বাংলা ভাষা ধ্বংসের চক্রান্ত ও আরবায়নের জোরদার প্রচেষ্টা

0
47

© স্মৃতিলেখা চক্রবর্তী

বাংলা ভাষার শিকড়ে প্রাকৃত, হৃদয়ে সংস্কৃত। সেজন্যই এই ভাষায় আরবায়নের ভিত্তি স্থাপন খুব একটা সহজ হয়নি। তবে বাংলার খোলনলচে পর্যন্ত পাল্টে ফেলার চেষ্টা চলেছে অবিরাম। ধাপে ধাপে ধ্বংস করে দেবার জন্য বারবার আক্রমণ চালানো হয়েছে। বাঙ্গালী যখন অবিভক্ত বঙ্গে সংখ্যাগুরু ছিল, প্রবল বিক্রমে সে নিজের ভাষা রক্ষা করেছে। সনাতন বাঙ্গালী সংখ্যায় যত কমেছে, ততই বাংলার উপর জেঁকে বসেছে এক ভীষণ সঙ্কট। আরবী, ফার্সী, তুর্কী শব্দের ভারে চাপা পড়ে বাংলা ভাষা ক্রমেই নিজের স্বাতন্ত্র্য হারাচ্ছে। তার নিজস্ব চরিত্র ম্লান হচ্ছে। কারণ প্রতিটি ভাষার কিছু নিজস্বতা থাকে। শব্দ, বাক্যের গঠন, ব্যাকরণ, উচ্চারণ, সামাজিক রীতিনীতি এইসব দিয়েই প্রত্যেক ভাষা কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের দাবিদার। আরব সাম্রাজ্যবাদের লক্ষ্য হল এর প্রতিটিকে মুছে দিয়ে ভাষাটাকে কেবলমাত্র একটা আরবের অনুসারী ভাষায় পরিণত করা। মনে রাখতে হবে, ভাষা টিঁকে থাকে চর্চায়। চর্চা না করলে যেমন ভাষা হারিয়ে যায়, ঠিক তেমনই যে গোষ্ঠী যত বেশি কোন ভাষার চর্চা করে; সেই ভাষার উপর ওই গোষ্ঠী তত বেশি প্রভাব ফেলে। বাংলায় যারা কথা বলেন, তাদের মধ্যে এখন মাত্র ২৫% সনাতন বাঙ্গালী এবং ৭৫% হল বাংলাভাষী। অতএব, বাংলা ভাষাতে কার প্রভাব বেশি হবে, সেটা সহজেই অনুমান করা যায়। আর এই ৭৫% এরই প্রভাবশালী অংশের প্রত্যক্ষ প্রেরণায় বাংলাভাষাতে বর্তমান আরবায়ন চলছে। 

বাংলা ভাষায় এই আরবায়নের সূচনা মূলতঃ বহিরাগত সুফি হানাদারদের হাত ধরে। সুফীদেরকে অনেকে নিঃস্বার্থ ধর্মগুরু মনে করলেও এরা ছিলেন একাধারে যোদ্ধা এবং ধর্মান্তরের কারিগর। এঁদের লক্ষ্য ছিল ছলে-বলে-কৌশলে সনাতন বাঙ্গালীকে ধর্মান্তরিত করা। সুফিরা বাংলা ভাষাকে খুব একটা সুনজরে দেখত, এমন প্রমাণ নেই। তাই পরিষ্কার বাংলা শেখার কোন ইচ্ছা বা ধৈর্য্য তাদের ছিল না। তারা কথা বলত আরবি-ফার্সীর মিশেল দেওয়া এক বিকৃত বাংলায়। সাতশ-আটশ বছর আগে যখন অবিভক্ত বঙ্গে সুফীদের আগমন শুরু হয়, বাঙ্গালী বলতে কেবল সনাতন বাঙ্গালীই বোঝাত। তখনো বাংলার কোথাও নবাব বা সুলতানি শাসনে আসেনি। ফলে সুফীদের আরবী মিশ্রিত কথা বাঙ্গালীদের পক্ষে বোঝা অত্যন্ত দুষ্কর ছিল। এমনকি ওই বিকৃত মিশ্র বাংলা সাধারণ মানুষের কাছে হয়ে উঠেছিল কৌতুকের বিষয়। ফলে সুফীদের ব্যবহৃত আরবী-ফার্সী-তুর্কি শব্দগুলো ঠাট্টার ছলে বাঙ্গালীরা ব্যবহার করা শুরু করে সম্পূর্ন উল্টো অর্থে। 

