KGB ও ইন্দিরা গান্ধীর গোপন চুক্তি : কিভাবে ভারত সোভিয়েতের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছিল

0
901

(মূল সংবাদ পরিবেশিত হয় opIndia.com নামক ওয়েবসাইটে, তারিখ : 7 আগস্ট 2020: লেখক : নিভান সাধ)

অনুবাদ: সূর্য শেখর হালদার

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির কাছে অক্ষশক্তি বিধ্বস্ত ও পরাজিত হয়। এই মিত্রশক্তির মূল কান্ডারী ছিল ইউনাইটেড কিংডম , ইউনাইটেড স্টেটস অফ আমেরিকা এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন। অন্যদিকে অক্ষশক্তির নেতৃত্বে ছিল জার্মানি, জাপান এবং ইতালি । মিত্র শক্তি জয় লাভের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকার মধ্যে মতাদর্শগত বিভেদ প্রকাশ্য হতে থাকে। সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন সমাজতন্ত্র আর কমিউনিজমকে বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছিল, আমেরিকা তখন মেকি গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে গণতন্ত্র আর পুঁজিবাদকে দেশে দেশে চালাতে চাইছিল।

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের শেষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সূর্যাস্ত ঘটে গিয়েছিল। ভারত সহ বিভিন্ন দেশ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কবল থেকে এই সময় মুক্তিলাভ করছিল। এই সময় থেকে CIA ( আমেরিকান গুপ্তচর সংস্থা) ও KGB ( রাশিয়ান গুপ্তচর সংস্থা) সারা পৃথিবীতে বিভিন্ন দেশে গুপ্তচরবৃত্তি আরম্ভ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এই গুপ্তচরবৃত্তি এক মহান গুপ্তচর যুগের সূচনা করে।

ভাসিলি মিত্রখিন (Vasili Mitrokhin) নামক এক KGB গুপ্তচর পরবর্তীকালে ইউনাইটেড কিংডম এর পক্ষে চলে যান। তিনি তাঁর মিত্রখিন আর্কাইভ নামক একটি সংগ্রহশালাতে অনেক গোপন তথ্য প্রকাশ করেন। এই তথ্য ও নথির অনেকগুলি অধ্যায় জুড়ে রয়েছে ভারত আর গান্ধী পরিবারের কথা।

ভারত 1947 সালের 15 আগস্ট স্বাধীনতা লাভের পর দুটি গুপ্তচর সংস্থারই দৃষ্টি যায় ভারতের দিকে। দুই গুপ্তচর সংস্থারই উদ্দেশ্য ছিল পরোক্ষভাবে ভারত সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করা, কারণ ভারতের উপর নিয়ন্ত্রণের অর্থ এশিয়া মহাদেশের একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলের উপর নিয়ন্ত্রণ। মিত্রখিন তাঁর The Special Relationship with India অধ্যায়ের প্রথম ভাগে ( The Supremacy of the Indian National Congress) প্রকাশ করেন যে জোসেফ স্ট্যালিন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু সম্পর্কে খুব নিম্নমানের ধারণা পোষণ করতেন।

এই সংগৃহীত তথ্য অনুসারে স্ট্যালিন নেহেরু এবং মহাত্মা গান্ধীকে সাম্রাজ্যবাদীদের হাতের পুতুল বলে মনে করতেন। তিনি মনে করতেন যে এনারা নিজের জাতির মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে ব্রিটিশদের কাছে মাথা নত করেছিলেন। এনারা ব্রিটিশকে ভারতের উপর নিয়ন্ত্রণ শক্ত করতে সাহায্য করেছিলেন, তবে নেহেরু সম্পর্কে তাঁর এই কঠিন মন্তব্য সত্বেও নেহেরু সোভিয়েত রাশিয়ার উত্থানের প্রশংসা করতেন এবং বলশেভিক আন্দোলন থেকে অনুপ্রেরণা নিতেন।

প্রধানমন্ত্রী হবার পর নেহেরু সোভিয়েত রাশিয়াতে কূটনৈতিক সফর করেন। এই সফরের সব ঘটনা প্রবাহ সুন্দরভাবে সাজানো ছিল। মিত্রখিনের মতে সোভিয়েত রাশিয়া ভারতকে CIA এবং KGB – উভয়েরই খেলার মাঠ রূপে গণ্য করত । ইন্দিরা গান্ধী( মিত্রখিন তাঁকে যে কোড নেম দেন , সেটি হল বানো) প্রধানমন্ত্রী হবার পর KGB ভারত সরকারের অভ্যন্তর পর্যন্ত পৌঁছে যাবার সুযোগ লাভ করে।

মিত্রখিন উল্লেখ করেছেন ইন্দিরা গান্ধীকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেবার জন্য কুড়ি মিলিয়ন অর্থ রাশি দেওয়া হয়েছিল , এবং সোভিয়েত কর্তাব্যক্তিদের অবাক করে দিয়ে অর্থ রাশি বহন করার ব্যাগটি পর্যন্ত ইন্দিরা গান্ধী ফেরত দেননি। নেহেরুর মত ইন্দিরা গান্ধীও মনে করতেন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপ্লব ছিল সারা পৃথিবীর কাছে এক আলোকময় বার্তা। তিনি প্রায়ই সোভিয়েত ইউনিয়নের কারখানাগুলোতে যে নীতি অনুসরণ করা হত, সেগুলির প্রশংসা করতেন এবং ইন্দিরা গান্ধীর সোভিয়েত সফরের সময় সব কারখানাগুলি ও সুন্দরভাবে সাজানো ছিল।

