বাংলাদেশে ধারাবাহিক সংখ্যালঘু নির্যাতন এবং প্রধানমন্ত্রী মোদির সফর

0
172

  • © রঞ্জন কুমার দে

আবারও বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন, সৌজন্য সুনামগঞ্জ জেলার শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রাম।তথাকথিত সেই ধর্ম অবমাননার সূত্র ধরে গত ১৭ই মার্চ ২০২১ তারিখে মৌলবাদী হেফাজতিরা হিন্দু অধ্যুষিত পুরো একটি গ্রামের অন্ততপক্ষে ৯০ টি বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করে। অসংখ্য মন্দির ভেঙে সেখানের অনেকগুলো কষ্টিপাথরের মূর্তি সরিয়ে নেয়, টাকা পয়সা, সোনা লুট করে সংখ্যালঘু মহিলাদের শ্লীলতাহানি ও পুরুষদের মারধর করে ধর্মপ্রাণ এই তৌহিদী জনতা।

প্রত্যক্ষদর্শী এই গ্রামেরই দুই সন্তানের মা লবঙ্গ রাণী বলেন “হঠাৎ খবর পাই দু দিক থেকে নৌকা করে লাঠিসোটা নিয়ে লোকজন আসতেছে।ছেলের বউকে নিয়ে ঐ অবস্থাতেই ঘরে তালা দিয়ে দৌড় দেই হাওড়ের বাঁধের দিকে।প্রায় দু ঘন্টা পর ফিরে এসে দেখি ঘরবাড়ি তছনছ হয়ে গেছে”।ধর্মপ্রাণ এক মৌলবী চিৎকারের সুরে বলে উঠেন “হালার মালাউনের বাচ্চারা আর তরারে ছাড়তাম না।তোরা আমরার বড় হুজুরের সম্মান নষ্ট খড়ছস।”

উল্লেখ্য যে গত ১৫ ই মার্চ ২০২১ তে পাশ্ববর্তী দিরাই উপজেলায় হেফাজত প্রধান আমির জুনায়েদ এবং মামুনুল হক এক ধর্মীয় সমাবেশে চিরাচরিত উগ্র সাম্প্রদায়িক মন্তব্য রাখেন।পরের দিন ১৬ ই মার্চ সোশ্যাল মিডিয়ায় শাল্লার এক হিন্দু যুবক ঝুমন দাস হেফাজতি নেতাদের উদ্দেশ্যে করে একটা পোস্ট ভাইরাল হওয়ায় পাশ্ববর্তী তিনটি গ্রামের ধর্মীয় মৌলবাদীরা চরম ক্ষেপে উঠে এবং মিটিং, মিছিল করে মসজিদের মাইকে হামলার জন্য প্রচার চালায়। অবস্থার আঁচ অগ্রিম বুঝতে পেরে গ্রামের হিন্দুরাই অভিযুক্ত ঝুমন দাসকে পুলিশের হাতে তুলে দেয় এবং পুলিশ যথারিতি ১৭ তারিখে তাহাকে কোর্টে চালান দিয়ে দেয়।

কিন্তু হেফাজতি ইসলাম অনুসারীরা এরপরেও ঐ দিনই কয়েকশ মানুষ মিলে দেশীয় বল্লম, ডা,ছুরা নিয়ে সংখ্যালগু গ্রামটিতে কয়েক ঘন্টার তান্ডবলীলা চালায়।
সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যানে একাধিক ভিডিও চিত্রে ৬ থেকে ৭০ বৎসর বয়সী হামলাকারীদের ছবি স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।কিন্তু আফসোস ঝুমন দাসরা ধারা ৫৪ তে তৎক্ষণাৎ গ্রেফতার হলেও পরম্পরাগতভাবে এই দুর্বৃত্তরা আইন ও বিচারের ধরাছোঁয়ার নাগালের বাইরেই থেকে যায়। ধর্মীয় অবমাননার অজুহাতে সংখ্যালঘু হিন্দু নির্যাতন এখন বাংলাদেশের মৌলবাদীদের নতুন হাতিয়ার।

