স্বাধীনতার পরে ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত? কী বলেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি?

0
83
আদর্শ ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার ওপর ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির দৃষ্টিভঙ্গি কেমন ছিল? 

স্বাধীনতার পর ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা কেমন হবে তা নিয়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি আলোচনা করেছিলেন। 

হিন্দুদের শিক্ষাব্যবস্থা, তার চিন্তাধারা, সংগঠন সবই যেমন সহজ ছিল, তেমনই বিস্তারিত ছিল। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই তার বিবর্তন ঘটেছিল। হিন্দু শিক্ষাব্যবস্থা বরাবরই দুটি প্রাথমিক সংগঠনের ওপর ভর করে ছিল, যা কখনই পরিত্যক্ত হয় নি। হিন্দু শিক্ষাব্যবস্থায় মাতৃভাষার ব্যবহার থাকলেও মুখ্যত সংস্কৃত ভাষাই প্রাধান্য পেত। 

মুসলিমরা একাদশ শতকের শেষে বিশেষ করে উত্তর ভারত জুড়ে আধিপত্য স্থাপন করে। ত্রয়োদশ শতকের পর উত্তর ভারতে ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় ফার্সি ও আরবি ভাষা অনুপ্রবেশ করে। সে সময়ে ভারতের যেসব রাজ্যে মুসলিম শাসকের রমরমা ছিল, সেসব রাজ্যে শিক্ষাব্যবস্থায় মুসলিম পণ্ডিতদের নিয়োগ করা হত। এবং তারা ভারতীয়দের শিক্ষা দিতে গিয়ে দেখে, তারা হিন্দুদের তুলনায় সব দিক দিয়েই পিছিয়ে আছে। 

এই সময় থেকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা কার্যত ছিল ফার্সি ভাষা। হিন্দুরা সে ভাষা শিখতে দ্বিধাবোধ করেনি। তারা বুঝেছিল, যখন তারা মুসলিম শাসকদের অধীনে আছে, তখন ফার্সি ভাষা শিখে রাখা ভাল; তাতে অন্তত সরকারী চাকরি পাওয়া যাবে। এইসব কারণে মুসলিম শাসকরা সরকারী কর্মচারী হিসাবে হিন্দুদেরই বেছে নিত, তুলনামূলক ভাবে বেশি শিক্ষিত বলে। অন্যদিকে মুসলিমদের মধ্যে লেখাপড়া শেখার আগ্রহ তখনও ছিল না এখনও নেই। 

শুধু তাই নয়, সে সময়ে এমন অনেক মাদ্রাসা বা মক্তব ছিল, যেখানে শিক্ষক হিসাবে নির্বাচিত হতেন একজন হিন্দু। এদের বলা হত মুনশি। অন্যদিকে যারা মুসলিম শিক্ষণের ভার নিতেন, তাদের মোল্লা বলা হত। তৎকালীন অনেক মুসলিম ইতিহাসবিদ স্বীকার করেছেন যে, হিন্দু মুনশিরা তুলনামূলক ভাবে অনেক উচ্চমানের শিক্ষক ছিলেন। তাদের ফার্সি ভাষা, ইতিহাস ও সাহিত্য সম্পর্কে জ্ঞান মুসলিম শিক্ষকদের তুলনায় অনেক সময়েই বেশি হত। মক্তবের শিক্ষকদের বলা হত উস্তাদ, শিক্ষকের নাম দেখে শুধু বোঝা যেত, তিনি হিন্দু নাকি মুসলিম। যেখানে মক্তব বা মাদ্রাসার ব্যবস্থা ছিল, তার দায়ভার স্থানীয় মহাজন বা ভূস্বামী নিতেন। এতে যিনি দায়ভার নিচ্ছেন, তার নামডাক ও সামাজিক প্রতিপত্তি দুইই বেড়ে যেত। চতুর্দশ শতক থেকে শুধু মুসলিম ভূস্বামী নয়, অনেক হিন্দু ও জৈন ভূস্বামীও মুসলিম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়ভার বহন করতেন। এইভাবে মক্তব এক সময়ে প্রায় প্রাচীন হিন্দু পাঠশালার রূপ নিতে শুরু করে। শুধু ভাষা আলাদা, আর সব কিছুই প্রায় এক। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, বাকি বিশ্বে মক্তব বা মাদ্রাসার নিয়ম কিন্তু তৎকালীন ভারতের চেয়ে কিছুটা পৃথক ছিল।  

