দেশদ্রোহীতা এবং বাক স্বাধীনতা

0
65

© শ্রী রঞ্জন কুমার দে

ভারত পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচ যেকোন ফাইনাল থেকেও বেশি উত্তেজনা, পাড়ায় পাড়ায় রাস্তার মোড়ে সাজানো টিভি স্ক্রিন, আতশবাজি, আরো কত কি। এই ক্রিকেট ম্যাচে জড়িত থাকে আবেগ, ভালোবাসা, দেশপ্রেম। তবে সব শেষে এটা একটা খেলা যাহার দুপিঠে হার জিত উভয়টি রয়েছে, প্রত্যেকটা দিন আলাদা হয় ক্রিকেটের; যে বেশি ভালো খেলে সেই দিন তাঁদেরই হয়। হয়তো আমরা আবেগের বশে কোন সময় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ রাখতে অসুবিধা হয়,অনেক সময় দেখা যায় অতিরিক্ত ক্রিকেট আসক্তরা আত্মহত্যা করে নেয়।

এইবার টি-টোয়েন্টি ওয়ার্ল্ডকাপে ক্রিকেটার সামির বিরুদ্ধে ট্রল , পাকিস্থানের বিজয়উৎসব সেলিব্রেশন, পাকিস্তান সরকারের ঘৃনাসূচক মন্তব্য ক্রিকেটকে অনেক নিচের স্তরে পৌঁছে দিলো।১৯৯২ এর পর ১৪ তম সাক্ষাতে পাকিস্তান বিশ্বকাপে ভারতের বিরুদ্ধে জিত পায়,ভারতীয় সমর্থকরা নিশ্চয় হতাশ হয়ে ফাইনালের থেকেও বেশি হারের যন্ত্রণা অনুভব করেছে।কিন্তু এটা আরো বেশি পীড়া দেয় যখন দেখা যায় প্রিয় মাতৃভূমির হার কোন একটি শত্রু পক্ষের কাছে এবং কতিপয় কিছু দুষ্কৃতী চোখের সম্মুখে সেটা সেলিব্রেশন করছে।

কাশ্মীরের শ্রীনগর, উত্তর প্রদেশ ,রাজস্থান থেকে এরকম অনেক দেশবিরোধী অপ্রীতিকর ঘটনা লক্ষ্য করা গেলো। পাক-ভারত ম্যাচের শেষে জয়পুর রাজস্থানের এক স্কুল শিক্ষিকা নাফিজা Whatsapp স্ট্যাটাসে পাকিস্তানকে সমর্থন জানাতে আবেগবশত “We won”লেখেন, তখন উনাকে জানতে চাওয়া হয় আপনি “আপনি কি পাকিস্থানের সমর্থক” প্রত্যুত্তর ছিলো “হ্যা”।যদিও শিক্ষিকা ক্ষমা চেয়ে ঘটনাটিকে কৌতুকের ছলে বর্ণনা করেছেন কিন্তু শেষ রক্ষা হয় নি,তৎকালীন উনাকে বরখাস্ত করা হয়। যে বিদ্যালয়ে প্রার্থনায় রাষ্ট্রগান, রাষ্ট্রগীতে দেশপ্রেম ভাবনায় ছাত্রদের ত্বরান্বিত করা হয় সেখানে একজন শিক্ষিকার স্বদেশের পরাজয়ে উল্লাস স্বাভাবিকভাবে প্রশ্নঘাত করে।

অনুরূপভাবে শ্রীনগরের সরকারি SKIMS হাসপাতাল এবং করণ নগর মেডিকেল কলেজের (জিএমসি) কিছু কতিপয় এমবিবিএস ছাত্রছাত্রীদের পাক জয়ে আজাদী স্লোগান,আতশবাজি এমনকি তাদের পাক জাতীয় সংগীত গাইতেও দেখা যায়।বিতর্কিত এই পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে প্রশাসন UAPA (Unlawful Activities Prevention Act) এক্টের আওতায় অভিযোগ দায়ের করেছে, এর ফলে হয়তো তাদের ডিগ্রিপ্রাপ্তিতে এবং ভবিষ্যতে সরকারি সুবিধা অনিশ্চিত হয়ে গেলো।একইভাবে জম্মু-কাশ্মীরের রাজৌরি সরকারি হাসপাতালের কর্মী সাফিয়া মজিদের দেশ বিরোধী কার্যকলাপ জনসম্মুখে প্রকাশ পেলে কর্তৃপক্ষ তাকে তৎকালীন বরখাস্ত করেছে।এর আগেও ২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়ন ট্রফিতে পাকিস্তানের ভারতের বিরুদ্ধে জয় সেলিব্রেশনের জন্য মধ্যে প্রদেশ ,রাজস্থান থেকে প্রায় ২০ জন মুসলিম যুবককে গ্রেফতার করা হয়েছিলো, অবশেষে ১৫ জনের উপর থেকে মামলা সরাতে প্রশাসন বাধ্য হয়।