বাংলাদেশে পূর্বের ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠন ‘জামাত ই ইসলামী ‘কে সরকার নিষিদ্ধ করলেও হাসিনা সরকারের পরোক্ষ পৃষ্টপোষকতায় নতুন মৌলবাদী সংগঠন ‘হেফাজতে ইসলাম’ দেশের নাভিশ্বাস রুদ্ধ করে রেখেছে। সম্প্রতি হেফাজতের চোখ রাঙানিতে শেখ হাসিনা মাদ্রাসা শিক্ষাকে মাস্টার্সের মর্যদা দিয়েছেন।এই আপাদমস্তক হেফাজতি মৌলবাদীরা প্রথমে ২০১৩ সালের মে মাসে ঢাকার শাপলা চত্বরে নাস্তিক ইস্যুতে দেশজুড়ে অরাজকতা খাঁড়া করে, তারপর কাশ্মীরে ৩৭০ বলবদে তাদের ভারতীয় দূতাবাসে বিক্ষোভ, ফ্রান্স ইস্যু,বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণে তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ ইত্যাদি ইত্যাদি। সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিজির বাংলাদেশ সফরে এই মৌলবাদীরা আবার রাজপথে বিক্ষোভ,ত্রাস,অরাজকতায় মেতে উঠে এবং বেশ কয়েকজনের মৃত্যুও ঘটে।কওমী মাদ্রাসাভিত্তিক এই সংগঠনের মাদ্রাসার ছাত্ৰ ও শিক্ষক তাদের মূল সমর্থক হলেও বর্তমান বিরোধীশূন্য বাংলাদেশে ধর্মের হুজুগে হেফাজতে ইসলামই সবচেয়ে আলোচ্য ও প্রাসঙ্গিক।

“ধর্ম যার যার, উৎসব সবার” বা “রাষ্ট্র সবার” এই অসম্প্রদায়িক বার্তাগুলো প্রকৃতপক্ষে কাজকলম মাত্রই সীমিত। তাইতো সুনামগঞ্জের শাল্লাতে সংখ্যালগু গ্রামে আক্রমণ কোন কাকতলীয় নয় বরং পরিকল্পনাময় ধারাবাহিক অভ্যাস।

উল্লেখ্য যে কক্সবাজারের রামুতে ২০১২ সালের ২৯ শে সেপ্টেম্বর বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের শতবর্ষ পুরানো ১২ টি বৌদ্ধ বিহারের বিরল বৌদ্ধমূর্তি ,মন্দির এবং অসংখ্য বসতবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।তারপর ২০১৩ সালের ২ রা নভেম্বর পাবনার সাঁথিয়ায় হিন্দুপল্লী বনগ্রামে বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা হয়। ৬ মাস না যেতেই ফের ২০১৪ সালের ২৭ শে এপ্রিল কুমিল্লার হিন্দু অধ্যুষিত গ্রাম বাঘ সিতারামপুর গ্রামে বাড়িঘর, মন্দির ভাঙচুর ও লুটপাট হয়। তারপর একই কায়দায় ২০১৬ সালের ২৯ শে অক্টোবর বহুলচর্চিত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ৮ টি হিন্দু পাড়ায় অন্ততপক্ষে ৩০০ টা বসতবাড়ি ও ১০ টি মন্দিরে আক্রমণ চালিয়ে ধ্বংশলীলা ও লুটপাট করা হয়।হয়তো মৌলবাদীরা এতো তান্ডবের পরেও তৃপ্তি পায় নি ,তাই ফের ৫ দিন পর ৪ নভেম্বর ২০১৬ তে একই নাসিরনগরে হামলা চালিয়ে ৬ টি বাড়িঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এই হামলার এক বছর পর ২০১৭ তে ১০ নভেম্বর রংপুরের গঙ্গাচড়া ঠাকুরপাড়ায় হামলায় ১৫ টি হিন্দু বাড়ি লুটপাট ও ভস্মীভূত হয়।২০২০ সালের ১ নভেম্বর কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলায় কোরবানপুর গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের ৬টি বাড়িতে যথারীতি অগ্নিসংযোগ ,লুটপাট এবং ভাঙচুর হয়। সেই ট্রেডিশনে ২০২১ সালের ১৭ ই মার্চ সুনামগঞ্জের শাল্লায় সংখ্যালঘু নির্যাতন। প্রত্যকটি ঘটনা ভরা দিনদুপুরে মিটিং ,মিছিল, মসজিদের লাউডস্পিকারে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, কোরআন শরীফের অবমাননা নতুবা মোহাম্মদ (সা:) কে কটূক্তির বাহানায় নিরীহ সংখ্যালগুদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়া হয়।আলোচিত প্রত্যকটি সাম্প্রদায়িক হামলায় তদন্তে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে অভিযুক্তদের ফেসবুক হ্যাক ,ভুয়ো স্ক্রিনশট ভাইরাল এবং সেই অভিযুক্ত সম্পূর্ণ নির্দোষ। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা এবং সংখ্যালগু অত্যাচার এখন বাংলাদেশে বাৎসরিক উদযাপনে পরিণত হয়েছে।প্রকৃতপক্ষে ওয়াজ মাহফিল, মসজিদ, মাদ্রাসায় কট্টর মৌলবাদী বক্তাদের ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ধর্ম ও ধর্মাচার নিয়ে কুৎসা, মিথ্যাচার ও ঘৃণা ছড়ানোর প্রতিফলই হচ্ছে বর্তমান বাংলাদেশে ধর্মীয় উন্মাদ সাম্প্রদায়িকতা।

