জানেন কি? কোরআনের আয়াত নিষিদ্ধের দাবিতে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা হয়েছিল

0
541

(সংবাদটি প্রকাশিত হয় opIndia.com এর নিউজ পোর্টালে বিগত 14 ই মার্চ 2021)

অনুবাদ: শ্রী সূর্য শেখর হালদার

সম্প্রতি উত্তর প্রদেশ সেন্ট্রাল ওয়াকফ বোর্ডের প্রাক্তন চেয়ারম্যান সৈয়দ ওয়াসিম রিজভী সুপ্রিম কোর্টে একটি পিটিশন দাখিল করে মৌচাকে ঢিল ছুড়েছেন । এই পিটিশনে তিনি কুরআন থেকে 26 টি আয়াতকে বাদ দেবার পক্ষে সওয়াল করেছেন। তাঁর আবেদনে তিনি বলেছেন যে কুরআনের কিছু আয়াত আছে, যেগুলি সন্ত্রাস, হিংসা এবং জিহাদকে উৎসাহ দিয়ে থাকে। এই পিটিশনের পর ওয়াসিম সাহেবকে ভয় দেখানো হয়েছে এবং একজন মৌলবী ওয়াসিম সাহেবের মাথার দাম দিয়েছেন । তিনি ঘোষণা করেছেন যদি কেউ ওয়াসিম সাহেবের মাথা কেটে এনে দিতে পারে তবে তাকে তিনি কুড়ি হাজার টাকা বখশিস দেবেন।

এই ধরনের মধ্যযুগীয় ঘোষণা আজকের দিনে অবশ্যই রুচিবোধের প্রশ্ন তোলে। যাইহোক আজ থেকে 36 বছর পূর্বে এডভোকেট
শ্রী চাঁদমল চোপড়া এবং শীতল সিং কুরআনকে পুরোপুরি ভাবে নিষিদ্ধ করার দাবিতে কলকাতা হাইকোর্টে আবেদন করেন। 1985 খ্রিস্টাব্দের 29 শে মার্চ সংবিধানের 226 ধারা অনুসারে এই আবেদন করা হয়।। এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কলকাতা হাইকোর্ট সরকারকে পবিত্র বই কুরআনের প্রতিটা কপিকে বাজেয়াপ্ত করতে বলে।

এই আবেদনে বলা হয় যে কুরআনের প্রতিটা কপিকে Criminal Procedure এর 195 ধারা (প্রকাশনার অংশ বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা) অনুসারে সরকারের বাজেয়াপ্ত করা উচিত কেননা Indian Penal Code ( IPC) এর 153 A ধারা ( ধর্মীয় বিষয়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা তৈরি) এবং 295A ধারা (ধর্মীয় ভাবনায় ইচ্ছাকৃত এবং অভিসন্ধি মূলক আঘাত) অনুযায়ী এই আয়াতগুলো বাজেয়াপ্ত হওয়া উচিত। এই আবেদনে বলা হয় যে মুসলিমরা এই পর্যন্ত এই আইনের দ্বারা ইসলামের সমালোচনাকারী বিভিন্ন বই নিষিদ্ধ করেছে। এখনো অবধি এই ধারা গুলির বলে মূর্তিপূজা কারীদের বিভিন্ন পবিত্র সাহিত্য নিষিদ্ধ করা অথবা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

চাঁদমল চোপড়া এবং শীতল সিং কুরআনের বিভিন্ন আয়াত প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন যেখানে অবিশ্বাসী ( ইসলামে বিশ্বাসী নয় ) দের প্রতি হিংসা করার কথা বলা হয়েছে। তাঁরা পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত তুলে ধরেন যেখানে বলা হয়েছে :
“যখন পবিত্র মাস শেষ হয়ে যাবে তখন যেখানে মূর্তিপূজা কারীদের দেখবে সেখানে বিনাশ কর, তাদের গ্রেপ্তার কর, অবরোধ কর, লুকিয়ে থেকে তাদের ওপর আক্রমণ কর। “
আরেকটি আয়াতে বলা হচ্ছে: ‘ বিশ্বাসীগণ যেসব অবিশ্বাসীরা তোমাদের চারপাশে বাস করে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর, তাদের প্রতি কর্কশ হও।”

