বহুল একটি বোলিং স্পেলের জন্য নেট দুনিয়ায় ট্রল হতে হয়েছিলো ভারতের মোহাম্মদ সামিকে।ক্রিকেটে যেকোন ম্যাচের দায় কিভাবে একজনের উপর চাপানো যায় সে নিয়ে উঠে এসেছিলো বর্ণ বৈষম্যে বিতর্ক, ভারতের রাজনৈতিক শিবিরের রাহুল গান্ধী,ওয়েসিরা সামিকে পুঁজি করে ক্রিকেটকে ভোটের গ্লাসে মিশিয়ে দেন।মোহাম্মদ সামি নির্ধিদ্বায় ভারতের একনিষ্ঠ একজন ক্রিকেটার এবং ভারতের জন্য ছিনিয়ে এনেছেন অনেক জয়।সামির ট্রলের মুখ্য জবাব সিনিয়র শচীন টেন্ডুলকার,বিরাট কোহলি সহ প্রায় সব সিনিয়র কড়া ভাষায় দিয়েছেন।বিসিসিআই সামির একটি ফটো টুইট করে লিখে ,”গর্বিত।শক্তিশালী।উপরে উঠছি এবং এগিয়ে যাচ্ছি।”

সত্যি কথা বলতে মোহাম্মদ সামিকে কে বা কাহারা ট্রল করেছিলো সাধারণ মানুষের চোখে পড়ে নি,এর চেয়ে বরং বেশি নজরে এসেছে সামির হয়ে পাশে দাঁড়ানো প্রায় প্রত্যেক ভারতবাসীকে।নেট দুনিয়ায় সেদিন অক্ষয় কুমারও স্টেডিয়ামে হাসাহাসির জন্য নানা রকম ব্যঙ্গতার সম্মুখীন হয়েছিলেন।নিন্দুকেরা অনেক বার বিরাট কোহলির খারাপ প্রদর্শনের জন্য সস্ত্রীক অনুষ্কা শর্মাকেও ট্রল করেছিলো।প্রকৃতপক্ষে মোহাম্মদ সামিকে বর্ণ বৈষম্যের জন্য কোন প্রকৃত ভারতীয় হেয় করতে পারেন না, এটা একটি পূর্ববর্তী টোল কিটগুলোর মতো পরিকল্পিত সাজিসেভারতকে অসহিষ্ণু করার কৃত্রিম প্রচেষ্টা মাত্র।সামিকে ট্যুইটারে ট্রলের অধিকাংশ একাউন্টই ছিলো পাকিস্তানি এবং ফেইক একাউন্ট।উদাহরণস্বরূপ আলিতাজা নামের এক পাকিস্তানি একাউন্ট থেকে সামির বিরুদ্ধে ২৮ টি টুইট করা হয়েছিলো,ঘাটিয়ে দেখা যায় এই একাউন্ট থেকে ১৫ জন লোককে ফলো করা হতো যাহারা প্রত্যেকেই পাকিস্তানি এবং তাদের একাউন্ট থেকে শুধু ভারতের তথাকথিত অসহিষ্ণুতার প্রোপোগেন্ডা চালানো হতো।পাকিস্তানের করাচির বসবাসরত মোহাম্মদ কামরান ট্যুইট করেন যে,”Well done ISI agent Mohammod Shami.We are proud of you.”পাকিস্তানের আরেক টিভি এডিটর আদিল তায়েব লেখেন যে,”Mohammod Shami is playing from pakistan side.”এরকম অগণিত অনেক ট্যুইট করা আছে যেগুলোর মূল জড় পাকিস্তানে এবং ভারতকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অসহিষ্ণু প্রচার করার একটা অপকৌশল মাত্র।ভারত সেদিন মরুভূমির মাঠে পাকিস্তানের কাছে পরাজিত হয়েও ধোনি, কোহলি স্ববিনয়ে স্পোর্টসম্যান স্পিরিটির পরিচয় দেখিয়ে বাবর, রিজওয়ান, শোয়েব মালিকদের সাথে কুশল বিনিময় করতে দেখা যায়, এজন্যই ক্রিকেটকে জেন্টেলেমান গেম বলা হয়।অনবদ্য ওপেনিং জুটির জন্য বিরাট রিজওয়ানকে বুকে টেনে নেন এবং বাবরকে বাহবা দেন।নেট দুনিয়া কুর্ণিশ জানিয়েছে ধোনি -কোহলিদের এই স্পিরিট অফ ক্রিকেটকে, তাই আইসিসি সোশ্যাল মাধ্যম ইনস্টাগ্রামে একটি পোষ্ট করতে গিয়ে লিখে,”ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের এটাই আসল গল্প।”

