অনুশীলন সমিতির ইতিহাস

0
702

© অনিমিত্র চক্রবর্তী

পতনোন্মুখ রাষ্ট্রব্যবস্থা এক নয়া রাজনৈতিক সমীকরণ সৃষ্টি করে তৎকালীন সমাজের মধ্যে এবং সেই অনাকাঙ্খিত ধ্বংস সমাজের মধ্যে এক মহা আলোড়ন সৃষ্টি করে যা নব শক্তির উত্থানের একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু হয়।

এই শক্তিই পুনর্জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে, প্রতিশোধের আকাঙ্খায় ও নব রাষ্ট্রব্যবস্থা স্থাপনার স্বপ্নের দ্যোতক হয়ে ওঠে দ্রুত। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এরকম অজস্র উদাহরণ রয়েছে যখন উল্কাসম গতিতে উঠে আসা এক শক্তি জাতিগত আকাঙ্খার প্রতীক হয়ে উঠে এক পরাক্রমী গাথা রচনা করে। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে খাস কলকাতা শহরে স্থাপিত অনুশীলন সমিতি, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বজ্রমুষ্টি থেকে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে মাতৃভূমির স্বাধীনতা অর্জন করার কল্পে গঠিত, একই পরাক্রমী মহাকাব্যের পরিচায়ক।

যে সময় হিন্দুজাতি ও সমগ্র ভারতবর্ষ প্রায় প্রত্যেক অর্থেই দিশাহীন, তখনই কলম্বো থেকে আলমোড়া পর্যন্ত বয়ে গেল এক ঝড়। মেঘমন্দ্রিত কণ্ঠস্বরে উচ্চারিত হল, “উত্তিষ্ঠত, জাগ্রত, প্রাপ্য বরান নিবোধত।” অন্তর হল উদ্ভাসিত সেই জ্ঞানালোকের তেজঃস্পর্শে, মানুষ অভিভূত হলেন রাষ্ট্রীয় মুক্তির জন্য সংগ্রামের প্রেরণায়, কতকাল পরে লোকে সম্বিৎ ফিরে পেলো, উপলব্ধি করল জ্ঞানের শক্তিরচর্চা আর শক্তির জ্ঞানের চর্চার মর্মবাণী – আবির্ভূত হলেন স্বামী বিবেকানন্দ।

সেই অসামান্য ব্যক্তিত্বের প্রেরণায় অবিভক্ত বঙ্গের দিকে দিকে গড়ে উঠলো শরীর আর মনের চর্চার কেন্দ্র – অনুশীলন সমিতি তারই শ্রেষ্ঠতম প্রতিরূপ হিসেবে ইতিহাসে স্বীকৃতি লাভ করেছে।

যদিও অনুশীলন সমিতি নেতৃত্বাধীন ছিল বাঙালী হিন্দুর, তার সদস্যগণ ও প্রায় সবাই বাঙালী, তবু অচিরেই সমগ্র ভারতবর্ষে এই সংগঠনটি হয়ে ওঠে সংগ্রামী চেতনার আদর্শস্বরূপ, তরুণ, যুবাদের কাছে এক অসম্ভব কে সম্ভব করার একমাত্র পাথেয়।

কি ছিল তার পরাক্রম, নিঃস্বার্থে আত্মবলিদানের শক্তির উৎস?

তা হল ধর্ম,মাতৃভূমির প্রতি নিশ্চলা ভক্তি ও সেইজন্যে দানবকে পরাভুত করার অত্যুগ্র বাসনা।

১৯০৭-০৮ সালে ঋষি অরবিন্দ ঘোষ “বন্দেমাতরম” পত্রিকায় তাঁর অন্যতম এক সম্পাদকীয়তে লিখেছিলেন, “রাক্ষস যদি দেশজননীর বুকের উপর চেপে বসে তাঁর রক্তপানে উদ্যত হয় তাহলে মাতৃভক্ত সন্তান মাত্রেরই কর্তব্য হল রাক্ষসকে আক্রমণ করে তার প্রাণ বন্ধ করা।” এই বাক্যের প্রতিটি শব্দ স্পষ্ট হয়ে ওঠে অনুশীলন সমিতির কার্যপদ্ধতি মধ্যে।

