মা, একটা গল্প বলো!

0
178

© চয়ন মুখার্জি

  • মা , একটা গল্প বলো!
  • আচ্ছা শোন, তেপান্তর মাঠ পেরিয়ে, এক দেশে এক রাজা ছিল। তার হাতিশালে হাতি, ঘোড়া
  • না না, ওই গল্প আগে শুনেছি। আজ অন্য গল্প বলো
  • কীরকম গল্প সোনা?
  • একটা সত্যিকারের গল্প।
  • আচ্ছা শোন। অনেক বছর আগে এই বাংলা দেশে ..
  • বাংলাদেশ মানে? আমাদের পাশের দেশটা?
  • না সোনা। তখন ওই দেশটাও আমাদের দেশের মধ্যেই ছিল। ওই দেশ আর আমাদের রাজ্যটাকে মিলিয়ে বলা হতো বাংলা।
  • আচ্ছা
  • সেই বাংলা ছিল সোনার বাংলা। সেখানে একদল জোয়ান ছেলে দাপিয়ে বেড়াত। একদল লালমুখো সেই দেশটার রাজা হয়ে বসেছিল, সেই ছেলের দলের দাপটে তাদের রাজত্ব ছারখার হয়ে যাচ্ছিল। সেই ছেলেরা যেমন ছিল পড়াশোনায়, তেমনি খেলাধুলায়। রূপ গুণে তাদের তুলনাই হয়না।
  • খুব সুন্দর দেখতে ছিল তারা?
  • হ্যাঁ সোনা। তারা ছিল দেশের জন্য নিবেদিত প্রাণ। তাদের কথাবার্তায় লোকজন উদ্বুদ্ধ হতো। তারা দেশের জন্য সব ছেড়েছিল। দেশের জন্য নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করে দিত তারা। যেই যুগটাকে বলা হতো “অগ্নিযুগ।”
  • অগ্নি মানে তো আগুন মা। আগুন দিয়ে যুগের নাম কেন?
  • আগুনের তাপে সব জীবাণু মরে যায় তো সোনা। সেই ছেলেগুলোর সংস্পর্শে এসে দুস্টু লোকও শুদ্ধ হয়ে যেত। তাদের এক ডাকে লোকজন ঘরে ছেড়ে বেরিয়ে যেত। তাই ওরা আগুনের মতোই শুদ্ধ। আর ওই যুগটা অগ্নিযুগ।
  • আচ্ছা তারপর?
  • কিন্তু ওই ছেলেগুলোকে হিংসা করতো একদল দস্যু। তারা এসেছিল মরুভূমির দেশ থেকে। তাদের সবার ইয়া বড় ছাগলদাড়ি । মাথায় টুপি। তারা ছেলেগুলোকে দেখে হিংসায় ফেটে মরতো।

তারা ওই ছেলেগুলোর বাড়ি আক্রমণ করার চেষ্টা করতো। রাজকন্যাদের তুলে নিয়ে যেতে চাইতো। কিন্তু ছেলেগুলোর দাপটের জন্য সবসময় সুবিধা করতে পারতো না।

তারপর একদিন হিংসার জ্বালায় সেই দস্যুদের সর্দার আর লালমুখো শাসকরা  হাত মেলালো।  তারপর তারা এক উদ্ভট দাবী করে বসলো।

-কী দাবি মা?

  • তারা দাবি করলো, এই  বাংলা নামের জায়গাটা গোটাটাই তাদের। এই বাংলা ছাড়াও আরও কয়েকটা জায়গা তাদের দিয়ে দিতে হবে। ওই জায়গায় তারা ছাড়া আর কেউ থাকবে না।
  • ভারি অন্যায় তো!
  • অন্যায় তো বটেই! কিন্তু শাসক লালমুখোগুলো ছিল ওদের পক্ষে। তারাও বললো, ঠিক ঠিক, জায়গাটা দস্যুদের।
  • তারপর কী হলো মা?
  • তারপর একদিন, গভীর রাতে সেই দস্যুরা এই কলকাতা আর নোয়াখালি নামের একটা জায়গায় হঠাৎ ওই ছেলেগুলোর বাড়িঘর আক্রমণ করে বসলো। জোর করে রাজকন্যাদের তুলে নিয়ে গেল। বাকিদের খুন জখম কিছুই বাকি রইলো না!
  • ইসসস! ওদের সাজা হলো না?! ছেলেগুলো কোথায় ছিল?
  • ছেলেগুলো সংখ্যায় কম ছিল রে। তবু তারা কলকাতায় রুখে দাঁড়ালো । তাদের পাল্টা মার খেয়ে কলকাতায় দস্যুগুলো বাঁচাও বাঁচাও বলে পালিয়ে গেলো। কিন্তু নোয়াখালীতে দস্যুগুলো সংখ্যায় বেশি হওয়ায় জিতে গেলো।
  • তারপর?
  • ছেলেগুলোর সামনে ঘোর বিপদ। তখন তাদের নেতা হয়ে এগিয়ে এলেন একজন রাজা।
  • রাজা?
  • হ্যাঁ সোনা রাজা। তাঁর কথা শুনে লোকজন মুগ্ধ হয়ে যেত, তাকে সবাই মান্য করতো। সে তো রাজা, তার বাবাও ছিল রাজা । তার বাবাকে সবাই বলতো, বাংলার বাঘ। বাঘের বাচ্চা তো, তাই রাজারও দাপট ছিল বাঘের মতোই।

-রাজার নাম কী মা?

