১০ই ফেব্রুয়ারি; সোনাখালী দিবস- লালু, লাল্টু, অভিজিৎ

0
585

© তপন কুমার ঘোষ

শান্তি (লালুর স্ত্রী ) লালুর দুটো পা জড়িয়ে ধরে ডুকরে ডুকরে কাঁদছিল। আর বারবারই একই কথা কান্নাভেজা স্বরে বলে চলে ছিল, ‘ও ঠাকুর, আমি কি নিয়ে থাকবো!’

উনিশ বছরের শান্তি লালুর স্ত্রী। ও লালুর মৃতদেহের পা ধরে কাঁদছিল। সকলে টেনেও শান্তিকে লালুর পা ছাড়িয়ে আনতে পারছিল না।

‘ও ঠাকুর, আমি কি নিয়ে থাকবো ঠাকুর তুমি বলে দাও’ – এ আর্তনাদ যেন আমি সবসময় আমার কানে শুনতে পাচ্ছি।
পাঠক, আপনি কি আমাকে একটু বলে দেবেন যে ওই স্বর আমি কোনদিন ভুলতে পারবো কিনা?
আপনার কি এরকম কোন অভিজ্ঞতা আছে?

আমার নেই। এই প্রথম হলো। 12 দিন পর যখন লালুর বাড়িতে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম, শান্তি মাথায় আঁচল দিয়ে আমাকে প্রণাম করতে এসে ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলল। মুখে কোন কথা নেই। চোখে এক বোবা দৃষ্টি। সেই দৃষ্টিতে অনেক কথা। কিন্তু আমার সে অনুভূতি কই যে শান্তির সে দৃষ্টির সব কথা বুঝতে পারব? শান্তির মুখে কথা নেই। চোখে শুধু জল। কিন্তু আমি যে শুনতে পাচ্ছি 12 তারিখের রাতের সেই আর্তনাদ- ‘ ঠাকুর, আমি কি নিয়ে থাকবো ঠাকুর তুমি বলে দাও।’

শান্তি সরে গেল আমার সামনে থেকে। মা এলেন। শরীর দুর্বল, চলছে না। কোনরকমে চৌকিতে এসে বসে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আর শুধু কাঁদতে থাকলেন। শুধুই কাঁদতে থাকলেন। তাঁর দু হাতের বাঁধনের মধ্যে আমি ভয়ে কাঠ হয়ে বসে আছি। ভাবছি, এই বুঝি লালুর মা বলবেন – তুমি আমার ছেলেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেলে। দাও, আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দাও।

মাসীমা যদি একথা বলেন, আমি কি উত্তর দেবো? কিন্তু না।

মাসীমা তো সেকথা বললেন না। অতি ক্ষীণ স্বরে বললেন, বাবা হিন্দুরা বাঁচবে কি করে? ওরা কি কাউকেই রেহাই দেবে না?

মাসীমা বলে চললেন – লালু আমার গলা জড়িয়ে ধরে বলেছিল, মা, তোমার একটা লালু নয়, এরকম হাজার হাজার লালু আমি তৈরি করব। তারা হিন্দু সমাজকে রক্ষা করবে। আমার সেই একটা লালুই তো চলে গেল।

মাসীমা আবার কান্নায় ভেঙে পড়লেন।

আমি চৌকিতে বসে নিজের মনে মনে কথা বলতে লাগলাম, মাসীমা, আপনার ছেলে ধর্ম, সমাজকে রক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ দিল। সে জানতো, যে কোনদিন তার প্রাণ চলে যেতে পারে। তার বন্ধুরা, তার শুভানুধ্যায়ীরা, তাকে কত বারণ করেছিলো, কত সাবধান করেছিল।

কিন্তু সে যে স্বপ্ন দেখত এমন এক দিনের –

এসেছে সে এক দিন
লক্ষ পরাণে শঙ্কা না জানে
না রাখে কাহারো ঋণ
জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য
চিত্ত ভাবনাহীন। (রবীন্দ্রনাথ)

লালু তো জানত, এই পথে বিপদ আছে। তবু সে এই পথে এগিয়ে গেল কেন?

