হালিক কৈবর্ত রাজা ভীমের পুজো হয় রাঢ় অঞ্চলে?

0
294

© তমাল দাশগুপ্ত

ভীম একাদশীর দিনে রাঢ় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে যাঁর পুজো হয়, তিনি কি মহাভারতের ভীম? নাকি কৈবর্ত বিদ্রোহের ভীম? প্রসঙ্গত মহাভারতের ভীম মাকুন্দ ছিলেন, তবে সেটা নানা সিরিয়াল বা যাত্রার গালপাট্টা গোঁফওলা ভীমের দাপটে চাপা পড়ে যেতে পারে (বি আর চোপড়া অবশ্য তাঁর মহাভারতে গোঁফ দেখান নি, মূল মহাভারত অনুসরণ করে)। যে ভীমের পুজো হয় তাঁর মূর্তিতে কিন্তু সর্বত্র গোঁফ আছে। এবং তিনি কৃষিকাজের দেবতা হিসেবে পূজিত হন, সেটা দেখে মনে হয় এই ভীম আমাদের বাঙালির ইতিহাসের ভীম। কারণ কৈবর্ত রাষ্ট্রের নায়ক ভীম যে হালিক কৈবর্ত ছিলেন সে সম্পর্কে মোটামুটি ঐক্যমত্য আছে।

ভীম একাদশীতে মূলত মাহিষ্য জাতি, যেটি বাংলাভাষী হিন্দুর মধ্যে বৃহত্তম কাস্ট, তাঁরা রাঢ় অঞ্চলে ভীমের পুজো করেন। আমি একটা কাজে এসেছি বাংলায়, রয়েছি হুগলিতে আমার শ্বশুরবাড়িতে, প্রচুর জায়গায় দেখলাম ভীমের মূর্তি। অতি সম্প্রতি পুজো হয়েছে। বাঙালির ইতিহাসের ভীমের স্মৃতি এখনও এভাবে জাগরুক, এই কল্পনায় রোমাঞ্চ হল।

বরেন্দ্র অঞ্চলে ভীমের পান্তি দেখা যায় একাধিক স্থানে। এই রাজা জয়স্তম্ভ নির্মাণ করেছিলেন, তবে পূর্ববর্তী আমলের স্তম্ভও ভীমের জনপ্রিয়তার কারণে তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। ভীম ছিলেন বঙ্গের উত্তরে কিন্তু দক্ষিণে রাঢ় অঞ্চলে তাঁর নামে পুজো হয়, এর পেছনে ইতিহাসের কিছু চলাচল কাজ করেছে মনে হয়।

মহাভারতের সময় দক্ষিণ বঙ্গে কর্বট রাজ্য ছিল। মাহিষ্য জাতি কারিকা দেখে মনে হয় এই জাতি আদিতে একটি রাষ্ট্র ছিল, এবং রাষ্ট্রের কর্মে প্রয়োজনীয় যাবতীয় কুলশীল এই জাতির মধ্যেই বিদ্যমান ছিল।

কৈবর্ত জাতির দুটি অংশ, জালিক ও হালিক, এই বিভাজন পালসেনযুগে হয়ে থাকবে, অনেকেই মনে করেন। তবে হালিক উপাধির ব্যক্তিনাম চন্দ্রকেতুগড় গঙ্গারিডাই সভ্যতার সীল থেকে পাওয়া যায়।

মহাভারতের কর্বট থেকে আলেকজান্ডার সমকালীন গঙ্গারিডাই যদি হালিক কৈবর্ত অর্থাৎ মাহিষ্য জাতির রাষ্ট্র হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে উত্তর অঞ্চলে বরেন্দ্র ভূমিতে কৈবর্ত রাষ্ট্র এই ধারাবাহিকতায় দেখা যেতে পারে, একটি বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহ হিসেবে না দেখে। পালদের সঙ্গে তিক্ত সম্পর্ক হলেও সেনরাষ্ট্রের সঙ্গে সদ্ভাব থাকায় নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন এই মাহিষ্য জাতির লোকজন, তাঁদের মধ্যে মহামাণ্ডলিক মহেশ, এবং রাজকবি পপীপ এই দুজনের নাম পাওয়া যায়।

