তালিবঙ- প্রথম পর্ব

0
187

© ইন্দিরা ঠাকুরণ

আফগানিস্তানে তালিবানদের নিয়ে খুব আলোচনা করছেন ? একবার ভেবে দেখেছেন, বাঙালির অন্দরমহলে তালিবানদের মতোই গোঁড়া মুসলিম এবং মুসলিম সমর্থক বছরের পর বছর ধরে কিভাবে বেড়ে উঠছে?

বাম আমল থেকে কিভাবে যেন রটে গেল মুসলিম ধর্ম ভারি উদার। বিশেষতঃ কোন‌ও হিন্দুর মেয়ে যদি জীবনে চরম সুখী হতে চায়, তাহলে সে যেন মুসলিম ছেলেকে বিয়ে করে। রটনাটা মেয়ে মহলে ছড়াতে লাগলো স্কুল জীবন থেকেই। স্কুল কলেজের মেয়েদের টার্গেট করে টপাটপ মুসলিম ছেলেরা প্রেমের জালে ফাঁসাতে লাগলো। এক্ষেত্রে প্রেমে পড়া মেয়েরা অন্যান্য আর‌ও হিন্দু মেয়েদের ডেকে এনে আলাপ করাতো প্রেমিকের বন্ধুদের সঙ্গে। প্রেম বাড়তো চেন সিস্টেমে। আর এক্ষেত্রে এগিয়ে থাকতো বাঙাল বাড়ির মেয়েরা। তার তিনটে কারণ ছিল। প্রথমতঃ ঘটিদের বাড়িতে বিধিনিষেধের বেড়াজাল তখন‌ও বেশ কড়া হ‌ওয়ায় বাড়ির মেয়েদের মেলামেশার বিষয়টা গার্জেনরা কড়া নজর রাখতো । দ্বিতীয়তঃ বর্ডার টপকে এপারে আসার পরেই বাঙালদের মন থেকে মুসলিম সন্ত্রাসের কথা ভোজবাজির মতো মুছে যেতো এবং অদ্ভুত ভাবে মুসলিম-প্রীতি গজিয়ে উঠতো । তৃতীয়তঃ ভাল বর পাওয়া এবং অবাধ মেলামেশার আশায় বাঙাল বাড়ির মেয়েরা বাম পার্টি অফিসে বা থিয়েটার গ্রুপে গিয়ে সেকুলারিজমের পাঠ নিতো।

এমন বাঙালদের ব্যতিক্রম কি নেই ? আছে । কিন্তু সংখ্যায় তারা সত্যিই এখন নগণ্য।

বাম আমলেই শুনতাম, বাঙাল মেয়েরা খুব দুঃখ করে বলতো, পূর্ববঙ্গের রহিম চাচারা তাদের কতো ভালবাসতো ! তার ঠাকুমার ‘বিশেষ বন্ধু’ রহিমচাচা কিভাবে তাদের বর্ডার পার করে দেওয়ার সময় মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কেঁদেছিল । দেশ ছাড়ার আগে পিসিকে কত ভালবেসে রহিমচাচার ভাই তৃতীয় পক্ষের ব‌উ করে নেয় । আজ‌ও তাদের ভিটে পাহারা দিচ্ছে রহিম চাচারা ।

অত‌এব রহিমচাচা ভাল লোক, তিলজলার আবদুল ভাল, কাশ্মীরি শাল‌ওলা হ্যাণ্ডসাম সেলিম খুব ভাল । এই ভালর লিস্ট বাড়তে বাড়তে হঠাৎ নব্ব‌ইয়ের দশকে আম বাঙালির হাতে এসে পড়লো আগুনের গোলার মতো একটা ব‌ই । সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাবুলিওয়ালার বাঙালি বউ । যে আঁতেল বাঙালির মন জুড়ে এতোদিন ছিল আফগানিস্তানের মানুষ মানেই রবি ঠাকুরের বানানো গল্প রহমত-মিনি, সেখানে যেন ধাক্কা লাগলো ।

