ভারতের মধ্যে জঘন্য শাসনের নমুনা হলো ‛কেরালা মডেল’

0
138

কেরালা মডেল : করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের হাস্যকর পদ্ধতি

(সংবাদটি প্রকাশিত হয় বিগত 26 আগস্ট OpIndia.com নামক ওয়েবসাইটে। ইংরেজি ভাষায় সংবাদটি পরিবেশন করেন শ্রী অভিষেক ব্যানার্জি।)

অনুবাদক : শ্রী সূর্য শেখর হালদার

বিগত 20 মে 2020 ভারতের বিখ্যাত ইংরেজি দৈনিক The Hindu একটি নিবন্ধে লিখছে :

“With containment strategies in place even before the first case of novel coronavirus was detected on January 30 Kerala appears to have finally hammered the curve flat. “

অর্থাৎ, 30 January 2020 তারিখে করোনা ভাইরাসের প্রথম নিদর্শন ধরা পড়ার আগেই কেরালা যেন কনটেইনমেন্ট পদ্ধতি অবলম্বন করে করোনা ভাইরাস আক্রান্তের গ্রাফ শূন্যের ঘরে নামিয়ে এনেছে! আর 26 আগস্ট 2021 এর অবস্থা অনুযায়ী কেরালাতে নতুন করে 30,000 করোনা ভাইরাসের কেস ধরা পড়েছে। সঙ্গে রয়েছে 200 টি মৃত্যু আর 19 % এর উপর করোনা টেস্ট পজিটিভ আসার সংবাদ। সারা ভারতের জনসংখ্যার নিরিখে কেরালার জনসংখ্যা মাত্র 3%, কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে ভারতে নতুন করে করোনা ভাইরাস আক্রান্তদের 70 শতাংশই হল কেরালার। দৈনিক মৃত্যুতে কেরালা এখন ভারতে প্রথম । সারা দেশে করোনা টেস্টে পজিটিভ হওয়ার হার যেখানে 2.4 %, সেখানে কেরালাতে সেই হার 19% এরও বেশী । তারপরেও কেরালা মডেল নিয়ে এতো
হৈ চৈ কিভাবে হয়?

আমরা শুরু করতে পারি মার্চ 2020 সাল থেকে, যখন কেরালার মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী শ্রী পিনারাই বিজয়ন আরও সাতজন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে একইসঙ্গে কোভিড 19 এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। বর্তমানে আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার পলায়ন বিষয়ে সংবাদ করা এক সাংবাদিকের বক্তব্য ধার করে বলা যেতে পারে এটা যদি সাফল্য হয় তবে ব্যর্থতা কাকে বলা হবে ?
আমরা কি সেই সব পুরস্কারের তালিকা তৈরি করব যেগুলি কেরালার রকস্টার স্বাস্থ্যমন্ত্রী কে কে শৈলজা ( বর্তমানে আর ইনি স্বাস্থ্যমন্ত্রী নয় ) গ্রহণ করেছিলেন ? সেই সময় কি প্রচারটাই না পেয়েছিলেন শ্রীমতি শৈলজা? আল জাজিরা, বিবিসি নিউজ, নিউইয়র্ক টাইমস- আরো অনেক সংবাদমাধ্যমের চোখের মনি ছিলেন তিনি। লিবারাল সংবাদমাধ্যমগুলো তো কোভিড যুদ্ধে ভারতের অধিনায়ক রূপে কেরালার মুখ্যমন্ত্রীকে তুলে ধরতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। আমরা মনে করতে পারি ধ্রুব রাঠির ইউটিউব ভিডিও – কেরালা কিভাবে করোনা ভাইরাসকে পরাজিত করল কিংবা অন্য সাংবাদিকদের যাঁরা সবাই কেরালা সরকারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠেছিলেন সেই সময়। এই প্রসঙ্গে বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে দ্য হিন্দুর একটি সম্পাদকীয় নিবন্ধ ,
” The mark of zero: on containment of covid-19 cases in Kerala ” ।
2020 সালের মে মাসে প্রকাশিত 500 এরও বেশী শব্দে লিখিত এই সম্পাদকীয় এখন পড়লে মনে হবে এটি পৃথিবীর একটি অন্যতম
রম্যরচনা । এই নিবন্ধের কিছু অংশ এখানে উদ্ধৃত করা যেতে পারে –

” If in April there were early signs of Kerala gaining an upper hand over the virus, its control became clear from the 4th week of April … the containment success can be traced back to how Kerala did not wait for directions from the centre, but instead lead from the front …. But what sets it apart from the other states is the manner in which it followed text book epidemiology protocols to the tee. “

