হিন্দু আজন্মকাল থেকেই শক্তির পূজারী

0
116

© শ্রী কুশল বরণ চক্রবর্তী

হিন্দু আজন্মকাল থেকে শক্তির পূজারী;
শক্তিপূজায় বলি দৃষ্টিকটু, তবে অশাস্ত্রীয় নয়

সনাতন ধর্মে পশুবলি প্রথা দৃষ্টিকটু হলেও, শাস্ত্রে নিষিদ্ধ নয়।শুধুমাত্র বৈষ্ণব শাস্ত্রাদিতে পশুবলির আবশ্যকতা খুব একটা পাওয়া যায় না। এর অন্যতম কারণ বৈষ্ণব শাস্ত্রাদিতে ও উপাসনায় অহিংসা তত্ত্বের প্রভাব এবং শ্রীরামানুজাচার্য, শ্রীমধ্বাচার্য, শ্রীনিম্বার্ক এই প্রধান চার বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের প্রধান আচার্যবৃন্দ সকলেই দক্ষিণ ভারতের। আর বলার অপেক্ষা রাখে না, দক্ষিণ ভারতে ঐতিহাসিকভাবেই নিরামিষাশী প্রভাব প্রবল। সেখানে বহু মুসলিম এবং খ্রিস্টানরাও নিরামিষাশী। এই নিরামিষ খাদ্যাভ্যাসেরই সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈষ্ণব সম্প্রদায়গুলোর উপরে। কিন্তু এর পরেও বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের বেদের পরে প্রধানতম গ্রন্থ শ্রীমদ্ভাগবত এবং বিষ্ণু পুরাণে ধূপ, প্রদীপ, উপহার এবং বলি দ্বারা পূজা করতে বলা হয়েছে। তবেই দেবী সকল মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করবেন।

অর্চিষ্যন্তি মনুষ্যাস্ত্বাং সর্বকামবরেশ্বরীম্‌ ।
ধূপোপহারবলিভিঃ সর্বকামবরপ্রদাম্‌ ।।
( শ্রীমদ্ভাগবত: ১০. ২.১০)

“তুমি সর্বলোকের সকলের প্রার্থনাপূরণকারিণী বরদাদেবীরূপে পূজিতা হবে। লোকে ধূপ,প্রদীপ, উপহার এবং বলি দ্বারা সকল মনোবাঞ্ছা পূরণের জন্যে তোমার পূজা করবে।”

সুরামাংসোপহারৈশ্চ ভক্ষ্যভোজ্যৈশ্চ পূজিতা ।
নৃণামশেষকামাংস্ত্বং প্রসন্না সম্প্রদাস্যসি ।।
( বিষ্ণু পুরাণ: ৫.১.৮৬)

” হে দেবী! সুরা ও মাংস, ভক্ষ্য ও ভোজ্য দ্বারা তোমায় পূজা করলে তুমি প্রসন্ন হয়ে মনুষ্যগণের সর্ব প্রার্থিত বিষয় প্রদান করবে।”

