সহজ সত্যকে অস্বীকার করা হিন্দুর জাতীয় রোগ

0
451

© তপন ঘোষ
   

সহজ সত্যকে স্বীকার না করা পৃথিবীর আর কোন দেশের মানুষের স্বভাব আছে কিনা জানি না , কিন্তু ভারতের হিন্দুদের আছে । অর্থাৎ চোখের সামনে সবসময়ে যা দেখা যাচ্ছে , শােনা যাচ্ছে , বােঝা যাচ্ছে তাকেও স্বীকার না করা । গােটা পৃথিবীতে মুসলমান এবং অমুসলমানের মধ্যে সম্পর্ক কেমন তা না জানা থাকলেও , ভারতে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে সম্পর্ক কেমন তা না জানার , না বােঝার কোন কারণ আছে কি ? হিন্দু ও মুসলমান পাশাপাশি বাস করে । আমাদের মতাে সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদীরা গিয়ে খোঁচাখুঁচি না করলে হিন্দু ও মুসলমান পাশাপাশি শান্তিতে বসবাস করে কি ? তাহলে কলকাতার পার্ক-সার্কাস ক্রমেই হিন্দুশূন্য হয়ে যাচ্ছে কেন ? এটা কি কলকাতার মানুষের চোখে পড়ে না বা জানা নেই ? আমাদের পাশেই বাংলাদেশে ক্রমাগত হিন্দু নির্যাতন ও পরিণামে হিন্দু পলায়ন , এটাও কি শুধু হিন্দু বা মুসলিম সাম্প্রদায়িক শক্তির উসকানির পরিণাম ? যে কোন হিন্দু , যে কেনার জন্য বা ভাড়া নেওয়ার জন্য একটা বাড়ি খুঁজছে , সে মুসলমান । পাড়ায় গিয়ে বাড়ি নিতে চাইবে কি ? হিন্দুদের বড় উৎসব দুর্গাপূজায় ( যেখানে ধর্মের অনুসঙ্গ খুবই কম থাকে , আর শিল্প সংস্কৃতি হৈ-হুল্লোড় খাওয়া-দাওয়া ইত্যাদি অনেক বেশি পরিমাণে থাকে ) প্রতিবেশী মুসলমানরা কতটুকু অংশ গ্রহণ করে ? আর মুসলমানের কয়েকটি বড় বড় উৎসবে । যেমন ইদুজ্জোহা , ইদুলফিতর , সবেবরাত ইত্যাদি অনুষ্ঠানে প্রতিবেশী হিন্দুরা কতটুকু অংশগ্রহণ করে ? বহু পীরের মাজারে হিন্দুরা গিয়ে ধূপকাঠি জ্বালায় , কিন্তু কোন সন্ন্যাসীর সমাধিতে গিয়ে কোন মুসলমানকে শ্রদ্ধা জানাতে দেখেছেন কি ? আমি সুন্দরবন অঞ্চলে অনেক ঘুরেছি । বহু জায়গায় বনবিবির মূর্তি ও মন্দির দেখেছি । শহরে প্রচলিত ধারণা যে বনবিবির মন্দিরে , যারা মধু সংগ্রহে গভীর জঙ্গলে যায় যেখানে বাঘের ভয় আছে , সেই হিন্দু ও মুসলমানরা উভয়েই পূজা দেয় । কিন্তু এই প্রচলিত ধারণা একেবারেই ভুল । সুন্দরবনের গায়ে বহু হিন্দু গ্রাম আছে , মুসলিম গ্রাম আছে ও হিন্দু-মুসলিম মিশ্র গ্রামও আছে । আমি চ্যালেঞ্জ করে বলছি , যে কোন একটি পুরােপুরি মুসলিম গ্রাম বা মুসলিম পাড়ায় বনবিবির মন্দির বা মূর্তি এবং মুসলমানদের দ্বারা সেখানে পূজা দেওয়া দেখিয়ে দিন । কেউ পারবে না । শুধুই হিন্দু গ্রামে বা হিন্দু পাড়ায় বনবিবির মন্দির বা মূর্তি এবং তাতে পুজো দেওয়া দেখা যাবে । অর্থাৎ ঐ দেবী কার্যত শুধুই হিন্দুদের দেবতা । তাহলে তার নাম বনবিবি কেন ? সহজভাবেই তাে তার নাম বনদেবী হওয়া উচিৎ ছিল ! তা হল না , কারণ হিন্দু মুসলমান মিলনের সমস্ত দায় হিন্দুকে একা বহন করতে হবে । তাই দেবীকে বিবি বানাতে হবে । কিন্তু তা বানিয়েও কি মিলন হল ? সুন্দরবন সংলগ্ন গ্রামগুলিতে গিয়ে দেখে আসুন , সম্পূর্ণ অন্য চিত্র দেখতে পাবেন ।
    সুতরাং এই সহজ সত্য , যা কলকাতার পার্ক-সার্কাস , মেটিয়াব্রুজ থেকে শুরু করে সুন্দরবনের জঙ্গল পর্যন্ত দেখা যায় , তাকে স্বীকার না করা একটা মহারােগ । এই রােগেরই পরিণাম আমরা সবসময়ে ভুগছি । জাতীয় স্তরে এই রােগের পরিণাম হল , ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর দুই দেশে হিন্দু-মুসলিম জন-বিনিময় না করা । আর ক্ষুদ্র পরিসরে — গােটা দেশে গ্রামে গ্রামে , শহরের মিশ্র এলাকায় এর পরিণাম আমরা দেখতে পাচ্ছি । তাই হিন্দু-মুসলিম মিশ্র এলাকায় কি দুর্গাপূজার বিসর্জনে , কি মহরমের মিছিলে পুলিশকে এত সতর্ক ও তটস্থ থাকতে হয় । 
 