সে যুগে এতোটা সিরিয়ালে মশগুল থাকতো না বাঙালি। বাড়ির ব‌উরা ব‌ই বা পত্রিকা পড়তো । ফলে আলোচনায় উঠে আসতে লাগলো আফগানিস্তানের শ্বশুর-পুত্রবধূর যৌনাচার, একাধিক স্ত্রীর সঙ্গে এক বিছানায় শোওয়া, নানারকম অজাচার, পর্দাপ্রথা, ধর্ষণ, মেয়েদের চাবুক মারা ইত্যাদি ।তখন কেউ কেউ এ কথাও বলতো, আফগানিস্তানে যেতে হবে কেন, খাস পশ্চিমবঙ্গে অমুকবাবুর মেয়ে মুসলিমকে বিয়ে করার পর তার দুই সতীনের সঙ্গে থেকেছে এবং সাতটা বাচ্চাও হয়েছে।

এই প্রজন্মের যারা জানেন না, তাদের জন্য সংক্ষেপে সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচয় দিই । সুস্মিতার জন্ম খুলনায় ১৯৫৬ সালে । পরে তাঁর পরিবার কলকাতায় এসেছিলেন । নকশাল আমলে ট্যাটন প্রভৃতি বাম-নকশাল বন্ধুদের সঙ্গে মিশে বিপ্লব করার স্বপ্ন দেখলেও, সেটা করা হয়ে ওঠেনি । তাই অন্য রকম বিপ্লব করলেন । রুমা বা এইরকম কোন‌ও বন্ধুর মারফৎ আলাপ হয় কাবুলিওয়ালা জাম্বাজ বা জাঁবাজ খানের সঙ্গে । রুমাও প্রেম করতো এক কাবুলির সঙ্গে । সুস্মিতা জাম্বাজের প্রেমে পড়েন এবং বাড়ির অমতে বিয়ে করে ঘর ছাড়েন । জাম্বাজের হাত ধরে চলে যান সোজা আফগানিস্তানে  । সেখানে গিয়ে জাম্বাজের মুখোশ খুলে যায় । সুস্মিতা জানতে পারেন জাম্বাজের প্রথম স্ত্রীয়ের কথা, যা জাম্বাজ এতোদিন চেপে রেখেছিলেন । সতীনের সঙ্গে ঘর করতে করতে শ্বশুরবাড়ির হিংস্রতা, মারধোর সব‌ই সহ্য করেন । বহুবার পালিয়ে আসার চেষ্টা করেন ভারতে কিন্তু ধরা পড়ে গিয়ে নির্যাতন আর‌ও বাড়ে । আফগানিস্তানে আর‌ও অনেক বাঙালি ও ভারতীয় মহিলার সন্ধান পান যারা তাঁর‌ই মতো প্রেমের ফাঁদে পড়ে ঐ দেশে গিয়ে ফেঁসে গেছে । সকলেই ভয়ঙ্কর রকম অত্যাচারের শিকার । কিন্তু ফিরতে দেবে না কাউকেই । তার ওপর আফগানিস্তানে তখন তালিবানদের প্রবল প্রতাপ । ফলে সমস্যা আর‌ও গভীর ।সুস্মিতা ফাইনালি ভারতে আসতে পেরেছিলেন এবং এই ব‌ই লেখেন । ব‌ই প্রকাশের পর সব জানাজানি এবং রবীন্দ্রনাথের কাবুলিওয়ালার দেশের ইমেজে চুনকালি ।