অনেকের হয়তো মনে আছে ২০২০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বেঙ্গালুরুতে আসাদুদ্দিন ওয়াসীর উপস্থিতিতে ১৯ বৎসরের বামপন্থী এক ছাত্রী অমূল্য লিয়েনা সিএএ এবং এনআরসি বিরোধী খোলা মঞ্চে “পাকিস্তান জিন্দাবাদ” স্লোগান দিয়েছিলো, প্রশাসন তৎক্ষণাৎ তাকে আইসিপি অর্থাৎ রাজদ্রোহ মামলায় জেলভর্তি করে।কিন্তু এই রাজদ্রোহ আইন এবং বাক স্বাধীনতা ভারতীয় বিচারধারায় পরস্পর একটা বিতর্ক বহন করে আসছে। সুপ্রিম কোর্টের বরিষ্ঠ আইনজীবী দুষ্যংত দোবে বলছেন যে ,”পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলা রাজদ্রোহ নয়।রাজদ্রোহ তো দূরের কথা,এটা কোন আইনভঙ্গ ই নয় যেটার উপর ভিত্তি করে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারে”। উনার মতে ভারতীয় সংবিধান প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রতি সম্প্রীতি এবং একতা বজায় রাখতে বলেছে, কোন দেশের প্রতি হিংসা দেশপ্রেমের পরিচয় দিতে পারে না। সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন জজ সুদর্শন রেড্ডির ভাষায় “পাকিস্তান জিন্দাবাদ” স্লোগান ততক্ষণ পর্যন্ত অপরাধ নয় যখন পাকিস্তানকে শত্রু দেশ ঘোষণা না করা হয় কিংবা ভারত-পাকের মধ্যে কোন যুদ্ধ চলছে। সেই সূত্র ধরে ১৯৮৪ সালের ৩১ শে অক্টোবর ইন্ধিরা গান্ধী হত্যার পর পাঞ্জাব সরকারের দুই কর্মচারী বলবংত সিং এবং ভুপিংধর সিংকে “খালিস্থান জিন্দাবাদ” এবং “রাজ করেগা খালসা” নারার জন্য রাজদ্রোহ আইন 124-A তে গ্রেফতার করা হয়।কিন্তু মামলাটি ১৯৯৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধীন জাস্টিস এ .এস.আনন্দ এবং জাস্টিস ফৈজানুদ্দিন বেঞ্চ এই বলে মামলা নিষ্পত্তি করে দেন যে এক, দুই জনের এইরকম রাজনৈতিক নাড়া রাজদ্রোহ নয় কারণ এতে কোন হিংসা বা ঘৃণা ছড়াচ্ছে না এবং ইহা ইন্ডিয়ান স্টেটের জন্য বিপদসূচক নহে।সর্বোচ্চ কোর্ট উল্টা পুলিশ প্রশাসনকে ভৎসর্না করে বলে যে এইরকম অস্থিতিশীল পরিবেশে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে অপরিপক্কতার পরিচয় দিয়েছে।

এরকম আরো অনেক উদাহরণ আছে,১৯৬২ সালে বিহার সরকার ও কমিউনিস্ট নেতা কেদারনাথ সিংহের মধ্যে রাজদ্রোহের মামলায় সুপ্রিম কোর্ট উল্লেখযোগ্য একটি রায়দান করেছিলো।সাল ১৯৫৩ এর ২৬ শে মে কেদারনাথ বেগুসুরাইয়ে একটি পাবলিক বক্তৃতায় তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের জমকর আলোচনা করে তাদের পরাধীন বৃটিশ সরকারের সাথে তুলনা করেছিলেন।এই রাজদ্রোহ মামলায় মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট জবাব ছিলো যেকোন সরকারের কঠিন শব্দে সমালোচনা, আলোচনা, উপদেশ, গঠনমূলক বিরোধিতা রাজদ্রোহের সমার্থক হতে পারে না; রাজদ্রোহ তখনই হবে যখন কেউ হিংসা, বিদ্ধেষের বাতাবরণ ছড়িয়ে পুরো সিষ্টেমের ব্যবস্থা ভঙ্গ করে দিবে। আমরা যে রাষ্ট্রবাদ নিয়ে আলোচনা করছি সেই রাষ্ট্রগীত প্রণেতা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই রাষ্ট্রবাদ নিয়ে মতবাদটা জেনে নিই। তিনি অকপটে বলেছিলেন যে , “রাষ্ট্রবাদ আমাদের অন্তিম আধ্যাত্মিক লক্ষ্য হতে পারে না। আমার শরণস্থল তো মানবতাই। হীরের মূল্য দিয়ে আমরা কাঁচ কিনতে পারি না। যতদিন বেঁচে থাকবো ততোদিন দেশভক্তিকে মানবতার উপর বিজয় হতে দেবো না”। অহিংস রাজনীতির বিশ্বাসী স্বাধীনতা সংগ্রামী এম.কে.গান্ধী ১৯২২ সনে ইয়ং ইন্ডিয়াতে লিখেছিলেন,” যেকোন লক্ষ্য হাসিল করার পূর্বে আমাদের অভিব্যাক্তির স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করা জরুরি”।

