জন সংহতি: এক সার্বিক পর্যালোচনা

0
239

© পবিত্র রায়

পশ্চিমবঙ্গে নতুন একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠা হয়ে গেল। প্রয়াত হিন্দুত্ববাদী নেতা তপন ঘোষ মহাশয়ের হাত ধরে হিন্দুদের জন্য কাজ করা ‘হিন্দু সংহতি’ নামক সংগঠনটি বর্তমান সভাপতি দেবতনু ভট্টাচার্যের হাত ধরে ‘জন সংহতি’ নামক এক রাজনৈতিক দল জন্মগ্রহণ করল। তবে হিন্দু কল্যাণার্থে কাজ করার জন্য হিন্দু সংহতি সংগঠনটিও কিন্তু অস্তিত্ব হারাল না। জন সংহতি দলটি নির্দিষ্ট কোনও প্রতীক না পেলেও ফ্রি সিম্বল নিয়ে উত্তরবঙ্গে ৪০ ও দক্ষিণ বঙ্গে ১৩০ টি আসনসহ মোট ১৭০ টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে বলে ঘোষণা করেছে।

প্রশ্ন ছাড়া যেমন কোনও বিষয় সম্পূর্ণতা পায় না, এবিষয়টিও প্রশ্নের বাইরে নয়। সুতরাং প্রথম কথা হিসেবে উঠে আসে, দল গঠনের অধিকার আমাদের দেশে আছে- মতাদর্শ আলাদা হলে জনসমক্ষে মতাদর্শ তুলে ধরার জন্য আলাদা দল গঠন করা এমন কোনও নিষিদ্ধ বা অন্যায় কাজ নয়। সে হিসেবে হিন্দুদের দল বলে ঘোষণা করে একটি নতুন দলের জন্ম হওয়া আশ্চর্যের হতে পারে না। তবে প্রথম প্রশ্নই হলো সময় নির্বাচন নিয়ে। হিন্দুদের দল বলে ঘোষণা করে এই সময়েই কেন দল করতে হল, যেখানে বিধানসভা নির্বাচন একেবারে ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে? প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাঁদের স্ট্রাটেজি ঠিক করে নিয়েছে, ভোটার গণও এক প্রকার নিজেদের অবস্থান ঠিক করে নিয়েছে-এমন সময় এইমত দল ঘোষণা করাটা কিন্তু জনমনে সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি করে ফেলতে পারে।অবশ্য এর আগে ফুরফুরার পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকি একটি মুসলিম দল গঠন করেছে ও অন্ধ্রপ্রদেশের মিম নামক আসাদুদ্দিন ওয়েইসির দলের সাথে জোট করে নিয়েছে। এই আসাদুদ্দিন একবার বলেছিল সরকার পনের মিনিটের জন্য পুলিশ সরিয়ে নিক, ভারতের সমস্ত হিন্দুকে সাবাড় করতে আমরা সক্ষম।সমালোচকরা বলেন, আব্বাস সিদ্দিকির মৌলবাদী দল গঠন ও মিম দলের সাথে জোট গঠন করতে কলকাঠি নেড়েছে না’কি বিজেপি দল! আরও খোলসা করে বলতে হলে বলতে হয়, বিজেপি মমতার মুসলিম ভোটে ভাঙন ধরাতেই বিজেপি এইমত মুসলিম সাম্প্রদায়িক দল গঠন করায় সাহায্য করেছে।এবার কিন্তু প্রশ্নটা দেবতনু বাবুর দিকেই ফিরে আসে।যদি আমরা বলতে পারি যে, বিজেপির সহায়তায় মুসলিম দল গঠন করে সামনে এগিয়ে আনা হয়েছে, তার পাল্টা হিসেবে কি দেবতনু বাবুর জন সংহতি গঠন করতে সাহায্য করে মমতা বন্দোপাধ্যায় হিন্দু ভোট ভাঙানোর খেলায় দাবার চাল দিলেন? সন্দেহ কি সত্যিই অমূলক?
সন্দেহ আরও দৃঢ় হয় আসন সংখ্যা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বহর দেখে। যেমন, এবার বেশীরভাগ বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মনে করছে উত্তরবঙ্গে কমবেশি ষাটটি আসনের মধ্যে সিংহভাগ আসন এবার বিজেপি দখল করবে। দেবতনু বাবু সেই উত্তরবঙ্গেই ৪০ টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন।আর দক্ষিণবঙ্গে ১৩০ টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মোট ১৭০টি আসনের মধ্যে ভোট কাটাকুটি করে বিজেপি দলের মাত্র ৪০ টি সম্ভাব্য জেতা আসনে হার নিশ্চিত করা যায়, তাহলে তৃণমূল কংগ্রেস দলের পুনরায় পশ্চিমবঙ্গের কুরসি দখল করার পথ সুগম হবে,একথা হলফ করেই বলা যায়।

