বাংলার নবজাগরণে শ্রী শ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুরের অবদান

0
734

© তপন কুমার ঘোষ

পূর্ববঙ্গের দক্ষিণভাগের বিরাট এলাকায় ( মূলতঃ যশাের, খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুর জেলা ) একটা বিরাট জাতি প্রচণ্ড পরিশ্রমী, প্রচণ্ড সাহসী , অসম্ভব ধর্মপ্রাণ।

তারা কিরকম ব্যবহার পেয়েছিল বাকিদের কাছ থেকে — আপনারা কতটা জানেন?

আমি জানি।

পূর্বতন ফরিদপুর জেলা, বর্তমান গােপালগঞ্জ জেলার ভেন্নাবাড়ি গ্রাম আমার দ্বিতীয় বাড়ি। ১০০ % নমঃশূদ্র অধ্যুষিত। আপনারা কি জানেন এই ‘ নমঃশূদ্র ’ শব্দটা কবে সৃষ্টি, কার সৃষ্টি, কেন সৃষ্টি? তার আগে ওই নমঃশূদ্রদের কী নাম ছিল , কী নামে তাদেরকে উল্লেখ করতাে ভদ্রলােকরা ?

ভদ্রলােকদেরকে কী বলে সম্বােধন করতাে নমঃশূদ্ররা?
এখনাে করে। – বাবু বলে।

আমাকে যখন ওড়াকান্দি ঠাকুরবাড়িতে হরিচাঁদ ঠাকুরের বংশধর বৃদ্ধ শ্রীপতি ঠাকুর – ‘বাবু’ বলে ডাকলেন, লজ্জায় আমার মাথা নীচু হয়ে গেল। লজ্জায় আমার চোখে জল এসে গিয়েছিল। নিজের পরাজয় বলে মনে হয়েছিল। এত করেও ওদের সমান হতে পারলাম না! সেই পর থেকে গেলাম! আমি সবিনয়ে তাঁকে অনুরােধ করলাম , আমাকে বাবু না বলতে। আমি জানি ‘ বাবু ’- তে ভাল মন্দ অনেক কিছু আছে। কিন্তু নিশ্চিতভাবে আছে বিভেদ, পার্থক্য, distinction , difference আছে ‘ আমরা ’ , ‘ ওরা । এই পার্থক্য এই বিভেদের ভূমিতেই জন্ম নিয়েছে যােগেন মন্ডল। যােগেন বাবু ব্যক্তিগত ভাবে শিক্ষিত হলে কি হবে , তার বিরাট স্বজাতির লােকেরা যে অশিক্ষিত। যদি না জেনে থাকেন তা হলে জানা খুবই দরকার যে “ নমঃশূদ্র ” শব্দটার জন্ম ১৯২১ সালে। তার আগে আপনাদের পূর্বপুরুষরা ওদেরকে বলতেন চাঁড়াল। হ্যাঁ , ওদেরকে আপনারা চাঁড়াল বলতেন।

কি প্রচণ্ড তাচ্ছিল্য , অপমান , অবজ্ঞা মিশে ছিল / আছে এই শব্দটাতে — তা অনুভব করা অ – নমঃশূদ্রদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। অথচ এটা ওদের প্রাপ্য ছিল না। আপনাদের জমির চাষ ওরা করেছে, আপনাদের গােসম্পদ ওরা দেখাশােনা করেছে , বাড়ির জিনিস ওরা বয়ে দিয়েছে , ধান ভেনে চাল করে দিয়েছে। আর তার থেকেও বড় কী জানেন ? আপনাদের মন্দির , দেবমূর্তি , নারী ও সম্পদ শুধু ওদের জন্যই মুসলমানদের হাত থেকে নিরাপদে থেকেছে। আপনাদের জমিতে , সম্পদে ওরা লােভ করেনি। সারাদিন পরিশ্রম করে মূল্য হিসাবে যেটুকু ধান দিয়েছেন সেই চালের ভাত , আর পূর্ববঙ্গে অঢেল পাওয়া যায় শাপলা ডাঁটা আর মাছ — এতেই এরা সন্তুষ্ট ছিল ।

কিন্তু জানেন তাে , মহাকাল নামে এক প্রচণ্ড শক্তিশালী দেবতা আছে । তার প্রভাবের বাইরে কেউ নয়। বাবুরাও নয় । আর ওই চাঁড়ালরাও নয় । সেই দেবতার প্রভাবে ওই চাঁড়ালরাও পাল্টাতে লাগল। তাদেরও মান-অপমানের বােধ জাগা শুরু হল । খুব আস্তে আস্তে তারাও তাদের শ্রমের মূল্য ও সামান্য সম্মানের প্রত্যাশা করতে লাগল । কিন্তু বাবুরা তা দিতে নারাজ। একেবারেই নারাজ।তখন থেকেই শুরু হল ফারাক , গ্যাপ। এই গ্যাপ আগেও ছিল । সেটা ছিল মেনে নেওয়া গ্যাপ । এবার হল — না মেনে নেওয়া গ্যাপ। ইতিমধ্যে আবির্ভাব হয়েছে যুগপুরুষ হরিচাঁদ ঠাকুরের ১৮১২ সালে । হ্যাঁ , আমি তাঁকে যুগপুরুষ বলেই মনে করি । তাঁর ভক্তরা তাঁকে ভগবান , পূর্ণব্রহ্ম মনে করেন । তিনি এবং তাঁর সুযােগ্য পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুর এক বিরাট ঐতিহাসিক কর্তব্য পালন করেছেন । তাঁদের অবদান সংক্ষেপে লেখার চেষ্টা করলে বড়ই অন্যায় হবে । তাই আমি বড় বিভ্রান্ত কী করব ? তাও বলি — হরিচাঁদ দিলেন ধর্ম , গুরুচাঁদ দিলেন কর্ম । এটা যে কত বড় কথা কি করে বােঝাবাে ? আগে ধর্ম , পরে কর্ম । ভিতে ধর্ম , উপরে কর্ম । কর্ম তাে ওরা আগে থেকেই করতাে । গুরুচাঁদ ওদেরকে দিলেন কর্মের বাঁধুনি , কর্মের মূল্যের জ্ঞান। আর তার জন্য প্রথাগত শিক্ষা । অনেকে জানলে অবাক হয়ে যাবেন , বিদ্যাসাগর মশায় শিক্ষাবিস্তারে যত স্কুল খুলেছেন , সম্ভবত গুরুচাঁদ ঠাকুর তার থেকেও বেশি স্কুল পূর্ববঙ্গে খুলেছেন। তিনি ইংল্যান্ড ফেরত ব্যারিস্টার ছিলেন । কিন্তু আমরা বিদ্যাসাগরের নাম জানি , গুরুচাঁদের নাম জানি না । কারণ , ওই ‘গ্যাপ’ । ওই ‘আমরা ওরা’ । গুরুচাঁদ তাে আমাদের নন । তিনি ওদের। তাই জানি না ।

