সাপকে মাসী ভাবলে বিপর্যয় অনিবার্য

0
382


 © তপন ঘোষ 
আন্না হাজারে একটা বড় ক্ষতি করে দিয়ে গেলেন । রাজনৈতিক দল ও নেতাদের প্রতি জনসাধারণের বিতৃষ্ণা আগে থেকেই ছিল , সেটাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিলেন । কিন্তু ক্ষতি সেটা নয় । এই রাজনৈতিক দল ও নেতারা শ্রদ্ধার যােগ্য মােটেই নয় । ক্ষতিটা হল এই যে , দেশের সব সমস্যার মূল শুধু রাজনীতিই — এই ভুল ধারণাটা আরও দৃঢ় হল । অর্থাৎ , সাধারণ মানুষের কোন দোষ নেই , তারা দায়ী নয় , তাদের কোন ঘাটতি নেই দেশের ও সমাজের বর্তমান অধঃপতনে – এই ধারণাটা আরও জোরাল হল। সুতরাং , রাজনৈতিক দল ও নেতাদেরকে খুব গাল দাও , আমাদেরকে আর কিছু করতে হবে না । আমাদের নিজেদের কোনকিছু সংশােধন করতে হবে না – পাবলিক তাে এটাই চায়। আন্না হাজারে তাই পাবলিকের কাছে এত প্রিয় । 
  খুব মােটা কথায় একটা প্রশ্ন করা যাক । এখন হয় রাজনীতি আমাদের সর্বনাশ কর দিচ্ছে । কিন্তু দেশটা যখন মুসলমান ও ইংরেজদের কাছে পরাধীন হয়েছিল , তখন কি এইসব দল ছিল , না এইরকম নেতা ছিল ? ছিল না । যখন সােমনাথের মন্দির বারবার লুট হয়েছিল , তখন এরা ছিল ? ছিল না । তাহলে কেন এগুলাে হয়েছিল ? আন্না হাজারে এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারবেন কিনা জানি না , কিন্তু তাঁর দাবী ও আন্দোলনের মধ্যে এই প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাবে না । 
  আমার এই লেখাটির বিষয় আন্না হাজারে নয় । আমি তাঁকে কাছ থেকে দেখেছি , মহারাষ্ট্রের গ্রামে তাঁর সামাজিক কাজের কথা খুব ভালভাবে জানি । তাঁকে ও তাঁর কাজকে আমি শ্রদ্ধা করি । তাঁর বর্তমান আন্দোলনের দাবীকেও পরিপূর্ণ সমর্থন করি । তবুও এই আন্দোলনের উপরােক্ত কুফল সম্বন্ধে আমি শঙ্কিত । 
  এই শঙ্কা আমার মনে আরও জোরালভাবে উপস্থিত হয়েছে এই ২০১১ সালের মুসলমানদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান বকরিদের ঠিক আগে । একটা বিরাট ঘটনা চোখের সামনে ঘটছে । ঘটনাটি খারাপ ও বেআইনী । শুধু তাই নয় , এটি হিন্দু বিরােধী , হিন্দুদের ধর্মে আঘাত দেওয়ার জন্যই শুধু করা হয় । এটিকে আটকানাে বা প্রতিকার করার দায়িত্ব প্রশাসনের । প্রশাসন রাজনীতি দ্বারা পরিচালিত । বর্তমান রাজনীতি তো খারাপ । সুতরাং তারা ভােটের লােভে প্রশাসনকে নিষ্ক্রিয় ও বিপথগামী করছে । তাই প্রশাসন আইনের শাসন বজায় রাখার ও কোর্টের আদেশ পালন করার কোন চেষ্টাই করছে না । সুতরাং , সব দোষ রাজনীতির , আর আমরা সব ধােয়া তুলসীপাতা , রাজনীতি ছাড়া আর কারও কোন দোষ নেই । আহা , এর থেকে ভাল কথা আর কি হতে পারে ! আমি তাে বেঁচে গেলাম । সুতরাং , সকালে উঠে পত্রিকা হাতে নিয়েই খেলার পাতা , আর সন্ধ্যায় টিভিতে বচ্চনের কৌন বনেগা ক্রোড়পতি – এই দিয়েই তাে আমার নাগরিক কর্তব্য পালন করছি । 
  মূল বিষয়ে আসার চেষ্টা করি । মুসলমানদের দুটো ইদ । একটা খুশীর ইদ , একটা কাটার ইদ । এই কাটার ইদটা ওদের কাছে মােটেই খুশীর ইদ নয় । এটা ওদের সংকল্পের অনুষ্ঠান ও আল্লার কাছে প্রিয় বস্তুকে উৎসর্গ করার অনুষ্ঠান । ওরা বলে কুরবানী । এতে ওরা কোন পশুকে আড়াই প্যাচ দিয়ে কাটে । পশুটি যন্ত্রণায় ছটফট করে । ওদের শিশু , বালক , কিশােরেরা নতুন জামা প্যান্ট পরে এই কুরবানী দেখতে আসে । দেখতে দেখতে কী ধরণের মানসিক শিক্ষা পায় , সেটা আন্দাজ করা আমি পাঠকের উপরেই ছেড়ে দিচ্ছি । ওদের এই অনুষ্ঠানের নাম ইদ্-উজ-জোহা । আর খুশীর ইদের নাম ইদ – উল – ফিতর । এই কুরবানীকে আমাদের বলির সঙ্গে তুলনা করা ঠিক হবে না । এটা ওদেরও ভাল লাগবে না , আমাদেরও ভাল লাগবে না । এদুটো এক নয় । ওদের ধর্ম অনুসারে – কুরবানীর পশু ওদের প্রিয় বস্তু । আমাদের ধর্ম অনুসারে , আমাদের বলির পশু আমাদের অপ্রিয় ও ত্যাজ্য বস্তু । আমরা তামসিকতার প্রতীক হিসাবে পাঁঠা ও মােষ বলি দিই । তাই ইদের কুরবানী আর মহাষ্টমীর বলি এক নয় । 
  একটু সাইড লাইনে যাই । আমার এই লেখায় ‘ ওরা-আমরা ” অথবা আমাদের-ওদের ” – এই ধরণের শব্দ শুনতে হয়ত অনেকের ভাল না লাগতে পারে । তা সত্ত্বেও আমি জেনেশুনেই এই ধরণের শব্দ ব্যবহার করছি । কারণ , সাপকে মাসী , আর মাসীকে সাপ বলতে আমি রাজি নই । সাপকে মাসী বললে উপকার কিছু হয় কি না জানা নেই , কিন্তু অপকার বিরাট হয় । কোন শিশু , যে আগে মাসী দেখেছে কিন্তু সাপ দেখেনি , সে যখন পরে সাপ দেখবে , তাকে সে মাসী ভেবে আদর করতে যাবে , আর বিপদ ঘটবে । আমাদের দেশের সেকুলার বুদ্ধিজীবীদের প্রচেষ্টায় এদেশের বহু সাধারণ মানুষের বুদ্ধিই ওইরকম শিশুর মতই হয়ে আছে । তারা সাপকে মাসী ভেবে আদর করতে যায় । তারপর পাছায় লাথি খেয়ে কাউকে পূর্ববঙ্গ ছাড়তে হয় , কাউকে পার্ক সার্কাস ছাড়তে হয় , কাউকে বা মেটিয়াবুরুজ – মগরাহাট ছাড়তে হয় । 
 

