স্বামীজির আমেরিকা যাত্রা

0
198

© শ্রী সূর্য শেখর হালদার

স্বামী বিবেকানন্দ জন্মেছিলেন পরাধীন দেশের প্রজা হয়ে। কিন্তু তিনি ভারতীয় সংস্কৃতি, ভারতীয় ঐতিহ্যকে সারা বিশ্বের মধ্যে উচ্চস্থানে তুলে ধরতে
চেয়েছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন ভারতীয়দের আত্মমর্যাদাবোধ তৈরি করতে না পারলে, জগতের সামনে ভারতের হৃত মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে না পারলে, ভারতকে জগত সভার শ্রেষ্ঠ আসনে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। সে কারণেই সমগ্র ভারত পরিভ্রমণের পর তিনি সচেষ্ট হন আমেরিকা যাত্রা করে ধর্ম মহাসভায় ভারতের সনাতন ধর্মের ধ্বজ উত্তোলন করতে। কয়েকটি ঘটনা স্বামীজীকে আরো বেশি করে অনুপ্রাণিত করেছিল শিকাগো যাত্রার জন্য। তার মধ্যে অন্যতম একটি হল আবু রোড স্টেশনে এক ইউরোপীয় রেল কর্মচারীর এক ভারতীয় যাত্রীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার। গুরু শ্রীরামকৃষ্ণ এবং জগজ্জননীর কাছেও তিনি
আমেরিকা যাত্রার জন্য পেয়েছিলেন সুস্পষ্ট নির্দেশ । যখন তাঁর মনে পাশ্চাত্য যাত্রা উচিত হবে কিনা সে নিয়ে দ্বন্দ্ব কাজ করছে, তখন তিনি একদিন স্বপ্নে দেখলেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ সমুদ্র অতিক্রম করে যাচ্ছেন , আর তাঁকে ইঙ্গিত করছেন অনুসরণ করতে। সেই রাতে ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল স্বামীজীর। আর তিনি শুনতে পেয়েছিলেন গুরুর নির্দেশ – ‘ যাও, বিশ্বের কাছে প্রতিষ্ঠা কর ভারতকে।’ 31 মে 1893 পেনিনসুলার জাহাজে করে বোম্বে থেকে আমেরিকা যাত্রার ঠিক কয়েকদিন পূর্বে গুরুভাই স্বামী তুরিয়ানন্দকে কথাপ্রসঙ্গে স্বামীজি বললেন, ” হরি ভাই, এই ধর্মসভা – টভা যা হচ্ছে এসব এর ( নিজের দিকে তাকিয়ে) জন্য । আমার মন তাই বলছে। “

স্বামীজী শিকাগো যাত্রা করেছিলেন খেতরির মহারাজার উদ্যোগে। তবে মাদ্রাজ থেকে খেতরি
যাত্রার আগেই স্বামীজীর জন্য আমেরিকা যাত্রার টিকিট করে ফেলেছিলেন আলাসিঙ্গা প্রমুখ যুবকেরা। তাঁরা নিজেদের অর্থেই দ্বিতীয় শ্রেণীর একটি টিকিট কিনেছিলেন স্বামীজির জন্য। খেতরির রাজার নির্দেশে জগমোহন লাল দ্বিতীয় শ্রেণীর টিকিটকে প্রথম শ্রেণীর টিকিটে পরিবর্তন করে দেন। তাছাড়া স্বামীজীর আশীর্বাদে পুত্র সন্তান প্রাপ্ত রাজার ইচ্ছা ছিল তাঁর গুরু যেন
রাজবেশে পাশ্চাত্যে পদার্পণ করেন। তাই রাজার নির্দেশে স্বামীজীর জন্য এসেছিল একটি সিল্কের আলখাল্লা ও পাগড়ী। তবে এর বদলে গরম পোশাক কিনে দিলে স্বামীজীর বাস্তবিক উপকার হত, আমেরিকার প্রবল ঠান্ডার সঙ্গে তিনি যুদ্ধ করতে পারতেন । কিন্তু রাজার বা স্বামীজীর দক্ষিণ ভারতীয় ভক্তদের কারোরই অপরিচিত স্থানের আবহাওয়া কি রকম হতে পারে সে সম্পর্কে কোন ধারণা ছিল না। তবে বীর সন্ন্যাসীকে দমিয়ে রাখা আমেরিকা কেন অ্যান্টার্কটিকার শীতের পক্ষেও সম্ভব ছিল না। তাই শত প্রতিকূলতা জয় করে পাশ্চাত্য মননে এবং হৃদয়ে ভারতকে প্রতিষ্ঠা করেন এই সিংহ হৃদয় গেরুয়াধারী সন্ন্যাসী।

