কালী কৈবল্যদায়িনী: দীপান্বিতা কালীপুজোর ইতিহাস

0
143

© তমাল দাশগুপ্ত

দীপান্বিতা কালীপুজোর দিন আমরা মোক্ষদায়িনী কৈবল্যদায়িনী মাতৃকার উপাসনা করি। হরপ্পা সভ্যতায় ঊষার বোধন দিয়ে যে উৎসবের সূচনা হত, সেটা শেষ হত নিশার উপাসনা দিয়ে, কার্তিকী অমাবস্যায়। তাম্রাশ্ম যুগের সে সভ্যতার পতনের পরে অনবরত যুদ্ধ বিগ্রহে আচ্ছন্ন এই উপমহাদেশে দীপান্বিতা বোধ করি নতুন দ্যোতনা পায়, যখন দুর্গাপুজোয় যুদ্ধযাত্রা করে কালীপুজোর সময় শত্রুর মুণ্ড দিয়ে মালা গেঁথে মাকে নিবেদন করার একটি সুপ্রাচীন প্রথা এই কার্তিকী অমাবস্যায় দীপান্বিতা কালীপুজোর সাবলাইম তত্ত্বটি নির্মাণ করে।

মূল ধারণায় আছে নির্বাণ, মোক্ষ, সেই মহাদশা যেখানে জীব মুক্তি পায়। বলা দরকার যে আমাদের একটানা কোনও ইতিহাস না থাকার ফলে মাঝে মাঝেই বিভ্রান্তির অবকাশ ঘটে ফলে দীপান্বিতা কালীপুজো যে কৃষ্ণচন্দ্র পুনঃপ্রচলন করেন মধ্যযুগ অন্তে, সেটা প্রবর্তনের শিরোপা পেয়ে গেছে। আদিযুগে ছিল, কিন্তু মধ্যযুগে এটা লুপ্ত। শেকড়বিচ্ছিন্ন দিনকালে যা হয়। ফলে ত্রয়োদশ শতকের বৃহদ্ধর্ম পুরাণে আছে কিন্তু ষোড়শ শতকের বৃহৎ তন্ত্রসারে নেই এই দীপান্বিতা কালীপুজো। বস্তুত কালীঘাট মন্দিরে সেই মধ্যযুগের নিয়মে আজও লক্ষ্মীপুজো হয় দীপান্বিতা কালীপুজোর দিন। কারণ আগমবাগীশ জানতেন না, তাঁর সময় লুপ্ত হয়েছিল দীপান্বিতা, বৃহৎ তন্ত্রসারে কাজেই উল্লেখ নেই। এজন্য শশীভূষণ দাশগুপ্ত অনুমান করেছিলেন এবং তাঁকে অনুসরণ করে আরও অনেকে ভেবেছিলেন যে দীপান্বিতা কালীপুজো কৃষ্ণচন্দ্র প্রথম শুরু করেন। কিন্তু তা নয়, এই দীপান্বিতা কালীপুজোর উল্লেখ ত্রয়োদশ শতকের বৃহদ্ধর্ম পুরাণে পাওয়া যাচ্ছে। অতএব সেনযুগে ছিল (মালদা/গৌড় ১২০৬ সালে দখল করলেও মালদা থেকে হুগলি অবধি নেমে আসতে বিজাতীয় হানাদারদের প্রায় একশ বছর লাগে, অর্থাৎ দ্রুতগামী অশ্ব যে পথ আট ঘন্টায় যেতে পারে সে পথ অতিক্রম করতে ওঁদের নব্বই বছর লেগেছিল। প্রত্যেক ইঞ্চিতে প্রতিরোধ হয়েছিল, নতুবা এমন হয় না। অতএব ও সময়টাকে সেন-দেবযুগ বলাই ভালো) দীপান্বিতা কালীপুজো।

এই দিনটি কৈবল্যদায়িনী মাতৃকার। জৈনদের মধ্যে কাহিনী চালু ছিল, এই দিনে বর্ধমান মহাবীর নির্বাণপ্রাপ্ত হন, সেজন্য দীপমালায় সুসজ্জিত হয়েছিল পৃথিবী, এই উদ্দেশ্যে, যে একটি জ্ঞানের প্রদীপ যেহেতু নিভে গেছে তাই সহস্র প্রদীপ জ্বলে উঠবে। অনেক পরে রামায়েত ধর্ম (রামের উপাসনামূলক উত্তর ভারতীয় বৈষ্ণব ধর্ম) এই দীপান্বিতাকে নিজেদের রামকাহিনীর সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে আরেকটি মিথ তৈরি করবে। কিন্তু বৃহত্তর অর্থে এই দিনে অনেক প্রদীপ জ্বেলে মোক্ষদায়িনী কৈবল্যপ্রদায়িনী আদিমাতৃকার উপাসনা হত। মাতৃকা ধর্ম উপমহাদেশে প্রাচীনতম। পরবর্তী যুগের বর্ণবাদী সনাতনধর্ম হোক বা বর্ণবাদবিহীন বৌদ্ধ বা জৈন, সবাই তাদের ধর্মকে এই সুপ্রাচীন মাতৃকা উপাসনাময় তন্ত্রধর্মের আদলে গড়ে নিয়েছিল।

অষ্টাদশ শতকে কৃষ্ণচন্দ্র যখন পুনরায় চালু করেন তখন এই স্মৃতি অবচেতনে কিভাবে বেঁচে ছিল,ভেবেই আশ্চর্য হতে হয়। এ জাতি বারবার তার শেকড়কে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে, এই চেতনা, এই অভিজ্ঞান, এই বোধ আমাদের আগামী দিনেও পথ দেখাক।

ছবি পরিচিতি: অষ্টাদশ শতকে গৌড়বঙ্গে উৎকীর্ণ এই পাথরের কালীমূর্তি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে আছে। মূল মূর্তিতে লাল এবং সোনালী রং ছিল, যা বর্তমানে কিছুটা আবছা।

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.