যেমন- তুর্কী ভাষায় “উলূগ”  মানে হল “মহান”! এই উলূগ থেকেই বাংলা উল্লুক কথাটা এসেছে। বাংলায় উল্লুক মানে বোকা। আবার, উজবেক সেনাদের বীরত্ব গাঁথা সুফি পীর-দরবেশদের মুখে মুখে ফিরত। কিন্তু বঙ্গবীর ইছাই ঘোষ একবার তুর্কী বাহিনী এবং তাদের উজবেক ভাড়াটে সৈন্যদলকে রাঢ়ি জঙ্গলে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মারার পর বাংলায় দুটো নতুন শব্দের সৃষ্টি হয়। একটি হল “তুর্কী নাচন”, আরেকটি “উজবুক”! উজবেক সেনাবাহিনীর কথিত বীরত্বের প্রতি বাঙ্গালীর তাচ্ছিল্যের প্রতীক হল “উজবুক”! উজবুক মানে নির্বোধ। একইভাবে “বুজুর্গ” বা জ্ঞানী বৃদ্ধ বাঙ্গালীর কাছে হয়ে উঠল “বুজরুক” বা ভণ্ড। সুফীদের কাছে যেটা “নেকী” বা পুণ্য, সেটাই বাঙ্গালীদের কাছে হয়ে দাঁড়াল “ন্যাকামি”! আরবী জ্ঞানের ডিগ্রি “ফাজিল” বাংলা ভাষায় হয়ে গেল ফাজলামি। দুটো কথার অর্থ সম্পূর্ণ বিপরীত। এভাবে ভাষা দিয়েই ভাষা আগ্রাসনের যোগ্য প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল বাঙ্গালীরা। 

এরপরে বাংলার বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চলে যখন নবাবী বা সুলতানি শাসন শুরু হল, ধীরে ধীরে আরবী অনুপ্রবেশ বিস্তার পেতে লাগল। কারণ বাংলাতে সাম্রাজ্য স্থাপন করলেও সুলতান ও নবাবদের দরবারের ভাষা বাংলা ছিল না। ফার্সী ভাষাতেই চলত বাংলাকে শাসনের কাজ। বিচারের জন্য আইন, আদালত ইত্যাদিও হত বিদেশী ভাষাতেই। ভাষা সমস্যার জন্য ন্যায় বিচার পাওয়া কার্যতঃ ছিল অসম্ভব। যে কারণে একপেশে অযৌক্তিক বিচার-ব্যবস্থাকে এখনো বাংলাতে “কাজির বিচার” বলা হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভূমি-রাজস্ব, কর আদায় ইত্যাদি সমস্ত কিছুই যেহেতু আরবী-ফার্সিতে সম্পন্ন হত, তাই সাধারণ বাঙালিকেও এসব ভাষায় কিছুটা সড়গড় হতে হয়েছিল। তারই প্রভাব বাংলা ভাষাতেও পড়ে। আইন, আদালত, জমি, দাখিল, জারি, দরখাস্ত, বরখাস্ত ইত্যাদি অসংখ্য বিদেশী শব্দ ঢুকে পড়তে থাকে সুলতানি বদান্যতায়। যেখানে যেখানে বাঙ্গালী এসব বহিরাগতদের কাছে রাজত্ব হারিয়েছে, সেখানেই যোগ্য বাংলা শব্দকে ঠেলে সরিয়ে, জুড়ে বসেছে আরবী কিংবা ফার্সী শব্দ।

