ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি- বাঙ্গালীর ভাগ্যাকাশে কালো মেঘ

0
2744

© শান্তনু সিংহ

HISTORY REPEATS ITSELF — সরল বাংলা তর্জমা, ইতিহাস পুনরাবৃত্তি হয়। কিন্তু এর গূঢ় অর্থ অন্য। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়, কারণ ইতিহাস থেকে আমরা কিছু শিক্ষা নেই না। যাঁরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেন, তাঁদের STATESMAN বলা হয়। আর যাঁরা শিক্ষা নেন না, তাঁদের বলা হয় POLITICIAN।

কিন্তু এদেশের দুর্ভাগ্য, পলিটিশিয়ানরা সংখ্যায় ভারি, স্টেটসম্যানদের ওপর ক্ষমতার ছড়ি ঘোরান তাঁরা ।

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের দ্বিতীয় সরসঙ্ঘচালক পরম পূজনীয় গুরুজি, মাধব সদাশিব গোলওয়ালকার, বলতেন – A POLITICIAN THINKS FOR NEXT ELECTION, A STATESMAN THINKS FOR NEXT GENERATION।

ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী স্টেটসম্যান ছিলেন। তাই পলিটিশিয়ানের চাদরে না থেকে স্টেটসম্যানের দূরদৃষ্টি নিয়ে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, বাঙালি হিন্দুর জন্য একটা হোমল্যান্ড চাই। ডক্টর মুখার্জি কোরআন-হাদিস পড়েছিলেন কিনা জানিনা, কিন্তু কোরআন হাদিস পড়া এবং কোরআন-হাদিসের শিক্ষায় বড় হওয়া মুসলমান সমাজ ও তাদের প্রতিভূ মুসলিম লীগ নেতাদের সম্যক তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। দেশভাগ হলে পাকিস্থানে হিন্দুরা থাকতে পারবে না, অথবা থাকলে তাদের তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে থাকতে হবে, এটা বোঝার জন্য দরকার ছিল স্টেটসম্যানের দৃষ্টিভঙ্গি, যা গান্ধীর ছিল না, নেহেরুর তো নয়ই। তাই যখন দেশভাগ অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিল, তখন ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বাংলা ভাগ করার জন্য। মুসলমানরা দাবি করেছিল, হিন্দুদের সাথে তারা থাকতে পারবে না, কারণ তারা নিজেরাই একটা জাতি, ভারতীয় জাতির মধ্যে বা ভারতীয় জাতীয়তার মধ্যে তারা নিজেদের আবদ্ধ রাখতে পারে না।

মুসলমানদের এই দৃষ্টিভঙ্গির উত্তর ছিল একটাই। মুসলমান যদি হিন্দুর সঙ্গে থাকতে না পারে, তবে হিন্দুরও মুসলমানের সাথে থাকা সম্ভব নয় । তাই বাঙালি হিন্দুর জন্য চাই বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড। তৈরি হলো পশ্চিমবাংলা।

তাই একথা ঐতিহাসিক সত্য যে পশ্চিমবাংলা তৈরি হয়েছিল বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড হিসেবে। মুসলমানদের থাকবার জায়গা হিসেবে নয়। বাঙালি মুসলমানদের জন্য নয়, অবাঙালী মুসলমানদের জন্যও নয়।

এটা ইতিহাসের দলিল, 20 জুন বঙ্গীয় আইনসভায় যে ভোটাভুটি হয়েছিল। মুসলমান সংরক্ষিত ১১৯ টি আসনে নির্বাচিত মুসলমান বিধায়কের মধ্যে ১১৪ জন মুসলমান বিধায়কেরই পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। বাংলাকে ভালোবেসে বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড পশ্চিম বাংলার পক্ষে ভোট দেয়নি। কিন্তু সেই মুসলমান বিধায়কদের যে মুসলমানরা নির্বাচিত করেছিল, সেই মুসলমানরা বাংলার দুই-তৃতীয়াংশ ছিনিয়ে নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান করলেও, তারা কিন্তু রয়ে গেল এপার বাংলায়, অর্থাৎ পশ্চিমবাংলায়, অর্থাৎ বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড এ।

