এই বাংলার মাটি থেকেই হিন্দুত্ব ও হিন্দু জাতীয়তাবাদের জন্ম

0
52

© শ্রী সূর্যশেখর হালদার

উনবিংশ শতকের বাংলা ভারতীয় নবজাগরণের পীঠস্থান। আধুনিক ভারতের অনেক আদর্শের জন্ম এই উনবিংশ শতকের বাংলাতে। অনেক আদর্শের মধ্যে অন্যতম হলো হিন্দুত্ববাদের আদর্শ যা আজকের দিনে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ হিন্দু জাতীয়তাবাদ বলে বর্ণনা করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে হিন্দুত্ববাদ– এই শব্দটি, ভারতমাতার ধারণা, বন্দেমাতরম্ ধ্বনি – এই সবেরই সৃষ্টি বাংলার মাটিতে। বাংলার মাটি থেকেই এগুলি ছড়িয়ে পড়েছিল সারা ভারতে । এমনকি দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি গড়ে ওঠার ভিত্তি যে ধারণা- হিন্দু বিপদে , এটারও সূচনা হয়েছিল এই বাংলার মাটিতে।

বাংলার মাটিতে হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান উনবিংশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে। ঊনবিংশ শতকের প্রথম ভাগে বাংলাতে যে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিস্তার ঘটে , তারই ফলাফল ছিল হিন্দু জাতীয়তাবাদ। অনেকের মনে হতে পারে যে মেকলের শিক্ষা কিভাবে হিন্দুদের জাতীয়তাবাদী করে তুলল? এটা ঠিক যে ভারতীয়দের পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত করে আদর্শ কেরানি করে তোলাই ছিল মেকলের শিক্ষা পদ্ধতির লক্ষ্য। এই উদ্দেশ্যেই ইতিহাসে কুখ্যাত Macaulay’s Minute ( 1835) রচিত হয় এবং তৎকালীন গভর্নর জেনারেল হেস্টিংস তার যথাযথ প্রয়োগ ঘটান। কিন্তু ইতিহাস বড় নির্মম ! এই শিক্ষা ভারতবাসীকে প্রথমদিকে ব্রিটিশের পদলেহনকারী উপযুক্ত কেরানি বানালেও, উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে কেরানীর চাকুরী প্রার্থী শিক্ষিতের তুলনায় চাকুরীর শূন্যস্থান কম হওয়ায় শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়তে থাকে। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত এই নতুন শ্রেণীই ব্রিটিশবিরোধী রাজনীতিতে জড়িয়ে পরেন। আর ব্রিটিশ বিরোধী রাজনীতির অনুপ্রেরণা তাঁরা লাভ করেন স্বদেশীয় দর্শন , সাহিত্য এবং ধর্মীয় চিন্তাভাবনা থেকে। এই দিক থেকে দেখতে গেলে মেকলের শিক্ষা পদ্ধতি ঔপনিবেশিক স্বার্থরক্ষার ক্ষেত্রে কতটা সফল হয়েছিল, সেটা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। এটা ভুললে চলবে না যে 1893 সালে শিকাগো ধর্ম সভায় হিন্দু ধর্মের আদর্শ প্রচার করে পৃথিবীর বিখ্যাত হওয়া স্বামী বিবেকানন্দ কিম্বা ভারত তথা এশিয়ার প্রথম নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই পাশ্চাত্য শিক্ষাই গ্রহণ করেছিলেন। এর থেকে বোঝা যায় মেকলে শিক্ষাপদ্ধতি পরবর্তীকালে ঔপনিবেশিক শাসকের কাছে বুমেরাং হয়ে যায়।

ঊনবিংশ শতকের প্রথম দিকেই রাজা রামমোহন রায় যে ব্রাহ্ম ধর্মের প্রচলন করেন, সেটি ছিল একটি একেশ্বরবাদী , ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কার আন্দোলন। এই সংস্কার আন্দোলন পাশ্চাত্য শিক্ষার দ্বারা সম্পূর্ণরূপে প্রভাবিত ছিল। এই সংস্কার আন্দোলনই কিন্তু বাংলা তথা ভারতে নবজাগরণের বীজ বপন করে। এই আন্দোলনে মূর্তি পূজাকে, ধর্মীয় গ্রন্থের উপর অন্ধবিশ্বাস, অবতারবাদ, জাতিভেদ প্রথা জাত ধর্মের ভিত্তিতে ভেদাভেদ ইত্যাদি ধারণার নিন্দা করা হয় । বিভিন্ন প্রচলিত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয় এবং নারী শিক্ষার কথা প্রচার করা হয়। এই আন্দোলনের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেন ভারতীয় নবজাগরণের জনক তথা সমাজ শিক্ষা ও ধর্ম সংস্কারক রাজা রামমোহন রায়। তিনি 1828 খ্রিস্টাব্দে ব্রাহ্ম সভা প্রতিষ্ঠা করেন । তাঁর সঙ্গেই ছিলেন পরবর্তী কালের নোবেলজয়ী বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

