শ্রীরামের সমুদ্র শাসন

0
132

© সূর্য শেখর হালদার

লঙ্কেশ রাবণ সীতাকে হরণ করে লঙ্কাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল যে সমুদ্র পেরিয়ে লঙ্কাতে সীতা দেবীকে উদ্ধার করতে কেউ আসতে পারবে না । পবন পুত্র হনুমান সাগর পেরিয়ে সীতাদেবীর সংবাদ নিয়ে আসেন এবং লঙ্কা দহন করে প্রভু শ্রীরামের শক্তির পরিচয় রাবণকে দিয়ে আসেন। প্রভু শ্রীরাম হনুমান মারফত যখন জানতে পারলেন যে সীতাদেবী সমুদ্রের অপর তীরে লঙ্কার অশোকবনে বন্দিনী আছেন, তখন তিনি সুগ্রীবের নেতৃত্বাধীন বানর সেনা নিয়ে দক্ষিনের সমুদ্রতটে উপস্থিত হলেন। কিন্তু সমস্যা হল যে সমুদ্র পেরিয়ে এত বড় বানর সৈন্য নিয়ে শ্রীরাম কিভাবে লঙ্কা পৌঁছবেন ?

সুগ্রীব ও হনুমান বিভীষণকে অনুরোধ করলেন যে কিভাবে সমুদ্র পেরিয়ে লঙ্কা পৌঁছানো যায় তার উপায় নির্ধারণ করতে। ধর্মাত্মা বিভীষণ তখন বললেন রঘুবংশীয় রাজা রামচন্দ্রের সমুদ্রের শরণ নেওয়া উচিত। কারণ এই সমুদ্র খনন করেছিলেন রাজা সগর যিনি শ্রীরামের পূর্বপুরুষ। অতএব সমুদ্র নিশ্চয় শ্রীরামের কাজে সহায়তা প্রদান করবেন।
ধর্মশীল প্রকৃতি সম্পন্ন
শ্রীরাম বিভীষণের এই প্রস্তাব পছন্দ করলেন । লক্ষণ এবং বানররাজ
সুগ্রীবও বিভীষণের প্রস্তাব সমর্থন করলেন।

অতঃপর রাঘব সমুদ্রের তীরে কুশ বিস্তীর্ণ করে , দক্ষিণ বাহু বালিশের মত করে এবং বাহুতে মাথা রেখে, মহাসমুদ্র অভিমুখী হয়ে
কৃতাঞ্জলিবদ্ধভাবে শয়ন করলেন। এইভাবে সেই স্থানে তিন রাত্রি ব্যাপি তিনি সরিৎ পতি সাগরকে যথাবিহিত উপাসনা এবং পূজা করলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য এই স্থানে শ্রীরাম শিবলিঙ্গ স্থাপন করে মহাদেবের পূজা করেছিলেন বলে অনেক জায়গায় পাওয়া যায়। কিন্তু মহর্ষি বাল্মীকির রচনা অনুযায়ী শ্রীরাম তিন রাত্রি ধরে সমুদ্র বা বরুণের উপাসনা করেন।

“স ত্রি রাত্রোষিতস্তত্র নয়জ্ঞো ধর্মবৎসল: ।
উপাসত তদা রাম: সাগরং সরিতাং পতিম্ ।। ” ৬.২১.১১

কিন্তু তাঁর উপাসনা সত্ত্বেও সমুদ্রের তরঙ্গ রাশিকে তিনি শান্ত হতে দেখলেন না। তখন সমুদ্রের প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ে রক্তচন্দন শ্রীরাম লক্ষণকে বললেন যে সমুদ্রের খুব অহংকার, সেজন্যই সমুদ্র তাঁকে দেখা দিলেন না। শান্তি ক্ষমা সরলতা এবং মধুর ভাষণ – স্বজনদের এই গুণগুলি গুনহীন পুরুষের নিকট নিস্ফল হয়ে যায়।

” অবলেপ: সমুদ্রস্য ন দর্শয়তি য: স্বয়ম্ ।
প্রশমশ্চ ক্ষমা চৈব আর্জবং প্রিয়বাদিতা ।। ৬.২১.১৪

