ইন্দোনেশিয়ায় হিন্দুত্বের পুনর্জাগরণ: সুকমাবতীর পূর্বপুরুষের ধর্মে ফেরা

0
98

সংবাদ প্রকাশক opIndia.com । মূল সংবাদ পরিবেশন : দিবাকর দত্ত।
ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ : সূর্য শেখর হালদার

এই বছরের 26 অক্টোবর সুকুমাবতী সুকর্ণপুত্রী ইসলাম পরিত্যাগ করে সনাতন হিন্দু ধর্মকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করলেন । এই অনুষ্ঠান আয়োজিত হল ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপের সিঙ্গারাজা নগরে। সুকুমাবতী ইন্দোনেশিয়ার প্রথম রাষ্ট্রপতি সুকর্ন এবং তাঁর তৃতীয় স্ত্রী ফতিমাবতীর কন্যা। তিনি দেশের পঞ্চম রাষ্ট্রপতি মেঘাবতী সুকর্নপুত্রীর বোন এবং নিঃসন্দেহে সুকুমাবতী দেশের অন্যতম একজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব। তাঁর মত এইরকম একজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের ইসলাম ত্যাগ করে হিন্দু ধর্মে দীক্ষা নেওয়া অবশ্যই হিন্দুত্ববাদীদের কাছে এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

তাঁর এই হিন্দু ধর্ম গ্রহণের পিছনে যাঁর অবদান রয়েছে , তিনি হলেন সুকুমাবতীর
মাতামহী ইডা – আয়ু – নোমান – রাই – শ্রীম্বান। তিনি বালি দ্বীপের বাসিন্দা। সুকুমাবতী সুকর্ণপুত্রীর পূর্বেও হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকেছেন, ধর্ম বিষয়ে বিভিন্ন আলোচনা চক্রে থেকে ধর্মগুরুদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁর এই ইসলাম ত্যাগ করে হিন্দু ধর্ম গ্রহণের সিদ্ধান্ত তাঁর দুই ভাই – গুন্টুর সুকর্ণপুত্র ও গুরুহ সুকর্ণপুত্র এবং তাঁর বোন মেঘাবতী ও সুকুমাবতীর এই সিদ্ধান্ত সমর্থন করেছেন। সুকুমাবতীর সন্তানরাও তাঁর এই সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন।

আজকের দিনে ইন্দোনেশিয়া হচ্ছে পৃথিবীর সবচাইতে জনবহুল ইসলাম রাষ্ট্র । একটা সময়ে এই দ্বীপরাষ্ট্রে সনাতন হিন্দু ধর্মের যথেষ্ট প্রভাব ছিল । পার্শ্ববর্তী জাভা ও সুমাত্রা দ্বীপে হিন্দু ধর্মের যথেষ্ট বিকাশ ঘটে । প্রথম থেকে পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত সময়কালে হিন্দু ধর্ম ছিল ইন্দোনেশিয়ার প্রধান ধর্ম । কিন্তু ইসলামের অভ্যুদয় হবার পর ইন্দোনেশিয়াতে হিন্দুধর্ম পিছনে হঠতে থাকে এবং একসময় দ্বীপরাষ্ট্রে হিন্দু ধর্মের মানুষ সংখ্যালঘু হয়ে পরে।

আজকে ইন্দোনেশিয়ার সনাতন ধর্মালম্বীরা তাদের পূর্বপুরুষ বিশেষত পুরোহিত সবদাপালন এবং রাজা জয়াবায়ার ভবিষ্যৎবাণী মনে রেখেছে। সবদাপালন
ছিলেন একজন রহস্যময় পুরোহিত। তিনি মাজাপাহিত সাম্রাজ্যের রাজা পঞ্চম ব্রাওয়িজয়ার রাজসভায় পৌরোহিত্য করতেন। 1478 খ্রিস্টাব্দে রাজা ইসলামে দীক্ষিত হলে সমগ্র রাজ্য ইসলামিক ভাবাদর্শে প্রভাবিত হয়। এই পরিস্থিতিতে সবদাপালন রাজাকে অভিশাপ দেন । তিনি প্রতিজ্ঞা করেন আবার পাঁচশত বৎসর পর তিনি কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং রাজনৈতিক দুর্নীতির মধ্যে পুনর্জন্ম নেবেন এবং ভবিষ্যৎ বাণী করেন যে এই উপদ্বীপকে তিনি ইসলামের হাত থেকে রক্ষা করে আবার সনাতন ধর্মের গৌরব পুনরুদ্ধার করবেন। কল্পবৃষ অনুযায়ী তিনি বলেন যে তিনি হলেন জাভা ভূমিতে রানী এবং সমস্ত দেবতা ও আত্মাদের ভৃত্য। রাজার প্রথম পুরুষ উইকুমনুমানমা থেকে শুরু করে সকুত্রেম , ব্যামব্যাংগ সহ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আজকের দিন পর্যন্ত তিনি জাভা সাম্রাজ্যের ভৃত্য। তিনি এখানে উপস্থিত আছেন শুধুমাত্র জাভা সাম্রাজ্যের উত্তরসূরিদের সেবা করার জন্য । কিন্তু এই পর্যন্ত এসে তাঁকে বিদায় নিতে হল। তিনি বলেন যে তিনি তাঁর উৎসস্থলে ফিরে যাচ্ছেন। আর রাজা যেন মনে রাখেন যে পাঁচশত বছর পর আবার হিন্দু ধর্ম জাভাতে তিনি প্রতিষ্ঠা করবেন। তিনি রাজাকে বলেন যে তাঁর বোঝা উচিত যে তিনি যদি ইসলাম গ্রহণ করেন , তাহলে তাঁর সন্তান-সন্ততিরা পতিত হবে এবং জাভার আদি বাসিন্দা গণ জাভা ছেড়ে চলে যাবে। জাভার বাসিন্দাদের অন্য দেশের কাছে পরাভূত হতে হবে। কিন্তু পৃথিবীতে একদিন আসবে, যখন সমগ্র পৃথিবী একজন জাভা বাসীর দ্বারা চালিত হবে।