ধর্ম ভিন্ন হলেও পাঠাবলি এবং কুরবানির উদ্দেশ্য এবং প্রকৃতি প্রায় একই প্রকারের। দুটিই যার যার নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে সৃষ্টিকর্তার নামে সমর্পণ করে সেই পবিত্র মাংস খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা। আমি আমার এ জীবনে কোন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষকে কোনদিন দেখিনি কোরবানির বিরুদ্ধে কখনো কোন নেতিবাচক মন্তব্য করতে। সে অশিক্ষিত রিক্সাওয়ালা হোক অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। কারণ বিষয়টি তাদের ধর্মগ্রন্থে রয়েছে। কিন্তু হিন্দু সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি উল্টো। হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মগ্রন্থের বিবিধ স্থানে পশুবলির শাস্ত্রীয় নির্দেশ থাকার পরেও, তথাকথিত শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মানুষের এর বিরোধিতা করে। তাদের মধ্যে এমন একটি ভাব; যদি সে বলির বিরুদ্ধে না বলে, বলির বিরুদ্ধে না লিখে তবে সে প্রগতিশীলদের কাতারে ঠাই পাবে না। এরাই আবার পশুমাংস ভোজনের সময়ে মাংসের গামলা খালি করে ফেলে। এদের দ্বৈতচরিত্র ভয়ংকর। বঙ্গদেশে মনসাপূজা, দুর্গাপূজা এবং কালীপূজা আসলেই এই তথাকথিত পশুভক্ষক ঋতুভিত্তিক পশুপ্রেমীগণ শীতনিদ্রা ত্যাগ করে জেগে উঠেন। পেটের পাকস্থলীতে হজমের অপেক্ষায় পশুমাংস নিয়ে তারা সক্রিয়ভাবে শাস্ত্রীয় পশুবলির বিরুদ্ধে লেখালেখি, প্রচার শুরু করে দেয়। কিছু সস্তা বালখিল্য যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে চায়, সনাতন ধর্মে পশুবলি অধর্মাচরণ এবং অশাস্ত্রীয়। কিন্তু বিষয়টি তা নয়। অবশ্য বৈষ্ণব সম্প্রদায় এদের পর্যায়ে পড়ে না। তাদের উদ্দেশ্য মহত্তম। তারা উদ্ভিজ্জ আমিষ ভোজন করে শরীরকে শান্ত রেখে সাধন জীবনে অগ্রসর হতে চায়।

পশুবলি প্রসঙ্গে বলতে হয়, আমি বিশ্বাস করি আর না করি, পশুবলি অমানবিক এবং দৃষ্টিকটু একথা সত্য। কিন্তু পশুবলি সনাতন ধর্মে অশাস্ত্রীয় নয়। প্রায় সকল শাস্ত্রগ্রন্থেই পশুবলির নির্দেশনা রয়েছে। শাক্ত সম্প্রদায়ের বেদের পরে প্রধান গ্রন্থ শ্রীচণ্ডী। এই শ্রীচণ্ডীতে একাধিক স্থানে বলি প্রদানের কথা রয়েছে। পূজায় পশুবলি প্রদানের নির্দেশনা দেবী স্বয়ং নিজমুখেই দিয়েছেন :

বলিপ্রদানে পূজয়ামগ্নিকার্যে মহোৎসবে।
সর্বং মমৈতচ্চরিতমুচ্চার্যং শ্রাব্যমেব চ।।
জানতাজানতা বাপি বলিপূজাং তথা কৃতম্ । প্রতীচ্ছিষ্যাম্যহং প্রীত্যা বহ্নিহোমং তথা কৃতম্ ॥
(শ্রীচণ্ডী:১২.১০-১১)

“বলিদানে, দেবতার পূজায়, যজ্ঞ ও হোমাদিতে এবং মহোৎসবে আমার এই মাহাত্ম্য সম্পূর্ণরূপে পাঠ ও শ্রবণ করা কর্তব্য।
আমার মাহাত্ম্যপাঠের পর বিধিজ্ঞানপূর্বক বা অজ্ঞানপূর্বক অনুষ্ঠিত বলিদানসহকারে পূজা এবং আমার উদ্দেশে অনুষ্ঠিত হোমাদি আমি প্রীতিপূর্বক গ্রহণ করি।”

যজ্ঞাদি কর্মে পশুবধজনিত পাপ হয় না। বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসদেব রচিত বেদান্তসূত্রেও বলা হয়েছে:

অশুদ্ধমিতি চেৎ, ন, শব্দাৎ ॥
(ব্রহ্মসূত্র:৩.১.২৫)

“যদি এইরূপ বলা হয় যে, যজ্ঞাদিতে পশু ইত্যাদি বলি হয় বলে উহা পাপ।কিন্তু তা নয় — কারণ এর শাস্ত্রীয় প্রমাণ রয়েছে।”

