জ্যোতি বসু: গণহত্যার নায়ক- যাকে ভারত ভুলে গিয়েছে

0
4878

( মূল লেখাটি ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হয় ৮ই জুলাই ২০২০ opIndia.com নামক ওয়েবসাইটে। লেখক : অভিষেক ব্যানার্জি । )

অনুবাদ : সূর্য শেখর হালদার

১৯৭৯ সালের প্রথম দিকে প্রায় ৪০ হাজার ক্ষুধার্ত, বুভুক্ষু এবং অসহায় বাঙালী পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনের মরিচঝাপী নামক দ্বীপে আশ্রয় নিয়েছলেন। এনারা ছিলেন হিন্দু উদ্বাস্তু যাঁরা ধর্মীয় আক্রমণের কারণে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে পালিয়ে এসেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই উদ্বাস্তুদের কোন দায়িত্ব নেয়নি। উপরন্তু তাঁদের সুন্দরবনের গভীর অরণ্যে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছিল।

তারপর ১৯৭৯ সালের জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে তারা এল। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ লঞ্চ বোটে করে সেখানে হাজির হল আর হুগলি নদীর বদ্বীপ অঞ্চলের সমস্ত জলপথের দখল নিল। সমগ্র দ্বীপটি পুরোপুরিভাবে ঘিরে রাখা হলো। ফলে দ্বীপের ৪০ হাজার মানুষের খাদ্য ঔষধ পাওয়ার কোন উপায়ই আর থাকলো না।

জানুয়ারি মাসের ৩১ তারিখের সকালে পুলিশ ক্ষুধার্ত হিন্দু উদ্বাস্তুদের ওপর খুল্লাম খুল্লা গুলিবর্ষণ করল। গুলি চললো নির্বিচারে আর সেইসঙ্গে খালি করা হল বদ্বীপ। কেউ জানেনা ঠিক কতজন মানুষ সেদিন নিহত হয়েছিলেন কেননা পশ্চিমবঙ্গ সরকার কোনদিন মৃতের সংখ্যার উপর আলোকপাত করেননি।

এই সময়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী যাঁর নির্দেশে এই বর্বর নাশকতা ঘটেছিল, তিনি হলেন জ্যোতি বসু। সভ্য জগতের মানুষ হলে জ্যোতি বসুর সেদিন সঙ্গে সঙ্গে পদত্যাগ করা উচিত ছিল। সম্ভবত তাঁর গ্রেফতার হবার কথা। কিন্তু সেসব কিছুই ঘটল না। যখন জ্যোতি বসু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর পদ ত্যাগ করলেন, ততদিনে ইতিহাসে তাঁর নাম উঠে গেছে সবচেয়ে বেশিদিন পদে থাকা ভারতীয় মুখ্যমন্ত্রী রূপে।

ইতিহাসে যা উল্লেখ করা হয়নি এবং ভারতবাসী যা ভুলে গেছে সেটা হল জ্যোতি বসু হলেন একজন গণহত্যাকারী। আজ তাঁর জন্মদিন (৮ই জুলাই)। কয়েক বছর আগে তাঁর দেহাবসান ঘটেছে । এই গণহত্যা পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে এক বর্বর ঘটনা । এই কারণে জ্যোতি বসুর নরকেও স্থান হবে কিনা সন্দেহ।

জ্যোতি বসু ১৯১৪ সালের ৮ই জুলাই কলকাতাতে জন্মগ্রহণ করেন। অন্যান্য বিখ্যাত কমিউনিস্ট নেতাদের মত তিনিও ছিলেন পুরুষ, উচ্চবর্ণ এবং সমাজের সুবিধাভোগী শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। ছোটবেলা থেকে তিনি লোরেটো, সেন্ট জেভিয়ার্স প্রভৃতি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। এইসব বিদ্যালয় গুলি প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করতেন ব্রিটিশ সাহেবরা। উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের এবং তাঁদের অনুগামীদের সন্তানদের শিক্ষা। তারপর ব্রিটিশ পরিচালিত এলিট বিদ্যালয় থেকে তিনি যান ইংল্যান্ডের এলিট কলেজে পড়তে। অবশেষে ব্যারিস্টার রূপে স্বীকৃতি লাভ করেন।

এর থেকে বুঝতে কষ্ট হয় না যে জ্যোতি বসু কেন ৪০,০০০ বাংলাদেশি, ক্ষুধার্ত হিন্দু উদ্বাস্তুর প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন না। আমাদের ঐতিহাসিকরা এই বিষয় নিয়ে গবেষণা করলেই বুঝতে পারবেন যে এই উদ্বাস্তুদের বেশিরভাগ ছিলেন দলিত। এটাই হলো কমিউনিজম সবসময় দরিদ্র ক্ষুধার্তদের সম্পর্কে কথা বল যাতে করে ভিতরে ভিতরে নিজের সুবিধা বজায় রাখা যায়। তারপর যারা আসল ইতিহাসকে ভুলিয়ে দিয়ে উপকথা রচনা করতে পারে এমন ঐতিহাসিক দের উপর নির্ভর করা, যাতে করে সাধারণ লোক আসল ইতিহাস জানতে পারেন।

১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের পর জ্যোতি বসু একটি সভায় জনসমক্ষে ঘোষণা করেন, ‘ চীন কোনদিন আক্রমনকারী হতে পারে না’। তাঁর রাজনীতি যদি বিশ্বাসঘাতকতা পূর্ণ হয়, তবে তাঁর রাজত্ব ছিল রক্তাক্ত। বস্তুত ১৯৯৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন
গৃহমন্ত্রী বিধানসভায় স্বীকার করেন যে পশ্চিমবঙ্গে জ্যোতি বসুর মুখ্যমন্ত্রীত্বের শুরু থেকে ২৮ হাজার রাজনৈতিক হত্যা সংগঠিত হয়েছে। তাহলেই চিন্তা করুন প্রাণ হারানো মানুষের প্রকৃত সংখ্যা কত!

