LIG(Low Intelligence Group) বাঙালী

0
132

© দেবশঙ্কর ঘোষ

বিশেষ প্রতিভাবান কিছু বাঙালী চরিত্রে’র এক ঈশ্বরপ্রদত্ত বৈশিষ্ট্য আছে । এঁরা যে কোনো বিষয় এর উপরে’ই বিশেষজ্ঞ’র মন্তব্য করার প্রতিভা রাখেন । এঁরা নিজেদের চলমান এনসাইক্লোপিডিয়া, এবং ব-কলমে বুদ্ধিজীবি বলে মনে করে প্রীত হয়ে থাকেন ।
কিন্তু, কিছু বোকা বাঙালী, যাদের বুদ্ধিশুদ্ধি কম এবং যারা পরশ্রীকাতর,.. তারা এই শ্রেনী’র বাঙালী’দের আড়ালে “আঁতেল” বলে ডেকে থাকেন ।

আমি এই ‘বোকা বাঙালী’দের দলে আছি…

এই LIG বাঙালীরা..( “Low Income Group” নয়,..”Low Intelligence Group” )..কিন্তু নিজেদের স্ট্যাটাস সম্পর্কে খুব সচেতন !!
ধরুন, এঁরা হয়তো দুর্গাপূজার অষ্টমীর দিন সপরিবারে ” Mainland China” য় খেতে গেলেন । দেড় ঘন্টা বাইরে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে শেষে টেবিল পেলেন । মেনু-কার্ড’ এর ডানদিক’টা আগেই ভালো করে দেখে নিয়ে – চট্-জলদি একটা বাজেট এরা মনে মনে বানিয়ে ফেলবেন । তারপর হেসে ছেলেমেয়েদের বলবেন – ” কি খাবি বল্ “!! তিনি কিন্তু ততক্ষণে চিংড়ি মাছের সব দামী আইটেম গুলো মন থেকে বেমালুম ছেঁটে ফেলে দিয়েছেন । এর পরের কুড়ি মিনিট ধরে মেনুকার্ড ঘাঁটাঘাঁটি’র ফাঁকে.. Family Selfie তুলে Facebook এ পোস্ট করার পর LIG বাঙালী অর্ডার দেবে…” Chilly-Chicken & Veg Fried Rice ..2 Split in 4 please..”

এই দুটো চাইনিজ পদ বাঙ্গালীর একদম নিজস্ব ! ফ্যানাভাত-আলুসেদ্ধ’র মতো একদম চেনা আইটেম !

বাড়ি ফেরার পথে, LIG বাবা ছেলেমেয়েদের অবশ্যই বলবেন –” ধুশ্ ! ধুশ !! নামেই Mainland China, ওই তো খাবারের ছিরি !!! এর থেকে আমাদের পাড়ার কেলো-দা’র দোকানের চাউমিন অনেক ভালো । কি বলিস্ ?? “
এই মন্তব্যে’র পিছনে অবশ্যই এক গোপন উদ্দেশ্য আছে । সামনের বছর অষ্টমী’তে ছেলেমেয়েরা আর ভুলেও Mainland China র নাম করবে না…!!