শ্রুতিতে পশুবধের বিধান আছে— এবং এই কর্মের শুধুমাত্র পুণ্য ফলই হবে বলা আছে। বেদান্তসূত্রের এ সূত্রটির মাধ্যমে পূর্বসূত্রে উপস্থাপিত যজ্ঞে পশুবলি বিরোধীদের সকল আপত্তিটির খণ্ডন করা হয়েছে। আপত্তিটি ছিল যে, জীব যজ্ঞাদিতে পশু হননাদি দুষ্কর্মে পাপে লিপ্ত হয়ে বৃক্ষগুল্মাদি জন্ম প্রাপ্ত হয়। এই আপত্তিকে খণ্ডন করে বেদান্তসূত্রকার ব্যাসদেব বলেন, যজ্ঞে পশুহননাদি দ্বারা যজ্ঞকর্তার কোন পাপ বা অশুভ কর্মফলের সৃষ্টি হয় না— কারণ এটি শাস্ত্রানুমোদিত।

মহাভারতে বিবিধ স্থানেই পশুবলির প্রসঙ্গে বলা হয়েছে। ভীষ্মপর্বে অন্তর্গত শ্রীমদ্ভগবদগীতায় পূর্বে যে ‘দুর্গাস্তব’ রয়েছে, সে পবিত্র স্তোত্রের মধ্যেও অর্জুন দেবীকে “সর্বদা মহিষরক্তপ্রিয়ে!” বলে সম্বোধন করেছেন। কৌরবপক্ষীয় দুর্য্যোধনের সৈন্য যুদ্ধের জন্য উপস্থিত হয়েছে দেখে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে তাঁর যুদ্ধজয়সহ কল্যাণের জন্য বললেন। হে মহাবাহু অর্জুন, তুমি পবিত্রচিত্ত হয়ে যুদ্ধের অভিমুখে থেকে শত্রুগণের পরাজয়ের জন্য ‘দুর্গাস্তব’ পাঠ কর। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশে অর্জুন রথ থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে নেমে কৃতাঞ্জলি হয়ে দুর্গাস্তব পাঠ করেন।

মহিষাসৃক্ প্ৰিয়ে নিত্যং কৌশিকি পীতবাসিনি । অট্টহাসে কাকমুখি নমস্তেঽস্তু রণপ্ৰিয়ে।।
(মহাভারত: ভীষ্মপর্ব, ২৩.৮)

“সর্বদা মহিষরক্তপ্রিয়ে! কৌশিকি! পীতবসনে! অট্টহাসে! কাকবদনে! রণপ্রিয়ে! তোমায় নমস্কার।।”

মানববৎসলা দুর্গা অর্জুনের ভক্তি এবং স্তোত্রে সন্তুষ্ট হয়ে শ্রীকৃষ্ণের সম্মুখে আকাশে আবির্ভূত হলেন। দেবী দুৰ্গা বললেন— “হে দুৰ্দ্ধৰ্ষ পাণ্ডুনন্দন ! তুমি অল্পকালের মধ্যেই সকল শত্রুগণকে জয় করবে। কারণ, স্বয়ং নারায়ণ তোমার সহায় এবং তুমিও মহর্ষি নরের অবতার ; সুতরাং তুমি শত্রুগণের কেন—স্বয়ং ইন্দ্রেরও অজেয়।”

যুদ্ধজয়ের বরদান করে দেবী অন্তর্হিত হলেন। অর্জুনও দেবীকর্তৃক বর লাভ করে ধর্মযুদ্ধে জয়লাভের নিশ্চয়তা পেলেন। এরপরে অর্জুন নিজের উত্তম রথে আরোহণ করে রথের সারথি শ্রীকৃষ্ণসহ দিব্য শঙ্খধ্বনি করলেন।

দেবীপুরাণের বিভিন্ন স্থানে পশুবলির প্রসঙ্গ পাওয়া যায়। দেবতারা বলি দিয়ে দেবীর পূজা করেছেন, সন্তুষ্ট করেছেন।

বরঞ্চ সর্বলোকানাং প্রপদৌ ভয়নাশিনী।।
বলিঞ্চ দদ্যুর্ভূতানাং মহিষাজামিষেণ চ।।
( দেবীপুরাণ: ২১.৪-৫)

“সেই ভয়নাশিনী দেবী সকল লোককেই অভয় প্রদান করলেন। ভূতগণ মধ্যে মহিষ, ছাগ ইত্যাদি বলি দেবীকে প্রদান করলেন।”