প্রথম থেকেই সমিতি তার মত ও পথ নির্দিষ্ট করে ফেলেছিল। স্বামী বিবেকানন্দ, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, যোগেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণের লেখনী সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যবৃন্দের ওপর এক অসামান্য প্রভাব বিস্তার করে। তাঁরা হলেন শ্রী প্রমথনাথ মিত্র, শ্রী সতীশ চন্দ্র বসু, শ্রী অরবিন্দ ঘোষ, শ্রী যতীন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় (নিরালম্ব স্বামী) এবং শ্রী সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর। মার্চ ২৪, ১৯০২ (বঙ্গাব্দ ১৩০৮, ১০ ই চৈত্র) অনুশীলন সমিতির স্থাপনা হয় ও প্রথম ক্ষণ থেকেই শাপাদপী অর্থাৎ জ্ঞানের শক্তির চর্চা, শাপদাপি অর্থাৎ শক্তির জ্ঞানের চর্চা সংগঠনের মূলমন্ত্র হয়ে ওঠে।

তৎকালীন অবিভক্ত বঙ্গের দ্রুত পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক অবস্থা, দেশপ্রেমের জাগরণ ও দিকে দিকে শরীরচর্চা হেতু আখড়ার স্থাপনা সমিতির বৃদ্ধির পক্ষে অত্যন্ত সহায়ক হয়ে ওঠে।

প্রথমে, মনোযোগ কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ওপরেই ন্যস্ত থাকে,, যথা দর্জিপাড়া, পটলডাঙ্গা, গ্রে স্ট্রীট, খিদিরপুর। ক্রমশ শিবপুর, শালিখা, চন্দননগগর, শ্রীরামপুর, তারকেশ্বর, বালি এবং উত্তরপাড়াতেও আখড়ার স্থাপনা হয়। বিভিন্ন ধরণের শারীরিক কলাকৌশল, সম্মুখ যুদ্ধ, লাঠিখেলা, মুষ্টিযুদ্ধ, অসিখেলা প্রভৃতি সদস্যদের শেখানো হতো অত্যন্ত শৃঙ্খলা ও কঠোরতার সাথে।

কেউ ইচ্ছা করলেই সমিতির সদস্যপদ পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতোনা। বিশেষ পরীক্ষার মাধ্যমেই সদস্য নির্বাচিত হতো। এই ক্ষেত্রে শ্রী রতনমণি চট্টোপাধ্যায় বালি অঞ্চলে, শ্রী অমরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উত্তরপাড়া অঞ্চলে, শ্রী পঞ্চানন সিংহ এবং শ্রী জিতেন লাহিড়ী শ্রীরামপুর অঞ্চলে, শ্রী আশুতোষ দাস তারকেশ্বর অঞ্চলে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।

নিঃসন্দেহে, এই উদ্ভাবনী চিন্তা ও কর্মপদ্ধতি হিন্দু যুবকদের মধ্যে এক গভীরতর প্রভাব সৃষ্টি করে; সরকারী কাগজপত্র প্রমাণ করে কিভাবে সহস্র সহস্র জনগণ এইসব কলাকৌশলের প্রদর্শনী প্রত্যক্ষ করার জন্য সোৎসাহে অংশগ্রহণ করতো।

১৯০৫ সালে শ্রী পুলিনবিহারী দাশ দ্বারা ঢাকা অনুশীলন সমিতির স্থাপনা ও তাতে তাঁর প্রতি অনুরক্ত শত শত যুবকের যোগদান এক ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।

শ্রী দাশ একজন অসামান্য অস্ত্র বিশারদ, লাঠিয়াল ছিলেন; তাঁর দ্বারা প্রশিক্ষিত দুর্দমনীয় যুবকেরা ক্রমেই ব্রিটিশ প্রশাসনের এক চিন্তার কারণ হয়ে ওঠে। সাম্প্রদায়িক সঙ্ঘর্ষে হিন্দুদের বাড়ন্ত ভয়ঙ্কর প্রত্যাঘাত অবস্থাকে অত্যন্ত জটিল করে তোলে। প্রতিবেশী ধর্মীয় সম্প্রদায় ও ব্রিটিশ প্রশাসনের মধ্যে এক ত্রাহি ত্রাহি রব ওঠে।

অতি শীঘ্রই পুলিনবাবুর কর্মকুশলতা, যোগ্য নেতৃত্বে ঢাকা অনুশীলন সমিতির ৬০০টি শাখা গড়ে ওঠে এবং এক্ষেত্রে বিক্রমপুর ও বরিশাল জেলার সাফল্য হিতৈষী ও বৈরী দুপক্ষকেই স্তম্ভিত করে। ১৯১০ সালে গঠিত ঢাকা ষড়যন্ত্র মামলা ও তার সাথে সমিতির কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির সম্বন্ধ সমিতির ভবিষ্যতের সম্মুখে এক প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করায়।