তুলনায়, “আঁতেল বাঙালী ” কিন্তু অনেক সপ্রতিভ । অনেক বেশি Well informed এবং Smart ..
এঁরা Mainland China য় টেবিল দখল করে প্রথমেই উঁচু গলায় ওয়েটার’কে “হেক্সকিউ-উ-উজ মি” বলে তর্জনী নাচিয়ে ডেকে পাঠাবে । তারপর, মেনুকার্ডে গোটা গোটা অক্ষরে ছাপা থাকা স্বত্ত্বেও জানতে চাইবে — ‘স্টার্টারে কি কি আছে, বা আজকের Special Dish কিছু আছে কি না !! যদিও ভুলেও দামী Special Dish এর অর্ডার দেবে না, কিন্তু ঐ যে বললাম — “well informed” থাকতে হবে !!
শেষে, খুব ছোট ছোট চুমুকে ‘জলজীরা’ শেষ করার পর অর্ডার করা হবে এক গালভরা স্প্যানিশ ডিশ্ –“Smoked Brinjolae- De -Pastarino – in Garlic Sauce”…যেটাকে গোদা বাঙ্গলা’য় বলা হয় – “বেগুন-পোড়া”। এইটা অর্ডার করা হবে অপ্রয়োজনীয় উঁচু গলায়.. যা’তে আশেপাশের টেবিলের লোকজনও শুনতে পায় –” আমি কি খাচ্ছি “!!
কাঁটা ও ছুরি সহযোগে বেগুনপোড়া’র শ্রাদ্ধ করতে করতে ফটো তুলে ফেসবুকে পোস্ট করা হবে –“Enjoying Quality Time with Sweetheart @ Mainland China”. এরপরে, গোলাপি ন্যাপকিনে আলতো করে ঠোঁট মুছে আঁতেল বাঙ্গালী স্ত্রী কে বলবে –“Delicious !! Isn’t it..??” মোমের পুতুল স্ত্রী ‘ও বলবে –“Simply Awesome..!!” আঁতেল ও খুশী হয়ে অফার করবে –“Care for Dessart Darling..??”….
এই গোত্রের আঁতেল বাঙ্গালী’দের শেষ-পাতে দই খেতে নেই !! এঁরা আইসক্রীম-ই খেয়ে থাকেন !!

এই দুই শ্রেণীর বাঙ্গালীর তফাৎ ‘টা মুলতঃ চালচলনে ও কথা’র চালে । Body language & Power of Speech, বা বাতেলা দেওয়ার ক্ষমতায়..।

আমি এখনো বোকা, কমবয়েসে আরো গাধা ছিলাম ।
যখন বুঝলাম আমি আপাদমস্তক এক ভ্যাবলাকান্ত,..কোনভাবেই আঁতেল’দের কাছে ঘেঁষতে পারছি না,.তখন একদিন রথীন’কে ধরলাম – “আঁতেল হতে গেলে কি করতে হয় রে..??”

রথীন বলল –“ঝাল-নুন দিয়ে দু-ঠোঙ্গা ছাড়ানো বাদাম কিনে নিয়ে আয়,..তারপর বলছি “।

এবং রথীন সবিস্তারে বোঝালো…
“শোন্ , প্রথম হচ্ছে Appearance . তোর আঁতেল-সুলভ চরিত্রগঠন আস্তে আস্তে হয়ে যাবে.. , কিন্ত সব থেকে আগে ভোলবদল করতে হবে । জীন্স’এর প্যান্টের সাথে শার্ট পরা চলবে না ! পাঞ্জাবি অথবা গুরু-কুর্তা পরবি। তা’ও, এমনি সাদা বা একরঙা পাঞ্জাবি চলবে না । চকরা-বকরা ক্যাটকেটে রঙের বাটিকের পাঞ্জাবি চাই । পায়ে সর্ব্বদা হাওয়াই চপ্পল থাকবে,..জুতো একদম বাদ । জিন্সের প্যান্ট গুলো’র হাঁটু’র কাছ টা ব্লেড দিয়ে ফালা ফালা করে কেটে দিবি । জানি, তোর খুব কষ্ট হবে,..কিন্তু এটা করতে হয় ! আর এই প্যান্টগুলো দু-মাসে একবার কাচবি । তোর তো আবার চোখে পাওয়ার নেই..! কিন্তু, চশমা তো একটা লাগবেই ! একটা প্লেন কাঁচের মোটা কালো ফ্রেমের চশমা বানিয়ে নে ! সত্যজিৎ রায়ে’র চশমা টা দেখেছিস তো…?? ওটাই ফলো কর্…!! গড়িয়াহাটে গিয়ে একটা কাঁধে ঝোলানো শান্তিনিকেতনি কাপড়ের ব্যাগ কিনে নিবি । ঐ ব্যাগে একদম Un-common , High-Funda ‘র কিছু বই সবসময় রাখবি — যার সারমর্ম সাধারণ মানুষ বোঝেনা । যেমন ধর্ —- চে-গুয়া-ভরা, বার্গম্যান, ভ্লাদিমির নভোকভ, উডি এলেন,..এইসব আর কি !! তুই যা ক্যাবলা,..ভুলেও ” মুজতবা আলি” বা “বিভুতিভুষন” থলের মধ্যে নিয়ে ঘুরিস্ না..। সবাই প্যাঁক্ দেবে !! সব বই কিন্তু ইংরেজি বই হওয়া চাই, বাংলা বই খবরদার নয় !! এর জন্য তোকে প্রায় ই কলেজ স্ট্রিটে সময় দিতে হবে,..কিছু করার নেই !! আমি অবিশ্যি তোকে এই ব্যাপারে সাহায্য করতে পারি,..যদি ফেরার সময় “মিত্র কাফে” তে মাটন-কবিরাজী খাওয়াস্..!!