দেশ বিভাগের পূর্বে অসংখ্য দাঙ্গা , দেশ বিভাগের সময় গণহত্যা , এমনকি দেশ বিভাগের পরও সারা ভারতে যত বড় বড় দাঙ্গা হয়েছে —  তার খবর কি কেউ জানে না ? ১৯৬৪ সালে কাশ্মীরের ‘ হজরতবাল মসজিদ ’  থেকে মহম্মদের চুল চুরি যাওয়ার গুজবে বা অজুহাতে গােটা ভারতে ভয়ংকর দাঙ্গা হল । আমি ছােট বেলায় বাড়ির ছাদ থেকে কলকাতায় সেই দাঙ্গার আগুন দেখেছি । সেই অহেতুক দাঙ্গার কথা বয়স্ক মানুষেরা কি ভুলে গিয়েছেন ? নাকি জোর করে ভুলতে চেয়েছেন ?
   

এই সহজ সত্যকে আমরা স্বীকার করি না বলেই ইতিহাসের কিছু সহজ সত্য আমরা দেখতে পাই না । নেশনস্টেট-এর কনসেপ্ট বা অবধারণা খুব বেশি পুরানাে নয় । তার আগে রাজ্য নির্ধারিত হত রাজাদের জয় বা পরাজয়ের উপর ভিত্তি করে । তাই রাজ্যের ভাঙা-গড়া বা সীমানা পাল্টানাে খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল । ইউরােপে এই সেদিন পর্যন্ত বহু দেশের বা রাজ্যের ভাঙা গড়া হয়েছে । ঠিক তেমনিভাবে ভারতেও রাজাদের জয় পরাজয়ের দ্বারা রাজ্যের সীমা নির্ধারিত হত । কিন্তু বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার যে মানচিত্র আমরা দেখি , তাতে দেশগুলির যে সীমানা আমরা দেখি তা কিন্তু শুধু রাজাদের জয়-পরাজয়ের দ্বারা নির্ধারিত হয়নি । তা নির্ধারিত হয়েছে , আমাদের ধর্মের জয়-পরাজয়ের দ্বারা । আফগানিস্তান , পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আগে ভারতেরই অঙ্গ ছিল । এই তিনটি দেশ আজ বিদেশে পরিণত হয়েছে শুধু ভারতের কোন রাজাদের পরাজয়ের জন্য নয় । তা যদি হত তাহলে সেখানে আমরা হিন্দুদেরকে দেখতে পেতাম । কিন্তু তা পাচ্ছিনা । অর্থাৎ ভারতের ঐ সকল অংশে আমাদের হিন্দু ধর্মের পরাজয় হয়েছে । তাই প্রাচীন অখণ্ড ভারতের ঐ অংশগুলি আজ শুধু বিদেশী রাষ্ট্রে পরিণত হয় নি , তা আজ হিন্দুশূন্য হয়েছে ।
   