আমি কিন্তু এই ব্যাপারটায় মুসলমানদেরকে সাপ বলছি না , এবং হিন্দুদের এই লাথ খেয়ে পালিয়ে আসার জন্য শুধু মুসলমানদেরকেই ১০০ শতাংশ দায়ী করছি না । মুসলমানরা অবশ্যই হিন্দুর পিছনে লাথি মেরেছে । সেজন্য তারা দায়ী । কিন্তু পুরােটা শুধু তারাই দোষী নয় । যারা লাথ খেয়েছে – তাদেরও দোষ অনেকটাই আছে । কী দোষ ? রাশিয়া , চীনে মগজ গচ্ছিত রাখা কম্যুনিষ্টদের মত আমি কখনই একথা মেনে নেব না যে , পূর্ববঙ্গে সব হিন্দুরা ছিল জমিদার । তারা গরীব মুসলমান চাষীদের উপর খুব অত্যাচার আর ঘৃণা করেছিল । তারই প্রতিক্রিয়াতে হিন্দুদেরকে মুসলমানের লাথি খেতে হয়েছে । এ হচ্ছে কম্যুনিষ্ট নির্বোধদের যুক্তি । পূর্ববঙ্গের নমঃশূদ্ররা কেউ জমিদার ছিল না । তারাও হিন্দু জমিদারদের হাতে শােষিত ও লাঞ্ছিত হয়েছিল । তাহলে যােগেন মন্ডল পাছায় লাথি খেলেন কেন ? পি.আর.ঠাকুর , উপেন বিশ্বাসরা ঠাকুরনগরে এলেন কেন ? বনগাঁ , বাগদা , গাইঘাটায় , পিলিভিতের পাহাড়ে আর গড়চিরােলীর জঙ্গলে যে কয়েক কোটি বাঙালী রিফিউজী আছে তারা কি সব জমিদারতনয় নাকি ? তারা লাথ খেল কেন ? সুতরাং , ওইসব মগজ বন্ধক দেওয়া কম্যুনিষ্ট নির্বোধদের কথা বাদ দিন । কেন হিন্দুরা ( মনমােহন সিং , আদবানি সহ ) লাথ খেল এবং এখনও খাচ্ছে , তার সত্য কারণটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে হবে । 
 

এটা ঠিক যে , মুসলমানরা অসহিষ্ণু এবং অপরের সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে থাকতে পারে না । তার উপর তাদের ধর্মের আদেশ অনুসারে সব অন্য ধর্মের মানুষকেই তারা বলপ্রয়ােগ করে মুসলমান বানাতে চায় । বিশ্বের যেখানেই তাদের একটু শক্তি হয়েছে , সেখানেই তারা অন্য ধর্মের উপর অত্যাচার করেছে ও জোর করে ধর্মান্তরিত করেছে । তাই অবিভক্ত ভারতে ও যেখানে তাদের সংখ্যা ও শক্তি বেশী ছিল সেখানেই তারা হিন্দুদের পিছনে লাথি মেরেছে । তবু বলছি – তারাই একমাত্র দায়ী নয় । 
 

সুন্দরবনের ধারে ধারে তাে আমাদের কয়েক হাজার গ্রাম আছে । এই গ্রামগুলাে লােহার তারের জাল দিয়ে ঘেরা নয় । তাও সেখানে সব লােক বাঘের কামড়ে তাে মারা যায়নি । বছরে মাত্র ৫-৭টা লােক বাঘে খায় । বেশী মানুষ যে বাঘের কামড়ে মারা যায় না , তার কারণ হল ওই জঙ্গলের ধারের মানুষরা বাঘকে বাঘ বলেই জানে । মাসী বলে মনে করে না । তাই বাঘের থেকে সাবধান থাকে , এবং বিপদ আসার আগে থেকেই ব্যবস্থা অবলম্বন করে । বাঘ একবার ঘাড়ে পড়লে আর ব্যবস্থা নিয়ে বেশী লাভ হয় না । বাঘকে মাসী বলে মনে করলে আগে থেকে ব্যবস্থা নিত না । বেঘােরে মারা পড়ত । গ্রামগুলাের সব লােক মারা যেত । 
 