কিন্ত পাকিস্তান ক্রিকেট এবং তাদের সচেতন মহল সেই শিষ্টাচার গ্রহণ করতে পারে নি।পাকিস্তানের গৃহ মন্ত্রী শেখ রশিদ দেড় মিনিটের এক ভিডিও ট্যুইটে বলেন পাকিস্তানের ভারতের বিরুদ্ধে জয়,ইসলামের জয়।তিনি দুনিয়ার সব মুসলিম তথা ভারতীয় মুসলমানদেরও পাকিস্তানকে সমর্থনের জন্য অভিনন্দন জানান।একই সঙ্গে রশিদ উনার বক্তব্যে পাকিস্তানে বসবাসরত সমগ্র সংখ্যালঘু হিন্দু, খৃস্টান, শিখদের এবং ভারতে বসবাসকারী মুসলমানদেরও অপমান করলেন।একইরকম বক্তব্য আরেক পাকমন্ত্রী করেন যে প্রথমে আমরা তাদের হারাই, তারপর মাটিতে পড়ার পর চা পাণ করাই।পাকিস্তানের ধর্ম বিদ্বেষ তাদের প্রত্যেকটি কার্যকলাপে ফুটে উঠে।পাকিস্তানের সিলেবাসে হয়তো লিখা নেই ভারতে বসবাসরত মুসলমান তাদের দেশের মোট জনসংখ্যার থেকে অনেক বেশি।ভারতের ক্রিকেট জুড়ে রয়েছেন আজহার উদ্দিন ,সাবা করিম, ইরফান, ইউসুফ, সামি সহ অগণিত মুসলিম ক্রিকেটারের যোগদান এবং অবদান।

এটা পাকিস্তান ক্রিকেট নয় যেখানে একমাত্র হিন্দু ক্রিকেটার দীনেশ কানেরিয়া বারংবার ড্রেসিংরুমে, খেলার মাঠে এবং বাহিরেও উনার প্রতি বর্ণবৈষম্যের অভিযোগ তুলেছিলেন,আরেক ক্রিস্টান ক্রিকেটার ইউসুফ ইউহানা সপরিবারে ধর্ম পরিবর্তন করে হয়ে গেছেন মোহাম্মদ ইউসুফ।পূর্বে ২০০৭ সনেও টি-টুয়েন্টি ওয়ার্ল্ড কাপে শোয়েব মালিকের দল ভারতের কাছে হেরে গেলে উনার বক্তব্য ছিলো এরকম,”আমার নিজের দেশ পাকিস্তান এবং পুরো দুনিয়ার মুসলিমদের সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানাই।”শোয়েব হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন এই ম্যাচে তাকে বোল্ড করা ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ ক্রিকেটার ইরফান পাঠান একজন ভারতীয় মুসলিম।ঐ দিনও শোয়েবের মন্তব্যে উনার দেশের সংখ্যালঘু সমর্থকদের আঘাত করেছিলেন এবং ভারতীয় মুসলিমদের অপমান,কারণ কোন প্রকৃত ভারতীয় মুসলিম ভারত-পাক ম্যাচে পাকিস্তানকে সমর্থন করতে পারে না।প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের ড্রেসিংরুমের অপসংস্কৃতি,ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক মূল্যবোধের প্রভাব খেলার মাঠে ও বাইরে তাই ছাপ রেখে যায়।২০০৬ সালে ডক্টর নাসিম আশরাফকে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান বানানো হয়।তখন নাসিম পাক ক্রিকেটারদের বলেছিলেন নিজেদের ধার্মিক মান্যতাযুক্ত গতিবিধি যেন সার্বজনীন স্থানে প্রদর্শিত না করে।কিন্ত শোয়েব মালিকের পর দলের আরেক সিনিয়র ক্রিকেটার ওয়াসিম আকরাম লর্ডসে বাংলাদেশের কাছে পরাজিত হয়ে মন্তব্য করেছিলেন,ব্রাদার ন্যাশনের কাছে হার হলো।

পাকিস্তান তাদের ধর্মীয় কট্টরবাদ ও আদর্শ ক্রিকেটের মাঠে এখনো সেই একই ট্রেডিশনে।এইবারের ভারত -পাক বিশ্বকাপ ম্যাচে পানীয় বিরতিতে মোহাম্মদ রিজওয়ানকে খোলা মাঠে নামাজ আদায় করতে দেখা যায়।এতে অবশ্যই রিজওয়ান নেট দুনিয়ায় খুব বাহবা খুঁড়াতে সক্ষম হন,প্রাক্তণরা হয়েছেন খুশিতে বগবগা।রাওলপিন্ডি এক্সপ্রেস খ্যাত প্রাক্তন ক্রিকেটার শোয়েব আক্তার ট্যুইট করেন যে আল্লাহ তাদের মস্তক অন্য আর কাহারো কাছে নথ করান না যে তাঁর সামনে নথ মস্তিষ্ক হয়, সুবানাল্লাহ।পাক ক্রিকেটের আরেক প্রাক্তন স্পৃডার ওয়াকার ইউনুস বেসরকারি একটি চ্যানেলে বলেন যে-সবচেয়ে ভালো লেগেছিলো রিজওয়ানের সব হিন্দুদের মধ্যে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করা।ইউনুসের এই কট্টর মন্তব্যে খুব সমালোচিত হয়েছিলেন,ক্রিকেট বিশ্লেষক হর্ষ ভোগলে, ভেঙ্কটেশ প্রসাদ সহ আরো অনেকে কড়া ভাষায় ইউনুসকে তিরস্কার করেন।অবশেষে অবশ্য ইউনুস উনার কৃত মন্তব্যের জন্য অনুসূচিত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেন, কিন্তু ততক্ষণে উনার কট্টর মৌলবাদী আদর্শ জনসম্মুখে প্রকাশ পেয়ে যায়।তাই পাকিস্তান ক্রিকেটের আগাগোড়া আদর্শ, ভাবধারা মৌলবাদী সংস্কৃতিতে ভরপুর এবং পরিপূর্ণ, কিন্তু তাহারা সেটা এবার মোহাম্মদ সামির সৌজন্যে ভারতীয় ক্রিকেটে লেভেল মারার অপপ্রচার এবং অপচেষ্টা করেছিলো মাত্র ।

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.