বাংলাতে নবাবী শাসন যখন শেষের মুখে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নামে ইংরেজ শাসন শুরু হতে চলেছে; তখনই গরিবুল্লা, সৈয়দ হামজা ইত্যাদির প্রেরণায় এক অদ্ভুত বাংলার আবির্ভাব ঘটে। ৩৫%-৪০% আরবি-ফার্সী শব্দ মিশ্রিত বাংলা। রেভারেন্ড জেমস লং, সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় ইত্যাদিরা একে “মুসলমানি বাংলা” নামে অভিহিত করেছেন। সমগ্র ইংরেজ শাসনকাল জুড়ে ছিল এর ব্যাপ্তি। এই “মুসলমানি বাংলা”-তে যেসব গল্প-কবিতা রচনা করা হত, সেসবেরও কোন স্থানীয় ভিত্তি ছিল না। প্রতিটি গল্প কবিতার বিষয়বস্তু ছিল মধ্যপ্রাচ্যের কোন বীর যোদ্ধা বা প্রেমিক-প্রেমিকা। গরিবুল্লার আমির-হামজা কাব্য বা ইউসুফ-জুলেখা এর যোগ্য নিদর্শন। ইংরেজ রাজত্বেই আরো একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধিত হয়, যার প্রবর্তক ছিলেন তিতুমীর। বাংলার মুসলমানদের মধ্যে দুটি উল্লেখযোগ্য গোষ্ঠী ছিল। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগতদের বংশধররা ছিলেন সম্ভ্রান্ত বা আশরাফ। এদের নাম কখনোই বাংলাতে হত না। কিন্তু স্থানীয় ধর্মান্তরিত বা আতরাফ মুসলমানদের নাম বাংলাতেই রাখা হত। তিতুমীরের প্রভাবে বাংলার আতরাফদের নামও আরবীতে রাখা শুরু হয়। তিতুমীর ছিলেন ওয়াহাবি বা শুদ্ধিকরণ আন্দোলনের পুরোধা। ফলে বাংলার থেকে তার কাছে আরবি ভাষা অবশ্যই বেশি পবিত্র ছিল। আর “মুসলমানি বাংলা” ছিল, বাংলা এবং আরবীর মধ্যবর্তী একটা পর্যায়। ধীরে ধীরে বাংলার থেকে আরবীর দিকে যাবার একটা ধাপ। কিন্তু পরবর্তীতে এই “মুসলমানি বাংলা”র খানিকটা দেশীয়করণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম এবং বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। এদের লেখাতে আরবি-ফার্সি শব্দের ব্যবহার আগের মতন বা আরো বেশি হলেও, লেখার বিষয়বস্তু মধ্যপ্রাচ্যের বদলে বঙ্গ ও ভারত সংক্রান্ত হয়। স্থানীয় এবং জাতীয় স্তরের নানান সমস্যা নিয়ে এঁরা সাহিত্য রচনা করে গেছেন। 
দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গে পাকিস্তানি আমল শুরু হলে বাংলার আরবায়ন প্রবেশ করে তার চতুর্থ ধাপে। পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা উর্দু হলেও, বাংলাকেও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়ার পক্ষে জোরালো দাবি জানান শ্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। প্রথম দিকে মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মত বাংলাভাষী বুদ্ধিজীবীরা একে বিশেষ পাত্তা দেননি। শহীদুল্লাহ মনে করতেন উর্দু বনাম বাংলা ঝগড়া লাগিয়ে লাভ নেই। কারণ, প্রতিটি মুসলমানের ভাষা আরবিই হওয়া উচিত। কিন্তু আরবি শিক্ষা যেহেতু উর্দুভাষী এবং বাংলাভাষী, সকলের পক্ষেই খুব অসুবিধাজনক, তাই একটি নতুন সমাধান সূত্র খোঁজা শুরু হয়। পাকিস্তান সরকার ১৯৫৬ সালে বাংলাকে সরকারি ভাষা করার দাবি মেনে নেয় ঠিকই। তবে সেই বাংলা সনাতন আদি বাংলা নয়। সরকারি মদতে ৩০%-৩৫% আরবি-ফার্সী শব্দ ঢুকিয়ে এক নতুন বিকৃত বাংলা তৈরি করে তাকেই মান্যতা দেওয়া হয়। খুঁজে খুঁজে বাদ দেওয়া হতে থাকে বা বিকল্প শব্দ তৈরির চেষ্টা হতে থাকে, সনাতনের ছাপ থাকা যে কোন বাংলা শব্দের। ছাড় পায়নি ফুল, ফল, লতা, গাছ বা পাখির নামও। যেমন- রামধনু, লক্ষ্মী মেয়ে, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, মোহনভোগ, গোবিন্দভোগ ইত্যাদি। বানিয়ে ফেলা হয় এসব বিকল্প শব্দ এবং আরবি-ফার্সী শব্দ সম্বলিত নতুন বাংলা অভিধান বা ডিক্সনারী। শুধু তাইই নয়, বাংলা লিপির বদলে আরবি লিপিতে এই নতুন বাংলা লেখা যায় কিনা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছিল তা নিয়েও। 