প্রসঙ্গ – ওরা আমরা , ওদের আমাদের । সব মানুষই এক । সবই ঈশ্বরের সৃষ্টি । এভাবে বিভাজন বা বিভেদ করা কি ঠিক ? বেচারা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্য তাে ‘ ওরা -৩৫ , আমরা ২৩০ ‘ বলেই জনগণের চক্ষুশূল হয়ে গেলেন । ওরা – আমরা ’ – র ভুলের খেসারত দিতে প্রায় বনবাস নিয়েছেন । আমিও সেইরকমই ‘ ওরা-আমরা ‘ বলছি । কিন্তু বুদ্ধের সঙ্গে আমার একটু তফাৎ আছে । উনি তৃণমূল আর সিপিএমকে বলেছিলেন , আমি মুসলমান আর হিন্দুকে ‘ওরা – আমরা’ বলছি । ওরা আমরা কি এক ? যদি এক হয় , তাহলে পাকিস্তান হল কেন ? তাহলে কাশ্মীরে হিন্দুরা থাকতে পারল না কেন ? তাহলে মেটিয়াবুরুজ , পার্ক সার্কাস , রাজাবাজার থেকে হিন্দুরা পালাচ্ছে কেন ? যদি এক হবে তাহলে ৫০০ ঘর হিন্দুর মধ্যে ৫ ঘর মুসলমান নিরাপদে বাস করতে পারে , কিন্তু ৫০ ঘর মুসলমানের মধ্যেও ৫ ঘর হিন্দু নিরাপদে বাস করতে পারে না কেন ? যদি এক হবে , তাহলে মহারাষ্ট্র , বিহার , আসামের মুখ্যমন্ত্রী মুসলমান হতে পারে , কিন্তু কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী একজন হিন্দু হতে পারে না কেন ? যদি এক হবে তাহলে স্বাধীনতা পূর্ববর্তী অখন্ড বাংলায় তিনজন মুখ্যমন্ত্রীর মধ্যে ( নাজিমুদ্দিন , ফজলুল হক , সুরাবর্দী ) একজনও হিন্দু হলেন না কেন ? যদি এক হবে তাহলে গত হাজার বছরে ৩০ হাজার মন্দির ভাঙল ওরা , আর মাত্র একটা অব্যবহৃত মসজিদ ভাঙতেই এত হৈচৈ কেন ? যদি এক হবে তাহলে করাচীতে আদবানির বাড়ীর চিহ্নমাত্র নেই , অথচ মুম্বাইতে জিন্নার বাড়ী এখনও সুরক্ষিত কেন ? যদি এক হবে তাহলে দুর্গাপূজার মন্ডপ মসজিদের আকৃতিতে হতে পারে , কিন্তু ইদের গেট কোন সুন্দর মন্দিরের ধাঁচে কেন হতে পারে না ? যদি এক হবে , তাহলে ভারতে এক লক্ষ মসজিদ আছে , আর আরবদেশে একটিও মন্দির নেই কেন ? ওদেশে তাে লক্ষ লক্ষ হিন্দু কাজ করছে । 
  এ প্রশ্নগুলির উত্তর ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা দিতে পারবে না । কম্যুনিষ্টরাও পারবে না । সুতরাং , ওরা আমরা এক নয় । বিভাজনটা সাম্প্রদায়িক তপন ঘােষ করছে না । বিভাজনটা আছে । 
 

তারপর উপদেশ আসবে – এই ‘ ওরা-আমরা ’ কি এক করার চেষ্টা করা উচিত নয় ? সব মানুষ এক হব এটাই কি ভাল নয় ? কবিরা বলেছেন – সবার উপরে মানুষ সত্য , একই বৃন্তে দুইটি কুসুম , এসাে হে আর্য এসাে অনার্য হিন্দু মুসলমান । আরও কত কিছু বলেছেন কবিরা , মহাপুরুষরা । রামকৃষ্ণও নাকি তাই বলেছেন ! তাহলে সব মানুষকে , হিন্দু মুসলমানকে এক করার চেষ্টা করা কি উচিত নয় ? এই চেষ্টাই কি মানবতা , বিশ্ব মানবিকতা নয় ? 
 

হ্যাঁ , চেষ্টা করা উচিত । বিশ্বের সব মানুষকে , আর আমাদের দেশে হিন্দু মুসলমানকে এক করার চেষ্টা করা উচিত । শুধু একটু চোখ কান খুলে করা উচিত , আর স্বর্গীয় শিবপ্রসাদ রায়ের কথা অনুযায়ী – ‘ একটু কান্ডজ্ঞান রেখে করা উচিত । ’  পূর্ববঙ্গের উদার প্রগতিশীল হিন্দুরা ওই ‘ ওরা-আমরা ’ কে এক করার চেষ্টা করছিলেন । আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন । তাই , পূর্ববঙ্গে কমুনিষ্টদের ঢুকতে দিয়েছেন , গান্ধীকে কাপড়ের আঁচল বিছিয়ে ঢুকতে দিয়েছেন , কিন্তু সাভারকারকে ঢুকতে দেন নি , শ্যামাপ্রসাদের হিন্দু মহাসভাকে প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় আইনসভায় একটা আসনেও জয়ী করেন নি । এই ভাবে ‘ ওরা-আমরা ‘কে এক করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে গিয়ে কান্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন পূর্ববঙ্গের উদার প্রগতিশীল ধর্মনিরপেক্ষ হিন্দুরা । এই কান্ডজ্ঞান হারানাের ফলশ্রুতিই হল – লাথির এক ধাক্কায় শিয়ালদা স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে মুখ থুবড়ে পড়া । 
 