এই বিষয়টি প্রথমে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারক জে. খাস্তগীরের সামনে উপস্থাপিত হয়। আজকের দিনে যেইরকম ভাবা হয়, সেইদিন কিন্তু সেইরকম হয়নি। অর্থাৎ, আবেদন কিন্তু বাতিল হয়নি। বিচারক সেদিন আবেদন শুনেছিলেন এবং তিনি বাদী ও বিবাদী দুই পক্ষকেই বিজ্ঞপ্তি পাঠান ।এই প্রসঙ্গে বরিষ্ঠ আইনজীবী আলহাজ সি.এফ. আলী বলেন , “পুরো ব্যাপারটাই মনে হচ্ছে পাগলামি এবং অবাস্তব । কোন মরণশীল জীব পৃথিবীতে বসে আল্লাহের পবিত্র বানীকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে না। পৃথিবীর কোন আদালতের এই ক্ষমতা নেই।”
খুব দ্রুত 70 জন আইনজীবী মিলে একটি অফিসিয়াল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে বিচারক জে. খাস্তগীরের আদালত বয়কট করা হবে। অন্য আইনজীবীদেরও এই ব্যাপারে অটল থাকার অনুরোধ করা হয়।

উগ্র মৌলবাদী ইসলামিক সংগঠনগুলি যেমন জামায়েত-ই-ইসলামী এবং কেরালা মুসলিম অ্যাসোসিয়েশন একটি কুরআন ডিফেন্স কমিটি বানিয়ে ফেলে । উদ্দেশ্য ছিল তাদের এই আন্দোলনকে গতি দেওয়া। তবে যাই হোক তারা আদালতের লড়াইতে অংশগ্রহণ করেনি কারণ তাদের ভয় ছিল তারা সরাসরি লড়াইতে অংশ নিলে সাধারণ মুসলিমরা আইন ও প্রশাসনকে অমান্য করে সমস্যা তৈরি করতে পারে। অবশ্য সিপিআইএম পরিচালিত পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আদালতে যাতে এই মামলা উঠতে না পারে সেই জন্য বাম সরকার এফিডেভিট করে জানায় যে কুরআনের ওপরে রায় দেবার ক্ষমতা আদালতের নেই । সারা পৃথিবীতে কুরআন মুসলিমদের পবিত্র গ্রন্থ রূপে স্বীকৃত। এর প্রতিটি কথাই ইসলামের বিশ্বাস অনুযায়ী রচিত এবং এগুলি অপরিবর্তনশীল।

বামফ্রন্ট সরকার এটাও দাবি করে যে অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এই মামলা করা হয়েছে। ভারতের ইতিহাসে এই ধরনের মামলা কোনদিন করা হয়নি। তৎকালীন কংগ্রেস পরিচালিত কেন্দ্র সরকারও সহমত পোষণ করে এবং এই আবেদনের বিরোধিতা করে। প্রচন্ড রাজনৈতিক চাপের কারণে বিচারক খাস্তগীর তাঁর তালিকা থেকে এই মামলা সরিয়ে দেন , এবং সতীশচন্দ্রের আদালতে পাঠিয়ে দেন। রাজ্যের advocate-general এস. কে. আচারিয়ার পরামর্শ অনুযায়ী এরপর মামলাটি সরানো হয় বিমল চন্দ্র বসাকের বেঞ্চে। তিনি 1985 সালের 17 মে মামলাটি খারিজ করে দেন।