২৮ হাজার রাজনৈতিক হত্যার সরকারি সংখ্যাটাও কিন্তু কোন আলোড়ন ফেলে নি: জ্যোতি বসুর গৌরবে কালিমা লেপন করতে পারেনি, কারণ কমিউনিস্ট নেতারা তাঁদের অনুগত ঐতিহাসিক ও বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে নিয়ে চলেন। আর তাই সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে এলিট ক্লাস ও ফ্যাশনেবল বামপন্থীদের কাছে তিনি পরিচিত হলেন ‛সর্বহারার মহান নেতা’ হিসেবে।

বস্তুত ১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে লোকসভা ত্রিশঙ্কু হল। ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলির মনে এই ধারণার উদয় হলো যে শ্রদ্ধাস্পদ জ্যোতি বসুর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া উচিত, কিন্তু জ্যোতি বসুর নিজের দলের মধ্যের শত্রুরাই তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হওয়া থেকে থামিয়ে দিলেন । এভাবেই ভারত এমন এক প্রধানমন্ত্রী পাবার খুব কাছাকাছি এসেছিল যিনি উদ্বাস্তুদের নির্বিচারে হত্যা করেছেন: হাজার হাজার বিরোধীদের হত্যা করিয়েছেন এবং ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের সময় চীনের সরকারি বক্তব্যকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন।

এখন আপনারা সম্ভবত শুনেছেন যে জ্যোতি বসুর অর্থনীতি রাজ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পকে বন্ধ করে দিয়েছে। আপনি কি জানেন, এটাকে তিনি ব্যাখ্যা করেন এই বলে যে এটা হল সাধারণ মানুষ এবং বিপ্লব বিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির প্রচার।

এবারে আসা যাক জ্যোতিবাবুর পুত্র চন্দন বসুর কথায়। শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা করার প্রয়োজনে সংগ্রাম শিখতে জ্যোতি বসু তাঁর পুত্রকে ইংল্যান্ডে পাঠান: না ভিয়েতনাম বা গুয়েতেমালাতে নয় ! বাস্তবে চন্দন বসু আসলে হয়ে ওঠেন একজন শিল্পপতি: শিল্পজগতের একজন নক্ষত্র। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা তার নাম অনুমোদন করে ব্যাংকের ঋণ পাবার জন্য: বড় কর্পোরেট সংস্থা থেকে চুক্তি পাবার জন্য।

বাবা পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশের কমিউনিস্ট মুখ্যমন্ত্রী আর ছেলে একজন ব্যবসায়ী যিনি West Bengal Financial Corporation থেকে ঋণ পাবার জন্য অনুমোদিত হচ্ছেন। দেশের সামনে সততার এই অনন্য নিদর্শন প্রতিষ্ঠা করার জন্য পিতা-পুত্রের একসঙ্গে পদ্মবিভূষণ পাওয়া উচিত ছিল !

কিন্তু এটা সম্ভব হল কিভাবে? উত্তর হল জ্যোতি বসুর পক্ষে ছিল প্রয়োজনীয় সমর্থন। সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ,কবি, ঐতিহাসিক প্রভৃতি প্রত্যেক ধরনের উপযুক্ত মানুষকে সঙ্গে পান তিনি। আজকের মতো অবস্থাও ছিল না সেদিন। যে কেউ একজন নবিমুম্বাইয়ের কোন গির্জাতে পাথর ছুড়লে পরেরদিন সেটা নিউইয়র্ক টাইমসে খবর হয়ে যায় যে ভারত অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছে।

সবাই বলে মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে খারাপ কথা বলতে নেই। এটা একটা ভদ্রতা বা অলিখিত নিয়ম যা সবাই মেনে চলে। কিন্তু একজন মানুষ যদি হাজার -, লাখ -লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয় ,সে ক্ষেত্রে কি হবে? ক্ষতিগ্রস্থদের কথাও আমাদের শোনা উচিত। ঠিক যেভাবে বিখ্যাত ব্যাক্তিরা ইন্টারনেটে সমালোচিত হয়ে ১০০ ডায়াল করে পুলিশ না ডেকে টুইটারে পুলিশ ডাকেন আর সবাই সেটা গুরুত্ব দিয়ে শোনেন সেভাবেই এনাদের কথাও শোনা উচিত।

সুতরাং জ্যোতি বসু সম্পর্কে খারাপ কথা বললে লজ্জিত বা দুঃখিত হবার কারন নেই। মনে রাখবেন অন্যজগতে অন্তত ২৮ হাজার কণ্ঠস্বর আছে যারা আপনি জ্যোতি বসুর বিরুদ্ধে বললে আপনাকে সমর্থন করবেন।

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.