আমি বললাম –” এর পরে’র পদক্ষেপ…??”
আমার হাত থেকে বাদামের ঠোঙাটা ছিনিয়ে নিয়ে রথীন বলল —
” ব্যস্, তোর Public image দাঁড়িয়ে গ্যালো….এরপর তোকে আঁতেল’দের ঠেক খুঁজে বের করতে হবে ; না’হলে মিশবি কাদের সাথে..??
বলে দিচ্ছি আঁতেল’দের কোথায় পাবি…!! ভর দুপুরে,– সবাই যখন চাকরি-বাকরি, অফিস-কাছারী নিয়ে ব্যস্ত,..তখন আঁতেলদের পেয়ে যাবি কলেজ স্ট্রিটে’র কফি হাউসে অথবা রবীন্দ্রসদন – নন্দন চত্তরে। তোর পক্ষে কলেজ স্ট্রিট অনেক দূরে হয়ে যাবে,..তুই ঘরে’র খেয়ে নন্দনে-ই হাত পাকা, এবং মোষ তাড়া । কিন্তু সাবধান..!! ওখানে গিয়ে একদম ক্যাবলামি করবি না.. ভুলেও সিগারেট ধরাবি না । বিড়ি খাওয়া অভ্যাস কর্..। দুধ-চা খাওয়া ছেড়ে দে,.. লেবু-চা ধর্ । কাপের বদলে মাটির ভাঁড়ে র-চা খেতে হবে..!
Academy of Fine Arts এর পাশে চিত্ত-দা’র স্টলে ভাঁড়ে করে লাল-চা বিক্রি হয়,..ওখানে খাতা খুলে নিবি । দুমদাম করে পেমেন্ট করবি না,..ধারে খাবি..। আঁতেল-দের পকেটে বেশি টাকা থাকেনা,..বা থাকতে নেই..!!
বল্, তোর আর কোনো প্রশ্ন আছে..?? আর কোনো বিষয়ে আলোকপাত করাতে চাস্ আমাকে দিয়ে..?? “

আমি হতাশ হয়ে বললাম — ” নাহঃ !! আর জেনে লাভ নেই,. আমার দ্বারা হবে না রে..”!!
রথীন বলল –“ফালতু ফালতু বালখিল্যের মতো পণ্ডশ্রম করালি..!! একটা সিগারেট ধার দে, কাল শোধ করে দেবো..। এই নিয়ে ১২৭ টা হলো, আমি হিসাব রাখছি ।”

সেই থেকে আমি LIG বাঙালী হয়ে থাকলাম…
এবং,আমি সেই বাঙালী, — যার পাজামা’র দড়ি ছিঁড়ে গেলে,..নির্দ্বিধায় সেফটিপিন মেরে চালিয়ে দেয়…
এবং,আমি সেই বাঙ্গালী, – যার টিভি’র রিমোট কাজ না করলে…ব্যাটারি না বদলে, ক্রমাগত বাঁ-হাতে’র তালু’তে ঠুকতে থাকে…
এবং, আমিই সেই বোকা বাঙ্গালী — যে বাসে হঠাৎ জানলা’র ধারে সিট পেয়ে গেলে..শিশুর মতো আল্বহাদে আটখানা হয়…