দেবীপুরাণে পশুবলি প্রসঙ্গে প্রজাপতি ব্রহ্মা বললেন:

জলদান্তে আশ্বিনে মাসি মহিষারিনিবর্হিণীম্‌ ।
দেবী সম্পূজয়িত্বা তু অষ্টমী হ্যর্দ্ধরাত্রিষু ।
যে ঘাতয়ন্তি সদা ভক্ত্যা তে ভবন্তি মহাবলাঃ ।।
( দেবীপুরাণ:২১.৯)

“বর্ষা প্রভাতে আশ্বিন মাসে অষ্টমী অর্ধরাতে দেবীকে নিষ্ঠার সাথে পূজা করে যারা মহিষ, ছাগ বলি প্রদান করেন, জগতে তাঁরা মহাবলশালী হয়ে থাকেন।”

দেবী দুর্বলদের পূজা কখনোই গ্রহণ করেন না। অনেক দুর্বলচিত্ত অহিংসার নামে নিজের নপুংসকতা এবং দুর্বলতাকে আচ্ছাদিত করার চেষ্টা করে। কিন্তু দেবীর শরণে থাকলে মনুষ্যের কোন ভয় নেই। দেবী তাঁর আশ্রিত ভক্তের সর্বপ্রকার ভয় হরণ করে নেন।

পদ্মস্থা চর্চ্চিকা রৌপ্যা ধর্মকামার্থমোক্ষদা ।
প্রেতস্থা সর্ব্বভয়হা নিত্যং পশুনিপাতনাৎ ।।
( দেবীপুরাণ:২৩.১৬)

“কমলাসনা দেবীমূর্তি আরোগ্য, ধর্ম, কাম, অর্থ ও মুক্তি প্রদান করেন। প্রেতাসনা দেবী পশুবলি গ্রহণ করে নিত্য সর্ববিধ ভয় হরণ করেন।”

প্রেতাসনা বলতে প্রেত বা শবের ওপর অধিষ্ঠিতা দেবী বোঝানো হয়েছে। কালী, তারা, চামুণ্ডা সবাই শবাসনা। দেবীকে পূজা করলে দেবী নিজেই চতুর্বিধ ফল দেন।শুভনিশুম্ভ বধ করেছেন যে কৃষ্ণবর্ণা হস্তে মুণ্ড এবং ত্রিশুলধারিণী কৌশিকীদেবী (কালী) বলি মাংসে অত্যন্ত তৃপ্তা হন।

বলিমাংসৌদনাহারাং কৃষ্ণগন্ধস্রজপ্রিয়াম্‌ ।
তুরুস্কাগুরুহোমেন বিকারিভয়নাশিনীম্‌ ।।
( দেবীপুরাণ: ৫০.৩৮)

“বলি, মাংস, অন্ন, নৈবদ্য এই দেবীর খুব প্রিয় । এই দেবীকে কৃষ্ণবর্ণ চন্দন , মালা দিতে হয় । তুরুস্ক , অগুরু ইত্যাদি দ্বারা হোম করলে দেবী সর্বভয় নাশ করেন । “

দেবী রক্তমালা ও রক্তবস্ত্র ধারণ করেন। বিধিভাবে পূজা করলে এই দেবী সর্ব্বসিদ্ধি প্রদান করেন ।দেবীপুরাণে কার্ত্তিক মাসের চতুর্দশী ও অমাবস্যা তিথিতে বলি দিয়ে দেবীর পূজা বিধান আছে-

তুলাস্থে দীপদানেন পূজা কার্য্যা মহাত্মনা ।
দীপবৃক্ষাঃ প্রকর্তব্যা দীপচক্রাস্তথাপরা ।।
দীপযাত্রা প্রকর্তব্যা চতুর্দ্দশ্যাং কুহূষ চ ।
সিনীবালীস্তথা বৎস তদা কার্য্যং মহাফলম্‌ ।
সর্বশেষে প্রকর্তব্যা বলিপূজাহোমোৎসবম্‌ ।
নৈরাজনং প্রকর্তব্য নৃনাগতুরগাদিষু।
কার্তিক্যাং কারয়েৎ পূজা যাগং দেবীপ্রিয়ং সদা।।
( দেবীপুরাণ: ৫৯.২৩-২৬)