এবার একটু ইতিহাসের দিকে তাকানো যাক। মুসলিম লিগের হাতের পুতুল হয়ে যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল তাঁদের দেওয়া অর্থের উপর নির্ভর করে বাংলা প্রদেশে হিন্দু সমাজকে বিভাজন করে চলেছিল নিম্ন বর্গীয়দের মূল হিন্দু সমাজ থেকে আলাদা করে। বেশীরভাগ আসনে মুসলিম লিগকে বিজয়ী করে দিত হিন্দুভোট ভাগাভাগি করে।একদিন দেশ ভাগ হলো। যোগেন বাবু পাকিস্তানের মন্ত্রী হলেন।একটা সময় এলো যখন তাঁকে পালিয়ে এসে হিন্দুত্ববাদীপশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিতে হল। তখন জনৈক ব্যক্তি যোগেন বাবুকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি কেন এমনটি করেছেন। যোগেন বাবু অসহায়ের মত উত্তর দিয়েছিলেন,’আমার কিছু করার ছিলনা’। মুসলিম লবির স্বার্থ সিদ্ধির জন্য মমতা দেবীর অবশ্যই জেতা প্রয়োজন মুসলিম দের পক্ষে, একথাই বেশিরভাগ হিন্দুত্ব বাদী মনে করে। আর সেই জেতার সহায়তা করার জন্য পরিণাম ফল কি যোগেন বাবুর মত হতে পারেনা বলে দেবতনু বাবু মনে করছেন ?

রাজনীতিতে সময় নির্বাচন একটি মোক্ষম সিদ্ধান্ত। দেবতনু বাবুর সময় নির্বাচন নিয়ে এবার একটু আলোকপাত করা যেতে পারে। ধরা যাক,মমতাদেবী দেবতনু বাবুর বদান্যতায় আবার ক্ষমতায় এলেন।দেবতনু বাবুর দলের কতটা উপকারে লাগবে ? এমনও তো হতে পারে এই দল ভবিষ্যতের বিজেপি হয়ে উঠতে তথা বিশ্বাস ঘাতকতা করা দলকে পুনরায় ভবিষ্যতে এইমত কাজ করা থেকে নিবৃত্ত রাখতে অস্তিত্ব হীন করে দিলেন ! আর সেটা যদি না’ও হয়, তাহলে হিন্দু সমাজ কি দেবতনু বাবুকে ক্ষমা করবে বিশ্বাস ঘাতকতা ভুলে গিয়ে? আবার যদি দেবতনু বাবুর হিন্দু সমাজের প্রতি বিশ্বাস ঘাতকতা করার পরও বিজেপি ক্ষমতায় আসে, দেবতনু বাবুর হিন্দু সংহতি ও জন সংহতির অস্তিত্ব থাকবে কি ? মানুষ চায় প্রত্যক্ষ ফল।যখন দেখবে নরম হিন্দুত্ববাদী দল হলেও বিজেপি দল ক্ষমতায় এসেছে, জন সংহতি দলের সিংহভাগ সদস্য কিন্তু বিজেপির ছাতার তলায় আশ্রয় নিয়ে নেবে।সংগঠন বাঁচিয়ে রাখাই দুষ্কর হয়ে উঠবে। বর্তমান সময়ে দেবতনু বাবুর সমস্ত সভ্যগণই কি ওনার সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন ? মনে হয় সেটা হয়ে উঠবে না।উনি যা’ই করুন, সমস্ত হিন্দুত্ববাদী সভ্যগণ কিন্তু বর্তমানে ইতিহাস ও রাজনীতি সচেতন। নির্বাচনের আগেই নতুন এই দলটির এলোমেলো হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল বলেই দৃষ্ট হয়।