হে আমার সবর্ণের ( General caste ) লােকেরা , নিজের বুকে হাত দিয়ে একবার ভাবুন তাে — যে হরিচাঁদ এত মানুষকে ধর্ম দিলেন , তাঁর প্রতি আপনার মনে ভক্তি আসে কিনা ? যে গুরুচাঁদ এত স্কুল খুললেন , তাঁর এই অবদানের কথা ভেবে মনে গর্ব হয় কি ? এর উত্তর আপনি নিজে ছাড়া আর কেউ দিতে পারবে না।

১৮৭৭ সালে হরিচাদ ঠাকুরের দেহাবসানের পর ঐ দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেন তাঁর সুযােগ্য পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুর। হরিচাঁদ তাঁকে লন্ডন থেকে ব্যারিস্টারি পড়িয়ে এনেছেন । হরিচাঁদের দেওয়া ধর্মভাবকে সম্পূর্ণ বজায় রেখে গুরুচাঁদ তার জাতির মানুষকে পরবর্তী পর্যায়ের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেলেন । তাঁর কার্য এবং অবদান নিয়ে যথেষ্ট গবেষণা এখনও হয়নি , যা হওয়া দরকার । তার তিনটি অবদান চোখে পড়বেই ।
( ১ ) তিনি তাঁর জাতির মানুষকে শিক্ষিত করে তােলার প্রচন্ড চেষ্টা করেছেন ।
( ২ ) তাদের শ্রমের মূল্য বুঝতে শিখিয়েছেনও তাদেরদাবি আদায়ের জন্য সচেতন ও সংগঠিত করেছেন ।
( ৩ ) তাঁর জনগােষ্ঠীর মানুষের জন্য সম্মান আদায় করেছেন ।

১৮৮১ সালে । গুরুচাঁদ ঠাকুর খুলনার দত্তডাঙাতে ‘ সারা বাংলা নমঃশূদ্র সম্মেলন ’ করেছেন । সেই সম্মেলন থেকে তিনি আহ্বান জানিয়েছিলেন ঐ নমঃশূদ্র জাতির প্রতি স্থানে স্থানে স্কুল শুরু করতে । তিনি তাঁর জাতির লােকদেরকে আগ্রহ করেছিলেন , ‘ খেতে পাও বা না পাও , কিন্তু সন্তানকে শিক্ষা দেওয়া চাই । তিনি নিজেও বহু স্কুল স্থাপন করেছেন । তখনও সরকারি খাতায় এই জাতির মানুষদের কাস্ট হিসাবে লেখা হত চন্ডাল । একজন ব্রিটিশ অধিকারী সি.এস.মীড সাহেবের সঙ্গে আলােচনা করে এবং তাঁর সাহায্য নিয়ে ১৯১১ সালের জনগণনায় সরকারি খাতায় এই কাস্টের নাম চন্ডালের পরিবর্তে নমঃশূদ্র লেখালেন । এইখানটা আমার কাছে অস্পষ্ট এবং আমি কিছুটা বিভ্রান্ত । চন্ডাল বা চাঁড়াল – এই অপমান বা অবজ্ঞাসূচক শব্দটা পাল্টিয়ে যখন নতুন শব্দ নিলেন, তখন তার মধ্যে আবার এই শূদ্র শব্দ কেন যােগ করলেন? শূদ্র শব্দটাও তাে সমাজে খুব উঁচু নজরে দেখা হয়না ।

স্বামী বিবেকানন্দের মতাে সিংহপুরুষকেও এই শূদ্র জাতিভুক্ত হওয়ার কারণে আমেরিকায় বসে চোখের জল ফেলতে হয়েছিল । এবং তাঁকে সাফাই দিতে হয়েছিল যে । তিনি শূদ্র নন, ক্ষত্রিয় পরিবারে তাঁর জন্ম। স্বামী বিবেকানন্দের অতি উজ্জ্বল জীবনে এই একটিমাত্র ঘটনাকে আমি ব্ল্যাকস্পট বলে মনে করি — তার শূদ্রত্বকে অস্বীকার করা ও উচ্চবর্ণের দাবি করা ।

১৯১১ থেকে এখন একশাে বছর পার হয়ে গেছে । তাই কোন সামাজিক পটভূমিকায় ও কোন মনস্থিতিতে গুরুচাঁদ ঠাকুর নিজের জাতির নামের মধ্যে এই শূদ্র শব্দটিকে গ্রহণ করলেন , নাকি করতে বাধ্য হয়েছিলেন , তা আমার বােঝার ক্ষমতা নেই।

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.