অসামর্থ্য ফলা হে ্যতে নির্গুনেষু সতাং গুণা: । ৬.২১.১৫ক

শ্রী রাম ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন যে আত্ম প্রশংসাকারী দুষ্ট , ধৃষ্ট , প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী এবং সর্বত্র কঠোর দন্ডদাতা ব্যক্তিকে সব মানুষই সমীহ করে। এই ভূলোকে সাম নীতির দ্বারা (শান্তির দ্বারা ) কীর্তিমান হওয়া যায় না, যশের প্রসার লাভ হয় না , যুদ্ধে জয় লাভও করা যায় না। অতএব এই পরিস্থিতিতে শ্রীরাম সিদ্ধান্ত করলেন যে তিনি তাঁর শক্তিশালী শরের দ্বারা সমুদ্র শুষ্ক করে দেবেন। সাপ , মৎস্য, মকর ও অন্যান্য জলজ জন্তুদের ছিন্নভিন্ন করে দেবেন যাতে করে বানরেরা পদব্রজে এই বিশাল সমুদ্র পার হতে পারে।

এই বলে তিনি সৌমিত্রি লক্ষণকে তাঁর তীর ও ধনুক আনতে নির্দেশ দিলেন। তাঁর নেত্র যুগল ক্রোধে বিস্ফারিত এবং কালাগ্নির দেদীপ্যমান হয়ে উঠল। তিনি ধনুতে ব্রহ্মাস্ত্র যোজনা করে জ্যা আকর্ষণ করলেন। সহসা আকাশ যেন বিদীর্ণ হল : পর্বত রাশি কম্পিত হল: চতুর্দিক তমসাচ্ছন্ন হল: সূর্য চন্দ্র নক্ষত্র তির্যক মার্গে চলতে আরম্ভ করল: মহাসমুদ্র সুবিশাল তরঙ্গমালায় পরিব্যপ্ত হয়ে উঠল, জলজ প্রাণীরা ভীত ও সন্ত্রস্ত হল: পাতাল বাসি মহাবলী দানবেরাও ব্যাকুল হয়ে উঠল: আকাশে শতশত উল্কা প্রজ্বলিত হয়ে উঠল এবং অতুলনীয় শব্দে বজ্রপাত আরম্ভ হল: নদ-নদী দের প্রভু উদ্ধত সমুদ্র আপন সীমানা অতিক্রম করে বেলাভূমিকে প্লাবিত করলেন।

এই পরিস্থিতিতে উদয়াচল থেকে দিবাকরের ন্যায় জলরাশি ভেদ করে স্বয়ং সমুদ্র প্রকট হলেন। তাঁর মুখ উজ্জ্বল; তিনি স্নিগ্ধ , বৈদূর্যমণি তুল্য বর্ণ বিশিষ্ট, স্বর্ণালঙ্কারে ভূষিত, রক্ত পুষ্প মাল্য ও বস্ত্র পরিহিত । সমুদ্র কৃতাঞ্জলি হয়ে শ্রী রাম কে বললেন:

” পৃথিবী বায়ু আকাশ জল জ্যোতি এই পঞ্চভূত চিরকাল স্বাভাবিক মার্গেই অবস্থান করে। আমি স্বভাবত অগাধ ও অতরনীয়। মনোকামনা লোভ ভয় বা অনুরাগের বশে আমি জলরাশি স্তম্ভিত করতে পারি না। তবে তুমি যে প্রকারে জলরাশি অতিক্রম করে উত্তীর্ণ হবে তা আমি বলছি, শোনো। বানর সেনা যখন পার হবে আমি তখন স্থলের ন্যায় স্থির থাকবো আর হিংস্র জল জন্তুরা কেউ আক্রমণ করবে না। “

শ্রীরাম তখন সমুদ্রকে প্রশ্ন করলেন যে তিনি তাঁর এই অমোঘ বান কোথায় নিক্ষেপ করবেন। সমুদ্র বললেন:

” উত্তর দিকে দ্রুমকুল্য নামক এক স্থান আছে যেখানে উগ্র দর্শন আভীর প্রভৃতি দস্যু গণ আমার জল পান করে । সেই পাপীদের স্পর্শ আমি সহ্য করতে পারি না। সেইখানেই তুমি তোমার শর নিক্ষেপ করো। “

শ্রীরাম তখন বজ্র তুল্য সেই ব্রহ্মাস্ত্র মোচন করলেন । যে স্থানে সেই শর পতিত হল, স্থান মরুকান্তার নামে পরিচিত হল। শরের আঘাতে সেই স্থানে একটি গহ্বর উৎপন্ন হল আর রসাতল থেকে সেই গহ্বরের মুখ দিয়ে জল উদগীরণ হতে লাগল। এই কারণে এই গহ্বর এর নাম হল ব্রণ কূপ।
শ্রীরামের বরে মরুকান্তার অতি উর্বর ও উত্তম স্থান রূপে প্রসিদ্ধ হল।

এরপর সাগর শ্রীরামকে বললেন যে তাঁর বাহিনীতে বিশ্বকর্মা পুত্র নল রয়েছেন। নল পিতৃলব্ধ বরের প্রভাবে সমুদ্রবক্ষে সেতু নির্মাণ করুন আর সেই সেতু তিনি ধারণ করবেন। বানর সেনা এই সেতুর উপর দিয়ে লঙ্কা গমন করবে। এই বলে সাগর অন্তর্হিত হলেন।

” অয়ং সৌম্য নলো নাম তনয়ো বিশ্বকর্মণ: ।
পিত্রা দত্তবর: শ্রীমান প্রীতিমান বিশ্বকর্মণ: ।।”
৬.২২. ৪৫

নল তখন বললেন যে সমুদ্র ঠিকই বলেছেন। তিনি বিশ্বকর্মার বরে সমুদ্রের উপর সেতু নির্মাণ করতে পারবেন। এতক্ষণ তাঁকে কেউ কিছু প্রশ্ন করেন নি , তাই তিনি বলেন নি। এভাবেই সমুদ্রের উপর নির্মিত রাম সেতু নির্মাণের প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছিল।

রামায়ণের এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বাল্মীকি রামায়ণের যুদ্ধ কাণ্ডের ২০ থেকে ২২ সর্গের মধ্যে বর্ণিত হয়েছে। এই ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয় যে আমরা যদি ভালো কোন কার্য করতে যাই , তাহলে আমাদের সর্বদা বিনীতভাবে, নত মস্তকে অন্যদের থেকে সাহায্য চাইতে হবে। কিন্তু আমাদের সেই ভালত্বকে যদি কোন শক্তিশালী , ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ আমাদের দুর্বলতা বলে ভাবে, তখন আমাদের নিজস্ব শক্তি দেখানো প্রয়োজন ঠিক যেমন শ্রীরাম সমুদ্রকে দেখিয়েছিলেন। বানর সেনাপতি নলের আচরণও শিক্ষণীয় । আমাদের কোন প্রতিভা থাকলেও আমাদের উচিত নয় ডংকা বাজিয়ে সকলকে তা জানান দেওয়া। যখন সঠিক সময় আসবে তখনই একমাত্র নিজ শক্তির কথা প্রকাশ করা উচিত। আর সমুদ্রের অবস্থা প্রমাণ করে ক্ষমতার মোহে গর্বদ্ধত হওয়া ঠিক না। রাবণ রাজাও ক্ষমতার মোহে অহংকারী ছিলেন। তবে সমুদ্র যেমন শেষে শ্রীরাম প্রভুর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন : রাবণ সেটা করেন নি। তাই রাবণ সবংশে ধ্বংস প্রাপ্ত হন; আর সমুদ্র বেঁচে যান ।

তথ্যসূত্র :

১. বাল্মীকি রামায়ণ ( বাংলা অনুবাদ ) : গীতা প্রেস , গোরক্ষপুর।

২. বাল্মীকি রামায়ণ সারানুবাদ : রাজশেখর বসু ।

🚩জয় শ্রীরাম 🚩
🙏🙏

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.