সুতরাং , ‘ ওরা-আমরা ‘ কে একরার চেষ্টা করার সময় একটু চোখ কান খুলে রেখে করতে হবে । আর যতক্ষণ একনা হচ্ছে , ততক্ষণ ‘ওরা-আমরা’ কে মেনে নিয়েই চলতে হবে । আমি এই প্রসঙ্গেই সাপকে মাসী বলার বিপজ্জনক ভুলের কথা বােঝানাের চেষ্টা করছিলাম । মুসলমানরা সাপ না বাঘ না হায়েনা না আমাদের মতই সাধারণ মানুষ । সে বিচার পাঠক করুন । কিন্তু ‘ওরা-আমরা’কে এক ভাবাটাই হল আমার মতে সাপকে মাসী ভাবা । এই ভুলের খেসারত হিন্দুরা আগেও দিয়েছে , আবারও দিতে হবে । 
 

আমিও তাে চাই , ‘ ওরা-আমরা ’ এক হয়ে যাক । সব শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষই তাই চায় । কিন্তু চাইলেই কি হয়ে যায় ? হয় না । তার জন্য কিছু করতে হয় । কি করতে হবে ? শুধু হিন্দুদেরকে উপদেশ দেওয়া – সব মানুষ সমান , সবাই ভাইভাই , সবারই চামড়ার রঙ আলাদা হলেও রক্তের রঙ এক — এইসব উপদেশেই ‘ ওরা-আমরা ’ এক হয়ে যাবে ? এইসব উপদেশ প্রদানকারীদের জিজ্ঞাসা করতে চাই –কটা মুসলিম পাড়ায় গিয়ে , কটা মুসলমান গ্রামে গিয়ে , কটা মসজিদে গিয়ে , কটা মাদ্রাসায় গিয়ে , কটা মক্তবে গিয়ে , কটা এতিমখানায় গিয়ে , কটা মাজার শরীফে গিয়ে , কটা মিলাদে গিয়ে , কটা জলসায় গিয়ে , কটা জুম্মার নামাজে গিয়ে আপনি এই উপদেশ দিয়েছেন নিজের বুকে হাত রেখে উত্তর দিন । আরও উত্তর দিন ওইসব জায়গায় আপনি কত মিনিট কথা বলার ( উপদেশ ) সুযােগ পেয়েছেন , কটা মুসলমানকে আপনার কথা শােনাতে পেরেছেন ? ‘ সব মানুষ এক ’ এই উপদেশ শুনে তারা কী উত্তর দিয়েছে , কতটা ইতিবাচক সাড়া পেয়েছেন ? আপনার এই উপদেশকে তারা কতটা সমর্থন করেছে ? এগুলি পরিমাপ করে , তবেই না বােঝা যাবে যে ‘ ওরা-আমরা ’ কে এক করা যাবে কিনা ? এবং করা গেলে কতটা সহজে বা কতটা বাধা পার করে তবে করা যাবে ! একবারও মুসলমান এলাকায় , মসজিদে মাদ্রাসায় না গিয়ে শুধু হিন্দু —  গুলাে কে জ্ঞান দিয়েই ‘ ওরা-আমরা ’ এক হয়ে যাবে ? আপনি যদি তাই মনে করেন , তাহলে আমি আপনাকে মনে করি ন্যাকা অথবা ভন্ড অথবা নির্বোধ ।     