দেবতনু বাবুর সংগঠনকে এগিয়ে নিতে হলে কি করা উচিত ছিল ?এবার একটু কাল্পনিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে হয়।ধরা যাক, বিজেপি দল একক ভাবে ক্ষমতায় এলো তারপর? তৃণমূল, কংগ্রেস ও বামপন্থীদের হিন্দু লবির এক বৃহৎ অংশ দলত্যাগ করে বিজেপিতে যোগদান করবে, একথা নিশ্চিত করেই বলা যায়। ফলত দলটি একটি জগাখিচুড়ি দলে পরিণত না হলেও মতাদর্শগত বিচ্যুতি আসার সম্ভাবনা প্রবল বিরোধী একপ্রকার থাকবে না।তৃণমূল, কংগ্রেস ও বামপন্থীদের সাম্প্রদায়িক তোষণ ও সবিরোধী ব্যবহারের জন্য সমাজ এদের বিচ্যুত করেছে, এরপর করবে অস্তিত্বহীন বিজেপি দলও রাজ্যের অতীতের অনুকরণে হয়ে উঠবে ধর্ম নিরপেক্ষ দল।সেক্ষেত্রে পোড় খাওয়া পুরাতন হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সদস্যগণ হয়ে উঠবে অসহিষ্ণু ও বিরোধী এঁরাই বিরোধীতার জায়গা ভরাট করবে প্রকৃতির নিয়মে পৃথিবীতে শূণ্য স্থান হতে পারে না।জন সংহতির উচিত হত ওই বিক্ষুব্ধ কট্টর হিন্দুত্ব বাদীদের নিয়ে বিরোধীতার নেতৃত্ব দেওয়া। সাফল্য মিলত অচিরেই।

দেবতনু বাবুর প্রয়াস কতটা সফলতা পেতে পারে? ৩৭০, ৩৫এ রদ, তিন তালাক রদ, পাকিস্তানের ভেতরে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক, চিনের সাথে চোখে চোখ রেখে মোকাবিলা করা, বিশ্ব রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ দেশ হয়ে ওঠা, পৃথিবীর চতুর্থ আর্থিক শক্তি, মৌলবাদ নিয়ন্ত্রণ, লক ডাউন পরিস্থিতিতে সুস্থভাবে খাদ্যের যোগান বজায় রাখা, রাম মন্দির নির্মাণ শুরু করা, কোভিড-১৯ প্রতিরোধে সফল ভ্যাকসিন আবিষ্কার প্রভৃতি বিজেপি দলের প্রতি এক মোহে আবিষ্ট করে রেখেছে জনগণকে। এইমত অবস্থায় দেবতনু বাবুর প্রয়াস কিছু করে উঠতে পারবে বলে মনে হয়না-বরং মুখ থুবড়ে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল।

স্বাধীনতার পর হতে কাল্পনিক ধর্ম নিরপেক্ষতার কুইনাইন খাইয়ে যে বাঙালি জাতিকে মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছিল, সেই জাতির ঘুম সবে ভাঙা শুরু হয়েছে। এমন সময়ে সেই জেগে ওঠা দৈত্যের মুখোমুখি হয়ে নিরস্ত করতে যাওয়াটা বোধহয় অবিবেচক ও শঠতার নিদর্শন। বোতলের দৈত্য বাইরে বেরিয়ে গিয়েছে,নতুন করে বোতলে ঢোকানো এক প্রকার অসম্ভব বলেই মনে হয়। খুব সম্ভবত তপন বাবুর হাত ধরে হিন্দু কল্যাণে গড়ে ওঠা এক হিতৈষী সংগঠনের অপমৃত্যু ঘটতে চলেছে স্রেফ সময় নির্বাচনের ভুলে। ঠিক যেমন মমতাদেবীর অদূরদর্শিতায়, গোয়ার্তুমি, তোষণ ও স্বজন প্রিয়তার জন্য এক সম্ভাবনাময় রাজনীতির মৃত্যু হতে চলেছে।হিন্দু সংহতি তথা ‘জন সংহতি’ নামক রাজনৈতিক সংগঠনের মৃত্যুই হয়ত আমাদের দেখতে হবে।

(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.