বর্তমানে দীক্ষা অনেকটা ব্যবসায় পরিণত হয়েছে

0
352

© কুশল বরণ চক্রবর্ত্তী

“কার্তিকে মন্ত্রসিদ্ধিঃ স্যান্মার্গশীর্ষে তথা ভবেৎ”;দীক্ষা গ্রহণের জন্যে সকল মাসই প্রশস্ত নয়
বর্তমানে দীক্ষা অনেকটা ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। অথচ দীক্ষা অত্যন্ত পবিত্র একটি আধ্যাত্মিক ক্রিয়া। দীক্ষায় মানুষের নতুন জন্ম হয়। একজন সদগুরু শিষ্যকে বেদ-বেদান্তের মুক্তির পথ নির্দেশনা দেন। এমন জীবন্মুক্ত গুরু শিষ্যের কাছে কিছুই প্রত্যাশা করেন না। তিনি শুধু শিষ্যকে মুক্তির পথে অগ্রসর হতে করুণা করে পথ দেখান। যিনি নেই যে পথ খুঁজে পেয়েছেন, তিনিই অন্যদের পথ দেখাতে পারেন। তাই দীক্ষা নিয়ে কখনই ব্যবসা করা উচিত নয়। গুরু ব্যবসার মত পাপকর্ম আর নেই। এই গুরুব্যবসায়ীরা গুরু নামকেই কলঙ্কিত করছে। বিষয়টিকে তারা যেহেতু ব্যবসা হিসেবে গ্রহণ করছে, তাই তারা ব্যবসার সকল কৌশলগত দিকও গ্রহণ করছে। ব্যবসার প্রসারে লোক টানতে তারা বিভিন্ন প্রকারের অশাস্ত্রীয় প্রচারণা করছে। এতে হয়ত তাদের ব্যক্তিগত লাভ হচ্ছে। কিন্তু সমষ্টিগতভাবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছি। আজকে গুরু একটা ব্যবসাতে পরিণত হয়েছে। ব্যবসায় মত এখানেও লাভ লোকসানের আছে। ব্যবসায় প্রোডাক্টের মার্কেটিং এর জন্যে যেমন লোক নিয়োগ করা হয়; এখানেও তাই চলছে। গুরুরা বিভিন্ন এজেন্ট নিয়োগ করে, তারা আবার গুরুদের আয়ের কমিশন পায়। এই ভণ্ড গুরুরা বেদবেদান্তের প্রচার বাদ দিয়ে নিজের ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রচার নিয়েই অষ্টপ্রহর ব্যস্ত।সেজেগুজে রোডশোসহ ক্ষমতা প্রদর্শনের হেন পন্থা নেই, যা তারা তা ব্যবহার করে না।

এ কারণেই অনেকেই এই গুরু ব্যবসায়ীদের প্রসঙ্গে রসিকতা করে বলেন:
“সকল ব্যবসা বন্ধ হল, 

খোলা রইলো গুরুর দ্বার,

 গুরুর ব্যবসা চলে ভাল, 

যদি থাকে ভাল ক্যানভাসার।”

এই সকল গুরু ব্যবসায়ীদের সংগঠনে দেখা যায়, যাকে পায় তাকেই ধরেধরে দীক্ষিত করে। কোন তিথি, নক্ষত্র, মাস, বার কিছুই তাদের যায় আসে না। অনেক সময়ে দেখা যায় ছোটছোট ছেলেমেয়েদের এই সকল গুরু ব্যবসায়ীরা বাবামায়ের অজ্ঞাতসারে দীক্ষা দিয়ে তাদের হাতে দীক্ষাপত্র ধরিয়ে দেয়। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। এই জোরজবরদস্তি করে ধরেবেঁধে দীক্ষা দেওয়ার জন্য অনেকে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে দীক্ষা নিতে বাধ্য হয়। দীক্ষিত ব্যক্তি জানেও যে তার গুরুর কি নাম, কোথায় তিনি থাকেন? জীবনে আর গুরুর সাথে দেখা হবে কিনা, তাও সুস্পষ্টভাবে তারা জানেন না। এভাবেই দীক্ষা নামক মহত্তম বিষয়টি প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, শুধু গুরু নামক কিছু ব্যক্তি এবং তার সুবিধাভোগী অনুসারীদের কারণে।