দ্বিতীয় মহীপাল দুর্বল অযোগ্য ও অনৈতিক শাসক ছিলেন, তাঁর সময়ে কৈবর্তরা বিদ্রোহ করেন, মহীপাল নিহত হন। বরেন্দ্র অঞ্চলে কৈবর্ত রাষ্ট্র স্থাপন করেন দিব্য এবং তারপর সিংহাসনে বসেন তাঁর ভাই রুদোক। এই রাজবংশের শেষ শাসক রুদোকপুত্র ভীম। তাঁকে পরাস্ত করতে সুবিশাল সামন্তচক্র গঠন করেছিলেন রামপাল, আঠেরোজন সামন্ত রাজা নিয়ে সেই অভিযান দেখে বোঝা যায়, ভীমের সৈন্যবাহিনী অতীব শক্তিশালী ছিল। রামপাল কর্তৃক ভীম সপরিবারে নৃশংসভাবে নিহত হন। সেদিন বরেন্দ্র অঞ্চলে কৈবর্ত রাষ্ট্র বিধ্বস্ত হওয়ার পরে কি রাঢ় অঞ্চলে চলে এসেছিলেন হালিক কৈবর্ত জাতির একটা বৃহৎ অংশ? সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না, বিশেষ করে সেনদের আদি নিবাস ছিল রাঢ় এবং সেনদের সঙ্গে অচিরে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে মাহিষ্য জাতির, যদিও রামচরিত গ্রন্থে উল্লিখিত নিদ্রাবলীর শ্রীবিজয় যিনি রামপালের সামন্তচক্রে ভীমের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেন তিনি সেনসাম্রাজ্যেরই প্রতিষ্ঠাতা বিজয়সেন। রাজনীতি জটিল বিষয়।

দেশপ্রাণ শাসমলের সময় থেকেই মাহিষ্য শব্দটি সর্বত্র ব্যবহৃত হতে শুরু করে এবং ট্র্যাডিশনাল জাতিনাম অর্থাৎ হালিক বা চাষী কৈবর্ত জাতিনামটি প্রায় অব্যবহৃত হয়, যদিও এ নামটি পুনরায় ব্যবহৃত হচ্ছে এখন, মূলত ওবিসি সংরক্ষণ স্বার্থে।

মহারাষ্ট্রে যেমন মারাঠা কাস্ট, বাংলায় অনুরূপ কাস্ট কিছু আছে কিনা, এই প্রশ্ন করলে তার উত্তর সম্ভবত হবে মাহিষ্য। বৃহৎ এবং রাষ্ট্রনৈতিক নেতৃত্বের ইতিহাসের গৌরব আছে এঁদের আদিকাল থেকেই। আধুনিক যুগে রাণী রাসমণি এই কাস্টের অন্তর্গত ছিলেন। স্বদেশী যুগে কোনোও এক আশ্চর্য কারণে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের স্বরাজ্য দল বিপুল মুসলিম তোষণ করলেও মাহিষ্য জাতির অবিসংবাদী নেতা, বাংলার কৃষকদের সবথেকে জনপ্রিয় নেতা, বিলেত ফেরত ব্যারিস্টার দেশপ্রাণ শাসমলকে অপাংক্তেয় করে দেয়। গান্ধীর বিপক্ষে একজন কৃষক নেতাকে তুলে ধরতে পারলে এভাবে হয়ত বাঙালি জাতি বিধ্বস্ত হত না এবং সর্বভারতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে বাঙালির নিজস্ব ক্ষমতা ধরে রাখা যেত।

মাহিষ্য রাজা ভীম তাঁর অবচেতন স্মৃতি নিয়ে রাঢ় অঞ্চলের বাঙালির মধ্যে ভীম পুজোর মাধ্যমে জীবিত আছেন। তিনি আমাদের জাতিকে শক্তি প্রদান করুন এবং সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাঁর স্মৃতি আমাদের নেতৃত্ব দিক।

© তমাল দাশগুপ্ত Tamal Dasgupta

(ছবিতে দেখছেন তিন মানুষ সমান উঁচু একটি ভীম প্রতিমা। হুগলি জেলায়। ছবি তুলেছেন ঋতুপর্ণা।)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.