পঞ্চদশ শতকের শুরুতে ইসলামিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিন্দুদের যাওয়া নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হতে থাকে। ফার্সি ভাষায় পড়াতে-পড়তে গিয়ে হিন্দুদের মধ্যে ধর্মীয় চেতনায় ঘাটতি দেখা দিচ্ছে কিনা; তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ষোড়শ শতকের শুরুতে রচিত চৈতন্য মঙ্গলের লেখক জয়ানন্দ বিদ্রূপ করে লিখেছেন, 
"এত তো ঘোর কলিকাল দেখছি! ব্রাহ্মণরা আর হিন্দু নেই, দিনকে দিনে তারা মোল্লায় পরিণত হচ্ছে। তারা টাকার লোভে সংস্কৃত পড়ানোর চেয়ে ফার্সি ভাষায় পড়াতে বেশি পছন্দ করছে। এমনকি তারা দাড়িও রাখছে মোল্লাদের অনুকরণে। চিন্তার বিষয়।"

সে সময়ে শিক্ষনপদ্ধতির মাধ্যম ছিল মোটামুটি দুই তিনটে — আরবি, ফার্সি ও সংস্কৃত। মাঝেমধ্যে স্থানীয় ভাষায় পড়ানো হত বটে, কিন্তু মোটের ওপর ঐ দু তিনটে ভাষাতেই পঠনপাঠনের কাজ চলত। এতে শিক্ষার মান তেমন বাড়ে নি। তবে তা নিয়ে হিন্দু বা মুসলমানরা তেমন মাথা ঘামায় নি।  

মোটামুটি একই সময়ে ইউরোপে ক্যাথেড্রাল ও কনভেন্ট স্কুলে যে পঠনপাঠন চলত, তার মান অন্তত পাঠশালা বা মক্তবের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত ছিল। যদিও পদ্ধতি প্রায় একই ছিল তবে অনেক বেশি 'প্র্যাকটিকাল' বিষয় পড়ানো হত। মধ্যযুগে ভারতের উল্লেখযোগ্য সংস্কৃত শিক্ষাকেন্দ্রের মধ্যে নবদ্বীপ, বেনারস, কাঞ্চিপুরম, নাসিক, দ্বারকা, হরিদ্বার প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। কিন্তু সমস্যা হল, উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকের অভাবে উপরোক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি ধীরে ধীরে বন্ধ হবার উপক্রম হচ্ছিল। অন্যদিকে ইউরোপিয়ান ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি ধীরে ধীরে উন্নততর শিক্ষা দিতে শুরু করেছিল। শিল্পপতি পৃষ্ঠপোষকরা আধুনিকীকরণের ওপর জোর দেওয়া শুরু করেছিল। তাদের জন্যই চার্চের পাঠ্যসূচীতে ধর্মের পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পড়ানো শুরু হয়।   

যে সময়ে ইংলিশ বণিকরা ভারতে অনুপ্রবেশ করেছিল, সে সময়ে ইউরোপের শিক্ষাব্যবস্থা সবচেয়ে উন্নত জায়গায় পৌঁছেছিল। অষ্টাদশ শতকে তাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে তিনটে শব্দে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে — বাস্তববাদী, পরীক্ষণমূলক ও বস্তুবাদী। এই কারণে ইংলিশ বা অন্যান্য ইউরোপীয় জাতিসমূহ বিশ্বের বাকি দেশগুলির চেয়ে অনেকটাই অগ্রসর ছিল। ভারতের ব্যাপারটা ছিল ঠিক উলটো। ভারতীয়রা আজকের মতই সেযুগেও নতুন কিছু শিখতে বড়োই অলস ছিল। তারা সর্বদা নিজের গৌরবময় অতীতের রোমন্থন করতে ভালবাসত, যা আর কোনওদিনও ফিরবে না। এখানেই মৌলিক পার্থক্য ছিল ইউরোপীয় ও ভারতীয়দের মধ্যে। এটা সত্যিই দুঃখের স্রেফ আধুনিকীকরণের অভাবেই ধীরে ধীরে সংস্কৃত শিক্ষাকেন্দ্রসমূহ ধ্বংস হতে লাগল। 