মিত্রখিন ভারত সরকারের উদ্বেগ বাড়িয়ে দাবি করেন যে কংগ্রেস পার্টির সাতজন ক্যাবিনেট মন্ত্রী সোভিয়েতের অর্থেই নির্বাচিত হয়েছেন। এনারা সকলেই ছিলেন ইন্দিরা জামানার মন্ত্রী। এমনকি মিত্রখিনের মতে নেহেরু জামানার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভি. কৃষ্ণ
মেননও সোভিয়েতের সমর্থন লাভ করেছিলেন। মিত্রখিনের সংগ্রহশালা থেকে যে তথ্য পাওয়া যায় তাতে দেখা যাচ্ছে যে সোভিয়েতের সমর্থন এবং প্রভাবের কারণেই কৃষ্ণ মেনন ব্রিটিশ যুদ্ধবিমানের পরিবর্তে সোভিয়েত রাশিয়ার বিমান কেনেন। এর প্রধান কারণ ছিল 1962 এবং 1967 সালের নির্বাচনে কৃষ্ণ মেননের নির্বাচনী প্রচারের অর্থ সরবরাহ করেছিল KGB।

মিত্রখিন এর সংগ্রহশালা থেকে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সোভিয়েতের যোগাযোগের কথাও জানা যায়।মিত্রখিনের মতে সোভিয়েত রাশিয়া বিভিন্নভাবে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিকে আর্থিক সাহায্য করত। কখনো কখনো খুব অদ্ভুত ভাবে অর্থের লেনদেন চলত যেমন দিল্লির ট্রাফিক জ্যামের মধ্যে গাড়ির জানালা দিয়ে আর্থিক লেনদেন। বহুবার ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কোষাগারে অর্থ পাঠানোর প্রমাণ পেয়েছে। এইসব ঘটনা জানতে পারলে নেহেরু মুচকি হেসে বলতেন যে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে সোভিয়েত সরকার অবমূল্যায়ন করে থাকে। তবে তিনি বুঝতেন যে সোভিয়েত রাশিয়া ভারতীয় সরকারের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে গেছে এবং গুপ্তচরদের মাধ্যমে নানা তথ্য পাবার চেষ্টা করছে। মিত্রখিনের মতে বিদেশে অনেক ভারতীয় কূটনীতিবিদ KGB এর মহিলা গুপ্তচরদের দ্বারা আকর্ষিত হতেন, তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতেন। তারপর ব্ল্যাকমেলের ভয় বহু গোপন তথ্য তাঁদের দিয়ে দিতেন। এই মহিলা গুপ্তচররা SPARROW নামে পরিচিত ছিলেন।

1 972 সালের মধ্যে ভারতের দশটারও বেশী মিডিয়া হাউজকে KGB অর্থ সরবরাহ করত এবং এইভাবে প্রায় 3500 টি নিবন্ধ তারা ভারতীয় সংবাদপত্রে প্রকাশ করে।

মিত্রখিনের সংগ্রহশালা এটাও দাবি করে যে 1977 এর নির্বাচনে 21 জন অবামপন্থী নেতাকে নির্বাচনের জন্য অর্থ সাহায্য করে KGB। নেহেরু গান্ধী জামানায় ভারতে গুপ্তচরবৃত্তি ছিল সাধারন ব্যাপার এবং ভারত সেসময় বিদেশী গুপ্তচর সংস্থা দের ক্রীড়া ভূমিতে পরিণত হয়।

ইউনাইটেড কিংডম এবং আমেরিকার মত দেশ মিত্রখিনের দাবিকে যাচাই করবার জন্য বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু ভারতের কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন প্রথম ইউপিএ সরকার মিত্রখিনের সমস্ত দাবিকে উড়িয়ে দেয়। এমনকি কোন তদন্ত কমিটি পর্যন্ত গঠন করার প্রয়োজন বোধ করেনি। সারা পৃথিবী যখন মিত্রখিনের সংগ্রহশালাকে অন্যতম চাঞ্চল্যকর একটি পাল্টা গুপ্ত সংস্থার তথ্য রূপে বিচার করছে, ভারত তখন এই সংগ্রহশালার তথ্য যাচাই করবার কোন তদন্তই করেনি। ভারতের জাতীয় কংগ্রেস পার্টি কোনরূপ তদন্ত ছাড়াই এই তথ্য ভিত্তিহীন বলে দাবি করে। কিন্তু মিত্রখনের দাবি বুঝিয়ে দেয় যে ভারতের প্রাচীন রাজনৈতিক দলের অন্ধকার ইতিহাস সম্পর্কে অনেক তথ্য উঠে আসতে বাকি আছে। মিত্রখিনের সংগ্রহশালা একটি ডুবন্ত হিমবাহের অগ্রভাগ মাত্র।

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.