১৮৫৭ পরবর্তী অধ্যায়: হিন্দুর জন্য শিক্ষা(প্রথম পর্ব)

0
762

© তপন ঘোষ

১৮৫৭-র বৃটিশ বিরােধী মহাসংগ্রাম সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে শেষ হয়ে গেল। ১০-ই মে উত্তরপ্রদেশের মীরাট সেনা ছাউনীতে বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল। সেখান থেকে বৃটিশ সেনাবাহিনীর মুসলিম অশ্বারােহী সৈন্যরা ২১ শে মে দিল্লী গিয়ে নামে মাত্র মােগল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ-কে বিদ্রোহের নেতা ও ভারতসম্রাট রূপে ঘােষণা করল । এই ঘটনায় উৎসাহিত হয়ে দিল্লীর মুসলমানরা জামা মসজিদের প্রাঙ্গনে সমবেত হয়ে জেহাদ ঘােষণা করল। এলাহাবাদের মৌলভী লিয়াকৎ আলি, লক্ষৌ-এর নবাব , বিজনােরের মুসলিম শাসক এবং আরও অনেক মুসলিম শাসক , মৌলভী, ইমামরা হিন্দুস্থানকে দারুল হারব থেকে আবার দারুল ইসলামে পরিণত করতে পবিত্র জেহাদ ঘােষণা করলেন। এই জেহাদের পরিণাম অনেক জায়গায় হিন্দুর উপরও পড়ল। বিজনােরে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা লেগে গেল। সেখানে হিন্দু ছিল মুসলমানদের দ্বিগুণ। ফলে মুসলমানরা হিন্দুর কাছে পরাজিত হল। সেখানে বৃটিশ শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হল।

তারপর সব জায়গায় বিদ্রোহীদের পরাজয় ঘটতে লাগল। মনে রাখতে হবে , বৃটিশ সেনাবাহিনীর মধ্যে শক্তিশালী শিখ রেজিমেন্ট বৃটিশের সম্পূর্ণ অনুগত ছিল। সেটাই তাে স্বাভাবিক। কারণ , তাদের গুরুদের নির্মম হত্যাকারী ঔরঙ্গজেবের বংশধরকে পুনরায় বাদশা করতে ইসলামিক জেহাদে শিখরা কি করে অংশগহণ করবে ? তাদের নবম গুরু তেগবাহাদুরের হত্যাকারী ঔরঙ্গজেব। তাদের দশমগুরু গােবিন্দ সিং-এর চার পুত্রকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে মুসলিমরা। তার মধ্যে দুই ছােট ছেলে ফতে সিং ও জোড়াবর সিং কে দেওয়ালে জীবন্ত গেঁথে দিয়েছে পাঞ্জাবের শিরহিন্দের মুসলিম নবাব। শিখ যােদ্ধারা যারা মুসলমানের হাতে বন্দী হয়েছিল , তাদেরকে ফুটন্ত তেলে ফেলে দিয়ে হত্যা করেছে , তুলাে জড়িয়ে পুড়িয়ে মেরেছে , মাথা থেকে গােটা শরীর করাত দিয়ে চিরে দিয়েছে , বন্দা বৈরাগীর দেহ থেকে গরম সাঁড়াশি দিয়ে মাংস টেনে টেনে ছিড়ে হত্যা করেছে মুসলিম শাসকেরা। তাই মুসলমানদের জেহাদে তাদের মােগল সাম্রাজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার লড়াইতে শিখরা অংশগ্রহণ করতে পারে না।

১৮৫৭ – র মহাবিদ্রোহ বা মহাজেহাদ অচিরেই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হল । তার পরের চিত্রটা দেখা যাক । দিল্লীর অবস্থা আরও শােচনীয় । বিদ্রোহ দমনের পর বাহাদুর শাহকে নির্বাসিত করা হল বর্মায় । তাঁর দুই পুত্রকে ফাঁসি দেওয়া হল তাঁরই সামনে । স্ত্রী পুরুষ নির্বিচারে সাদা মানুষদের হত্যা করার প্রতিশােধ নেওয়া হল সমান নির্মমভাবে । দিল্লীর জনগণের এক বিশাল অংশকে তাড়িয়ে দেওয়া হল শহর থেকে । লালকেল্লা থেকে জামা মসজিদ পর্যন্ত এলাকায় বাস করতাে অসংখ্য মুসলিম অভিজাত । তাদের বাসগৃহ নির্মমভাবে গুড়িয়ে দিয়ে অঞ্চলটাকে পরিণত করা হল চাষের মাঠে । কিছু কিছু রক্তোন্মাদ বৃটিশ অফিসার অপরাধীদের বিচারের ভার তুলে নিলেন নিজেদের হাতেই । নির্বিচারে হত্যা করতে লাগলেন সন্দেহভাজনদের । বিশেষ কমিশনের অধীনে বিচার হল তিন হাজার তিনশাে ছ জনের । তাদের মধ্যে দুহাজার পঁচিশ জনের কয়েদ হল । ফাঁসিতে ঝােলানাে হল তিনশাে বিরানব্বই জনকে । প্রতিশােধের আগুনে দগ্ধ হলেন বহু মানুষ , যাঁরা বিদ্রোহের সঙ্গে কোনক্রমেই জড়িত ছিলেন না ।

