ওয়াকফ সম্পত্তি: দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠার অন্যতম হাতিয়ার- (১)

0
576

© দেবতনু ভট্টাচার্য

১২০৪ সাল থেকে বঙ্গভূমির উপরে ইসলামের আক্রমণ শুরু হয়। বখতিয়ার খিলজি নবদ্বীপ দখল করেন। সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য উত্তর দিকে যাত্রা শুরু করে তিনি কোচদের হাতে সম্পূর্ণভাবে পর্যুদস্ত হন এবং ১২০৬ সালে তার মৃত্যু হয়। কিন্তু উল্লেখযোগ্য যে এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সদ্য অধিকৃত নদীয়ায় বেশ কয়েকটি মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকাহ তৈরি করেন। যে কোনও মুসলিম সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দেখা যায় যে মুসলিম শাসকরা অধিকৃত ভূমিতে গুরুত্ব সহকারে মসজিদ, মাদ্রাসা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছেন। শক, হূণ, কুষাণ ইত্যাদি বহিরাগত হানাদারদের আক্রমণের সাথে ইসলামী আক্রমণের এটা অন্যতম মূলগত পার্থক্য। মুসলমানদের আক্রমণের পিছনে শুধুমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের প্রেরণা ছিল না, ছিল ধর্মীয় প্রেরণা। অবশ্য ইসলাম অনুযায়ী সাম্রাজ্য বিস্তার (দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠা) এর জন্য বিধর্মীদের সাথে যুদ্ধ (জেহাদ), বিধর্মীদের সম্পদ এবং নারী লুন্ঠন (গনিমতের মাল) এগুলিও ধর্মীয় অনুষ্ঠান। তাই আমরা সনাতন ধর্মকে যে চোখে দেখি, ইসলামকে সেই চোখে দেখলে হবে না। আমাদের সনাতন ধর্মও অবশ্যই রাজনীতি বাদ দিয়ে নয়। রামায়ণ, মহাভারত পড়ুন, রাজা হরিশচন্দ্র, রাজা উশীনরের উপাখ্যান পড়ুন, জানতে পারবেন সনাতনী দৃষ্টিতে ক্ষাত্রধর্ম কি। ওদের সাথে আমাদের এই পার্থক্য সাংস্কৃতিক উত্তরণের স্তরের পার্থক্য। চাল, ভাত আর পায়েসের মধ্যে যে পার্থক্য থাকে, এই পার্থক্য হল সেটাই। তাই ধর্মের প্রসঙ্গ উঠলেই মুড়ি-মুড়কি একদর গোছের ধর্মনিরপেক্ষতার বুলি না আওড়ে আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে।

যাইহোক, মূল আলোচ্য বিষয় জমি দখল। এবং সেটা বিশ্বব্যাপী নিজেদের মতবাদের প্রতিষ্ঠা এবং অন্যান্য মতবাদের ধ্বংসের উদ্দেশ্যে। মুসলিম আক্রমণের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখবেন যে কোনও এলাকায় তাদের শাসন প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরেই সেখানে মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাহ, মাজার ইত্যাদির প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে গুরুত্ব সহকারে এবং এই উদ্দেশ্যে অধিগ্রহণ করা জমিকে আল্লাহ-র কাছে উৎসর্গ করা হয়েছে, অর্থাৎ সেই জমির মালিক হয়েছেন আল্লাহ স্বয়ং। আল্লাহর মালিকানাধীন এই ধরণের সম্পত্তিকে আউকাফ বা ওয়াকফ সম্পত্তি বলা হয়। মুসলিম শাসনাধীন বঙ্গে শাসকদের এবং সাধারণ মুসলিম সমাজের উদ্যোগে এইভাবে অসংখ্য ওয়াকফ সম্পত্তি তৈরি হয়েছে যেগুলোর বেশিরভাগই দেশভাগের পরেও ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবেই আছে, অধুনা বাংলাদেশে তো বটেই, এমনকি আমাদের পশ্চিমবঙ্গের মাটিতেও।

দেশে এখন ৬ লক্ষের বেশি ওয়াকফ সম্পত্তি, যার ৪৯% আছে কর্ণাটক, পশ্চিমবঙ্গ এবং উত্তরপ্রদেশে। দেশে প্রতিরক্ষা, রেল মন্ত্রকের পর তৃতীয় বৃহৎ সম্পত্তি রয়েছে ওয়াকফ বোর্ডের হাতে। সাচার কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে ওয়াকফ সম্পত্তি রয়েছে প্রায় ১ লক্ষ ৪৮ হাজার ২০০ টি। যার মাত্র ২৩ হাজারের মতো সম্পত্তি রয়েছে ওয়াকফ বোর্ডের আওতায়। প্রায় ১ লক্ষ ২৫ হাজার সম্পত্তির কোন হদিস নেই। ২০১০ সালে কলকাতা বাদে গোটা রাজ্যে ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ে যে সার্ভে করা হয় তাতে দেখা গিয়েছে ১৬,৪৩,৩৬০ একর সম্পত্তি রয়েছে গোটা রাজ্যে।