কোন কোন মাসে দীক্ষিত হলে, কি কি শুভাশুভলক্ষণ হয়, তা ‘বৃহৎ তন্ত্রসারঃ’ গ্রন্থে সুস্পষ্টভাবে নির্দেশিত হয়েছে :
অথ দীক্ষাকালঃ। 

মস্তারারমস্তু চৈত্রে স্যাৎসমস্তপুরুযার্থদঃ।

বৈশাখে রত্বলাভঃ স্যাজ্যষ্ঠে চ মরণং ভবেৎ।

আষাঢ়ে বন্ধুনাশঃ স্যাৎ পূর্ণায়ুঃ শ্রাবণে ভবেৎ। প্রজানাশাে ভবেদ্ভাদ্রে আশ্বিনে রত্নসঞ্চয়ঃ।

কার্তিকে মন্ত্রসিদ্ধিঃ স্যান্মার্গশীর্ষে তথা ভবেৎ।

পৌষে তু শত্রুপীড়াস্যান্মাঘে মেধাবিবর্দ্ধনম্।

ফাল্গুণে সর্বকামাঃ স্যুর্মলমাসং বিবর্জয়েৎ। 

চৈত্রে তু গােপাল বিষয়ং গৌতম্যুক্ত্বাৎ। 

মধুমাসে ভবেদ্দীক্ষা দুঃখায় মরণায় চ। 

ইতি বচনান্নান্যত্র।

তথা- জ্যৈষ্ঠে মৃত্যুপ্রদা বিদ্যা আষাঢ়ে সুখসম্পদঃ।

ইতি যােগিনীহৃদয়াদাষাঢ়ে শ্রীবিদ্যায়াং ন দোষঃ।।

অত্র চ মাসঃ সৌরে মাসি শুভা দীক্ষা ন চান্দ্রে ন চ তারকে।

ইতি গৌতমীয়াৎ।। 

বৈশম্পায়নসংহিতায়াম্।। 

মন্ত্রস্যারম্ভণং মেষে ধনধান্যপ্রদং ভবেৎ।

বৃষে মরণমাপ্নোতি মিথুনেহপত্যনাশনম্। 

কর্কটে মন্ত্রসিদ্ধিঃ স্যাৎ সিংহে মেধাবিনাশনম্।

কন্যা লক্ষ্মীপ্রদা নিত্যং তুলায়াং সর্বসিদ্ধয়ঃ।

বৃশ্চিকে স্বর্ণলাভঃ স্যাদ্ধনুর্মানবিনাশনম্। 

মকরঃ পূণ্যদঃ প্রােক্তঃ কুম্ভোধনসমৃদ্ধিদঃ। 

মীনো দুঃখপ্রদো নিত্যমেবং মাসবিধিক্রমঃ।।

“দীক্ষার কাল নির্ণয়:চৈত্র মাসে মন্ত্র গ্রহণ করলে সমস্ত পুরুষার্থ সিদ্ধি হয়, বৈশাখে রত্নলাভ, জ্যৈষ্ঠে মরণ, আষাঢ়ে বন্ধুনাশ, শ্রাবণে দীর্ঘায়ুঃ, ভাদ্রমাসে সন্তাননাশ, আশ্বিনে রত্নসঞ্চয়, কার্তিকে ও অগ্রহায়ণে মন্ত্রসিদ্ধি, পৌষ মাসে শত্রুবৃদ্ধি ও পীড়া, মাঘমাসে মেধাবৃদ্ধি ও ফাল্গুণ মাসে মন্ত্রগ্রহণ করলে সকল মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়। এভাবে মাসের গুণাগুণ বিবেচনা করে মন্ত্র গ্রহণ করা একান্ত বিধেয়, পরন্তু বিহিত মাসও যদি মলমাস হয়। তবে সেই মাস বর্জন করতে হবে। চৈত্র মাসে যে দীক্ষা উক্ত হল, তা শুধুই ‘গােপালমন্ত্র’ বিষয়ে। চৈত্র মাসে মন্ত্র গ্রহণ করলে দুঃখ ভােগ ও মরণ হয়ে থাকে। এইভাবে গ্রন্থান্তরে বিস্তারিত লিখিত আছে। অতএব চৈত্র মাসে কেবল গােপালমন্ত্র গ্রহণ করতে পারবে; অন্য দেবতার মন্ত্রে দীক্ষিত হতে পারবে না। আষাঢ় মাসে