‘ দিল্লীর ধূলা মুসলমানদের রক্ত চায় ’ , গালিবের কলম থেকে আর্তনাদ ঝরে পড়ল । গালিব বিদ্রোহকে সমর্থন করেন নি । কিন্তু বিদ্রোহােত্তর দিল্লীর মর্মন্তুদ অবস্থা তাঁকে স্পর্শ করেছিল । তিনি লিখেছেন , আমার সামনে রক্তের বিশাল সমুদ্র , আল্লাহ জানেন আমাকে আরও কী দেখতে হবে । ( সূত্র -ঃ স্যার সৈয়দ আহমদ খাঁ , একটি রাজনৈতিক জীবনী । লেখক – রুদ্রপ্রতাপ চট্টোপাধ্যায় )

উত্তরপ্রদেশের আরও বহুস্থানে ইংরাজরা বিদ্রোহীদেরকে এইরকমই নির্মমভাবে দমন করল । আর এই দমনে যারা বিদ্রোহের সঙ্গে যুক্ত ছিলনা সেরকম বহু সাধারণ ও প্রভাবশালী মুসলমানকে হত্যা করা হল । গােটা উত্তর ভারতে মুসলমানের জেহাদের আকাঙ্খাকে গুঁড়িয়ে দিল ইংরাজরা । এই অবস্থায় ইংরাজ ও মুসলমানের পারস্পরিক সম্বন্ধ কিরকম হতে পারে — বােঝা খুব কঠিন কি ? তাদের উভয়ের মানসিকতা পরস্পরের প্রতি কেমন ছিল – বুঝতে নিশ্চয় অসুবিধা হয় না । চরম বিদ্বেষ , চরম শত্রুতাপূর্ণ ।

১৮৫৭-র আগের ১০০ বছরের চিত্রটা কিরকম ছিল ? ১৭৫৭-য় পলাশির যুদ্ধে ইংরাজরা বাংলা বিহার উড়িষ্যার নবাব সিরাজদৌল্লাকে পরাস্ত করে ক্ষমতা দখল করেছিল । সেই যুদ্ধে তাে শক্তির পরীক্ষা হয়নি । সিরাজের সেনাপতি মীরজাফর বেইমানি করে ইংরাজের দিকে যােগ দিয়েছিলেন । এখানে মনে রাখা দরকার , সিরাজের হিন্দু-সেনাপতি মীরমদন ও মােহনলাল কিন্তু বেইমানি করেন নি । যাই হােক , ইংরেজ বিশ্বাসঘাতকতা দিয়ে ক্ষমতা দখল করায় মুসলমানের মনে প্রচন্ড ক্ষোভ ছিল যে অন্যায়ভাবে বৃটিশরা তাদের হাত থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়েছে এবং তার ফলে দারুল ইসলাম দারুল হারবে পরিণত হয়ে গিয়েছে । এই একশ বছরে হিন্দুরা এগিয়ে গেল ইংরাজের কাছাকাছি । তারা ইংরাজের চাকরিতে যােগ দিয়ে বৃটিশ শাসনকে সাহায্য করতে লাগল । আর সাধারণ হিন্দুরা মুসলিম শাসনের অত্যাচার থেকে বেশ কিছুটা মুক্তি পেল । কিন্তু সেইসঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার যে তখন ভারতে ইংল্যান্ডের সরকারের শাসন চলত না । তখন চলত ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নামক বাণিজ্যিক সংস্থার শাসন ও শােষণ । ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও অনেক জায়গায় অনেক অত্যাচার করেছে ( নীলকর সাহেবদের অত্যাচার ) । কিন্তু তাও মুসলিম শাসনের অত্যাচার ছিল আরও ভয়ংকর ও নিকৃষ্ট ।