ডক্টর মেঘনাদ সাহা, ডক্টর সুনীতি চট্টোপাধ্যায়, ডক্টর যদুনাথ সরকার – যাঁরা বাঙালি হিন্দুকে মুসলমান শাসনের গিনিপিক এ পরিণত না করবার জন্য ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর এই বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন, তারাও তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বুঝতে পেরেছিলেন, ভারতবর্ষে বা বাংলায় মুসলমানরা মুসলমানই হয়ে আছে, ভারতীয় বা বাঙালি হতে পারেনি। চট্টগ্রামে ৮0% মুসলমান জনসংখ্যার প্রাচুর্য থাকা সত্বেও চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনে একজন মুসলমান বিপ্লবীর নাম নেই ।ঢাকায় ৬০% মুসলমান জনসংখ্যা হওয়ার পরেও একজন মুসলমান বিনয় বসুদের সাথে রাইটার্স এর অলিন্দ যুদ্ধ অংশগ্রহণ করেনি।

তাই কথা সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এদেশের ভালো-মন্দ চিন্তা করার জন্য হিন্দুদের ওপরই দায়িত্ব দিয়েছেন, আর আক্ষেপ করেছেন, মুসলমানদের এদেশের প্রতি কোন দরদ নেই। তাদের সব সত্তা পড়ে আছে আরবে।

শুধু বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড পশ্চিমবাংলা তৈরি করেই ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী তাঁর কর্তব্যের ইতি টানতে চান নি। বাঙালি হিন্দু যেন আরেকবার মুসলমানদের ইসলামি রাজনীতির কারণে উদ্বাস্তু না হয়,তার জন্য স্টেটসম্যান ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি চেয়েছিলেন EXCHANGE OF POPULATION। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি হিন্দুরা চলে আসুক তাদের জন্য তৈরি হোমল্যান্ড পশ্চিমবাংলায়, আর বাঙালি হিন্দুর হোমলান্ড পশ্চিমবাংলা থেকে মুসলমানরা চলে যাক তাদের জন্য তৈরি পূর্ব পাকিস্তানে। কিন্তু পলিটিশিয়ান গান্ধী বা নেহেরু তা হতে দেননি। আর তা না হওয়ার ফল, আজ আব্বাস সিদ্দিকী, ত্বহা সিদ্দিকীর মতো নেতারা মুসলমানদের নিয়ে আলাদা রাজ্য গঠন করার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।

পাড়ায় পাড়ায় এই সিদ্দিকিদের তৈরি করার প্রধান আসামি অবশ্যই কমিউনিস্টরা। গত ৩৪ বছরের তাদের শাসনকালে গ্রামেগঞ্জে হাজার হাজার বেআইনি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা, লক্ষ লক্ষ অনুপ্রবেশকারীকে পশ্চিমবাংলায় নিয়ে এসে তাদের এখানে নাগরিক করে দেওয়া, কম্যুনিস্টরা স্টেটসম্যান হলে করতেন না। কিন্তু কমিউনিস্টরা শুধুমাত্র পলিটিশিয়ান, তাই জেনারেশন চুলোয় যাক, লক্ষ্য ইলেকশন ।

