মায়ের স্বপ্নাদেশ পেয়েই দক্ষিণেশ্বর মন্দির প্রতিষ্ঠা করলেন রানী রাসমণি

0
170

© শৈবাল বন্দ্যোপাধ্যায়
১৮৪৭ সালের এপ্রিল বা মে মাস। কলকাতা বাবুঘাটের কাছে তৈরি হল ২৫টি বৃহৎ নৌকার একটি নৌবহর। শোনা গেল, জানবাজারের জমিদার প্রয়াত রাজচন্দ্র দাসের স্ত্রী রানী রাসমণি একটি বিরাট তীর্থ যাত্রীর দল নিয়ে চলেছেন বারাণসী। মোট চারখানি নৌকা ভর্তি চাল, তিন খানি নৌকা য় তেল, লবণ, একখানিতে চারটি গাভী ইত্যাদি চলেছে রানীর সঙ্গে ।

কিন্তু যাওয়া হল না । যাত্রার ঠিক আগের দিন রাতে বারাণসীর বিশ্বনাথ এবং অন্নপূর্ণা স্বপ্নাদেশ দিলেন রানী রাসমণিকে। বারাণসী যাবার প্রয়োজন নেই, এই বাংলাতেই গঙ্গার তীরে দেবীকে প্রতিষ্ঠা করুন তিনি । দেবী সেই পুজো গ্রহণ করবেন ।
ব্যাস, সকালেই রানীর আদেশ- যাত্রা বাতিল করে সমস্ত রসদ গঙ্গাতীরে বিতরণ করতে।

এসবের পর রানী রাসমণি শুরু করলেন মন্দিরের জন্য গঙ্গার তীরে উপযুক্ত জমির সন্ধান । প্রথমে চেষ্টা করলেন ” গঙ্গার পশ্চিম কূলে” উত্তরপাড়ায়। প্রত্যাখ্যান পেলেন উত্তরপাড়ার জমিদার দের থেকে । এরপর তাঁর জন্মস্থান হালিশহরে। হালিশহর, যার পূর্ব নাম কুমারহট্ট, শ্রীচৈতন্যের গুরু ঈশ্বরপুরীর জন্মস্থান হিসেবে একটি পবিত্র বৈষ্ণব স্থান । আবার কালীসাধক রামপ্রসাদ সেনের জন্মস্থান হিসেবে শাক্ত দেরও তীর্থ । কিন্তু এখানেও জমি পেলেন না রানী রাসমণি । ভাটপাড়ার শ্মশানের কাছে পেলেন জমির সন্ধান । কিন্তু সেখানকার পন্ডিতদের বাধায় সেটিও অধরা থেকে গেল ।

অবশেষে কলকাতা থেকে পাঁচ মাইল উত্তরে দক্ষিণেশ্বর গ্রামে ইংরেজ জন হেস্টি সাহেবের একটি কূর্ম পৃষ্ঠ জমির সন্ধান পাওয়া গেল । সাধনার পীঠস্থান হিসেবে এরকম জমি অনুকূল স্থান বলেই বিবেচিত হয় । জমির পরিমাণ ছিল সাড়ে চুয়ান্ন বিঘা।

১৮৪৭ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর ৪২ হাজার ৫০০ টাকায় জমিটি কিনে নিলেন রানী রাসমণি । পরে আশপাশের আরো কিছু জমি কিনে মোট ৬০ বিঘা জমিতে মন্দির নির্মাণ শুরু করা হয়েছিল ।
মন্দির নির্মাণে বিভিন্ন রকমের বিরোধিতা ও প্রচুর মামলা – মোকদ্দমার মুখোমুখি হতে হয়েছিল রানীকে। তার মধ্যে বাইরের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে নিজের জামাইদের সঙ্গেও মামলা হয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে সমস্ত বাধা সরে গিয়ে মসৃণ হয়ে গিয়েছিল নির্মাণের কাজটি।
গঙ্গার তীরে পোস্তা বাঁধিয়ে ছিল বিখ্যাত ” ম্যাকিনটস অ্যান্ড বার্ন” কোম্পানি । এরপর গঙ্গার দিকে দ্বাদশ শিবমন্দির, বিশাল উঠোনের পূর্ব দিকে বিষ্ণু মন্দির, কালী মন্দির, নাটমন্দির, পূজারীর ঘর, ভোগরান্নার ঘর প্রভৃতি তৈরি হল। ১৮৫৫ সালে শেষ হল মন্দির নির্মাণের কাজ । ওদিকে এই সময় জানবাজারের বাড়িতে নির্মিত হয়েছিল দেবমূর্তি গুলি । নির্মাণের পর মূর্তি গুলি সযত্নে বাক্স বন্দী করে রাখা হয়েছিল । রানী আবার স্বপ্নাদেশ পেলেন তাড়াতাড়ি মূর্তি প্রতিষ্ঠার।