অর্থাৎ কেরালা 2020 সালের এপ্রিলের মধ্যে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করে ফেলে। তাদের এই সাফল্যের কারণ অন্য রাজ্যের মত কেরালা সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করেনি। নিজে থেকেই এগিয়ে এসেছিল করোনা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে। অন্য রাজ্যগুলির থেকে কেরালা পৃথক এই কারণেই যে কেরালা সরকার অক্ষরে অক্ষরে মহামারীবিদ্যার কেতাবি বক্তব্যকে বাস্তবায়িত করেছে মহামারী প্রতিরোধের ক্ষেত্রে , যেটা অন্যরা করতে পারেনি।

আজকের দিনে এই সম্পাদকীয় নিছকই একটি উপহাস। আর এই উপহাস প্রসঙ্গে মনে করা যেতে পারে শ্রীমান রাহুল গান্ধীকে । সারা পৃথিবী জানে শ্রীমান কেরালার সাংসদ। তিনি সংসদে কেরালার ওয়েনাডের জনপ্রতিনিধি এবং তাঁর দল কেরালাতে প্রধান বিরোধী দল। কিন্তু কেউ কি কোনদিন দেখেছেন তাঁকে কেরালা সরকারের কোভিড নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে কোন সমালোচনা বা নিদেনপক্ষে কোন টুইট করতে? এবার চিন্তা করুন এই সমালোচনা না করার কারণ কি হতে পারে। আপনি কি কোনদিন শুনেছেন যে কোনো বিরোধী রাজনৈতিক দল শাসকদলের কোভিড নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার মত একটা বৃহৎ ইস্যুতে সরকারের সমালোচনা থেকে বিরত থেকেছে? কিন্তু কেরালাতে এটাই হয়েছে।

আসলে কেরালা মডেল বলতে বোঝায় মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট। কেরালা মডেল বলতে বোঝায় শাসক-বিরোধী গোপন আঁতাত। কেরালাতে কেউ এমন নেই যে সরকারকে প্রশ্নের সম্মুখীন করতে পারে। এখানে সরকার পক্ষ আর বিরোধী পক্ষের বিরোধিতা শুধুমাত্র লোক দেখানো। প্রসঙ্গত মনে করা যেতে পারে চীনেও কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়াও এই রকম আটটির মত বৈধ স্বীকৃত রাজনৈতিক দল রয়েছে। এগুলি বিরোধীদলের ভূমিকা পালন করে থাকে। তবে তারা বিরোধী রাজনীতি তেমনভাবেই করে, যাতে চীনে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব চিরকাল প্রতিষ্ঠাতা থাকে। কেরালাতেও আজ একই রকম ঘটনা ঘটছে। কেরালা হল কমিউনিস্ট শাসিত ভারতের একমাত্র রাজ্য এবং যেখানে তথাকথিত বিরোধী দল হল কংগ্রেস আর কংগ্রেস সর্বদাই সিপিআইএমের নেতৃত্ব মেনে নিতে প্রস্তুত। ভিতরে ভিতরে কোন বিরোধিতা নেই। আর রাজ্যের বাইরে কমিউনিস্টরা তাদের ভাবমূর্তি ঠিক করে নিচ্ছে সাংবাদিকদের সঙ্গে গোপন চুক্তি করে । পাঠক আপনি শুধু আপনার প্রিয় সংবাদ পাঠক/ পাঠিকা, সম্পাদক বা সাংবাদিককে লক্ষ্য করুন । তাঁর অতীতের দিকে নজর দিন। দেখবেন, কলেজ জীবন থেকে তাঁর সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির সখ্যতা রয়েছে। অন্য রাজনৈতিক দলগুলি যখন জনগণের কাছে পৌঁছে তাদের বার্তা দিতে সচেষ্ট, তখন কমিউনিস্টরা যারা শুধু তথ্য নিয়ন্ত্রণ করে তাদেরই নিয়ন্ত্রণ করতে সচেষ্ট।

কেরালা মডেল শুধুমাত্র মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট নয় ; বরং বিশেষজ্ঞদের নিয়ন্ত্রণ করারও একটি অভিনব প্রয়াস। এনারা সব অসম্ভব সুন্দর কথা বলবেন যেমন কেরালার কোভিড সংক্রমণ হল ‘ নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ‘ । যখন সর্বত্র টেস্ট পজিটিভ আকাশ ছুঁতে চলেছে, তখন এই বিশেষজ্ঞরা এক নতুন শব্দবন্ধ বের করলেন –
টার্গেটেড টেস্টিং ‘ । প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য এই টার্গেটেড টেস্টিং কেরালা ব্যতীত ভারত এমনকি পৃথিবীর কোথাও হয়নি। কেরালা মডেলের মতই এটি যুক্তি নয়, বরং বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে ।এইসব বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কেউ কেউ বিশ্বাসযোগ্যতাও তৈরি করতে পেরেছেন। আমাদের সমাজ এই সব বিশেষজ্ঞদের তৈরি করতে বিনিয়োগ করছে, তাঁদের মনকে প্রশিক্ষিত করছে, স্বাধীনভাবে ভাবতে শেখাচ্ছে। কিন্তু এইসব বিশেষজ্ঞরা তৈরি হবার পর তাঁদের নিজেদেরকে বিক্রি করে দিচ্ছেন কোন রাজনৈতিক দলের কাছে এবং সেই দলের হয়ে লবিবাজী করছেন।