    মুসলমানরা অন্ততঃ আপনার মত অতটা ভন্ড নয় । ওদেরও ‘ তাকিয়া ’ ( ধর্মের জন্য মিথ্যাচার করা ) আছে । তবুও আমাদের সেকুলারদের থেকে ওরা বড় ভন্ড হতে পারে নি । ওদের সামনে গিয়ে আপনি যেই বলবেন আমরা তােমরা এক , সব মানুষ সমান – তখনই ওদের মনে প্রশ্ন উঠবে , তাহলে মােমিন আর কাফের কারা ? খােদাতালা তাে কোরাণে বলে দিয়েছেন , মােমিন আর কাফের আলাদা আলাদা শুধু নয় , তারা পরস্পরের শত্রু । শুধু তাই নয় , মােনিনরা আল্লার প্রিয় , আর কাফেরদেরকে আল্লা একেবারেই দেখতে পারেন না । কাফেরদের জন্য আল্লা দোজখের আগুন সব সময় জ্বালিয়ে রেখেছেন । কাফের কারা ? যারা চুরি ডাকাতি করে , খুন করে , ধর্ষণ করে , তারা ? না , তারা কাফের নয় যদি তারা আল্লা এবং রসুলকে মানে । যারা চুরি করে না , রাহাজানি করে না , মিথ্যা কথা বলে না , খুন ধর্ষণ করে না , কিন্তু আল্লা না মেনে অন্য দেবতাকে মানে এবং রসুলকে মানে না – তারা কাফের । সেই ছােটবেলা থেকে সরল ও বিশ্বাসী মুসলমানরা মসজিদে মক্তবে মাদ্রাসায় গিয়ে মৌলবী মৌলানা ইমাম ও হুজুরদের কাছ থেকে এই কথা শুনে এসেছে , সাক্ষরেরা কোরাণে হাদীসে পড়ে এসেছে । আর আপনি তাদেরকে গিয়ে বলছেন – “ আমরা তােমরা সমান ’ , ‘ মােমিন কাফের এক । তাহলে কি কোরাণ হাদীসে মিথ্যা কথা লেখা আছে ? ইমাম মৌলবী সাহেবরা ভুল কথা বলেন ? হে আমার উপদেশ প্রদানকারী ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা , মুসলিম ভাইদের এই প্রশ্নের উত্তর আপনাকে দিতে হবে । উত্তর দিয়ে তাদেরকে সন্তুষ্ট করতে হবে । তবে তাে তারা ওই ‘ এক হওয়ার ’ কথা বুঝতে পারবে , আর গ্রহণ করবে । এখন বলুন , আপনি ওই প্রশ্নের কী উত্তর দেবেন ? বলবেন কোরান ভুল , মৌলবী সাহেবরা মিথ্যা কথা বলেন ? আপনি বলবেন তাে যে , মােমিন কাফের আলাদা নয় , এক ? তাই কাফেরের মােমিন হওয়ার দরকার নেই । যে যার নিজের ধর্ম নিয়ে থেকেই ভগবানেরও প্রিয় হওয়া যায় , আল্লারও প্রিয় হওয়া যায় । মসজিদের চত্বরে দাঁড়িয়ে জুম্মাবারের দুপুরের নামাজের পর ছােট্ট একটা হ্যান্ড মাইক নিয়ে এই কথা গুলাে বলবেন তাে ? যদি বলতে পারেন , তাহলে ‘ ওরা-আমরা ‘ কে এক করার প্রক্রিয়াটা শুরু হবে মাত্র । চলুন শুরু করা যাক । বলুন কোন্ মসজিদে প্রথম যাবেন ? চিৎপুরের নাখােদা মসজিদে , নাকি ইমাম বরকাতির টিপু সুলতান মসজিদে ? আমার অবশ্য বেশী পছন্দ ক্যানিং লাইনে ঘুটিয়ারী শরীফ । ওখানে গিয়ে এইসব প্রচার করলে আপনার কান্ডজ্ঞান ‘ খুব তাড়াতাড়ি ফিরে পাবেন— গ্যারান্টি দিয়ে বলছি । স্বর্গে শিবপ্রসাদ রায় একটু স্বস্তি পাবেন আপনার কান্ডজ্ঞান ফিরে আসলে । যদি সময় থাকতে কান্ডজ্ঞান ফিরে আসে তাহলে আমাদের পশ্চিমবঙ্গটা আর পূর্ববঙ্গ হবে না । দেরী হলে পশ্চিমবঙ্গকে বাঁচানাে যাবে না ।
   

চেষ্টা করি মূল জায়গায় ফিরে আসার । আমার দৃষ্টিতে মুসলমানরা সাপ নয় । মুসলমানরা মুসলমান । ‘ হিন্দু আর মুসলমান সমান ‘ , ‘ ওরা-আমরা ’  এক এই ধারণাটাই হল আমার মতে সাপ । কারণ এটা ঠিক নয় । এটা ভুল , এটা মিথ্যা । এই মিথ্যাটাকে সত্য বলে মনে করাটাই হল , আমার মতে , সাপকে মাসী বলা । বলা শুধু নয় , মনে করা । সাপকে মাসী ভাবলে , মিথ্যাকে সত্য ভাবলে – সর্বনাশ হবে । আগেও হয়েছে , এখনও হচ্ছে , পরেও হবে । সাপের কামড়ে পৃথিবীর ৭০০ কোটি লােক মারা যায়নি । কারণ , লোকেরা সাপকে সাপ বলেই জানে , মাসী বলে ভাবে না । কিন্তু হিন্দুরা , শিক্ষিত অশিক্ষিত সবাই এই মিথ্যাটাকে সত্য বলে মনে করে , তাই মরে । গান্ধারে মরেছে , সিন্ধে মরেছে , পাঞ্জাবে মরেছে , পূর্ববাংলায় মরেছে , কাশ্মীরে মরেছে । সাপকে মাসী বলে না ভাবলে মরত না । 
   