ভারত দেশকে মাতা রূপে কল্পনা ও চিত্রায়ণ জনপ্রিয়তা লাভ করে উনবিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকের শেষের দিকে। ভারতকে ভারতমাতা রূপে সম্বোধন প্রথম পাওয়া যায় উনবিংশ পুরাণ নামে একটি ব্যঙ্গাত্মক গ্রন্থে। এটির প্রকাশনার সময় ছিল 1866 খ্রিস্টাব্দ । বইটির লেখক ছিলেন কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস। এটি ছিল ছদ্মনাম এবং সম্ভবত এই ছদ্মনামের আড়ালে প্রকৃত লেখক ছিলেন তৎকালীন সময়ের অন্যতম পন্ডিত ভূদেব মুখোপাধ্যায় । বাংলায় হিন্দু জাতীয়তাবাদের বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা নেন এই ভূদেব মুখোপাধ্যায়। ভূদেব ও তাঁর সময় সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বিশিষ্ট ভাষাবিদ আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন যে 1840 থেকে 1870 পর্যন্ত সময়কালে বাঙালি মনন এবং সংস্কৃতি খুব একটা পরিপুষ্ট ছিল না এবং এর ফলে পরাধীন বাঙালির মনে একপ্রকার হীনমন্যতা বাসা বাঁধে। বাঙালি বলতে এখানে তিনি বাঙালি হিন্দুদের বুঝিয়েছিলেন । এই ঘটনা যখন ঘটে তার আগেই বাঙালি জাতি পাশ্চাত্য শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জ্ঞান বিজ্ঞানের সংস্পর্শ লাভ করেছে।

1867 খ্রিস্টাব্দে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ; কবি, নাট্যকার ও সম্পাদক নবগোপাল মিত্র, এবং প্রাবন্ধিক রাজনারায়ণ বসু একত্রিত হয়ে হিন্দুমেলা সংগঠিত করতে নেতৃত্ব দেন। পরবর্তীতে এই হিন্দু মেলা জাতীয় মেলা নামে পরিচিত হয়। এই মেলার উদ্বোধনে রবীন্দ্রনাথের বড় ভাই তথা বিশিষ্ট ভাষাবিদ দ্বিজেন্দ্রনাথের লেখা দেশাত্মবোধক গান গাওয়া হয়। এই গান ভারতমাতাকে উদ্দেশ্য করে রচিত হয়ে। গানটির কথা ছিল এইরূপ – ‘মলিন মুখচন্দ্র মা ভারত তোমারি…’

উনবিংশ শতকের সত্তরের দশকের শেষের দিকে বঙ্কিমচন্দ্র বন্দেমাতরম্ মন্ত্র রচনা করেন। এই মন্ত্র ছিল তাঁর রচিত অন্যতম বিতর্কিত উপন্যাস আনন্দমঠ এর অংশ । 1882 খ্রিস্টাব্দে আনন্দমঠ প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাস সাহিত্যগুণ ও সামাজিক প্রভাবের জন্য বাংলা সাহিত্যের একটি মাইলফলক হয়ে রয়েছে। এই উপন্যাসটি ছিল মুসলিম বিরোধী মনোভাবের জন্য বিতর্কিত ।