সপ্তদশ শতকের পর থেকে ইউরোপে যেখানে শিক্ষাব্যবস্থায় বিজ্ঞান, ভূগোল ও ইতিহাসের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছিল, সেখানে ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় কোনও বদল ঘটেনি। এরপর ব্রিটিশরা যখন ভারতে নিজস্ব শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করল। তখনও দেখা গেল নিজের শিক্ষাব্যবস্থায় কোনও বদল আনেনি তারা। তাড়া পশ্চিমী শিক্ষাশৈলী ভারতের ওপরে চাপিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু তাতে ভারতের কোনও ক্ষতি হয়নি, বরং লাভ হয়েছিল। একমাত্র ক্ষতি বলতে — শিক্ষার মাধ্যম ইংরেজি হওয়ায় সংস্কৃত ও স্থানীয় ভাষা কিছুটা অবহেলিত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সার্বিক ভাবে ভারতের উপকারই হয়েছিল আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা পেয়ে; যা ঐ সময়ে অত্যন্ত জরুরি ছিল। 

আমাদের দরকার ছিল আরও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার। যা থাকলে ভারতের জ্ঞানপিপাসু জনগণের সুবিধা হত নিঃসন্দেহে। কিন্তু তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রীগণ সে বিষয়ে নজর দিচ্ছেন না, ইচ্ছাকৃত ভাবে নাকি আধুনিক শিক্ষা গ্রহণ করার ব্যাপারে তার কোন প্রকার মানসিক বাধা ছিল কিনা; তা নিশ্চিত ভাবে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু এই কারণে ভারতের যে ক্ষতি হয়েছে তা সহজে পূরণ করা সম্ভব নয়। ভ্রান্ত শিক্ষানীতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি এখন স্রেফ কেরানি তৈরির কলে পরিণত হয়েছে। সেখান থেকে প্রকৃত জ্ঞানসাধক, সংস্কৃতিপ্রেমী ছাত্র বের হওয়া সম্ভব নয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন কিছু আনা দরকার, যাতে ছেলেমেয়েরা উৎসাহিত হয়ে উঠবে। 

এখন সময় হয়েছে এমন শিক্ষাব্যবস্থা আনা, যাতে আমাদের ছেলেপুলেরা কিছু শিখতে পারে, কিছু সমাজকে উপহার দিতে পারে। ভারতের শিক্ষাব্যবস্থাকে ভারতের মানসিকতার জন্য উপযোগী বানাতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় পশ্চিমী আধুনিকতার সাথে ভারতীয় দর্শন মেশাতে হবে। কাজটা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। শিক্ষাব্যবস্থায় গ্রাম উপেক্ষিত থেকেছে, এবার গ্রামকে গুরুত্ব দিতে হবে। ভারতের ভূগোল, কৃষি, সমবায় ব্যাঙ্ক, ইন্ডাস্ট্রি, গ্রামীণ অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জুড়তে হবে শিক্ষাব্যবস্থায়; যাতে ভারতীয় যুবকযুবতীরা বুঝতে পারে — ভারতের আসল সমস্যা কোথায় এবং সমাধান বা কি। শিক্ষাব্যবস্থাকে ভারতের স্বার্থে কাজে লাগাতে হবে, ভারত বিরোধী শক্তির স্বার্থে নয়। 









We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.