শিকাগো ধর্ম মহাসভা ও স্বামীজি

0
23

© শ্রী সূর্য শেখর হালদার

শিকাগোর বিশ্বধর্ম মহাসভা পৃথিবীর ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। এই ধর্ম মহাসভার আয়োজন হয়েছিল কলম্বাসের আমেরিকা আগমণের চারশো বছর পূর্তি উপলক্ষে। এই ধর্ম মহাসভা ছিল আসলে এক বিরাট মেলার অংশ । এই মেলায় অনেক রকম প্রদর্শনী ও অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছিল। তবে সকল প্রকার প্রদর্শনী ও অনুষ্ঠানের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ধর্ম মহাসভা। এই মেলার নাম ছিল কলম্বিয়ান এক্সপোজিশন।

এই ধর্ম মহাসভা প্রস্তুতির জন্য সময় লেগেছিল প্রায় ত্রিশ মাস। এর প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন জণ হেনরি ব্যারোজ। এই ধর্ম মহাসভার প্রস্তুতির জন্য উদ্যোক্তাদের প্রায় দশ সহস্র চিঠি এবং চল্লিশ সহস্র অন্যান্য নথিপত্র রেলপথে ও স্টিমার যোগে পৃথিবীর বিভিন্ন ঠিকানায় পাঠাতে হয়েছিল। মোট দশটি ধর্মের প্রতিনিধিরা এই ধর্ম মহাসভায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই ধর্ম গুলি হল ইহুদি , ইসলাম, হিন্দু , বৌদ্ধ, তাও , কনফুসিয়াস মতবাদ, শিনটো , পারসিক ধর্ম, ক্যাথলিক এবং গ্রীক চার্চ ও প্রটেস্ট্যান্ট ধর্ম। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট দুটোই খৃষ্টান রিলিজিয়ন এর অন্তর্গত। কিন্তু উভয়ের মধ্যে দীর্ঘ বিরোধের ইতিহাসের কারণেই এই দুই খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে আলাদা আলাদাভাবে আহ্বান করা হয়েছিল।

ধর্ম মহাসভার জন্য স্থান নির্বাচিত হয়েছিল শিকাগোর আর্ট ইনস্টিটিউট। ধর্ম মহা সভার অধিবেশন গুলি দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল – মূল শাখা ও বিজ্ঞান শাখা। মূল শাখার অনুষ্ঠানগুলি হয়েছিল কলম্বাস হলে, যেখানে আসন সংখ্যা ছিল চার সহস্র। আর বিজ্ঞান শাখার জন্য নির্ধারিত ছিল ওয়াশিংটন হল।

ধর্ম মহাসভায় উদ্যোক্তারা ধর্ম মহাসভার উদ্দেশ্য হিসেবে বেশ কয়েকটি বিষয় ঘোষণা করেছিলেন। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল

প্রধান প্রধান ঐতিহাসিক ধর্মের প্রতিনিধিদের ইতিহাসে প্রথমবারের জন্য একই সভায় একত্রিত করা।

বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে কি কি সাধারণ সত্য রয়েছে
সেগুলিকে তুলে ধরা।

প্রতিটি ধর্ম ও খ্রিস্টান চার্চ এর বিভিন্ন শাখা যে সত্য গুলিকে তাদের ধর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্য বলে মনে করে সেগুলিকে নির্দিষ্ট করে দেখানো।

বিভিন্ন ধর্ম পরস্পরকে কিভাবে আলোকিত করেছে বা আগামী দিনে আলোকিত করতে পারে সেটি আলোচনা করা।

শিক্ষা দারিদ্র প্রভৃতি ব্যবহারিক সমস্যাগুলি সমাধানের ক্ষেত্রে ধর্ম কোন আলোকপাত করতে পারে কিনা সেই বিষয়টি খতিয়ে দেখা।

বিভিন্ন দেশ ও জাতি গুলিকে অধিকতর সৌহার্দ্য সূত্রে বাঁধা যাতে পৃথিবীতে স্থায়ী শান্তির পথ সুগম হয়।