২০১২ সালের কক্সবাজারের রামু থেকে এখন পর্যন্ত কোন অভিযুক্ত সংখ্যালগু বাস্তবে দোষী প্রমাণিত হয় নি ।কক্সবাজারে উত্তম বড়ুয়া নামে যে বৌদ্ধ যুবকের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ উঠেছিলো সেই ব্যক্তি বাস্তবে আছেই কিনা জানা যায় নি।ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নাসিরনগরে রসরাজ দাসের বিরুদ্ধে ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ছিলো, কিন্তু সেই ব্যক্তি একজন জেলে ছিলো এবং ফেসবুকে তার কোন প্রকৃত আইডি ছিলো না। রংপুরের গঙ্গাচড়ায় লেখাপড়া না জানা নির্দোষ টিটু রায়কে একই দোষে অভিযুক্ত করা হয়,আজ সে বেঁচে আছে কিনা কাহারো জানা নেই।কুমিল্লার মুরাদনগরে ফ্রান্স ইস্যুতে একজন হিন্দু শিক্ষকের ফেসবুক স্ট্যাটাস “স্বাগতম প্রেসিডেন্টের উদ্যোগকে” লেখার অপরাধে পুরো একটি সংখ্যালগু গ্রাম পুড়িয়ে ছাড়খার করে দেওয়া হয়।এখন সুনামগঞ্জের শাল্লাতে কাঠগড়ায় ঝুমন দাস , অভিযোগ সেই ধর্ম অবমাননার।২০১২ থেকে ২০২১ পর্যন্ত এই মৌলবাদীদের যদি কিছুটা হলেও কঠোর হাতে দমন করা যেতো কিংবা এই কট্টর মৌলবাদীদের বিচারের আওতায় আনা যেতো তাহলে আগামী দিনের জন্য হয়তো কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা যেতো।কিন্তু আক্ষেপ! ১৯৪৬,৪৭,৬৪,৭১ থেকে সংখ্যালঘুরা বরাবরই অত্যাচারিত হয়ে আসছে, অত্যাচারীরা কখনো মুসলিম লীগ, জামাত ই ইসলামী, বিএনপি ,আওয়ামীলীগ বা হেফাজতে ইসলাম।

প্রশাসনের যদি সদিচ্ছা থাকতো তাহলে শাল্লার সাম্প্রদায়িক আক্রমণ আটকানো যেতো। স্থানীয় দারাইন নদী পার হয়ে গ্রামটিতে পৌঁছতে কয়েক ঘন্টার সময় লাগে,তাছাড়া প্রশাসন মৌলবাদীদের মসজিদে মাইকিং, মিটিং,মিছিল সব বিষয়ে অবগত ছিলো।এইসব দুষ্কৃতীকারীরাই হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে প্রধানমন্ত্রী মোদির বাংলাদেশ সফরকে ইস্যু করে তান্ডবলীলায় পুরো দেশকে অচল করে রেখেছে।বাংলাদেশের প্রশাসন আগে থেকেই যদি কঠোর হাতে এইসব জঙ্গীদেরকে দমন করে রাখতো তাহলে আজকের দিনে হয়তো সরকারকে এই কঠিন দিন দেখতে হতো না!প্রাক্তন ভারতীয় হিন্দু রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশ সফরকালে সংখ্যালগু হিন্দু নির্যাতনে টু শব্দ করেন নি, সেই ট্রেডিশনে প্রধানমন্ত্রী মোদিও। মোদিজি পারতেন একটু সময়ের জন্য হলেও সুনামগঞ্জের শাল্লায় নির্যাতিত ধার্মিক সংখ্যালঘুদের সঙ্গে দেখা করতে। তাহলে নিশ্চয় তাঁদের জখমে কিছুটা হলেও মলম লাগতো এবং ধর্মীয় সংখ্যালগু সুরক্ষায় বাংলাদেশ সরকার ও মৌলবাদীদের নিকট এক কঠিন বার্তা প্রেরিত হইতো।

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.