অনুশীলন সমিতির দ্রুত বৃদ্ধি ব্রিটিশ প্রশাসন কে শঙ্কিত করে ও এর রোধে এক কমিশন সৃষ্টি করা হয়। কমিশনের কর্তব্য ছিল বৈপ্লবিক সংগ্রামের প্রভাবের বৃদ্ধির কারণ, বাঙালী হিন্দুর জাতিগত স্বার্থের সাথে তার সংযোগ অন্বেষণ করা ও এটিকে ধ্বংস করার এক নির্দিষ্ট পদ্ধতি নির্ধারণ করা। ১৯১৮ সালে এই সিডিশন কমিটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ রাজত্ব উচ্ছেদ হেতু অনুশীলন সমিতির মহা-পরিকল্পনা, ইতিহাসে খ্যাত হিন্দু-জার্মান ষড়যন্ত্র হিসেবে, এবং তার ব্যর্থতা ব্রিটিশ সরকারকে সমিতির প্রতি ক্রমশ প্রতিশোধপরায়ণ করে তোলে। ভয়ঙ্করতম নিষ্পেষণের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ প্রশাসন অনুশীলন সমিতি, তার ভিত্তি, ব্যাপ্তি ও বিচারধারাকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার সর্বোত্তম প্রয়াস করে।

শত শত যুবক গ্রেপ্তার হয়, নির্যাতিত হয়, ফাঁসিকাষ্ঠে নিজেকে উৎসর্গ করে – সমিতির বহু শাখা বন্ধ হয়ে যায়। নিঃসন্দেহে, এই বিশাল ক্ষতি অনুশীলন সমিতির কার্যপ্রবাহে নিদারুণ সমস্যা সৃষ্টি করে। বাঙালী হিন্দু জাতির ওপর তার সক্রিয় প্রভাব হ্রাসও হয় যথেষ্ট পরিমাণে।

ফলতঃ এক শূন্যতার সৃষ্টি হয় সমাজের মধ্যে যা পূর্ণ করার লক্ষ্যে দ্রুত এগিয়ে আসে জাতীয় কংগ্র্রস ও কমিউনিস্ট পার্টি। ১৯৩০ সালের মধ্যে সরকারী নিষ্পেষণ, নতুন বিচারাধারার প্রভাবে সমিতির সদস্যসংখ্যায় দ্রুত ধস নামে। সমাজতন্ত্র ও সোভিয়েত বিপ্লবের প্রতি অখণ্ড বিশ্বাসে সমিতির বহু নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি অন্যান্য গণসংগঠনে যোগদান করেন।

অবশ্যই উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রমও ছিল।

শ্রী পুলিনবিহারী দাশের মত বেশ কয়েকজন প্রণম্য বিপ্লবী চিরদিনই অনুশীলন সমিতির মূল আদর্শের, যা মূলত বাঙালী হিন্দুর শিরদাঁড়া হিসেবে প্রখ্যাত ইতিহাসে, প্রতি অনুরক্ত থেকে যান। ‘৪৬ র মহাসমর ও তদপরবর্তী ‘৪৭ র দেশভাগে তাঁদের সিংহসদৃশ পরাক্রম পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করে হিন্দু জাত্যাভিমানকে।

তবুও এটি আশ্চর্যের বিষয় যে স্বাধীন ভারতের সরকার এই প্রকৃত অর্থে মহাত্মাদের স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে। ১৯৪৭ সালে, জাতীয় স্বাধীনতার অনতিপরেই, প্রধানমন্ত্রী শ্রী জওহরলাল নেহেরু বহু প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সম্বলিত এক ইতিহাস কমিশন গঠন করেন দেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রকৃত ইতিহাস রচনার জন্য।

ডঃ তারাচাঁদকে সেই কমিশনের সভাপতি নিযুক্ত করা হয়; পশ্চিমবঙ্গ থেকে সেই কমিশনের দুজন সদস্য ছিলেন – বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার ও ডঃ সুরেন্দ্রনাথ সেন।

কিন্তু নেহেরু ও কংগ্রেসর গোপন নির্দেশে বঙ্গের গৌরবময় সশস্ত্র বৈপ্লবিক সংগ্রামের ইতিহাসকে সম্পূর্ণ নস্যাৎ করা হয় এবং মুছে দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদে ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার কমিশন থেকে পদত্যাগ করেন ও বলেন, “একজন ঐতিহাসিক হিসেবে আমি কি করে একটি প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসকে অস্বীকার করি?”

এর প্রতিবাদে তিনি রচনা করেন “ভারতের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস”, সেই গ্রন্থে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ উচ্ছেদের সংকল্পে বঙ্গের মরণপণ বিপ্লবী সংগ্রাম ও অনুশীলন সমিতির গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা শ্রদ্ধার সাথে রক্ষিত আছে।

আজ মার্চ মাসের ২৪ তারিখ। আজকের দিনেই অনুশীলন সমিতি পথ চলা শুরু করেছিল।

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.