সুতরাং এখন কর্তব্য কী ? পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের মৃত্যু শিয়রে । বাংলাদেশ গ্রাস করে নিচ্ছে । মুসলিম এলাকা ছেড়ে হিন্দু পালিয়ে যাচ্ছে । ওই এলাকায় পুলিশ ঢুকতে পারে না । মুসলিমবহুল স্থানে থানা ও ফাঁড়িগুলােতে পুলিশ প্রাণ হাতে করে ভয়ে ভয়ে থাকে ।  কাপুরুষ নির্বীর্যরা যেমন বাইরে অপমানিত হয়ে ঘরে এসে বৌ – এর উপর বীরত্ব ফলায় , ঠিক তেমনি মুসলমানদের দেশবিরােধী , আইনবিরােধী ও হিন্দুবিরােধী কাজ একটুও আটকাতে না পেরে এবং তাদের কাছে মার খেয়ে ও চোখের সামনে সরকারী সম্পত্তি ধ্বংস হতে দেখে , পুলিশ নেড়িকুত্তার মত পালিয়ে এসে হিন্দুদের উপর হম্বিতম্বি করে আর আইন শেখায় । আর সদ্য কুলপিতে গত ২৪ অক্টোবর তারিখে কুলপি থানার বীরপুঙ্গব পুলিশেরা । মুসলিম আক্রোশের হামলা থেকে পুলিশ আবাসনে নিজেদের পরিবারের মা-বৌদের শ্লীলতা রক্ষা করতে পারেনি । এরকম ঘটনা পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে শত শত ঘটছে । সংবাদমাধ্যমে তার অতি অল্পই প্রকাশিত হয় । এই তাে পুলিশের অবস্থা । পুলিশ হিন্দুকে বাঁচাতে পারবে না । পশ্চিমবঙ্গকেও পারবেনা । তার উপরে হিন্দুরা সাপকে বলছে মাসী । বলছে সব মানুষ এক , মােমিন কাফেরও এক । হিন্দুরা এই অতি সহজ কথাটা বুঝতে পারছে না যে , সব মানুষ এক , ওরা আমরা এক — এই কথাগুলাে কাফেররা বােঝে , মােমিনরা বােঝে না । কারণ তাদের ধর্মীয় শিক্ষায় মােমিন আর কাফের কখনও এক হতে পারে না । 
  তাহলে কর্তব্য কী ? সাধারণ হিন্দুদেরকে ওই সাপকে মাসী বলা ছাড়াতে হবে । তাই যখনই কোন সেকুলার ব্যক্তি ‘ হিন্দু মুসলমান ’ , ‘ ওরা – আমরা এক এই বাণী দিতে আসবে – তখনই তাদেরকে করজোড়ে অনুরােধ করে অথবা ঘাড় ধরে বলতে হবে , এক্ষুনি চলুন কোন মুসলিম এলাকায় আর মসজিদে । সেখানে গিয়ে এই উপদেশগুলাে দেবেন । আগে আপনার মুসলিম ভাইদেরকে আর মৌলবীসাহেবদেরকে শেখাবেন – মানুষের মধ্যে মােমিন – কাফেরে কোন তফাৎ নেই , মানুষের একটাই জাত , শিব আর আল্লা এক , জেহাদ করে মানুষ মারলেও সেটাও খুন , অহিংসা শ্রেষ্ঠ , জিন্নার থেকে গান্ধী শ্রেষ্ঠ , পরােপকার ও সৎকাজ করাটাই বড় কথা , আল্লা ও রসুলকে না মেনেও যদি সৎকাজ কর তাহলেও আল্লা খুশী হবেন , মুসলিম উম্মা হিন্দু উম্মা এসব আলাদা হয় না , মানুষের একটাই উম্মা ( জাত ) মানব উম্মা , ধর্ম নিয়ে মাতামাতি করতে নেই , মানুষকে ভালবাসতে হয় , সন্তানদের ভাল করে লেখা পড়া শেখাতে হলে জন্ম নিয়ন্ত্রণ করতে হবে । এইসব কথা মসজিদের সামনে গিয়ে আগে বলুন । তার পর হিন্দুদেরকে বােঝাতে আসবেন ।
   

এই কাজটা করতেই হবে । মুসলমানদের মাথায় লাঠি মারতে হবে না । তার থেকে অনেক বেশী দরকার এইসব দিব্যজ্ঞানী হিন্দুদের কান্ডজ্ঞান ফেরানাে । আমরা তর্ক দিয়ে যুক্তি দিয়ে তা পারব না । এরা দিব্যজ্ঞানের নেশায় বুঁদ হয়ে আছে । এদের কান্ডজ্ঞান ফেরানাের একমাত্র উপায় হল এদেরকে মসজিদে ও মুসলিম এলাকায় পাঠিয়ে তাদের মহামূল্যবান জ্ঞানের মনিমুক্তো ছড়াতে বলা । আর কিছু করতে হবে না । শিবপ্রসাদ রায়ের বই আর স্বামী বিজয়ানন্দের ভাষণের থেকেও দশগুণ বেশী টোটকার কাজ করবে এটা । ওদের কান্ডজ্ঞান ফিরে আসবে গ্যারান্টি ।

   এতসব কথা আমার মনে এল ২০১১ সালের নভেম্বর মাসে বকরিদের আগের দিন । গভীর দুশ্চিন্তায় রাতটা বিনিদ্র কাটল । কারণটা বলা দরকার । 
 

১৯৮২ সালের ২০ আগষ্ট কলকাতা হাইকোর্টের মামলায় বিচারপতি এ.কে. সেন এবং বিচারপতি বি.সি. চক্রবর্তী রায় দিয়েছিলেন , বকরিদে কুরবানীর জন্য গো-হত্যা করা নিষেধ । এই রায়ের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের বাম সরকার ১৯৮৩ সালেই সুপ্রীম কোর্টে আপীল করে । আপীল নং ৬৭৯০/৮৩ । দীর্ঘ ১২ বছর মামলা চলার পর ১৬.১১.৯৪ তারিখে প্রদত্ত রায়ে সুপ্রীম কোর্টের ৩ জন বিচারপতির বেঞ্চ কলকাতা হাইকোর্টের রায়কে বহাল রাখেন এবং কুরবানীর জন্য গােহত্যা নিষিদ্ধ করেন । বাংলার প্রতিটি মানুষ জানে যে এই রায় পালিত হয় না । গরু কাটা অবাধে চলতে থাকে। তাই ২০১০ সালে আবার কলকাতা হাইকোর্টে আবেদন করা হয় করিদে গােহত্যা বন্ধ করার জন্য । ১৩৭৮/১০ নং রিট পিটিশনের এই আবেদনের বিচারে ১২.১১.১০ তারিখে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি রাজ্য সরকারকে আবার আদেশ দেন । গােহত্যা বন্ধের জন্য । তারপরও কয়েক লক্ষ গরু কাটা হয় । অল্প কিছু হিন্দু কোর্টের আদেশ পালন করার জন্য গােহত্যায় বাধা দেওয়া নয় , শুধু রাস্তায় নেমে সামান্য প্রতিবাদ করতে যায় , মুসলমানরা তাদেরকে অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করে ( হাওড়া সাঁকরাইলের ঘটনা ) , এবং পুলিশ প্রতিবাদী হিন্দুদেরকে মেরে ঘরে ঢুকিয়ে দেয় । হাইকোর্ট থাকে গঙ্গার ধারে , আর পুলিশ সর্বত্র নিরাপদে নির্বিঘ্নে গরুকাটাকেই Protection দেয় । হাইকোর্টের প্রাণ থাকলে , মান অপমান বােধ থাকলে ঐ চূড়াওয়ালা বাড়িটা মা গঙ্গায় প্রবেশ করত ।