“কার্ত্তিক মাসে দীপমালা দান করে পূজা করবে। ঐ মাসের চতুর্দশী এবং অমাবস্যার দিন দীপমালা, দীপচক্র ও দীপবৃক্ষাদি নির্মাণ করিবে। ঐ দিবস বলি- পূজা- হোম করা কর্তব্য। দেবতাদের অভ্যুত্থান ও মনুষ্য, অশ্ব, হস্তি প্রভৃতির নীরাজন করবে (যুদ্ধযাত্রার পূর্বে অস্ত্রশস্ত্রাদি পরিষ্কারকরণ তথ অর্চনাকরণ)। কার্তিক মাসে দেবীর পূজা এবং দেবীর উদ্দেশ্য যজ্ঞ করবে। যজ্ঞ দেবীর অত্যন্ত প্রিয়।”

দেবীপুরাণেই স্বয়ং ব্রহ্মা বলেছেন- উদর তৃপ্তির জন্য প্রানী হত্যা করে খেলে পাপ। কিন্তু যজ্ঞের উদ্দেশ্যে দেবতাকে উৎসর্গ করে, সেই উৎসর্গিত মাংস গ্রহণ করলে কোন পাপ স্পর্শ করে না।

ব্রহ্মোবাচ-
যজ্ঞার্থে পশবঃ সৃষ্টা যজ্ঞেম্বেষাং বধঃ স্মৃতঃ ।
অন্যত্র ঘাতনাদ্দোষো বাঙ্মনঃকায়কর্ম্মভিঃ ।।
দেবার্থে পিতৃকার্যেষু মনুষ্যর্থে পুরন্দর ।
বধয়ন্‌ ন ভবেদেন অন্যথা মহাকিল্বিষী ।।
নবকৃষরপূপাণি পায়সং মধুসর্পিষী।
বৃথামাংসঞ্চ নাশ্নীয়াদ্দেবপিতৃ অহোমিতম্।।
( দেবীপুরাণ: ৯৭.৩-৫)

“ব্রহ্মা বললেন, হে পুরন্দর ! যজ্ঞের জন্যই পশুর সৃষ্টি । যজ্ঞে তাদের বধ শাস্ত্রে বিহিত রয়েছে । যজ্ঞের কার্য্যে , বাক্য , মন , কায় ও কর্ম ছাড়া বাকী কর্মে পশুঘাত করলে পাপ হয়।
দেবকার্য্যে, পিতৃকার্য্যে ও মনুষ্যকৃত্যে পশুবধ করলে পাপ হয় না। এর বিপরীতে করলে বরং পাপ হয় ।
দেবতা ও পিতৃগণকে নিবেদিন না করে নূতন কৃষর, পিঠা, পায়স, মধু, ঘৃত ও দেবতাকে অনিবেদিত বৃথামাংস ভক্ষণ করবে না।”

পশুবলি প্রসঙ্গে বরাহপুরাণে বলা হয়েছে :

বরাহ উবাচঃ
মার্গমাংসং ভরং ছাগং শাকং সমনুধুজ্যতে ।
এতান্‌ হি প্রাপণে দদ্যান্মম্ম চৈতৎ প্রিয়াবহম্‌ ।।
বুজানো বিততে যজ্ঞে ব্রাহ্মণে বেদপারগে ।
ভাগো মমান্তি তত্রাপি পশূনাং ছাগ্লস্য চ ।।
মহিষং বর্জয়েন্মস্যং ক্ষীরং দধি ঘৃতং ততঃ ।
বর্জ্জয়েত্তত্র মাংসানি যজুষা বৈষ্ণবোহশ্নৃতে ।।
পরং পায়সপি বর্জ্যানি তন্মাংসং চেতক খুরে ।
পক্ষিণাঞ্চ প্রবক্ষ্যামি যে প্রযোজ্যা বসুন্ধরে ।।
যে চৈব মম ক্ষেত্রেষু উপযুজ্যন্তি নিত্যশঃ ।
লাবুকং কার্ত্তিকঞ্চৈব প্রশস্তঞ্চ কপিঞ্জলম্‌ ।।
( বরাহ পুরাণ:১১৯.১১-১৫ )