1893 খ্রিস্টাব্দে 31 মে পেনিনসুলার জাহাজে স্বামীজি যাত্রা করেন বোম্বে থেকে আমেরিকার পথে। পথে একবার জাহাজ বদলে 1893 খ্রিস্টাব্দের 25 জুলাই এমপ্রেস অফ ইন্ডিয়া জাহাজে করে তিনি উপস্থিত হন কানাডার ভ্যাঙ্কুভার বন্দরে। ভ্যাঙ্কুভার থেকে দীর্ঘ ট্রেন যাত্রা করে, দুবার ট্রেন পাল্টে শিকাগোতে তিনি উপস্থিত হন 30 জুলাই তারিখে। সেদিন ছিল রবিবার; সময় রাত এগারোটা। পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ অপরিচিত। তাঁর কাছে না ছিল উপযুক্ত অর্থ, না ছিল উপযুক্ত পোশাক। কিছুটা অস্বস্তি বোধ করছিলেন স্বামীজি। এই সময় তিনি জানতে পারলেন এক মর্মান্তিক সত্য। শিকাগো ধর্ম মহাসভায় যোগদান করতে গেলে পরিচয় পত্র চাই। কিন্তু তাঁর কাছে তো কোন পরিচয় পত্র নেই! ভারত থেকে আনাতে গেলেও তাতে কোন লাভ হবে না। কারণ ধর্ম মহাসভায় যোগদান করার তারিখ পেরিয়ে গেছে। স্বামীজীর মন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল, তবে হতাশ হলেন না তিনি। কারণ তিনি হলেন চিরকালের বীর প্রতিকূল অবস্থায় তাঁর মন আরো শক্ত হয়ে ওঠে। তিনি ভাবতে লাগলেন আমেরিকায় থেকে কিভাবে ভারতের ভাব তিনি প্রচার করতে পারেন।

এই সময় তিনি শুনলেন শিকাগোর থেকে বস্টন শহরের থাকা-খাওয়ার খরচ অনেক কম। তার পুঁজি অল্প। তাই ট্রেনে করে তিনি যাত্রা করলেন বস্টন অভিমুখে। ট্রেনেই পরিচয় হলো মাঝ বয়সী এক আমেরিকান মহিলার সঙ্গে। তাঁর নাম মিস ক্যাথেরিন স্যানবর্ন। স্বামীজীর সৌম্য দীপ্ত চেহারা দেখে আকৃষ্ট হয়েছিলেন তিনি। তাই নিজে এগিয়ে এসে কথা বললেন স্বামীজির সঙ্গে এবং দুই-একটি কথাতেই মুগ্ধ হলেন ঠিক যেমন ভারতবর্ষে সবাই হতো। ভগবানের অদ্ভুত কৃপা। ওই মহিলাও ছিলেন বস্টন বাসী এবং তাঁর খামারবাড়িতে জায়গা হল স্বামীজীর। এর ফলে দৈনন্দিন রাহা খরচ বেঁচে গেল স্বামীজীর।