এই পরিস্থিতিতে এবছর ২০১১ সালে আবার একাধিক মামলা করা হয় হাইকোর্টে , যদিও তার কোন প্রয়ােজনই ছিল না , কারণ ২০১০ সালের রায়েই হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি বলে দিয়েছিলেন যে বকরিদে কুরবানীর জন্য গােহত্যা বন্ধে এই হাইকোর্ট ও সুপ্রীম কোর্টের রায় আগে থেকেই আছে । তা সত্ত্বেও অবাধে গােহত্যা চলায় তা বন্ধের আবেদনের একটি মামলার রায়ে গত ১৯.১০.১১ তারিখে বিচারপতি হরিশ ট্যান্ডন ও বিচারপতি সৌমেন সেন বকরিদে গােহত্যা নিষেধ করেন । আর একটি মামলায় যার রিট পিটিশন নং ১৬৭ ৪৯/১১ , স্বয়ং প্রধান বিচারপতি মিঃ জে , এন , প্যাটেল এবং বিচারপতি অসীম কুমার রায় আরও কড়া আদেশ দিয়েছেন গত ২.১১.১১ তারিখে । মহামান্য বিচারপতিদ্বয় এই আদেশে রাজ্য সরকারকে মুখ্য সচিবের ( চিফ সেক্রেটারি ) মাধ্যমে নির্দেশ দিয়েছেন যে করিলে গরু কাটা তাে বন্ধ করতেই হবে , এমনকি যে সমস্ত অস্থায়ী গােহাট বসেছে , সেগুলােও বন্ধ করতে হবে , এবং কুরবানীর জন্য গরুর চলাচলও বন্ধ করতে হবে । আর কোন আদেশ দিতে বাকী থাকল কি ?

কিন্তু সবাই জানে লক্ষ লক্ষ গরু পশ্চিমবঙ্গে কাটার জন্য আনা হয়েছে । গরুর বাজার কয়েক হাজার বসেছে । পাড়ায় পাড়ায় গরু বেঁধে রাখা আছে । ৭ নভেম্বর সকাল থেকেই প্রকাশ্য রাস্তায় গরু কাটা শুরু হয়েছে । গলার নলিকাটা গরু রাস্তায় পড়ে ছটফট করছে । রক্তে ভেসে যাচ্ছে রাস্তা । পার্কসার্কাস , মেটিয়াবুরুজেহিন্দুরা বাড়ির ছােটদেরকে দূরে আত্মীয় বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে বড়রা দরজা জানালা বন্ধ করে বসে আছে । ভাবছে আর ক’বছর এখানে থাকা যাবে ? বােধ হয় ২-৩ বছরও থাকা যাবে না । 
 

এইরকম এক পরিস্থিতিতে কোর্টের আদেশ ও আইনের পালন করার জন্য পুলিশ প্রশাসন কী করছে ? তাদেরও মেধা ও বুদ্ধির অভাব নেই । ইদের আগে থেকেই ১০৭ ধারায় প্রতিবাদী ও সম্ভাব্য প্রতিবাদী হিন্দুদেরকে গ্রেপ্তার করা শুরু করে দিয়েছে । উদ্দেশ্য – এই ত্যাঁদড় হিন্দুগুলােকে থানার লক আপে পুরে বাকী হিন্দুদেরকে ভয় দেখিয়ে ঘরে আবদ্ধ রাখা , যেন কেউ জবাই – এর জায়গায় না যায় , প্রতিবাদ না করে , আর থানায় ডায়েরী বা FIR. করতে না আসে । থানায় লিখিত অভিযােগ জমা না পড়লে সহজেই কোর্টকে পরে বলে দেওয়া যাবে যে , গরু কাটা হয়নি । এমনই নির্লজ্জ দুকান কাটা প্রশাসন ও তাদের পরিচালক সরকার । সুতরাং , সরকার তার কর্তব্য পালন করল না । কিন্তু এটা তাে গােপন কথা নয় । জনসাধারণ কি এটা জানে না ? জানে । কিন্তু এনিয়ে তারা চিন্তিত নয় । তারা চিন্তিত শচীন-সৌরভের ভবিষ্যৎ নিয়ে । জনসাধারণ দেখেছে , কোর্টের আদেশ মেনে কালীপূজায় শব্দবাজি বন্ধ করতে পুলিশের তৎপরতা । জনসাধারণ দেখছে দুর্গাপূজা কালীপূজা এবং সমস্ত পূজার বিসর্জন তাড়াতাড়ি করিয়ে দেওয়ার জন্য পুলিশের প্রচেষ্টা । অথচ সমস্ত মসজিদের বেআইনী মাইক বন্ধ করতে , রােজার মাসে প্রত্যেক শুক্রবার সমস্ত জায়গায় রাস্তা বন্ধ করে নামাজ পড়া আটকাতে , বেআইনী গরু কাটা বন্ধ করতে , সবেবরাতের দিন শব্দবাজি বন্ধ করতে – পুলিশের এতটুকু তৎপরতা তাে নেই-ই , বরং এই বেআইনী কাজগুলাে যাতে মুসলমানরা সুষ্ঠুভাবে করতে পারে , এই সমস্ত বেআইনী কাজে যেন কোনরকম বাধা সৃষ্টি না হয় , তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও প্রশাসন ( BDO , SDO , DM ) তৎপর । প্রশাসনের আচরণের এই দু’রকমের নীতি কি শিক্ষিত সচেতন মানুষদের চোখে পড়ে না ? শিল্পী সাহিত্যিক সাংবাদিক বুদ্ধিজীবীদের চোখে পড়ে না ? শীর্ষেন্দু , শক্তি , সুনীল , অপর্ণা , সৌমিত্র , অমর্ত্য , সুজাতদের চোখে পড়ে না ? এই দ্বৈত আচরণ সম্বন্ধে তারা একটাও কথা বলেন না কেন ? একটা গল্প কবিতা নাটকও লেখেন না কেন ? এটাও কি ভােটলােভী রাজনৈতিক নেতাদেরই দোষ ? এই দ্বৈত আচরণের পিছনে কারণটা কী , মানসিকতা কী এবং এর পরিণাম কত ভয়ংকর হতে পারে , সে সম্বন্ধে কি কেউ একটু ভাববেন না ? সব দোষ কি সত্যিই রাজনৈতিক দলগুলাের ? তারা না হয় মুসলমান ভােটের জন্য ওদের সব অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয় । কিন্তু শক্তি , সুনীল , সঞ্জীব , শংকর- এরা তাে ভােটেও দাঁড়ান না , দলও করেন না , তাহলে এরা এই দু-মুখাে আচরণের প্রতিবাদ করেন না কেন ? 
 

