জঙ্গীদের নাকি ধর্মীয় পরিচয় হয় না!

0
372


© তপন ঘোষ 
   

জঙ্গি বা সন্ত্রাসবাদীদের নাকি কোন ধর্মীয় পরিচয় হয় না — শুনতে শুনতে প্রায় কান পচে গেল। যখনই কোথাও একটা বড়সড় জঙ্গি হামলা হয়, বেশকিছু নিরীহ মানুষের প্রাণ যায়। রক্তে ভিজে যায় রাজপথ — তখনই বেশ কিছু বুদ্ধিজীবি ভিজে ভিজে চোখে , দরদ বিগলিত কণ্ঠে শােকপ্রকাশ করতে করতে শেষ বলেন — জঙ্গিদের কোন ধর্মীয় পরিচয় হয় , তারা আদপে সব এক। বােগাস্। এরা যে কোন বুদ্ধিতে বুদ্ধিজীবি তা গবেষণার বিষয় হতে পারে। নাকি চোখে ঠুলি পড়ে আসল সত্যটাকে দেখতে তারা অস্বীকার করেন। 
 

আসল সত্য হল জঙ্গিদের ধর্মীয় পরিচয় আছে। অন্ততঃ ইসলামিক জঙ্গি গােষ্ঠীগুলি তাই প্রমাণ করেছে। আই এস , আল-কায়দা , বােকো-হারাম , যইশ-ঈ-মহম্মদ , জামাতেউল মুজাহিদিন প্রভৃতি জঙ্গী গােষ্ঠীগুলাের আসল উদ্দেশ্য কী ? সারা বিশ্বকে এক মুসলিম রাষ্ট্রের অধীনে আনা। প্যান ইসলামিজিম প্রতিষ্ঠা করা। আর তা করতে হবে ইসলামিক জেহাদের মতে। জেহাদ কী? ইসলাম মতে জেহাদ হল পবিত্র ধর্মযুদ্ধ। এই যুদ্ধের উভয় দিকেই ধর্মযােদ্ধার লাভ। জিতলে গনিমতের মাল ভােগ করার সুখ , আর পরাজিত হয়ে মৃত্যুবরণ করলে জন্নতে গিয়ে অখণ্ড সুখভােগ। অতএব ইসলামিক ধর্মযােদ্ধারা তাদের ধর্মীয় পরিচয় নিয়েই লড়াইয়ের ময়দানে অবতীর্ণ হন । এখানে সমাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি বা অর্থনীতি বলে কোন কিছু নেই। 

  বিষয়টা একটু ব্যাখ্যা করা যাক। কিছুদিন আগে পর্যন্তও শ্রীলঙ্কায় তামিল এলটিটিই জঙ্গিরা তাদের অধিকারের জন্য লড়াই চালাচ্ছিল। কিন্তু তাদের দাবীতে কোথাও ধর্মীয় অধিকার ছিল না। তারা একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে স্বায়ত্তশাসন দাবি করেছিল। যদিও কোন বিচ্ছিন্নতাবাদই সমর্থনযােগ্য নয়। কিন্তু শ্রীলঙ্কা সরকারের সঙ্গে এলটিটিই-র কোন ধর্মীয় বিবাদ ছিল না। তাই জাফনার বাইরে কোন অঞ্চলের প্রতি তাদের দাবি ছিল না। কিন্তু ধর্মীয় যােদ্ধারা একটি অঞ্চল জয় করবার পর অন্য বিধর্মী অঞ্চল আক্রমণ করে জয়ের পরিকল্পনা করে , এই যুদ্ধ তার শেষ হবে সমস্ত বিধর্মীকে হত্যা বা ধর্মান্তরিত করার পরই। এবার ইসলামিক জঙ্গী সংগঠনগুলির দিকে একটু আলােকপাত করা যাক। কয়েকবছর আগে কেনিয়ার একটি মল দখল নিয়ে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে সেখানে হত্যালীলা চালায় বােকো হারাম। অর্থাৎ মুসলিমদের ছেড়ে দিয়ে অমুসলিমদের বেছে বেছে হত্যা করে তারা। একইরকম ভাবে মূর্তিপূজক ইয়াজিদিদের উপর ফতােয়া জারি করেছিল ইসলামিক স্টেট। হয় ইসলাম গ্রহণ করাে নয়তাে মৃত্যুবরণ করাে। ইয়াজিদিদের বুকের পাটা আছে। নারকীয় অত্যাচার সহ্য করেও তারা ইসলাম কবলু করেনি। তাই তাদেরকে হত্যা করাটা ধর্মীয় পবিত্র কর্ম বলেই মনে করে আই এস জঙ্গিরা। উত্তর ইরাকের কুর্দ সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি একইরকম আচরণ করে তারা। সম্প্রতি বাংলাদেশে জেএমবি জঙ্গীরা ঢাকার গুলশানে স্প্যানিশ রেস্তোরাঁয় ঢুকে যে নৃশংস হত্যালীলা চালালাে তাতেও তাদের ধর্মীয় পরিচয় স্পষ্ট। মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে নির্ভুল উচ্চারণে কলমা পড়তে বলা হয়েছে পণবন্দীদের। যে বলতে পেরেছে , তাদেরকে ছেড়ে দিয়েছে জঙ্গিরা। আর যারা বলতে পারেনি ( ইসলামিক সম্প্রদায়ের নয় বলেই বলতে পারেনি ) তাদেরকে কুপিয়ে হত্যা করেছে। ইশরাত আখন্দ নামক এক মহিলা হিজাব পড়ায় তাকে হত্যা করে জঙ্গিরা। কারণ ইসলাম মুসলিম মহিলাদের এখনও অতটা স্বাধীনতা দেয়নি যতটা উপভােগ করত ইশরাত। সর্বোপরি জঙ্গিদের বাংলাদেশ সরকারে দেওয়া তিনটে দাবির অন্যতম হল—  ‛এই হানাদারিকে ইসলাম প্রতিষ্ঠার স্বার্থে অভিযান হিসাবে স্বীকৃতি দিতে হবে ।’ – এরপরও বলতে হবে ‘ সন্ত্রাসবাদীদের কোন ধর্ম হয় না।’ 
 

 ইসলামিক জঙ্গি গােষ্ঠীগুলাে ইসলাম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই সারা বিশ্বে সন্ত্রাসবাদকে ছড়িয়ে দিয়েছে। তাদের নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে , থাকতে পা আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। কিন্তু প্রকৃত লক্ষ্যে তারা এক — আর তা হল বিশ্বজুড়ে প্যান ইসলামিজিম প্রতিষ্ঠা করা।
 

 (লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় স্বদেশ সংহতি সংবাদ,  জুলাই ২০১৬ সংখ্যায়)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.