হিন্দু জাতির অধঃপতনের নেপথ্য চিত্র- পঞ্চম পর্ব

0
300

© পবিত্র রায়

মুসলিম আক্রমণ দিয়ে শুরু হলো আমাদের আধুনিক ইতিহাস। সম্ভবতঃ ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর যখন খলিফা পদে আসীন, তখনই মুসলমানরা হিন্দুকূশ পার হয়ে প্রথম ভারত আক্রমণ করে।ক্ষাত্রতেজ পরিপূর্ণ ব্রাহ্মণ রাজা দাহির পিতা চাচ তখন মসনদে।এই চাচ মুসলমান বাহিনীকে আক্রমণ করে পরাজিত ও বিধ্বস্ত করে দেন।প্রধান সেনাপতি ছিলেন আব্দুল আজিজ- তাঁকে হত্যা করেন।সেই বাধাদান এমনই প্রবল ছিল যে ৬৪২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মুসলমানরা আর ভারতের দিকে তাকাতে সাহস পায়নি।এরপর আরবরা জলপথে প্রথম সিন্ধু প্রদেশের দেবল বন্দর আক্রমণ করে।এই আক্রমণেও আরব সৈন্যরা পরাজিত ও বিধ্বস্ত হয়- তার সাথে সেনানায়কের মৃত্যু হয়।

এরপর ৬৬০ খ্রিস্টাব্দে হযরত আলির খিলাফত আমলে পুনরায় সিন্ধু এলাকায় আক্রমণ চালায় মুসলিম বাহিনী।এই আক্রমণও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। প্রচন্ড রকমের প্রহার পেয়ে পরাজিত হয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হয় মুসলিম বাহিনী। আমাদের দেশের ঐতিহাসিকগণ দেখাতে চেষ্টা করেন যে বিন কাশিমের নেতৃত্বে আরব মুসলমানরা আমাদের আক্রমণ করলো, আর ভেজা বেড়ালের মত সহজেই পরাজয় স্বীকার করে নিলাম। ব্যাপারটা কিন্তু এত সহজ ছিল না।এর পূর্বে মুসলিম বাহিনী ভারতীয়দের কাছে তিনবার কচুকাটা হওয়ার পর চতুর্থ বারে সাফল্য পায় ঘটনার দুর্বিপাকে ও বৌদ্ধদের প্রত্যক্ষ বিশ্বাসঘাতকতায়। শুধু বৌদ্ধরাই নয়, এর সাথে ছিল দাহিরের বাহিনীর শ’পাঁচেক মুসলিম সেনা এক্ষেত্রে মুসলমান সেনাদের সম্যক পরিচয় প্রদান করা আবশ্যক মনে করছি।

একে হিন্দু রাষ্ট্র, যেখানে কোনও মুসলমান নেই- তায় আবার রাজা হলেন এক ব্রাহ্মণ, মুসলমান সৈন্য তো থাকারই কথা নয়!

মহম্মদ আল্লাফি নামক বহু আসামাত গোত্রের একজন ভাড়াটে সৈনিক ছিলেন। এই আল্লাফি রামালের মুসলিম প্রধানদের বিরুদ্ধে যান। এই আল্লাফি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য আশার’এর পূত্র আব্দুর রহমানকে হত্যা করে। এই আল্লাফি মুসলমান প্রধানদের বিরুদ্ধে যাওয়ার পর রাজা দাহিরের সেনাবাহিনীতে যোগদান করে পাঁচশো আরব সৈন্য সহযোগে। আল্লাফি রাতের অন্ধকারে রামালের সেনাবাহিনীর উপর আক্রমণ চালিয়ে পরাজিত করেন। দাহিরের এক সৎ ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী মন্ত্রী ছিলেন ‘বুধিমান’। এই বুধিমানই আল্লাফি ও তাঁর সৈন্যদের দাহিরের বাহিনীতে নিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। হায়রে বুধিমান! ইসলামী দর্শন না জেনেই দাহিরের বাহিনীতে নিয়োগের সিদ্ধান্ত কত বড় ভুল ছিল, সেটা অচিরেই বুঝতে পারা গেল বিন কাশিমের সাথে যুদ্ধের সময়। এই পাঁচশো সৈন্য দাহিরের পক্ষে যুদ্ধ না করে সোজাসুজি বিন কাশিমের বাহিনীতে যোগ দিল, যাঁরা দাহিরের দুর্বলতা তথা আঁটঘাট খুব ভাল করেই জানত।