1882 খ্রিস্টাব্দে বঙ্কিমের আর একটি নিবন্ধ প্রকাশ পায়। এটির নাম ছিল বাংলার ইতিহাস সম্বন্ধে কয়েকটি কথা। এই নিবন্ধ বঙ্কিমচন্দ্র সম্পাদিত বঙ্গদর্শন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এই নিবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র ইসলাম শাসকদের ইতিহাসকে বাংলার ইতিহাস বলে মানতে অস্বীকার করেন। এখানে তিনি লিখেছেন যে তাঁর বিবেচনায় একটিও ইংরেজি বই বাংলার সঠিক ইতিহাস তুলে ধরেনি। এই বইগুলিতে যা রয়েছে, তা হল মুসলিম রাজাদের জন্ম, মৃত্যু এবং তাদের পারিবারিক বিবাদ । এইসব মুসলিম শাসকদের অধিকাংশই বিছানায় শুয়ে, আরাম করতেন আর বাংলার বাদশা, বাংলার সুবাদার ইত্যাদি অপ্রয়োজনীয় উপাধি গ্রহণ করতেন। এগুলি কোনভাবেই বাংলার ইতিহাসকে প্রতিফলিত করে না। বাংলার ইতিহাসের সঙ্গে এসবের কোনো সম্পর্কই নেই। যেসব বাঙালি এইসব বিবরণকে ইতিহাস বলে মনে করে, তারা বাঙালি নয়। কোন বাঙালি যদি বিনা প্রশ্নে
আত্ম- অহংকারী, মিথ্যাবাদী, হিন্দুবিদ্বেষী মুসলিমদের বক্তব্যকে মেনে নেয়, তাহলে সে বাঙালি হতে পারে না।
এই নিবন্ধে তিনি বাঙ্গালীদের বাংলার একটি সঠিক ইতিহাস অনুসন্ধান করতে বলেন। বাঙালি বলতে তিনি কিন্তু বাংলাভাষী হিন্দুদেরই বোঝান।

1892 খ্রিষ্টাব্দে চন্দ্রনাথ বসুর বই হিন্দুত্ব প্রকাশিত হয়। প্রকাশক ছিলেন গুরুদাস চট্টোপাধ্যায়। অনুমান করা যায় ছাপার অক্ষরে সর্বপ্রথম হিন্দুত্ব শব্দটি এই বইতেই ব্যবহৃত হয়। 1894 খ্রিস্টাব্দে Calcutta Review এর জুলাই সংখ্যায়
( vol . 99) Vernacular Literature ( দেশীয় সাহিত্য) বিভাগে আড়াই পাতা জুড়ে এই বই সম্পর্কে আলোচনা প্রকাশিত হয় । এই সমালোচনাতে বইটিকে ‘ ‘evidently a work of Hindu revival ‘( হিন্দু জাগরণের একটি প্রত্যক্ষ প্রমাণ ) বলে অভিহিত করা হয়।

হিন্দু জাগরণ শুরু হয় পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির মোকাবিলায় একটি পাল্টা আখ্যান রূপে। ধীরে ধীরে হিন্দু জাগরণ হিন্দু জাতীয়তাবাদের রূপ নেয় এবং শাসক ব্রিটিশকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। এই জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি ছিল যে ভাবনা সেটি হল- হিন্দু কখনো হীন নয়: হিন্দু কারও অধীনস্থ থাকবে না। আজ এই একবিংশ শতাব্দীতে বহু বাঙালি হিন্দু মনে করেন যে হিন্দু জাতীয়তাবাদকে উত্তর ভারত থেকে আমদানি করা হয়েছে। তাঁদের এই ধারণা যে সঠিক নয়, এই নিবন্ধ সেটা প্রমাণ করে। আসলে স্বাধীনতা ও দেশভাগের পরবর্তী কালে বাঙালি হিন্দু দীর্ঘকাল বিজাতীয় কমিউনিস্ট শিক্ষার সংস্পর্শে থেকেছে। দেশভাগের ক্ষত- ভিটে জমি হারানো, উদ্বাস্তু হওয়া ও সম্মান হানির স্বীকার হওয়া , বাঙালি হিন্দুকে সেই সময় ভীত-সন্ত্রস্ত করে রেখেছিল। সেই সুযোগে হিন্দুবিদ্বেষী কমিউনিস্ট শাসক বাঙালি হিন্দুকে
আত্মঘৃণা পোষণ করতে শিক্ষা দেয়। আর এই শিক্ষা জন্ম দেয় বাঙালি সেক্যুলার গোষ্ঠীর : বাঙালি ভুলে যায় তার অতীতের হিন্দু জাতীয়তাবাদের আখ্যান। আজ সময় এসেছে আবার সেই আখ্যান তুলে ধরার, না হলে আরো একবার পরাধীনতা আসন্ন।

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.