তার কি দায় পড়েছিলো অন্য হিন্দুদের রক্ষা করার কথা চিন্তা করার।

তার কি দায় পড়েছিলো মুসলিম দুষ্কৃতকারীদের হাত থেকে হিন্দু নারীদের সম্মান রক্ষা করার?

কই, সবাই তো একথা ভাবে না।

তাহলে লালুর মনে এ চিন্তা এলো কি করে?

নিজের উন্নতি নয়। হিন্দুদের রক্ষা।

মাসীমার হাতের বাঁধনের মধ্যে বসে আমি ভাবতে লাগলাম, মাসীমা, লালু তো এ চিন্তা আপনার কাছ থেকেই পেয়েছে। কারণ লালুর শরীরে যে আপনার রক্ত। আর আপনি তো একজন সাধারন নারী নন। আপনিতো ফণি বাংলার মেয়ে। বাসন্তী থানায় ফণি বাংলা নামে এক ডাকে সবাই চেনে। ফণি বাংলা অর্থাৎ ফণি মন্ডল। কেন চেনে?

কারণ এই ফণি মণ্ডল আজ থেকে 30 বছর আগে মুসলিম আততায়ীদের হাতে খুন হয়েছিলেন। 7 নং সোনাখালি গ্রামে। না ফণি মণ্ডল নিজের ধান রক্ষা করতে গিয়ে খুন হননি। নিজের জমি জায়গা রক্ষা করতে গিয়ে খুন হননি। তিনি খুন হয়েছিলেন গো হত্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে। অর্থাৎ ধর্ম রক্ষায়। সেই ফণি মন্ডলই তো লালুর দাদু, মাতামহ। লালু যে তারই নাতি। লালুর শরীরে যে তাঁরই রক্ত। সেই রক্তই তো মায়ের মধ্যে দিয়ে লালুর শরীরে এসেছিল।

তাই হিন্দু মা বোনদের উপর পাশবিক অত্যাচার, অসম্মান, অপমান দেখে লালু স্থির থাকবে কি করে?

ফণি মণ্ডলের রক্ত লালু কে স্থির থাকতে দেয়নি। সে ছটফট করেছে। প্রতিরোধ করতে, প্রতিকার করতে। তাই তো সে এগিয়ে গেছে। নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছে। দধীচি মুনি, অভিমুন্য, পৃথ্বীরাজ, তেগ বাহাদুর, গুরু গোবিন্দ সিং, ফতে সিং, জোড়াবর সিং এদের সঙ্গে আজ লালুর স্থান মহাকাশের একই নক্ষত্রলোকে, ইতিহাসের একই পাতায়।

মাসীমা তো এসব কথা জানেন। তাই তিনি আমাকে দোষারোপ করেন নি। শুধুই জড়িয়ে ধরে কেঁদেছেন।

আমি মাসীমাকে সান্তনা দেওয়ার একটা কথাও বলতে পারিনি। কিন্তু মনের মধ্যে আমার একটাই সংকল্প তৈরি হয়েছে। লালুর কাজ আমাকে সম্পূর্ণ করতে হবে। লালু নিজের বিধবা মা, দাদা, দিদি, 19 বছরের স্ত্রী, দেড় বছরের ঐ ফুটফুটে শিশু কন্যাটি – এইসব মায়া ফেলে চলে যেতে পারল, তাহলে আমাদের কিসের ভয়, কিসের মায়া?

লালুর কাজ আমরা করবই। আমি করবই। মাসীমা, আপনাকে সান্ত্বনা দেব না। শুধু আমার সংকল্প আপনাকে জানাবো। লালুর কাজ আমি করব। আমার সঙ্গে যে আসবে, যারা আসবে, তাদেরকে নিয়েই করবো। যদি আমার সঙ্গে কেউ না আসে, তাহলে আমি একাই করবো। আর কিছু না পারি, লালু তো হতে পারব। শহীদ তো হতে পারব। ফণি বাংলা আর লালুর সঙ্গে এক সারিতে গিয়ে বসবো। এই পৃথিবীতে নয়। অন্য কোথাও।