ধর্ম মহাসভায় যোগ দেবার সমস্ত রাস্তা সেই মুহূর্তে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবুও স্বামীজি আশা করলেন আমেরিকায় থেকে ভারতের জন্য কিছু কাজ তিনি করতে পারবেন। তিনি শিষ্যদের চিঠিতে জানালেন যে যদি তাঁকে মাস দুয়েক আমেরিকায় থাকার খরচ ভারত থেকে পাঠানো যায় তবে তিনি খড়কুটো আঁকড়ে ধরে ভেসে থাকবেন এবং পাশ্চাত্য বাসীর কাছে ভারতকে চেনানোর উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। যদি আমেরিকায় তিনি ব্যর্থ হন, তাহলে ইংল্যান্ড গিয়ে চেষ্টা করবেন। আর যদি সেখানেও ব্যর্থ হন তাহলে আবার ফিরে যাবেন ভারতে এবং ঈশ্বরের পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষা করবেন।

যাই হোক স্বামীজীকে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ মনোরথ হতে হয়নি। স্যানবর্ণের সূত্রে বস্টনের শিক্ষিত সমাজে ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠতে লাগলেন স্বামীজী। বিভিন্ন ক্লাবে, গির্জায় সভা করতে লাগলেন। বস্টনের সংবাদপত্রে তাঁর বক্তৃতার খবর বের হতে লাগল। বস্টনের সংবাদপত্র গুলি কখনো তাঁকে ‘ রাজা’, কখনো আবার ‘ সন্ন্যাসী’ বলে সম্বোধন করতে লাগল। সত্যই তিনি ছিলেন সন্ন্যাসী রাজা। তাঁর বক্তব্যে মহিত হল বস্টন বাসী। প্রতিটা সংবাদপত্র গুরুত্ব দিয়ে ছাপতে লাগল তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম।

এবার স্যানবর্নের সূত্র ধরেই স্বামীজীর সঙ্গে পরিচয় হলো হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন হেনরি রাইটের। এই সুপন্ডিত অধ্যাপক সম্পর্কে বলা হত যে তিনি ছিলেন বিশ্বকোষ তুল্য জ্ঞান ভান্ডারের অধিকারী। তিনিও স্বামীজীর প্রতিভায় বিমুগ্ধ হলেন। স্বামীজীর সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পারলেন যে পরিচয় পত্রের অভাবে স্বামীজী যোগ দিতে পারছেন না শিকাগো ধর্ম মহাসভাতে। এই কথা শুনে রাইট বললেন,
আপনার কাছে পরিচয় পত্র চাওয়ার অর্থ হলো সূর্যকে প্রশ্ন করা তার কিরন দেওয়ার অধিকার আছে কিনা।

এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি স্বামীজিকে । অধ্যাপক রাইট নিজেই এক পরিচয় পত্র লিখে দিলেন। তিনি লিখলেন যে স্বামীজি এমন এক ব্যক্তি যে আমেরিকার সমস্ত পণ্ডিতের পাণ্ডিত্য এক করলেও এনার পাণ্ডিত্যের সমান হবে না। শুধু তাই নয় তিনি শিকাগো পর্যন্ত যাওয়ার জন্য স্বামীজীকে টিকিট কিনে দিলেন এবং সঙ্গে কিছু অর্থ রাশিও দিলেন যাতে শিকাগোতে স্বামীজীর কোন অসুবিধা না হয়। এভাবেই অধ্যাপক রাইটের চেষ্টায় অসম্ভব সম্ভব হল। স্বামীজীর কাছে দ্বার খুলে গেল শিকাগো ধর্ম মহাসভার। এর পরে যা ঘটেছিল সেটা ঐতিহাসিক। তাঁর প্রথম বক্তৃতাতেই পাশ্চাত্যবাসীর হৃদয় জয় করে নিলেন স্বামীজী। সেই দিনটা ছিল আজ থেকে ঠিক 128 বছর আগের 11 সেপ্টেম্বর। এরপর 1893 খ্রিস্টাব্দের 27 সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেশ কতকগুলি বক্তিতা করেছিলেন স্বামীজী: তিনি হয়ে উঠেছিলেন শিকাগো ধর্ম মহাসভার মধ্যমণি। আর ভারতের সংস্কৃতি , ধর্ম প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল সারা বিশ্বের দরবারে।

তথ্য সূত্র : পরিব্রাজক স্বামীজী : দেশে ও বিদেশে । রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অফ কালচার , গোলপার্ক

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.