পলিটিশিয়ান মমতা ব্যানার্জি ও এর ব্যতিক্রম নন। বাঙালি হিন্দুর হোমলান্ড পশ্চিমবাংলাকে মুসলমান পাকল্যান্ড তৈরি করবার জন্য তিনি যেন এক ধনুর্ভঙ্গ পণ করেছেন। দুর্ভাগ্য বাঙালি হিন্দুদের। তারা রাজনীতি আর নিজের প্রাপ্য অধিকার- এই দু’য়ের পার্থক্য বুঝতে শেখেনি। লক্ষ লক্ষ বাঙালি হিন্দুর রক্তের বিনিময়ে, লক্ষ লক্ষ বাঙালি হিন্দুর বাড়ির মেয়েদের সম্মান এর বিনিময়ে, লক্ষ লক্ষ বাঙালি হিন্দুর উদ্বাস্তু হওয়ার বিনিময়ে, বাঙালি হিন্দুর জন্যই যে হোমল্যান্ড পশ্চিমবাংলা তৈরি হয়েছে, সেটা এখন আবার পাকিস্তান হতে চলেছে। একটা বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড পশ্চিমবাংলার গ্রামে গ্রামে আবারো উঠতে শুরু করেছে পাকিস্তানের গন্ধ ।

দুঃখজনকভাবে, ইলেকশনের জন্য মমতা ব্যানার্জিকে বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড পশ্চিমবাংলায় মুসলমান তাস খেলার পরামর্শ দিয়েছিলেন যে পলিটিশিয়ানরা, তাঁরা আজ আবার বঙ্গ বিজেপির সম্পদ। দেখা যাক, বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড পশ্চিমবাংলাকে বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড হিসেবেই রক্ষা করবার জন্য তৃণমূল বা সিপিএম থেকে আসা এতদিনকার মুসলমান তাস ব্যবহার করা নেতাদের কিভাবে সামলাবেন, বা আদৌ সামলাতে পারবেন কিনা, অথবা আসিউদ্দিন ওয়েসিস র ফ্রাঙ্কেনস্টাইনকে ।

বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড পশ্চিমবাংলা রক্ষা করবার দায়িত্ব বাঙালি হিন্দু কে-ই নিতে হবে। বাঙালি হিন্দু কে-ই সাহসের সাথে মোকাবিলা করতে হবে অবাঙালি হিন্দুদের চক্রান্ত। মনে রাখতে হবে, জন্মগতভাবে গান্ধী হিন্দুই ছিলেন। নেহেরু মুসলমান হলেও তাকে ভারতবর্ষের মানুষ হিন্দুই মনে করে।

তপন ঘোষের কথা দিয়ে শেষ করি- “জমি কখনো বাপের হয়না, জমি হয় দাপের ।” পূর্ব পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসা প্রত্যেক বাঙালি হিন্দুর একটা করে জমির দলিল ছিল। সেগুলো এখনও তাদের টিনের বাক্সে শোভা পায়।
কিন্তু জমির দলিল দিয়ে তারা তাদের জমি রক্ষা করতে পারেনি। কারণ তারা সেদিন দাপ দেখাতে পারেনি। সরল ভাবে বিশ্বাস করেছিল কংগ্রেসের অবাঙালি হিন্দু নেতৃত্বের কথায়, যাঁরা পলিটিশিয়ান ছিলেন, স্টেটসম্যান হতে পারেননি।

বাঙালি হিন্দু চিরদিনই হয়েছে অবাঙালি হিন্দুদের চক্রান্তের শিকার। তাই বাঙালি হিন্দুকে আবার মাঠে নামতে হবে। বাঙালি হিন্দুর একমাত্র হোমল্যান্ড পশ্চিমবাংলাকে রক্ষা করবার জন্য। কোন মেরুদণ্ডহীন বঙ্গ নেতৃত্বের ওপর ভরসা করে নয়।

আসুন, বিশ্বাস রাখুন, ভরসা করুন তপন ঘোষের স্বপ্নকে পাথেয় করে চলা, বাংলার মাটি, স্বাদ, গন্ধে উজ্জীবিত একদল বাঙালি হিন্দুকে, যারা শত চেষ্টা করলেও কোনদিন পলিটিশিয়ান হতে পারবে না, স্টেটসম্যান ই থেকে যাবে।

(লেখক কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী। মতামত ব্যক্তিগত)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.