চলে যাবার আগে সাবধান বাণী শোনান সবদাপালন। তিনি বলেন যে
আজ হতে পাঁচশত বছর পর তিনি আবার ফিরে আসবেন এবং জাভার চারপাশে তিনি আবার আধ্যাত্বিকতার প্রতিষ্ঠা করবেন। যারা এটা মেনে নেবে না তাদের সংখ্যা কমে যাবে আর তারা রাক্ষসের খাদ্য হবে। আর যতক্ষণ না এরা সম্পূর্ণ ধ্বংস হচ্ছে ততক্ষণ তিনি শান্তি লাভ করবেন না।

এই সাবধানবাণীতে তিনি বলেন যে যখন মাউন্ট মেরাপি অগ্নি উদগীরণ করবে, এবং তার লাভা ও ছাই যখন প্রবল গন্ধ সহযোগে দক্ষিণ পশ্চিম দিকে ছড়িয়ে যাবে, তখন বুঝে নিতে হবে তিনি আবার পুনর্জন্ম গ্রহণ করতে চলেছেন। ঘটনাচক্রে 1978 খ্রিস্টাব্দে ইন্দোনেশিয়াতে আধুনিক হিন্দু মন্দির নির্মাণ সম্পূর্ণ হয় এবং এই সময়ে মাউন্ট সেমেরু অগ্নুৎপাত করে। হিন্দুরা মনে করে সবদাপালনের ভবিষ্যৎবাণী সত্য হচ্ছে ।

এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য রাজা জয়বায়ার ভবিষ্যৎবাণী। রাজা জয়বায়া 1135 খ্রিস্টাব্দ থেকে 1157 খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কেদিরি রাজ্যের রাজা ছিলেন। তিনি পূর্ব জাভা সাম্রাজ্যের বিপুল উন্নতি সাধন করেন। তিনি একজন ভবিষ্যৎ বক্তা ছিলেন এবং তাঁকে রাতু- আদিল বা বিচক্ষণ রাজা বলা হত। তিনি সামাজিক অবক্ষয়ের মধ্যে সামাজিক রীতি-নীতি ধরে রাখতে সচেষ্ট হয়েছিলেন । তাঁর ভবিষ্যৎ বাণীর এতই ক্ষমতা ছিল যে আধুনিক ইন্দোনেশিয়াতেও তাঁর ভবিষ্যতবাণী সাংস্কৃতিকভাবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ । তিনি হিন্দু সাহিত্য পছন্দ করতেন এবং এমপু পানুলু এবং এমপু সেডার মত কবিদের আশ্রয়দাতা ছিলেন । তাঁর সময় হিন্দু রাজাকে ভগবান বিষ্ণুর অবতার রূপে পূজা করা হত। তিনি এটা প্রমাণে সচেষ্ট হন যে তিনি কোন হিন্দু দেবতার বংশের সন্তান । বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থ অনুযায়ী হিন্দু রাজারা ভগবান ব্রহ্মার বংশধর রূপে বিবেচিত হতেন। তিনিও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না।

রাজা জয়বায়া ভবিষ্যৎবাণী সমন্বিত একটি স্তবক রচনা করেন, যেটির নাম হল
সেরাত জয়বায়া। মৌখিক ধারা অনুযায়ী এটি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের কাছে চালিত হতে থাকে । অবশেষে 1835 খ্রিস্টাব্দে তার সবচেয়ে পুরাতন সংস্করণটি অনূদিত হয় । রাজার ভবিষ্যৎবাণীর মধ্যে অন্যতম বিখ্যাত ছিল যে জাভার বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে শ্বেতাঙ্গদের অধীনস্থ থাকবে । ঘটনাচক্রে 1595 খ্রিস্টাব্দে ইন্দোনেশিয়া ডাচদের উপনিবেশে পরিণত হয় । এই ঘটনা ঘটে রাজার মৃত্যুর প্রায় চারশত বছর পর। এটাও রাজা বলেছিলে যে শ্বেতাঙ্গদের পরে পীতাঙ্গ বা হলুদ বর্ণের মানুষরা জাভা অধিকার করবে। এটাও সত্যি প্রমাণিত হয় যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান ইন্দোনেশিয়া আক্রমণ করে এবং ডাচদের বিতাড়িত করে ইন্দোনেশিয়ার দখল নেয়। তাঁর এই দুই ভবিষ্যৎবাণী এবং তার সঙ্গে ভগবান বিষ্ণুর অবতার রূপে রাজ্যশাসনের কথা তাঁকে অমরত্ব প্রদান করেছে।

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.