দু-চারটে স্পর্শকাতর বিষয় আছে,.. যা নিয়ে মন্তব্য করার সুযোগ পেলে কোন বাঙালী ছাড়েনা !! এর মধ্যে সবথেকে জনপ্রিয় হলো — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সত্যজিৎ রায়..।
ইষ্টবেঙ্গল-মোহনবাগান, বা CPM-TMC নিয়েও তর্কাতর্কি হয়, কিন্তু, আঁতেল’দের কাছে এই বিষয় গুলো নিম্নমানের । নেহাৎ দরকার পড়লে তাঁরা এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ’র বিশেষ টিপ্পনী দিয়ে থাকেন….

বাঙ্গালী’র স্টকে বিদ্যাসাগর, বঙ্গিমচন্দ্র, নজরুল, মাইকেল মধুসূদন ও আছেন,.. কিন্তু তাঁরা বহুল চর্চিত নন !
কেন..??

বিদ্যাসাগর মহাশয় মোটামুটি ভাবে সব বাঙ্গালীকেই ছোটবেলায় “বর্ন পরিচয়” করিয়ে দিয়েছেন..। ব্যস্, তাঁর প্রতি বাঙ্গালী’র ও বাঙ্গালী’র প্রতি তাঁর ডিউটি শেষ..!! এরপর তাঁর যেসব কান্ডকারখানা…– বাল্যবিবাহ রোধ,..নারী-শিক্ষা, বিধবা বিবাহ ইত্যাদি.. ইত্যাদি.. এর সু-ফল বাঙ্গালীরা পেয়ে গেছে । সুতরাং, বাঁকুড়া-বীরভুম অঞ্চলে বিদ্যাসাগর মহাশয় এর দু-চারটে মুর্তি বসিয়ে বাঙ্গালী তাঁকে মনে রেখেছে । তবে,..অবাধ্য পুত্র কে বাঙ্গালী মায়ে’রা আজও মনে করিয়ে দেন — “কি ভাবে বিদ্যাসাগর মশাই মায়ের ডাকে সাঁতরে দামোদর পার হয়ে ছিলেন “..( যদি গল্পটা জানা থাকে !!)

বঙ্গিমচন্দ্রে’র গদ্যের ভাষা অত্যন্ত বঙ্গিম..সুতরাং,..যার লেখা পড়তে দাঁত ভেঙ্গে যায়, তাঁকে নিয়ে কি ভাবে আলোচনা করা যেতে পারে ..??
আর মাইকেল..?? তিনি তো আরেক কাঠি উপরে..!! ” ঈরম্মদ” মানে কেউ বলে ব্জ্র..তো কেউ বলে কাঁঠাল..!! “কোকনদে” মানে কোকাকোলা না নদী.. তা”ই এখনো সঠিক জানা গেল না..!!

রবীন্দ্রনাথ বরং অনেক নাগালের মধ্যে । অনেক বেশি চর্চিত এবং ভাষাও সোজাসাপ্টা, বোধগম্য..।
আর, যেহেতু রবীন্দ্রনাথ নিজেই ছিলেন এক অন্তহীন সুবিশাল সমুদ্র,..
তাঁর রচনা নিয়ে দু-একটা বেফাঁস মন্তব্য করলেই বা কে দেখতে যাচ্ছে..!!
কোন “মাই-কা-লাল” বুকে হাত রেখে বলতে পারে–” হ্যাঁ, আমি রবীন্দ্রনাথ পুরো পড়েছি এবং হ্র্বদয়ঙ্গম করেছি “..?? সেই বুকের পাটা কারোর নেই….
সুতরাং, আলোচনা”র মধ্যে কেউ যদি মাল খেয়ে ফস্ করে বলেও ফ্যালে —

“কলিকাতায় গিয়েছিনু…
পালকি রাখিয়া ছায়ে..
ফুচকা খেয়েছিনু..।।”..

এটা গুরুদেবের-ই লেখা,.. দু-একজন বড়োজোর ভুরু কুঁচকে তাকাতে পারে । তার বেশি কিছু নয়…!!
কারণ, সকলের’ই জ্ঞানের ভান্ডারে ছ্যাঁদা আছে…!!!