কলকাতায় ব্রিটিশরা টিপু সুলতানের পরিবারকে নির্বাসিত করেছিল টালিগঞ্জে। সেই টালিগঞ্জের প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের সংলগ্ন সতীশচন্দ্র রায় রোডের ওয়াকফ সম্পত্তির উপরে আজ মার্কেট কমপ্লেস হলেও জমির মালিকানা কার হাতে? প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডেই অবস্থিত দাতাবাবার মাজার। দাতাবাবা মাজার লাগোয়া আরপি কলোনির সম্পত্তি ওয়াকফ সম্পত্তি। টালিগঞ্জে গলফ-ক্লাবের জমি ওয়াকফের, ক্লাব আজও তার ভাড়া দেয়। কলকাতার (দক্ষিন) যাদবপুরের মতো জায়গার সুলেখা মার্কেট, গড়ফা, পূর্বাচল কিংবা সন্তোষপুরে ব্যাপক সংখ্যক ওয়াকফ সম্পত্তি কিন্তু ওয়াকফ সম্পত্তি। রাজভবন (গভর্নর হাউস), মোহামেডান, ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান ক্লাবের জায়গাও ওয়াকফের। এমনকি আকাশবাণী ভবন (কলকাতা), ফোর্ট উইলিয়ামস (ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় সদর দপ্তর), ময়দান ও সংলগ্ন এলাকা, ইডেন গার্ডেনস ওয়াকফ সম্পত্তি। সবই ওয়াকফ সম্পত্তি, যার জমির পরিমাণ ২৫৫৫ বিঘা। ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত সরকার ১৯৯ টাকা ভাড়া দিত। তারপর মোতায়ালি (তদারক কারী) মওলানা আবুল বরকত সাহেব ৯৯ বছর বয়সে মারা গেলে তার উত্তরাধিকারীকে আর ভাড়া দেয় না রাজ্য সরকার। বাংলা বিহার-ওড়িশার নবাব আলীবর্দি খাঁ তার শাসনকালে এই ২৫৫৫ বিঘা জমি দান করে যান।

লক্ষ্য করুন, মুসলিম শাসনের অবসান হয়েছে, ইংরেজ শাসন শেষ হয়েছে, ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হয়েছে কিন্তু একটা বিশাল পরিমাণ জমির মালিক থেকে গেছেন আল্লাহ। অর্থাৎ এই জমির উপরে মুসলমানদের দখল থেকে গেছে আইনত। মুসলমানরা ইতিমধ্যেই ওয়াকফ সম্পত্তিগুলোর দাবিদার হিসেবে আওয়াজ তোলা শুরু করেছে। দেশভাগের সময় অনেকেই পাকিস্তানে চলে গিয়েছিল। পরবর্তীতে বাংলাদেশের নাগরিক হয়েও পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে যাওয়া ওয়াকফের দিকে তাদের নজর আছে।

কিছুদিন আগের ঘটনা। একজন বাংলাদেশী নাগরিক নিজেকে বিখ্যাত পান্ডুয়া মসজিদের মোতোয়ালি হিসেবে দাবি করেন। তিনি পান্ডুয়ায় থেকে মোতোয়ালি হিসেবে কাজও শুরু করছিলেন। অভিযোগ ওঠায় আদালত তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল মালদা জেলার প্রশাসনকে। যদিও তিনি নিরুদ্দেশ হয়ে যান। কিছুদিন আগে দক্ষিণ ২৪ পরগনার একটি ছেলে আমার সাথে দেখা করে। দেশভাগের সময় স্থানীয় এক মুসলমানের সাথে তারা ‘জমি বিনময়’ করে ভারতে চলে আসে। এখানে সেই মুসলমানের জমিতে একটি ছোট মসজিদ ছিল। বাংলাদেশ থেকে আসা পরধর্মে শ্রদ্ধাশীল হিন্দু পরিবারটি সংস্কারবশতঃ সেই মসজিদটাকে ভেঙে ফেলে নি। কিছুদিন আগে বাংলাদেশে চলে যাওয়া সেই মুসলিম পরিবারের কোনও এক আত্মীয় স্থানীয় মুসলমানদের সঙ্গে নিয়ে এসে সেই মসজিদ এবং সংলগ্ন জমি ওয়াকফ বলে দাবি করে।

মনে রাখতে হবে যে রাজনৈতিক শাসন ক্ষমতা অস্থায়ী কিন্তু ওয়াকফের মাধ্যমে জমি দখল আইনত স্থায়ী। পৃথিবীর বুকে প্রতিটি ভূমিখন্ড হল ইউনিক। এর কোনও ডুপ্লিকেট হয় না। এক একটা প্লট এভাবে দখল হওয়া মানে হল স্বাধীন ভারতে আইনত নিজের পায়ের তলার মাটির উপরে হিন্দুর দখল হারানো।

(লেখক হিন্দু সংহতির সভাপতি)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.