মন্ত্র গ্রহণ করলে বন্ধুনাশ হয়, এমন শাস্ত্রে বর্ণিত আছে, তবে তা সকল দেবতার মন্ত্রের ক্ষেত্রে নয়। “আষাঢ়ে মন্ত্র গ্রহণ করলে সুখ ও সম্পদ লাভ হয়” যােগিনী হৃদয়ের এই বচন বলে আষাঢ় মাসে শ্রীবিদ্যার মন্ত্রে দীক্ষিত হওয়া যায়। দীক্ষা বিষয়ে যে সকল মাসের দোষাদোষ লিখিত হইল, তা সকলই সৌর মাস। দীক্ষাতে সৌরমাসই প্রশস্ত, চান্দ্র মাসে গ্রহণ করবে না। বৈশম্পায়ন সংহিতায়ও এইরূপ মাসের নির্ণয় লিখিত আছে।”
গুরুগিরির নামে সেই ব্যক্তিরা শিষ্যদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং জৈবিক প্রয়োজনে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করছেন। অথচ আমাদের শাস্ত্রে যখন তখন দীক্ষা দেয়াকে সমর্থন করা হয়নি। প্রত্যেকেরই দীক্ষার তিথি, নক্ষত্র, মাস, বার আলাদা। বাবার জন্যে যে দীক্ষা তিথি প্রশস্ত, সন্তানের জন্যে সেই তথিটি প্রশস্ত নাও হতে পারে। ‘বৃহৎ তন্ত্রসারঃ’ অনুসারে দেখা যায়, চৈত্রমাসে মন্ত্র গ্রহণ করলে যেমন কল্যাণ লাভ হয়, পুরুষার্থ সিদ্ধি হয়; বৈশাখ মাসে দীক্ষিত হলে ধনরত্ন লাভ হয়; শ্রাবণ মাসে দীক্ষিত হলে দীর্ঘায়ু লাভ হয়; আশ্বিন মাসে দীক্ষিত হলে রত্নসঞ্চয় হয়; কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাসে দীক্ষিত হলে মন্ত্রে সিদ্ধি লাভ করা যায়; মাঘমাসে দীক্ষিত হলে মেধাবৃদ্ধি হয় এবং ফাল্গুণ মাসে মন্ত্রগ্রহণ করলে সকল মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়। তেমনি বিপরীতে কয়েকটি মাসে মন্ত্রগ্রহণ ব্যক্তির জন্যে কল্যাণকর নাও হতে পারে। জ্যৈষ্ঠ মাসে মৃত্যু, আষাঢ় মাসে বন্ধুনাশ,ভাদ্রমাসে সন্তাননাশ এবং পৌষ মাসে শত্রুবৃদ্ধি ও দেহে পীড়া হতে পারে। মানুষ মন্ত্রসিদ্ধ হয়ে মুক্তিলাভের আকাঙ্ক্ষাতেই গুরুর কাছে দীক্ষিত হয়। সেই মুক্তিলাভের দৃষ্টিতে দেখলে কার্তিক-অগ্রহায়ণ দীক্ষা নেওয়ার জন্যে অত্যন্ত প্রশস্ত দুটি মাস।অথচ বর্তমানে অহরহ দেখা যায়, স্বামী-স্ত্রী, সন্তানসন্ততি সহ সম্পূর্ণ পরিবার একইদিনে বছরের যে কোন সময়েই দীক্ষা নিচ্ছে। বিষয়টি জনপ্রিয় হলেও, শাস্ত্রের বিধানে যৌক্তিক নয়।

(লেখক কুশল বরণ চক্রবর্ত্তী সহকারী অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.