পাকিস্তান আমল শেষ হয়ে ১৯৭১ থেকে শুরু হয় বাংলাদেশ আমল। বাংলাদেশ আমলে আরবি-মিশ্রিত বাংলা তৈরির কাজে এক নতুন গতি আসে। সাথে সাথে বিশ্ব জুড়ে বাংলাদেশকেই বাংলা ভাষার একমাত্র ধারক-বাহক এবং বাংলাদেশের বাংলাকেই প্রকৃত বাংলা বলে প্রচার করা শুরু হয়। ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এবং সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইটে বাংলা বলে যেটা লেখা হয় সেটা আসলে “মুসলমানি বাংলা”-র বর্তমান উত্তরাধিকারী বাংলাদেশের বাংলা। বাংলাদেশের এই ভাষা সাম্রাজ্যবাদের ঢেউ এসে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম এবং ত্রিপুরার বাংলাতেও। এখানেও ধীরে ধীরে রামধনু হয়ে যাচ্ছে রংধনু, “লক্ষ্মী মেয়ে”-র বদলে ভাল মেয়ের কদর বাড়ছে, বিদ্রোহকে “জেহাদ” আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। “চিতায় ওঠা”-র বদলে কথ্য বাংলায় “কবরে যাওয়া” বা “কবর খোঁড়া” কথাগুলোর প্রচলন বেশি বাড়ছে। এক পা, এক পা করে বাংলা তলিয়ে যাচ্ছে আরবায়নের অতল গহ্বরে।

এই পাঁচটা ধাপ যে সবসময় একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন, তা একেবারেই নয়। কখনো দুটো বা তিনটে ধাপ পাশাপাশিই চলেছে। কখনো আবার একটা পুরোপুরি শেষ হবার আগেই আরেকটি ধাপ চালু হয়ে গেছে। কিন্তু ধাপে ধাপে আরবায়ন ক্রমাগত এগিয়েছে। কারণ এই বিপদ সম্বন্ধে সনাতন বাঙ্গালীর সচেতনতা ছিল না। ফলে এর গুরুত্বও উপলব্ধি করা যায়নি আর সংগঠিত প্রতিরোধও করা যায়নি। আরবায়নকে রুখতে গেলে প্রথমেই দরকার বাংলার শুদ্ধিকরণ। অর্থাৎ যোগ্য বাংলা শব্দ খুঁজে, আরবি-ফার্সী যাবতীয় বিদেশী শব্দকে বাংলা ভাষা থেকে বহিষ্কার করা। এই প্রক্রিয়াতেই সনাতন বাংলা তার নিজস্ব চরিত্র আবার ফিরে পাবে। শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া একটি সময়সাপেক্ষ এবং কষ্টসাধ্য ব্যাপার। কিন্তু লেগে থাকলে সাফল্য অবশ্যই আসবে। এই কাজটা আরো বহু আগেই শুরু করা উচিত ছিল। দেরি অনেক হয়েছে, তাই এখন থেকেই শুদ্ধিকরণের ভাবনা চালু করা উচিত। 
#বাংলা_ভাষার_আরবায়নের_পাঁচটি_ধাপ

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.