এবার বৌদ্ধদের বিশ্বাসঘাতকতা বিষয়ে কিছু বলতেই হয়।বিন কাশিম যখন তাঁর সেনাবাহিনীকে সিন্ধু অভিযানের জন্য প্রস্তুত করলেন,তখন নিরুণের গভর্নর ছিলেন একজন বৌদ্ধ শ্রমণ।এই শ্রমণের দিক নির্দেশনায় বিন কাশিম সিয়ুস্তানের দিকে সেনা পরিচালিত করলেন।পথিমধ্যে বাহরাজ নামক স্থানে যখন হাজির হলেন,সেখানেও পেলেন আরও এক শ্রমণকে।সিয়ুস্তান দুর্গের প্রধান বা গভর্নর ছিলেন বজ্র,যিনি ছিলেন রাজা দাহিরের কাকা চান্দোরের পূত্র বা কাকাতো ভাই।

শ্রমণরা বজ্র সমীপে হাজির হয়ে বললেন, ‘আমরা বৌদ্ধ ভক্ত,আমাদের ধর্ম শান্তির ধর্ম।যুদ্ধ, হত্যা ও যে কোনও প্রকারের রক্তপাত আমাদের ধর্মে নিষিদ্ধ।আমরা জেনেছি বিন কাশিম হাজ্জাজের নিকট থেকে একটি আদেশ পেয়েছেন যে,যে কোনও ব্যক্তি প্রতিরক্ষা কামনা করলে তাঁকে সেটা প্রদান করা হবে।আমরা তাই বিশ্বাস করি যে আমরা যদি মহম্মদ বিন কাশিমের সাথে চুক্তিবদ্ধ হই,তাহলে আপনি আমাদের কাজকে ঠিক এবং যুক্তিসঙ্গত মনে করবেন।কারণ আরবের মানুষ বিশ্বাসী ও তাঁরা তাঁদের চুক্তি রক্ষা করে।’ শ্রমণেরা তাঁদের প্রধান বজ্র’কে যুদ্ধ থেকে নিরস্ত থাকতে বললেন।আরও বললেন,মুসলমান সেনারা তাঁর দ্বারা পরাভূত হবে না,তিনি বাধা দিতেও সক্ষম হবেন না-শুধু তাঁর জীবন ও সম্পত্তি বিপন্ন হবে। বজ্র কিন্তু বৌদ্ধ শ্রমণদের উপদেশ গ্রহণ করলেন না।বজ্র শ্রমণদের উপদেশ যখন গ্রহণই করলেন না,তখন এঁরা বিন কাশিমের নিকট বার্তা প্রেরণ করলেন এই বলে যে,’দেশের সব প্রজা,কৃষক, ব্যবসায়ী,বণিক ও নীঁচু শ্রেণীর লোকেরা বজ্রকে ঘৃণার চোখে দেখে-তাঁর আনুগত্যও স্বীকার করে না।তাঁর এমন কোনও শক্তি নেই যে যার দ্বারা তিনি আপনাকে বাধাদান করতে পারেন।’ এরপর এক সপ্তাহকালব্যাপী যুদ্ধ হলো।

এক সপ্তাহকাল যুদ্ধের পর বজ্র যখন অনুধাবন করলেন যে পরাজয় অবশ্যম্ভাবী, তখন রাতের অন্ধকারে উত্তর দিক দিয়ে পলায়ন করলেন সেখান থেকে বুধিয়া রাজ্যের সীমানায় হাজির হলেন। এই সময় বুধিয়া রাজ্যের প্রশাসক ছিলেন একজন শ্রমণ।সেই শ্রমণের নাম ছিল কাকা এবং তাঁর পিতা ছিলেন আউ রাজার কোটাল। কুম্ভ নদীর তীরে সিসাম নামক জায়গায় তাঁর এক সুরক্ষিত দুর্গ ছিল। বজ্র এই দুর্গের পাশেই তাঁবু খাঁটিয়ে শিবির স্থাপন করলেন। এরপর কাকা’র সাথে সাক্ষাৎ করলে কাকা বললেন,’ সন্যাসীরা তাঁদের জ্যোতিষ শাস্ত্রের হিসেব অনুযায়ী বলেছেন, এই দেশ মুসলমান সৈন্যবাহিনী কর্তৃক অধিগৃহীত হবে এবং কাকা নিজেও সেটা বিশ্বাস করে।’ প্রমাণ হিসেবে দেখিয়েছিলেন জাঠ বাহিনী রাত্রিবেলা মহম্মদ বিন কাশিমের সৈন্য বাহিনীর উপর হামলা করতে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেছিলেন।এরপর কাকা বিন কাশিমের নিকট গমণ করে জাঠদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতায় সামিল হয়। তার সাথে জাঠদের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে দিয়ে বিন কাশিমের কাছে ভাল মানুষ সেজে বসলেন।উপরন্তু আত্মসমর্পণ করে সমস্ত রকমের সাহায্য করতে রাজি হয়ে পড়লেন।এরপর বিন কাশিম সিসাম দুর্গ আক্রমণ করলে বজ্রসহ বহু অমাত্য ও উচ্চপদস্থ কর্মচারীর মৃত্যু হয় বিন কাশিমের হত্যা লীলার মাধ্যমে।

(ক্রমশঃ)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.