বাস্তবিক ভাবে কেরালাতে কোনদিন কোভিড 19 এর প্রথম সংক্রমণ পুরোপুরিভাবে শেষ হয়নি । কিন্তু আমাদের বিশেষজ্ঞ ও বুদ্ধিজীবীদের নির্বাচনে জয়লাভ করতে হবে। সুতরাং তাঁদের কাজ হল বিহার, উত্তরপ্রদেশের মত ভারতের অন্যতম দরিদ্র রাজ্যের মানুষদের নিয়ে ঠাট্টা করা। তাই এই দুই রাজ্যের মানুষ তাঁদের চোখে কখনো গোমূত্রখোর, কখনো জাতিবাদী। এমনকি যখন ভোট শেষ হয়ে গেল, তখনও ঐ সব বিশেষজ্ঞরা নিজেদের সামলাতে পারলেন না ! কুম্ভ মেলা (যদিও বেশিরভাগ মানুষই জানেন না কুম্ভ এইবারে উত্তরপ্রদেশে নয় উত্তরাখণ্ডে আয়োজিত হয়) কুনওয়ার যাত্রার মতো বিষয় নিয়ে মজা করার সুযোগ তাঁরা ছাড়বেন কেন? এই সব মিটে যাওয়ার পরেও বিশেষজ্ঞরা মিথ্যার স্বর্গ বানিয়ে যেতে লাগলেন, আর কেরালার পক্ষে নানা ধরনের অজুহাত তৈরিতে ব্যস্ত থাকলেন । এখনো তাঁরা মিথ্যার সাগরে ডুব দিয়ে আছেন, কিন্তু ভাইরাসকে তো আর এভাবে বোকা বানানো যায় না। বিতাড়িতও করা যায় না। ভাইরাস কোনদিন ঘুষ খায় না বা হুমকিতে ভয় পায় না। তাই বিশেষজ্ঞদের প্রচার সত্বেও কেরালাতে এখনো চলছে কোভিড সংক্রমনের বিস্ফোরণ । তবে দোষ দেবার জন্য সন্দেহাতীতভাবে মোদী আছেন ।

তবে এর দায়িত্ব কিন্তু আমাদের সবার। আমাদের বহু পূর্বেই, অন্তত কয়েক দশক আগে কেরালা মডেলের বিসর্জন করবার প্রয়োজন ছিল। আমাদের আরো অনেক আগেই কেরালার রাজনৈতিক অত্যাচারকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল। কমিউনিস্ট সন্ত্রাস, রাজনৈতিক হিংসা, ইউনিয়নের গুন্ডা বাজী আর সরকারি নীতি যখন কেরালাতে সম্পদ তৈরি বন্ধ করে দিয়েছে , তখনই আমাদের ভাবা উচিত ছিল। আমাদের উচিত ছিল রাজ্যের অর্থনীতিকে সুদৃঢ় করার চেষ্টা করা। কারণ কেরালার অর্থনীতি এখন নির্ভর করে বিদেশ থেকে প্রেরিত অর্থের উপর। সরকার নাগরিকদের উপর এমন চাপ প্রয়োগ করেছে যে তারা রাজ্যের বাইরে কাজ খুঁজতে যাচ্ছে, আর বাইরে থেকে যে অর্থ উপার্জন করে রাজ্যে প্রেরণ করছে, তার ওপরই নির্ভর করছে রাজ্যের অর্থনীতি। সারা বছরের জন্য এটাই হলো কেরালা মডেল ।

আমাদের উচিত পৃষ্ঠপোষক মিডিয়াদের দ্বারা সংগঠিতভাবে তৈরি করা কেরালা সংক্রান্ত যাবতীয় কুসংস্কারাচ্ছন্ন মিথ্যা ধারণার যোগ্য জবাব দেওয়া। তার জন্য আমাদের হাতে রয়েছে প্রচুর পরিসংখ্যান । কিন্তু আমরা সেই চেষ্টা করিনি । তাই আমরা কমিউনিস্ট কেরালা থেকে করোনার তৃতীয় ঢেউ ভারতে ছড়িয়ে পড়ার অপেক্ষায় বসে আছি। আর চাটুকার সংবাদপত্রগুলি নিবন্ধ লিখে চলেছে কিভাবে কেরালা করোনা ভাইরাসকে পরাজিত করেছে !

Image credits: OpIndia

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.