শুধু শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীরাই নন , সাধারণ মানুষেরও একইরকম আচরণ । গত বছর দেগঙ্গায় অতবড় ঘটনা হল । কোন খবরের কাগজে বের হল না । কিন্তু দেগঙ্গার সাধারণ মানুষেরা কি মুখে মুখে , ফোন করে তাদের আত্মীয় স্বজন , বন্ধুদেরকে ওই ঘটনার কথা জানিয়েছেন । তাদের এম.পি হাজী নুরুল ইসলামের জঘন্য সাম্প্রদায়িক আচরণের কথা বলেছেন ? বলেন নি । সুতরাং , প্রশাসনের এই দ্বৈত আচরণের পিছনে শুধু ভােটলােভী রাজনৈতিক দল ও নেতারাই দায়ী নয় । এর পিছনে এক সার্বিক মানসিকতা কাজ করছে । সেই মানসিকতার শিকার সবাই – দল , নেতা , শিল্পী , সাহিত্যিক , বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষ সবাই । মানসিকতাটা হল এই — মুসলমানরা দেশের আইন মানবে না , নিয়ম নীতি মানবে না । তার উপর তারা হিংস্র এবং একজোট । জোর করে তাদেরকে দিয়ে আইন মানাতে গেলে তারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে একজোট হয়ে এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়বে যে সামলানাে যাবে না , বিরাট সমস্যার সৃষ্টি হবে , সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লেগে যাবে । সুতরাং ওদের উপর জোর খাটিয়াে না । তার থেকে হিন্দুরা তাে শান্ত । ওদেরকে চুপ করিয়ে রাখ । ওদের জায়গা দখল করে নেয় , ওদের মন্দির অপবিত্র করে , মূর্তির গলা কেটে নিয়ে যায় , ওদের মেয়েদের হাত ধরেটানে , ওদের বিসর্জন বা ধর্মীয় শােভাযাত্রায় আক্রমণ করে , ঠাকুর ভেঙ্গে দেয় , মেয়েদের রেপ করে মুসলমানরা যাই করুক না কেন হিন্দুদেরকে চুপ করিয়ে রাখ , ওটা সহজ । ওটাই শান্তি বজায় রাখার সহজ উপায় । এই সহজ উপায়টা রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনই শুধু নয় , সাধারণ মানুষ ও বুদ্ধিজীবীরাও মেনে নিয়েছে । 
 

এই হল মানসিকতা । কিন্তু এর পরিণামটা কী ? ওই সম্প্রদায় আধুনিকতাকে গ্রহণ করবে না , পরিবার পরিকল্পনা মানবে না । জন্ম নিয়ন্ত্রণ করবে না । তাদের সংখ্যা ও অনুপাত বেড়েই যাবে । সেই ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা দেশেরআইন , হাইকোর্ট সুপ্রীম কোর্টের আদেশ কিছুতেই মানবে না । আর তাদের এই না মানাটা অন্যরা মেনে নেবে , এটা গত ৬৪ বছরে তারা বুঝে গেছে । সুতরাং , এই প্রবণতাটাও  তাদের বেড়েই চলেছে । এই বর্ধিত জনসংখ্যা ও আইন না মানার বর্ধিত প্রবণতা পশ্চিমবঙ্গের মত রাজ্যে কি একটা খুব বড় রকমের সংকট সৃষ্টি করবে না ? এই বঙ্গ যে কারণে বিভাজন হয়েছিল , আমার নিজের ভিটেমাটি বিদেশে পরিণত হয়ে গিয়েছিল , সেই কারণটাই কি আবার তৈরী হচ্ছে না? ১৯৪৭ সালে হয়েছিল , আবার সেই পরিণামের দিকেই আমরা কি খুব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছি না? অর্থাৎ আবার একবার বাংলাভাগ , এবং তা ইসলামীকরণের দ্বারা ভাগ – সেইদিকেই কি যাচ্ছি না? তার মানে কি বাঙালী হিন্দু আর একবার রিফিউজী হওয়ার জন্য মনে মনে তৈরী হয়ে গেছে? 

(লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় স্বদেশ সংহতি সংবাদ, নভেম্বর ২০১১   সংখ্যায়)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.