সুদূর আফগানিস্তান বা বালুচিস্তান বা সিন্ধপ্রদেশ হিন্দুশূন্য হওয়া আর কলকাতার পার্ক-সার্কাস হিন্দুশূন্য হওয়া-এর মধ্যে কোন মিল কি দেখা যায় না ? সুসভ্য সুশিক্ষিত ও সুশীল মানুষরা দেখতে পান না , আমি দেখতে পাই । সেই মিলটা কী ? সেই মিলটা হচ্ছে , হিন্দু আর মুসলমান পাশাপাশি শান্তিতে বসবাস করতে পারে না । কেন পারে না সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজা দরকার আছে কি ? সুশীল সভ্য মানুষরা মনে করেন দরকার নেই। আমি মনে করি দরকার আছে। এই প্রশ্নটাকে এড়িয়ে গেলে বিশাল ভারতবর্ষ বা হিন্দুস্থান বর্তমানে যতটা ছােট হয়েছে , সেটুকুতেই থেমে থাকবে না , আরও ছােট হতে থাকবে। আমার এই কথাটা খুবই অসম্ভব , অবাস্তব ও সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক বলে মনে হচ্ছে কি ? তাই যদি হয় তাহলে স্বাধীন ভারতেও কাশ্মীরে আজ হিন্দু থাকতে পারে না কেন ? পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বড় অংশ নিয়ে ‘ গ্রেটার বাংলাদেশের আওয়াজ শােনা যায় কেন ? ভারতের মুসলিম প্রধান এলাকাগুলিতে হিন্দুকে ভয়ে ভয়ে থাকতে হয় কেন ? আর তারই প্রতিক্রিয়ায় উত্তরপ্রদেশে মুজফফর নগরে অথবা আসামের বােড়ােল্যান্ডে মুসলমানকে ভয়ে ভয়ে থাকতে হয় কেন ? 
 

যে সহজ সত্যের কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম , সেই সহজ সত্যটা হচ্ছে এই যে ৭১১ সালে হিন্দু রাজা দাহিরের রাজ্য সিন্ধের উপর মহম্মদ বিন কাশেমের আক্রমণ থেকে আজ পর্যন্ত এগারােশ বছরের ইতিহাসের যে সময়টা , তার মােট ফল হল — হিন্দুসমাজ তার মাটি হারিয়েছে , মানুষ হারিয়েছে ( হত্যা ও ধর্মান্তকরণ ) , সম্মান হারিয়েছে । এইসব হারানাের পরেও কি সেই পর্বটা ( হারানাের পর্ব ) সমাপ্ত হয়েছে ? একটু চোখ কান খােলা রাখলে দেখতে পাবেন , সেই পর্বটা সমাপ্ত হয়নি । এখনও চলছে । এই পর্বটাকে অন্যরা যে নামেই অভিহিত করুন না কেন , আমি বলব এটা যুদ্ধ পর্ব । সেই যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি , এখনও চলছে । সুতরাং এটাও বুঝতে হবে যে , যুদ্ধ যখন চলছে তখন চূড়ান্ত জয় বা পরাজয় কারাে হয়নি । অর্থাৎ হিন্দু জাতি অনেক কিছু হারিয়েছে , কিন্তু চূড়ান্ত পরাজয় এখনও মেনে নেয়নি । সেটুকুই আশা । তা না হলে আজ ভারত সিরিয়া বা ইরাক হয়ে যেতে পারত । তা হয়নি । 
  কিন্তু সমস্যাটা হল এই যে আমরা যুদ্ধাবস্থায় আছি এটা সমাজ স্বীকার করে কি ? করে এবং করে না । যারা মুসলমানের জ্বালায় জ্বলছে তারা স্বীকার করে । কিন্তু শহরের শিক্ষিত বুদ্ধিজীবি অংশ স্বীকার করে না । কিন্তু তারাই তাে সমাজের মস্তিষ্ক ! সেই মস্তিষ্ক স্বীকার না করলে এই যুদ্ধাবস্থা বাকি সমাজও বুঝতে পারেনা । ফলে মুসলিমের জ্বালায় যারা জ্বলছে তারা মনে করে যে এটা তাদের স্থানীয় সমস্যা মাত্র । তাই তারাও বৃহত্তর হিন্দুসমাজের সহযােগিতা আশা করেনা । ফলে সুদীর্ঘ এগারাে’শ বছরের যুদ্ধ চলতেই থাকে । হিন্দু তার মাটি , মানুষ ও সম্মান হারাতেই থাকে ।