কিন্তু প্রবল বাধা এল এইবার । রানী রাসমণি ছিলেন শূদ্রাণী। তাঁর মন্দিরে কোনো ব্রাহ্মণ পৌরোহিত্য করতে পারবেন না, দেবীকে অন্নভোগ দেওয়া যাবে না – এইসব মত দিলেন শাস্ত্রবিদ পন্ডিত সমাজ । বাধ্য হয়ে রানী কলকাতার চতুষ্পাঠী গুলিকে পত্র লিখে মত চাইলেন। মত চাইলেন নিজের কুলপুরোহিত এবং গুরুদেবের কাছে । সকলেই তাঁকে নিরাশ করলেন ।
সেই নৈরাশ্যের মধ্যে একটি অপ্রত্যাশিত কন্ঠস্বর শোনা গেল । ঝামাপুকুর টোলের পন্ডিত শ্রী রামকুমার চট্টোপাধ্যায় শাস্ত্র ঘেঁটে বিধান দিলেন মন্দির প্রতিষ্ঠা ও অন্নভোগ দুটোই করতে পারবেন রানী। শুধু তাঁকে ঐ মন্দির কোনো ব্রাহ্মণকে দান করতে হবে, রানী নিজে শুধু সেবাধিকারিণী থাকবেন । সানন্দে মেনে নিলেন রানী । পারিবারিক কুলগুরু শ্রী রামসুন্দর চক্রবর্তী কে মন্দির দান করে দিলেন । মন্দির উদ্বোধনের দিন স্থির হল ১৮৫৫ সালের ৩১শে মে, অর্থাৎ আজকের দিনে।

যে মন্দিরে একজন ব্রাহ্মণও আসবেন না, প্রসাদ গ্রহণ করবেন না বলে আগে বলা হয়েছিল, তার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন এক লক্ষের বেশি ব্রাহ্মণ । বাংলার বিভিন্ন জায়গা ও বাংলার বাইরে থেকে এসেছিলেন তাঁরা । রানী তাঁদের সবার পদধূলি গ্রহণ করে একটি বড় কৌটায় রেখেছিলেন । ব্রাহ্মণ ভোজনের ” দীয়তাং ভুজ্যতাং” , মর্যাদা অনুসারে দক্ষিণা এসবের সঙ্গে ছিল সাধারণ মানুষ আর কাঙালি ভোজনের বিরাট আয়োজন ।

সোমকাল, সোমপ্রকাশ প্রভৃতি সাময়িক পত্রে প্রকাশিত হয়েছিল বিশদ বিবরণ । রানী রাসমণি সেই দিনেই সৎ ও নির্লোভ পন্ডিত শ্রী রামকুমার চট্টোপাধ্যায়কে মা ভবতারিণী মন্দিরের প্রধান পুরোহিত রূপে নিয়োগের ব্যাপারটি নিশ্চিত করে ফেললেন ।

সমগ্র উৎসবের মধ্যে শুধু একটি মানুষ ছিলেন প্রতিক্রিয়াহীন। নীরবে এসেছিলেন ,নীরবেই চলে গিয়েছিলেন, ভাগ বসান নি সেই বিরাট ” দীয়তাং ভুজ্যতাং ” -এ, বাইরে খেয়েছিলেন এক পয়সার মুড়ি – মুড়কি। ইনি রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের উনিশ বছর বয়সী কনিষ্ঠ ভাই। অতি সাধারণ বেশ ধারী, অখ্যাত, দরিদ্র কিশোর , যার সম্বন্ধে কারোর কোনো কৌতূহল ছিল না , কেবল মন্দিরের অধিষ্ঠাত্রী দেবীই খুশি হয়েছিলেন । আগামী তিরিশ বছর এঁরই সাধনার পীঠস্থান হবে ঐ মন্দির, ঘুরে যাবে ভারতের ধর্মান্দোলনের ইতিহাসের মোড়।

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.