এইভাবে মুসলিমদের অন্দরমহলের কথা আলোচনা হ‌ওয়ার সময় হিন্দুবিদ্বেষী বাজারি পত্রিকাগুলো কি ছেড়ে কথা বলেছিল ? না । শুরু হয় সুস্মিতার নানারকম ইণ্টারভিউ এবং আর্টিকেল ছাপার পালা । প্রথম দিকে সে সব পড়লে মানুষের আতঙ্ক হবে, সহানুভূতি জাগবে সুস্মিতার জন্য । কিন্তু পরবর্তীকালে সুস্মিতা বারবার ধরা পড়লেন স্ববিরোধীতায় ভরপুর একজন মহিলা হিসেবে । কখন‌ও বলছেন, “আমার দেওর আমাকে পিটিয়েছিল, তাতে আপনাদের কি ? এসব দেওর-ব‌উদির বিষয়” ।আবার কখন‌ও বলেছেন, “জাম্বাজের বিরুদ্ধে কোন‌ও স্টেপ কেন‌ নিইনি জানেন ? তালাক বোঝেন ? সেই তালাকের ভয়ে” ।অর্থাৎ আর‌ও পাঁচটা মোল্লা-ঘরণী হিন্দু মেয়ের মতো ব্রেন ওয়াশড সুস্মিতা কোন‌ও অদৃশ্য আকর্ষণে তাঁর কলকাতার ফ্ল্যাটে জাম্বাজকে অ্যালাও করলেন । সুস্মিতার মা-বাবা তাঁকে গ্রহণ করেননি প্রথম দিকে । তাই এ দেশে ফেরার পর এবং ব‌ই লেখার আগে তাঁর ভরণপোষণ কিভাবে চলতো, সেটাও অজ্ঞাত । পরবর্তীকালে বাজারি পত্রিকাগুলো হয়তো কিছু আর্থিক ব্যবস্থা করেছিল । হয়তো জাম্বাজকে ডিভোর্স না করার পুরস্কার সেটাই । পুরোটাই আন্দাজ । কারণ লাভ জিহাদের এতোবড় ঘটনা চেপে যাওয়া এবং সেটাকে গ্লোরিফাই করাই এসব পত্রিকার কাজ ।

অতঃপর ২০১৩ সালে সুস্মিতা পুনরায় চললেন আফগানিস্তানে। সকলের বারণ সত্ত্বেও গেছিলেন কেন ? স্বামী জাম্বাজ এবং পেট্রোডলার পুষ্ট মিডিয়ার মিলিত চাপে পড়ে কি ? সেটাও অজ্ঞাত। কিন্তু যাওয়ার পরের পরিণতি ভয়ঙ্কর। ৫৭ বছর বয়সে ওখানে গিয়ে তালিবানদের হাতে একটানা গণধর্ষিত হয়ে, মার খেয়ে, নারকীয় অত্যাচার সহ্য করে, কালাশনিকভ রাইফেলের কুড়িটা গুলি খেয়ে মৃত্যু। সেই মৃত্যুর পর বাজারি পত্রিকাগুলো নামলো, “আহা, কলকাতার কাবুলিদের কেউ কিছু জিজ্ঞেস করো না ও ব্যাপারে । ওরা বড় ভাল, শান্তিপ্রিয়” ।আজ‌ও সেটা চালিয়ে যাচ্ছে । সম্প্রতি দ্য ওয়ালে প্রকাশিত আর্টিকেল থেকে জানা গেল, কাবুলিদের নাকি এখানকার আধার কার্ড আছে । তারা কি ভারতের‌ও নাগরিক ? নাকি বারো মাসের বেশি সময় ভারতে থাকার ফলে আধার কার্ড পেয়েছে ? সেকুলার পত্রিকা অবশ্য সেটা খুব স্বাভাবিক চোখেই দেখেছে ।
কিন্তু আমরা ঘরপোড়া গোরু । তাই এটাকে স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারছি না । বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান থেকে যদি এভাবে মুসলিমরা এ দেশে ঘর বানায়, আমরা কোথায় যাবো এরপর ?
( ক্রমশ )

(মতামত ব্যক্তিগত)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.