এডভোকেট চাঁদমল চোপড়া আদালতের রায় প্রচুর ভুল দেখতে পান , এবং তিনি সেই বছরের 18 জুন আবার একটি আবেদন করেন। এই পিটিশনের উদ্দেশ্য ছিল রায়ের পুনর্বিবেচনা করা। বিচারক বসাক তাঁর রায়ে লিখেছিলেন কুরআনের উৎপত্তি পার্থিব বিষয় নয়: এটি স্বর্গীয়। তিনি আরো ঘোষণা করেন যে আদালত পবিত্র বই সংক্রান্ত কোন বিষয়ে মতামত দিতে পারে না এবং আদালত অন্য ধর্মকে অপমান করতে পারে না। চোপড়া তাঁর পুনর্বিচারের আবেদনে বলেন যে বিচারকের বিচার ধর্মনিরপেক্ষতার মূল
ভাবধারাকে আঘাত করে এবং সেই কারণে এই বিচার অসাংবিধানিক। তিনি আরো বলেন যে আবেদনে কুরআনের অন্য ধর্মকে আঘাতকারী আয়াত গুলি উল্লেখ করার পরেও বলা হয়েছে কুরআন অন্য ধর্মকে অপমান করছে না।

চাঁদমল চোপড়া রায় পুনর্বিবেচনার আবেদনে বলেন যে কোন জনগোষ্ঠী যদি কোন বইকে পবিত্র বলে মনে করে, কিন্তু সেই বইয়ের কোন অংশ যদি Indian Penal Code এর 295 ধারাকে অগ্রাহ্য করে কিংবা ওই বইয়ের প্রকাশনা Indian Penal Code এর 295A ধারাকে খন্ডিত করে , তবে সেই তথাকথিত পবিত্র বইকে খতিয়ে দেখা কি আদালতের কাজ নয়? যাইহোক বিচারক বিমল চন্দ্র বসাক 1985 সালের 21 জুন তারিখে আবার আবেদন খারিজ করে দেন । এবারে তিনি যুক্তি দেখান যে আবেদনে সময় নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে এবং সেই কারণে তিনি মামলার মধ্যে প্রবেশ করেন না।

আবেদন খারিজ হয়ে যাবার পর সীতারাম গোয়েল ও
চাঁদমল চোপড়া একত্রে The Calcutta Quran Petition নামক একটা ঐতিহাসিক বই প্রকাশ করেন। বছরটা ছিল 1986। এই বইটি মুসলিম তুষ্টিকরণের জন্য ছদ্ম সেক্যুলারিজমের নামে বাম ও কংগ্রেসের মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক লালন-পালনের ঘৃণ্য ভাবাদর্শকে সামনে তুলে ধরে। এই বই প্রকাশিত হবার পর হিন্দু রক্ষা দলের সভাপতি ইন্দ্র সেনশর্মা এবং সচিব রাজকুমার আর্য গ্রেপ্তার হন। তাঁরা কুরআনের 24 টি আয়াতকে প্রকাশ করেন একটি হেডিং এর অধীনে। এই হেডিংটি ছিল ‘কেন এই দেশে ধর্মীয় সংঘাত বা রায়ট হয়?’ তাঁদের মতে এই আয়াতগুলি একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিমকে অন্য ধর্মের মানুষের বিরুদ্ধে লড়াই করতে উৎসাহিত করে। যতদিন না পর্যন্ত কুরআনের এই আয়াত গুলি সরানো হবে ততদিন পর্যন্ত এই দেশে ধর্মীয় সংঘাত বন্ধ হবে না। তবে তাঁরা দ্রুত রেহাই পান দিল্লির মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জেড.এস . লোহাতের আদেশে।

ওয়াসিম রিজভীকে কুরআনের হিংসাত্মক আয়াত নিষিদ্ধ করার দাবি জানানোর কারণে যখন প্রাণের ভয় দেখানো হচ্ছে, তখন চাঁদমল চোপড়ার এই আবেদনের কথা এবং পশ্চিমবঙ্গের বাম সরকারের মুসলিম তুষ্টিকরণ এর নীতি স্মরণ করা যেতে পারে। পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকীর সঙ্গে বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেসের নির্বাচনী জোট তৈরির পরিপ্রেক্ষিতেও এই ঘটনাকে বিচার করা যেতে পারে।

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.