এই সকল উদ্দেশ্যই সন্দেহাতীতভাবে অসাধারণ ছিল। কিন্তু তবুও শুনলে আশ্চর্য লাগবে যে এই মহৎ উদ্দেশ্য সমন্বিত ধর্ম মহাসভার বিরোধিতা উদ্যোক্তাদের সহ্য করতে হয়েছিল। এই বিরোধিতা এসেছিল খ্রিস্টধর্মের থেকে। ধর্ম মহাসভা আয়োজনের বিরোধিতা যেসব খ্রিস্টান মতালম্বী মানুষ করেছিলেন, তাঁদের বক্তব্য ছিল খ্রিস্টধর্মই একমাত্র ধর্ম এবং সেটাই শ্রেষ্ঠ ধর্ম। অতএব অন্য কোন ধর্মকেই খৃষ্টান ধর্মের সঙ্গে সম আসনে বসানো যাবে না। ক্যান্টারবেরির আর্চবিশপ ( ইংল্যান্ডের এ্যাংলিকান চার্চের প্রধান) এই ধর্ম মহাসভায় অংশগ্রহণ করতে অস্বীকার করেন এবং সকল খ্রিস্টান ধর্ম গুরুদের যোগ দেবার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করতে অনুরোধ জানান। ধর্ম মহাসভার প্রধান উদ্যোক্তা ডক্টর ব্যারোজ অবশ্যই এই মতামতে বিশ্বাসী ছিলেন না। কিন্তু গোপনে তাঁর উদ্দেশ্য ও আশা ছিল সকল ধর্মের উপস্থিতিতে খ্রিস্টধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করা। ধর্ম মহাসভার স্বপক্ষে বলতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেন যে অন্য ধর্মে যেসব সত্য আছে, সেগুলি খ্রিস্ট ধর্মতেও আছে। এছাড়াও খ্রিস্ট ধর্মের মধ্যে আরও অনেক সত্য আছে। তিনি আরো বলেন আলোর সঙ্গে অন্ধকারের বন্ধুত্ব হতে পারে না: কিন্তু আলোর সঙ্গে অল্প আলোর বন্ধুত্ব হতে পারে। সেই সঙ্গে তিনি এই মত প্রকাশ করেন যে ধর্ম মহাসভার পরে খ্রিষ্টধর্ম অন্য সব ধর্মের স্থান দখল করে নেবে।

যাইহোক, ধর্ম মহাসভার পর দেখা গেল উদ্যোক্তাদের এই উদ্দেশ্য পূরণ হলো না। এর কারণ যে ব্যক্তি ছিলেন, তিনি হলেন স্বামী বিবেকানন্দ। প্রথম থেকেই উদ্যোক্তাদের এই গর্বিত ভাব স্বামী বিবেকানন্দের দৃষ্টি এড়ায়নি। পরে তিনি একটি চিঠিতে লিখেছিলেন বিশ্ব ধর্ম সভার আয়োজন করা হয়েছিল খ্রিস্টধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে। সে কারণেই শিকাগোতে 11 সেপ্টেম্বর 1893 তারিখে তিনি প্রথম যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, সেই বক্তৃতার শুরুতেই সকল আমেরিকাবাসী কে ভ্রাতা ও ভগিনী বলে সম্বোধন করেন। সেই সঙ্গে ওই বক্তৃতায় তিনি সনাতন ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে না ধরে সনাতন ধর্মের
সহিষ্ণুতার দিকটি সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষিত আমেরিকাবাসীর হৃদয়ে প্রবেশ করে জানিয়ে দেওয়া যে তাঁরা যেখানে অন্য ধর্মকে না জেনে নিজের ধর্মকেই গর্বিতভাবে উচ্চে তুলে ধরতে চান, তখন সনাতন ধর্ম সকল ধর্মকে সত্য বলে স্বীকার করে।

উল্লেখ্য স্বামীজীর এই বিনয়ী ও মার্জিত ভাব আমেরিকার সকল বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় এবং সাধারন মানুষের হৃদয় স্পর্শ করে । তিনি হয়ে ওঠেন ধর্ম মহাসভার প্রধান আকর্ষণের কেন্দ্র এবং পরবর্তী বক্তৃতা গুলিতে তিনি সনাতন ধর্মের সারসত্য আমেরিকা বাসীর কাছে তুলে ধরেন। যেসব বক্তৃতাতে তিনি সনাতন ধর্মের শ্রেষ্ঠ দিকগুলি তুলে ধরেছিলেন সেগুলির মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য হলো Paper on Hinduism। 19 সেপ্টেম্বর 1893 তারিখে স্বামীজি তাঁর নিজের দ্বারা লিখিত এই ভাষণ পাঠ করেছিলেন।

তথ্যসূত্র: পরিব্রাজক স্বামীজী : দেশে ও বিদেশে। রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অফ কালচার, গোলপার্ক, কলকাতা।

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.