“ওড়িশি”, ” কুচিপুড়ি”, “ভারত-নাট্যম” এর মতো হাবিজাবি নাচের থেকে রাবীন্দ্রিক নাচ-ও অনেক সহজে শেখা যায়….
প্রথমে দু’হাতের বুড়ো আঙ্গুল আর তর্জনী’র মাথা ঠেকিয়ে হরিণের চোখের মতো করে ফ্যালো । দু-হাতে’র বাকী আঙ্গুল গুলো ছড়ানো থাকবে….
তারপর,..একটু হাঁটু ভেঙ্গে থুপ-থুপ করে কাপড় কাচো,..সামনের দিকে একটু ঝুঁকে কাপড় নিংড়াও…তারপর সোজা হয়ে কোমর সামান্য বেঁকিয়ে.. কাপড় দড়ি’তে মেলে দাও…!! গল্প শেষ..!!
রবীন্দ্রনাথ বাঙ্গালী’র গর্ব্বে’র বিষয়বস্তু,.. বাঙ্গালীর Fixed Deposit..
সেই জন্য,.. বাঙ্গালীর হৃদয়ে কবিগুরু যদি হন..South City Tower, ..বঙ্গিম, বিদ্যাসাগর, মাইকেল, নজরুল নেহাৎ ই G+4.

বাকি রইলেন এক বহুমুখী বিরল প্রতিভা — বাঙ্গালী’র সত্যজিৎ রায় ।
এই সত্যজিৎ কিন্তু একবার আমাকে এক বিশাল অস্বস্তি’তে ফেলেছিলেন…..!!!

আমেরিকায় গেছি..। কলকাতার এই ভেতো LIG বাঙালীকে নিয়ে যাওয়া হলো স্থানীয় “Bengali Society” র Cultural Program ‘এ.
বেশ গাম্ভীর্য পুর্ণ পরিবেশ.., আমি এক কোনায় চেপ্টে রয়েছি । আশেপাশে সব সম্ভ্রান্ত, সুশিক্ষিত, উচ্চবংশীয়, প্রতিষ্ঠিত বাঙ্গালী রা..। পুরুষ’রা বেশীরভাগ ই ধুতি-পাঞ্জাবী ও মহিলা’রা শাড়ী পরে এসেছেন…মার্সিডিজ বেঞ্জ চেপে !!

এক পেগ পেটে পড়তেই আমি আবেগে আপ্লুত..!! এত দুরে থেকেও এঁরা কি ভাবে বাংলা’কে বুকে জড়িয়ে ধরে রেখেছেন…!!!

ফিরে গিয়ে বাংলা’র দিদি’কে সব বলতে হবে…!!

এক মহিলা খুব সেজেগুজে, বড় খোঁপায় প্লাস্টিকের যুঁই ফুলে’র মালা জড়িয়ে এসে– চিত্রাঙ্গদা’র –“বধু কোন আলো লাগলো চোখে”..নেচে দিলেন.।
“নাচলেন” বলার থেকে..”নাচ ছড়ালেন” বললে ভালো হয়..!!
কিন্তু, এঁনার মাথায় এত বড় খোঁপা এলো কোত্থেকে..??? গতকাল ই এঁনার সাথে দেখা হয়েছিল “Home Depot” তে !! আমি গিয়েছিলাম ড্রিল মেশিন কিনতে,…বললেন – “জলের পাইপ কিনতে এসেছেন “..। তখন তো দেখেছিলাম ঘাড় পর্যন্ত বেগুনি -সবুজ রঙ করা চুল..!!
এ তো কেস উল্টো…!!
আমার “শ্যামা” গীতিনাট্য’র সেই –প্রহরী আর বজ্রসেন’এর সিন’টা মনে পড়ে গেল….
“ধর্..ধর্..ওই চোর, ওই চোর,…!!!”
.ধর্..ধর্..ওই চোর, ওই চোর….!!!