সুতরাং ১৭৫৭-১৮৫৭ এই একশাে বছরে ইংরাজের সঙ্গে মুসলমানের দুরত্ব অনেক বেড়ে গিয়েছিল এবং হিন্দুরা ইংরাজের অনেক কাছাকাছি এসেছিল । বিশেষ করে ইংরাজী শিক্ষা ব্যবস্থার লাভ হিন্দুরা পুরাে মাত্রায় উঠিয়ে আর্থিক উন্নতির দিকে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিল , আর মুসলমানরা ইংরাজী শিক্ষা ব্যবস্থাকে বর্জন করে অনেকটা পিছিয়ে পড়ল । একমাত্র এই কারণে একশাে বছরেই ভারতের সর্বত্র মুসলমানরা অশিক্ষা ও দারিদ্রের গহ্বরে ডুবে গেল , যারা তার আগে দীর্ঘ সাতশাে বছর ভারতে রাজত্ব করেছে , অসম্ভব মাত্রায় শােষণ করেছে এবং হিন্দুর বিপুল সম্পদ লুণ্ঠন করেছে । এর থেকেই বােঝা যায় এই জাতিটার অন্তর্নিহিত শক্তি বা আত্মশক্তি কত কম । এটা ঐ জাতির মানুষগুলাের দোষ নয় । ওদের ধর্ম এবং ধর্মীয় আচার আচরণ ওদেরকে সবসময়ে অনগ্রসর করে রাখে । এমনকি আজকের মুসলিম দেশগুলাের দিকে তাকিয়ে দেখুন । বহু দেশে মাটির নীচে তরল সােনা অর্থাৎ পেট্রল আছে । কি বিপুল সম্পদ ! কিন্তু ওরা সুখে থাকবে না । ওদের আল্লা যেন ওদেরকে সুখে থাকতে নিষেধ করেছে । তাই মাটির নীচে তরল সােনা , আর মাটির উপরে ওরা রক্তের বন্যা বইয়ে দিচ্ছে । নিজেদেরই রক্ত ।

১৭৫৭-১৮৫৭ অশিক্ষা , অজ্ঞানতা ও দারিদ্রে নিমজ্জিত হওয়ার পর ওদের ক্ষোভ জেহাদি মহাবিদ্রোহ রূপে বিস্ফোরণ হল । ইংরেজরা প্রথমে ওদের নৃশংসতার শিকার হল । তারপর সমান নৃশংসতা দিয়ে ওদের জেহাদকে দমন করল । ওদের ঘুরে দাঁড়ানাের সমস্ত আশা ও সম্ভাবনা ধ্বংস হয়ে গেল । সেই সময়ে একজন ব্যক্তি ওদের মধ্যে আবির্ভূত হলেন যার জন্য গােটা ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসটাই পাল্টে গেল । তাঁর নাম স্যার সৈয়দ আহমেদ খান ( ১৮১৭-১৮৯৮ ) ।

কী ছিল তাঁর বৈশিষ্ট্য এবং মুসলিম সমাজের প্রতি তাঁর বিশেষ অবদান ? তিনি তার গভীর পর্যবেক্ষণ শক্তি দ্বারা ভারতের মুসলমানদের দুর্দশার কারণ বুঝতে পেরেছিলেন এবং তার দূরদৃষ্টির দ্বারা । মুসলিমদেরকে সেই গাড়া থেকে টেনে তােলার পথ দেখিয়েছিলেন । সাধারণ ভাবে দেখলে সেই পথ হচ্ছে মুসলিমদেরকে ইংরাজী শিক্ষা গ্রহণ করতে আহ্বান জানানাে এবং তার জন্য প্রচেষ্টা শুরু করা । সিপাহী বিদ্রোহের ঠিক পরের বছরই ১৮৫৮ সালে তিনি উত্তর প্রদেশের মােরাদাবাদে ইংরাজী শিক্ষার স্কুল চালু করেন , ১৮৭৭ সালে আলিগড়ে ‘ মহমেডান অ্যাংলাে ওরিয়েন্টাল কলেজ ’ স্থাপন করেন । এই আলিগড় কলেজ থেকেই মুসলমানদের ইংরাজী শিক্ষা ও ইংরাজের কাছাকাছি আসা শুরু । এর অনেক পরে ওনার মৃত্যুর পর ১৯২০ সালে । এই কলেজ আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় রূপে । প্রতিষ্ঠা লাভ করে । এটা হল উপরের দেখা । আমি দেখি এর ভিতরের জিনিসটা । সেইসময়ে ভারতে প্রশাসনের কাজকর্ম চলত ফার্সি ভাষাতে যা মুসলমানের নিজস্ব ধর্মীয় ভাষা নয় । সেই ভাষাকে মুসলিমরা রাজভাষা হিসাবে গ্রহণ করেছিল । ব্রিটিশ রাজত্বে ইংরাজী হল রাজভাষা । স্যার সৈয়দ আহমেদের আহ্বানে সেটাকে ধীরে ধীরে গ্রহণ করল মুসলিমরা । একটা অমুসলিম ভাষা থেকে আর একটা অমুসলিম ভাষায় যাওয়ার মধ্যে কোন গভীর তাৎপর্য নেই । স্যার সৈয়দ আহমেদ তার বিশাল দূরদৃষ্টি দিয়ে যে কাজটি করেছিলেন তা হল চরম শত্রু ইংরেজকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করতে মুসলিম সমাজকে মােটিভেট করা । আমি এটাকে অনুপ্রাণিত করা বলব না । এটা কোন অনুপ্রেরণা নয় , এটা একটা মােটিভেশন । অর্থাৎ স্ট্যাটেজি বা কৌশল ।

(লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় স্বদেশ সংহতি সংবাদের মার্চ, ২০১৬ সংখ্যায় )

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.