“মৃগমাংস , ছাগ মাংস ও শসমাংস আমার অতি প্রিয় । সুতরাং এসব আমাকে নিবেদন করে দেবে। বিস্তৃত যজ্ঞে ছাগ ও অনান্য পশু দান করে বেদপারগ ব্রাহ্মণ কে সমর্পণ করলে আমি তাহার অংশভাগী হই।
আমাকে মহিষ মাংস , ক্ষীর, দৈ ও ঘি দান করতে হয়। কোনো কোনো বৈষ্ণবব্রতে মাংস দান করাও নিয়ম। হে বসুন্ধরা ! সম্প্রতি আমাকে যে সকল পাখীর মাংস আমাকে দিতে হয় তা উল্লেখ করছি, শ্রবণ করো।
লাবক, কার্ত্তিক , কাপিঞ্জল ও অনেক প্রকার মাংস আমার কাজে প্রযুক্ত । যে সব দ্রব্য আমার কাজে দান করতে হয় তা বললাম।”

ব্রহ্মবৈবর্ত্তপুরাণে দেবী দুর্গা এবং দেবী মনসার পূজায় অত্যাবশকীয় পূজার উপাচার হিসেবে বলি প্রদান করতে বলা হয়েছে:

মহিষেণ বর্ষশতং দশবর্ষঞ্চ ছাগলাৎ ।
বর্ষং মেষেণ কুস্মাণ্ডৈঃ পক্ষিভির্হরিণৈস্তথা ।।
( ব্রহ্মবৈবর্ত্ত পুরাণ:প্রকৃতিখণ্ড.৬৪.৯৪)

“দেবী দুর্গা মহিষবলি দিলে শতবর্ষ , ছাগল বলিতে দশ বৎসর , মেষ- কুস্মাণ্ড বলিতে এক বছর প্রসন্না থাকেন।”

পঞ্চম্যাং মনসাখ্যায়াং দেব্যৈ দদ্যাচ্চ যো বলিম্।
ধনবান্ পুত্রবাংশ্চৈব কীর্তিমান্ স ভবেদ্ ধ্রুবম্।।
(ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ : প্রকৃতি খণ্ড, ৪৬.৯)

“পঞ্চমী তিথিতে দেবী মনসাকে যে ব্যক্তি বলি প্রদান করে, সে ধনবান, কীর্তিমান এবং পুত্রবান হয়।”

জয় ত্বং কামভূতেশ সর্ব্বভূতসমাবৃতে ।
রক্ষ মাং নিজভূতেভ্যো বলিং গৃহ্ন নমোঽস্তু তে ।।
( গরুড় পুরাণ:পূর্ব খণ্ড, ৩৮.১৮ )

“ওঁ জয় ত্বং কামভূতেশে – ইত্যাদি মন্ত্রে সিংহবাহিনী মহিষমর্দিনী দেবীকে বলিপ্রদানপূর্বক পূজা সমাপন করবে।”

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণেও পাই। সেখানে বলা হয়েছে, দেবী মনসাকে যে ব্যক্তি বলি প্রদান করে, সে ধনবান, কীর্তিমান এবং পুত্রবান হয়। তাই সর্বদা নিষ্ঠার সাথে বলিদান করে দেবীকে পূজা করে সন্তুষ্ট করা প্রয়োজন।

নত্বা ষোড়শোপচারং বলিঞ্চ তৎপ্রিয়ং তদা।
প্রদদৌ পরিতুষ্টশ্চ ব্রহ্মাবিষ্ণুশিবাজ্ঞয়া।।
(দেবীভাগবত: নবমস্কন্ধ, ৪৮.১১৪)

“দেবরাজ ইন্দ্র ভক্তিযুক্ত শুদ্ধ হৃদয়ে ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং শিবের আজ্ঞায় পশুবলি সহ ষোড়শ উপচারে মনসাদেবীর পূজা করলেন।”