বাক স্বাধীনতা, অভিব্যক্তি এবং রাজদ্রোহের বিতর্ক অনেক পুরোনো শীতল যুদ্ধ। সেডিসন বা রাজদ্রোহ আইনে ইংরেজ শাসনকালে ১৯২২ সালে মহাত্মা গান্ধী ও ১৯০৮ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামী বাল গঙ্গাধর তিলককে জেল হাজতে যেতে হয়েছিলো। পূর্বে ইংরেজরা পরাধীন ভারতবর্ষে রাজদ্রোহ আইনে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের খুব সহজে জেলে পুরতে পারতো,তাহারা ১৮৭০ ক্রিস্টাব্দে ভারতবর্ষে রাজদ্রোহ আইন বলবৎ করেছিলো। আশ্চর্যজনকভাবে ইংল্যান্ড সেই আইন ২০০৯ সনে তাঁদের দেশে রদ করে দিলেও ভারতবর্ষে সেটা এখনো বহমান যেটার বাড়তি সুবিধা ক্ষমতাসীন প্রত্যক সরকার নিয়ে আসছে। ভারতীয় সংবিধান লাগু হওয়ার ১৭ মাস পর নতুন একটি বিতর্ক শুরু হয়েছিলো যে বাক স্বাধীনতার পরিধি কতটুকু হওয়া বাহ্যনীয়।অবশেষে ১৯৫১ তে সংবিধান প্রথম সংশোধিত হয়ে তিনটি নতুন শর্ত সংযোজিত হয়-পাবলিক অর্ডার,অন্যান্য দেশগুলোর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং অপরাধ করার জন্য উৎসাহপ্রদান, অর্থাৎ কেউ এমন কিছু বলতে বা লিখতে পারবে না যাহাতে সার্বজনীন শান্তি নষ্ট হয়,অন্যান্য দেশের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক খারাপ হয় এবং হিংসার বাতাবরণ তৈরি হয়।

প্রকৃতপক্ষে ভারতীয় জনসঙ্ঘের সংস্থাপক এবং হিন্দু মহাসভার নেতা শ্রী শ্যামা প্রসাদ মূখার্জি ১৯৫০ সনের নেহেরু-লিয়াকতের চুক্তি প্রবল বিরোধ করতে গিয়ে নেহেরু মন্ত্রিসভা থেকে ইস্তফাপত্র দিয়ে অখণ্ড ভারতবর্ষের দাবিতে সার্বজনীনভাবে ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধের সায় দিতে থাকেন।একটা সময় নিরুপায় নেহেরু তৎকালীন স্বররাষ্ট্রমন্ত্রী বল্লভভাই প্যাটেলের পরামর্শে ১৯৫১ তে বাক স্বাধীনতার অনুচ্ছেদ ১৯(২) সংশোধন করে পূর্বের মানহানি,অশ্লীলতা,আদালতের অবমাননা এবং দেশের সুরক্ষার সাথে আরো তিনটি নতুন শর্ত তথা সার্বজনীন শান্তি ভঙ্গ,অপরাধ করার জন্য উস্কানি এবং অন্য দেশের সাথে সুসম্পর্ক খারাপ করার মতো অভিব্যক্তিতে নিষেধাজ্ঞা জুড়ে দেওয়া হয়।ভারতে বাক স্বাধীনতা কয়েক বৎসর পরপর নতুন বিতর্ক তৈরি করে নিয়ে আসে, পাঁচ বৎসর আগে জেএনইউ এর প্রাক্তন ছাত্র অধ্যক্ষ কমিউনিস্ট নেতা কানাইয়া কুমারের উপর দেশদ্রোহের আরোপ লাগে কিন্তু আজ পর্যন্ত তিনি দোষী সাব্যস্ত না হয়ে খোলা আকাশের নীচে ঘুরছেন।

অভিব্যক্তিতে অবশ্যই স্বাধীনতা থাকুক কিন্তু দেশাত্মবোধ এবং ভারতীয় সার্বভৌমের স্বার্থে বিচারব্যবস্থা আরেকটু কঠোর হোক অন্যতায় দেশদ্রোহিরা ভারতের বিচার ব্যবস্থার উদারতার সুযোগ নিয়ে বারংবার দেশদ্রোহী কার্যকলাপে উৎসাহী হবে।এখানে অবশ্যই উল্লেখ্য যে ২০১৬ সালে ইন্দো-ক্যাঙ্গারু ম্যাচে বিরাট কোহলির পাকিস্তানি এক ভক্ত উমর দারওজ ভারত বিজয়ে মাত্র ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করায় পাকিস্তান আদালত তাকে ১০ বৎসর সশ্রম কারাদণ্ড দেয়, আর আমরা ভারতে দেশদ্রোহীদের খোলা ছুট দিয়ে বসে আছি।

(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.