  • রাজার নাম, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। ছবি দেখবি? এই দ্যাখ।
  • এই আমাদের রাজা।
  • হ্যাঁ সোনা। ইনিই ছিলেন সেই রাজা। তারপর শোন, সেও রাজা এগিয়ে এলেন।বজ্রনির্ঘোষে ঘোষণা করলেন, দিনের পর দিন এই গুন্ডামি আমি সহ্য করবো না। তোমরা যদি দলে ভারি হওয়ার জন্য আলাদা দেশ দাবি করো, তাহলে আমরাও দাবী করবো আমাদস্র আলাদা জায়গা। বাঙালি হিন্দুদের আলাদা জায়গা।
  • বাঙালি হিন্দু?
  • হ্যাঁ সোনা, সেই ছেলেগুলো, তুই, আমি, আমরা, সবাই বাঙালি হিন্দু। আমাদের ধর্ম হিন্দু, মাতৃভাষা বাংলা। আর আমাদের , অর্থাৎ এই বাঙালি হিন্দুদের রাজা ছিল ওই শ্যামাপ্রসাদ নামের লোকটা।
  • আচ্ছা তারপর?
  • এমনই সেই রাজার দাপট, যে লালমুখোরা সেই দাবী মেনে নিলো। বললো যে ভোট হোক। সবাই বাঙালি হিন্দুর জন্য আলাদা জায়গা চাইলে তারা মেনে নেবে।
  • ভোট মানে ওই যে সেদিন আঙুলে কালি লাগিয়ে ফিরলে, ঐটা?
  • খানিকটা ওরকমই।
  • তারপরে?
  • সেই রাজার পাশে এসে দাঁড়ালো নামী নামী সব লোক। সুনীতিকুমার চ্যাটার্জি, যদুনাথ সরকার, আশুতোষ লাহিড়ী, এ সি চ্যাটার্জি, মেঘনাদ সাহা, প্রেমহরি বর্মণ, আরো অনেকে! তাঁরাও একযোগে বললেন, বাঙালি হিন্দুর আলাদা রাজ্য চাই।
  • তারপরে ভোট হলো?
  • হলোই তো! আর ভোটে দেখা গেল, সেই রাজা জিতে গেছে রে! মুখ চুন করে লালমুখোরা আর সেই মরুদস্যুর দল মেনে নিলো। ২০ শে জুন, ১৯৪৭ জন্ম নিলো আমাদের এই রাজ্যটা , পশ্চিমবঙ্গ।
  • মানে ওই রাজা না থাকলে এই রাজ্য হতো না মা?
  • একদম তাই। ওই রাজাই এই রাজ্যের জনক, পিতা। আর ২০ শে জুন আমাদের প্রিয় রাজ্যটার জন্মদিন। ওইদিন পশ্চিমবঙ্গ দিবস।
  • ওই রাজা এখন কোথায় মা?
  • তিনি ও সাধারণ মানুষ ছিলাম না রে! তিনি ছিলেন মহাপ্রাণ। লোকের বিপদে আপদে ছুটে যেতেন। এরকমই এক জায়গায় তিনি যখন গেছেন, তখনই ওই মরুদস্যুর দল আর এক বেঈমান, চক্রান্ত করে তাঁকে মেরে ফেললো।
  • মেরে ফেললো! খুব অন্যায়, খুব অন্যায়। আমি ওদের শাস্তি দেবো।
  • সে তো দিবিই। সেই মরুদস্যুর দল এখনও এই রাজ্যের দিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকায়, ছলে বলে কৌশলে ছিনিয়ে নিতে চায়। তাদের আটকাবি না?
  • আটকাবোই তো! রাজা চলে গেছেন , আমি আছি তো! আমি আটকাবো!
  • একদম সোনা। আমরা সবাই মিলে আটকাবো। আমাদের এই রাজ্যটা বড় প্রিয়। তাকে দস্যুদের হাতে তুলে দেবো না ,কিছুতেই না!

–  আচ্ছা, ২০ শে জুন, তো এসেই গেলো মা! তাহলে ওইদিন আমরা রাজাকে জানিয়ে কিছু করবো না?

  • নিশ্চয়ই করবো। তুই গান গাইবি, আরো অনেকে রাজার ফটোতে শ্রদ্ধা জানাবে। জলদি একটা লিস্ট করে ফ্যাল দেখি, কী কী করে ফেলা যায়!

মা ছেলে ব্যস্ত পরিকল্পনা করতে যে তারা ২০ শে জুন কী করবে! ওদের আর ডিস্টার্ব না করাই ভালো। তার চেয়ে বলুন,

আপনি তৈরি তো?

! ভুলবেন না যেন, ২০ শে জুন, আমাদের রাজ্যের, বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ডের জন্মদিন। পশ্চিমবঙ্গ দিবস।

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.