হিন্দু আজন্মকাল থেকেই শক্তির উপাসক। তাদের দেবদেবীদের মূর্তি পরিকল্পনাই এর সাক্ষ্য দেয়। সকল দেবদেবীর হাতের অসুর বিনাশে অস্ত্রসস্ত্রসজ্জিত। যিনি প্রেমের দেবতা তাঁরও হাতে বাণ। শ্রীচণ্ডীর উত্তরচরিত্রে অষ্টভুজা যে দেবী সরস্বতীর ধ্যানমন্ত্র বর্ণনা করা হয়েছে, সেই ধ্যানমন্ত্রেও দেবী অস্ত্রসস্ত্রসজ্জিতা। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের হাতের সুমধুর মোহনবাশীর সাথে সাথে সুদর্শন চক্রও রয়েছে। এ চক্রটি ভগবান শ্রীবিষ্ণু এবং তাঁর অবতার শ্রীকৃষ্ণের প্রতীক। তাই আজও পুরীর জগন্নাথ মন্দির সহ প্রত্যেকটি বৈষ্ণব মন্দিরের চূড়ায় সুদর্শন চক্রকে স্থাপিত করা হয়। এ প্রসঙ্গে স্বামী প্রণবানন্দ মহারাজের একটি তেজদীপ্ত বাণী রয়েছে। তিনি বর্তমানের ভীত আত্মকেন্দ্রিক হিন্দু সম্প্রদায়কে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, হিন্দু একমাত্র শক্তির পূজক এবং শক্তির উপাসক। নিজেদের প্রকৃত স্বরূপ না চেনার কারণেই আমরা আজ আমাদের পুরনো হৃতগৌরব ফিরিয়ে আনতে পারছি না। মহাশক্তির সাধনা করে কোন মানুষ কখনো দুর্বল হতে পারে না।

“হিন্দু! তুমি কি জান না-তুমি শক্তির পূজক, শক্তির উপাসক ? তােমার সেই শক্তির সাধনা কোথায় ? শিবের হাতে ত্রিশূল, তাহা দেখিয়া তুমি কী চিন্তা করিবে? শ্রীকৃষ্ণের হাতে সুদর্শন, তাহা দেখিয়া তুমি কী ভাবনা ভাবিবে ? কালীর হাতে রক্তাক্ত খড়গ, দুর্গার হাতে দশপ্রহরণ, তাহা দেখিয়া তুমি কি শিক্ষা লাভ করিবে ? এই মহাশক্তির সাধনা করিয়া মানুষ দুর্বল হইতে পারে কি ? একবার ধীর স্থির হইয়া চিন্তা কর।”

স্বামী প্রণবানন্দ মহারাজের মত একই প্রকারের কথা কাজী নজরুল ইসলামের লেখাতেও পাওয়া যায়। তিনি দ্বিভুজে পরব্রক্ষ্মময়ী আদ্যাশক্তির শক্তি কামনা করেছেন। শক্তির উপাসনাতেই শক্তি লাভ হয়। তাই শক্তি পূজা করে শুধুই ভক্তি নয়, বিশ্বজয়ী হওয়া প্রয়োজন। যদি শক্তিপূজা করেও শক্তি লাভ না হয়, বিশ্বজয়ী হওয়া না যায়; তবে সেই শক্তিপূজা নিছক বিলাসতা মাত্র। সে পূজায় কোন লাভ হয় না, শুধুই কালক্ষেপণ।

“যে মহাশক্তির হয় না বিসর্জন
অন্তরে বাহিরে প্রকাশ যার অনুক্ষণ
মন্দিরে দুর্গে রহে না যে বন্দী
সেই দুর্গারে দেশ চায়।

আমাদের দ্বিভুজে দশভুজা শক্তি
দে পরব্রক্ষ্মময়ী
শক্তি পূজার ফল ভক্তি কি পাব শুধু
হব না কি বিশ্বজয়ী?

এ পূজা বিলাস সংহার কর
যদি পুত্র শক্তি নাহি পায়।”

লেখক পরিচিতি:

কুশল বরণ চক্রবর্ত্তী
সহকারী অধ্যাপক
সংস্কৃত বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.