তাই আজকে সেই যুদ্ধের স্বীকৃতি চাই । সমাজের মস্তিষ্কের সাথে বাকি বৃহত্তর সমাজের যে ডিস্কানেক্ট আছে। তা দূর করতেই হবে। সমাজ মস্তিষ্ক ও সমাজ শরীরকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সে দায়িত্ব সমাজ মস্তিষ্কেরই বেশি। অর্থাৎ শিক্ষিত বুদ্ধিজীবি শ্রেণিকে এই এগারােশ বছর ব্যাপী চলা যুদ্ধকে স্বীকার করতে হবে। তবেই দেশের এই সীমানা ছােট হওয়া ও সমাজের হিন্দুর অনুপাত / শতাংশ কমা রােখা যাবে। কিন্তু ওই যুদ্ধকে অস্বীকার করলে তা রােখা যাবে না। 

আমি বারবার বলেছি হিন্দু সমাজ ভীতু নয় , কাপুরুষ নয়। একটু খুঁটিয়ে দেখলে দেখা যাবে , হিন্দুসমাজের বহু গােষ্ঠী অত্যন্ত সাহসী ও দুর্ধর্ষ। কিন্তু তা সত্ত্বেও হিন্দুসমাজকে দুর্বল ও ভীরু বলে মনে হয়। তার কারণ কী ? তার একমাত্র কারণ হল হিন্দু সমাজের মস্তিষ্কের ( উচ্চ শ্রেণির ) সঙ্গে বাকি বৃহত্তর সমাজের ডিস্কানেক্ট , যাদের মধ্যে আছে এই সাহসী গােষ্ঠীগুলি। একেবারে উত্তর ভারতের কথা ধরা যাক। জাঠ , রাজপুত , ডােগরা , গুজ্জর , যাদব , খটিক , বাল্মীকি- সবগুলিই অত্যন্ত সাহসী গােষ্ঠী , সবাই জানে। কিন্তু উত্তর ভারতের নেতা বললেই চোখে ভেসে ওঠে পন্ডিত জওহরলাল নেহেরুর নাম , যিনি ছিলেন কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ , চরম ভীতু ও কাপুরুষ। তিনি ইংলন্ড , আমেরিকা ও রাশিয়ার ইতিহাস, ভূগােল ও সমাজশাস্ত্র যতটা জানতেন , তার সিকিভাগও উত্তর ভারতের এই সাহসী জনগােষ্ঠীগুলির কথা জানতেন না। এরই নাম ডিস্কানেক্ট। এরকম শুধু উত্তর ভারত নয় , গােটা ভারতের একই পরিস্থিতি। পূর্ব ভারতের কথা আমি খুব ভালাে করে জানি। এখানেও সাহসী গােষ্ঠীর অভাব নেই বরং সাহসী গােষ্ঠীতে ভরপুর। একটা ছােট্ট উদাহরণই যথেষ্ঠ । ১৯৮৩ সালে আসামে নেলি – তে একটি ছােট্ট হিন্দু জনগােষ্ঠী তিন হাজারের বেশি মুসলমানকে হত্যা করেছিল। আমাদের দুই বঙ্গের কথা আমি অন্যত্র বিশদভাবে আলােচনা করেছি এবং কত সাহসী ও দুর্ধর্ষ জাতি আমাদের এই দুই বাংলায় আছে তা উল্লেখ করেছি। 
   

সুতরাং , এগারাে’শ বছর ধরে চলা যুদ্ধের স্বীকৃতি এবং নিজেদের ধর্ম ও সমাজকে বাঁচানাের জন্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া আজ যুগের প্রয়ােজন। আর এই যুদ্ধে জেতার জন্য আমাদের সমাজের বর্তমানে পিছিয়ে পড়া যে সাহসী ও দুর্ধর্ষ গােষ্ঠী বা জাতিগুলি আছে , তাদেরকে যােদ্ধা বা ক্ষত্রিয়ের মর্যাদা দেওয়া- এটাই আজকের যুগধর্ম। এই যুগধর্ম যদি আমরা সঠিকভাবে পালন করতে পারি তাহলে আমরা বিজয়ী হব এবং ইতিহাসের মােড় অন্যদিকে ঘুরবে। না হলে হিন্দুসমাজ ও হিন্দুধর্ম ভারতবর্ষ থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। আর যেহেতু সনাতন ধর্মের বিনাশ নেই তাই এই সনাতন হিন্দুধর্ম হয়তাে রাশিয়া , আমেরিকা বা বিশ্বের অন্য ভূখন্ডে থাকবে , কিন্তু এখানে থাকবেনা।
 

(লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় স্বদেশ সংহতি সংবাদের পূজা সংখ্যায় ২০১৬ সালে)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.