লালু পড়াশোনায় ভালো ছিল। নিমপীঠ রামকৃষ্ণ আশ্রম এর ছাত্র ছিল। তাকে বন্ধু স্বয়ংসেবকেরা ডাকতো লালু ও লালুদা। আত্মীয়রা ডাকত অভিজিৎ। গৃহশিক্ষক হিসেবে ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। আর সংগঠক হিসেবে ছিল অসাধারণ। তারই প্রচেষ্টায় বাসন্তী থানার গ্রামে গ্রামে আর এস এসের শাখা গড়ে উঠেছিল। শাখায় শাখায় হিন্দু যুবকরা সংগঠিত হচ্ছিল। দীর্ঘদিনের অত্যাচারিত হিন্দুসমাজ একটা আশার আলো দেখতে পাচ্ছিল। লালুর ব্যবহার মধুর ছিল যে তার ব্যবহারের দ্বারা শিশু-কিশোর-তরুণ যুবক আর তাদের অভিভাবক সকলকে আপন করে নিত। সবাইকে উৎসাহিত করত। কিন্তু সবাইকে সমানভাবে কাজে এগিয়ে আনত না। এক একজনের মনে কতটা সাহস আছে, তার কতটা পিছুটান আছে, তার আশেপাশের পরিস্থিতি কি, এসব বিবেচনা করে যাকে যতটুকু এগিয়ে আনার, ততটুকু এগিয়ে আনত। প্রত্যেককে এমনভাবে কাজ দিত যাতে সে চাপ মনে না করে। ফলে সকলে খুশিমনে লালুর দেওয়া কাজ করতো। এরফলেই সংগঠনের কাজ এগিয়ে যেত। আর বিপদ? যেটা সবথেকে কঠিন জায়গা, যেখানে ঝুঁকি সবথেকে বেশি, সেখানে অন্যকে পাঠাতো না। সেখানে নিজে এগিয়ে যেত। ওর কাছের সহকর্মীরা, যুবকরা, এসব দেখত। তাইতো তারা তাদের লালুদা কে এমন প্রাণ দিয়ে ভালোবাসত। সত্যি কথা বলতে লালু ছিল এক অসাধারণ সাহসী ও নিপুণ সংগঠক।

আমি কতবার মনে মনে ভাবতাম, আমরা সারা ভারতে কত বড় বড় কার্যকর্তা দেখি। তাদের কত নামডাক। আমি তো তাঁদের কত কাছ থেকে দেখেছি, মিশেছি। কিন্তু এই দুর্গম সুন্দরবনের ধারে, এই দূর বাসন্তীতে এই ছেলেটিকে দেখেছি, কই, কারো থেকে তো কম মনে হচ্ছে না এই ছেলেটিকে। এত নিপুন সংগঠক, এমন প্রখর আদর্শবাদী, এমন নিঃস্বার্থ, এমন নেতৃত্ব গুণসম্পন্ন যুবক, বাসন্তীর এই অজপাড়া গ্রামে কি করে তৈরি হলো? তারপর ভাবতাম, তাহলে কি এরকম ছেলে ভারতের গ্রামে গ্রামে ছড়ানো আছে? তাহলে তো এদেশের আশা আছে। মনে আত্মবিশ্বাস বেড়ে যেত।

হিন্দু সমাজের আত্মসম্মান রক্ষার লড়াই লালু বাসন্তী থেকে শুরু করেছিল। কিন্তু ওর মনটা যে ছিল বড়। তাই এই লড়াইকে ও প্রসারিত করেছিল বাসন্তীর বাইরেও। তাতে ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু এক দিক থেকে লাভও হয়েছে। লালুর প্রেরণা আজ শুধু বাসন্তীর যুবকের নয়, কলকাতা ও অন্যান্য এলাকার বহু যুবককেও অনুপ্রাণিত করবে, করছে।

অসাধারণ সংগঠক লালু, সকলের বিশ্বাসের পাত্র নীরব কর্মী পতিত পাবন, অদম্য সাহসী মিষ্টি যুবক অনাদি, নির্ভীক কিশোর সুজিত আজ শহীদ হয়েছে। তারা আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু আছে আছে। তারা আমার মধ্যে আছে। তারা দুনিয়া ছেড়ে গেলেও আমাকে ছেড়ে যেতে পারবে না। তারা আকাশের নক্ষত্রের মধ্যে বসে দেখবে যে তাদের তপনদা তাদেরই কাজ করছে। অন্য কোন কাজ নয়।

05/03/2001

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.