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছে,..পাশাপাশি Background এ পুরুষদের স্কচ হুইস্কি ও চলছে..!! আমিও প্রায় দেড়-পেগ মেরে এনেছি..।
বুকে একটা –“ভগবান ছাড়া কাউকে ভয় পাইনা”.. গোছের সাহস এসে গেছে..!!!

এক খর্ব্বকায়, ভুঁড়ি-যুক্ত, টাকমাথা ভদ্রলোক এসে — ” বল বীর,..চির উন্নত মম শির..” আব্রত্তি করে শোনালেন । ভদ্রলোক বোধহয় নজরুল স্পেশালিষ্ট..!! “উন্নত শিরে” চকচকে টাক বলে আমি কিন্তু কিচ্ছু মাইন্ড করিনি…!! কিন্তু ভদ্রলোক ভরপুর “স-এ সি’লিপ ” কেটে গেলেন..!!
বার বার “সি’র..সি’র” শুনে শিউরে উঠতে হলো…!!

এরপরে এলেন এক দেড়’শ কেজি ওজনের.. বিপুলদেহী মহিলা..। ইনি রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইবেন….সঙ্গে Key-board বাজাবে তাঁর নব্বই কেজি’র ছেলে..। আমেরিকায় কেউ হারমোনিয়াম বাজায় না..!!
যা হোক ভদ্রমহিলা উদাত্ত গলায় গান ধরলেন —
” আমার এই দেহখানি তুলে ধর..।।
তোমার ওই দেবালয়ে প্রদীপ করো..।।

আমার আর সাহসে কুলালো না…
একেই মাল খেয়ে আছি, তারপর ওই দেড়শ কেজি ওজন কে দেবালয় পর্য্যন্ত টেনে তুলবে…??

আমার পিছনের সোফায় বসে ছ-সাত জন হুইস্কি সহযোগে আড্ডা দিচ্ছেন ।

একজনের জড়ানো গলায় সাহসী মন্তব্য কানে এলো —” বুঝলেন পার্থ-দা..!! ছেলেবেলায় স্কুলে যখন সত্যজিৎ রায়ে’র লেখা ” পথের পাঁচালী ” পড়েছিলাম,..তখন কি জানতাম..?? পরে উনি ওর এই লেখাটি নিয়ে এত সুন্দর একটা সিনেমা করবেন..?? আর সেই ছবি “কান ফিল্ম ফেষ্টিভ্যালে ” এওয়ার্ড পাবে..??”

বেশ ইন্টারেস্টিং মন্তব্য…!!

আমি ঘাড় ঘুরিয়ে একবার পার্থ-দা কে দেখে নিলাম ।
বেশ গম্ভীর, উচ্চমানের সম্ভ্রম জাগানো আঁতেল..!!
পার্থ-দা ভরাট গলায় বললেন –” Award না পাওয়ার কি আছে ? পথের পাঁচালী থেকে নিয়ে অপু ট্রিলজি—সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এর কি Remarkable, outstanding অভিনয়..!! Oscar টা তো সৌমিত্র’র পাওয়ার কথা ! ওই পাতি গোয়েন্দা “ফেলু-দা” র ফালতু রোলে সত্যজিৎ কেন যে ওকে নামাতে গ্যালো..!!”

আমার প্রথমেই মনে হলো – “আত্মহত্যা করব”..!! তারপরে মনে হলো — আরেক পেগ মেরে, আরেক’টু সাহস এনে সরাসরি –খুন করব..!! তারপর ভাবলাম , — একদম নর্থ ক্যালকাটা’র ভাষায় কাঁচা খিস্তি দেবো…!!

কিন্তু আমি LIG বাঙ্গালী, বিদেশে এসে ইজ্জত বা পাশপোর্ট… কোনটাই হারালে চলবে না..!!
তাই, সেই সব সম্ভ্রান্ত, উচ্চ-বংশীয় আঁতেল’দের..স্বভাবসুলভ উদারতার সাথে.. “এবারের মতো মাফ্” করে দিয়ে ল্যাজ গুটিয়ে দেশে ফিরে এলাম…।

Basically, আমি একজন ভীতু, বোকা, LIG বাঙ্গালী..।

( মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.