বাংলা ভাগ ও পশ্চিমবঙ্গের জন্ম

0
307

© সূর্য শেখর হালদার

পশ্চিমবঙ্গের বাঙ্গালীরা এক হতভাগ্য জাতি। ভারতের অন্যান্য অঙ্গ রাজ্যের কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল, তার ইতিহাস সেই রাজ্যের বাসিন্দারা জানতে পারে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে যাঁরা পড়াশোনা করেছেন ( পশ্চিমবঙ্গ বোর্ডের অধীনে) তাঁরা জানেন না পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যটা কবে কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল। এই রাজ্য সৃষ্টির পিছনে কারণটাই বা কি। কারণ সরকারি বিদ্যালয়ের ইতিহাস বইতে এই ইতিহাস পড়ানো হয় না। বাংলার ইতিহাস পড়ানো হয় না এ কথা বললে কিন্তু ভুল হবে। পাঠান সুলতানরা কিভাবে ‘বঙ্গ বিজয়’ করেছিলেন: বাংলার নবাবদের কৃতিত্ব : চরিত্রহীন সিরাজের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ – এইসব পশ্চিমবাংলার বিদ্যালয় পাঠ্য ইতিহাস বইতে খুব গুরুত্ব সহকারে বর্ণিত হয়। সেই সঙ্গে বাংলা ভাগের জন্য দায়ী করা হয় হিন্দুদের। ভারত কেশরী ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় আজও পশ্চিমবঙ্গের বিদ্যালয় পাঠ্য ইতিহাস বইতে ভিলেন। কেননা তিনি বঙ্গভঙ্গ করেছিলেন। অতএব ইতিহাস বইতে তিনি ব্রাত্য। কিন্তু এই তথ্য কি সত্য? আসুন আজ ডুব দেই ইতিহাসের সাগরে।

ভারত ভাগের জন্য কংগ্রেস মুসলিম লীগ এবং ইংরেজ সবাই দায়ী। এমন না যে শুধুমাত্র মুসলিম লীগ ভারত ভাগের জন্য দায়ী। যে বৈঠকে ভারত ভাগের সিদ্ধান্ত সরকারিভাবে গ্রহণ করা হয়, সেই বৈঠকে বাবাসাহেব আম্বেদকর উপস্থিত ছিলেন না। বাবাসাহেব এর অনেক অনুগামী এই তথ্যকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেন, এবং বোঝাতে চান বাবাসাহেব হিন্দু শক্তিকেই ভারত ভাগের জন্য দায়ী ভাবতেন। এটাও ঠিক বাবা সাহেবকে কংগ্রেস বিভিন্নভাবে হেনস্থা করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু হিন্দুত্ববাদী শক্তি কখনো বাবা সাহেবের বিরোধিতা করেনি। বরং উনি তৎকালীন আরএসএস এর সাহায্য নেন। এর যথেষ্ট প্রমাণ আছে । যদিও উনি প্রকাশ্যে হিন্দু বিরোধী ছিলেন, মনুস্মৃতি গ্রন্থ প্রকাশ্যে পুড়িয়ে বিক্ষোভ দেখান, কিন্তু আড়ালে আরএসএসের হিন্দুত্ববাদীদের সাহায্য তিনি নিতেন নির্বাচনী যুদ্ধে জেতার জন্য। আরএসএসের বিশিষ্ট কার্যকর্তা রাষ্ট্র ঋষি শ্রী
দত্তপন্থ ঠেংরিজী 1952 সালের ভোটে ওনার চিফ ইলেকশন এজেন্ট হন। সেবার দেখা যায় বাবাসাহেব নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন, কিন্তু তিনি উচ্চবর্ণের হিন্দুদের ও ভোট পেয়েছেন।
যাই হোক, এটা অন্য ব্যাপার। এটা নিয়ে অন্য নিবন্ধ লেখা যেতে পারে।

এবার আসি বাংলা ভাগ এর কথাতে। অনেক মুসলিম এবং ভীম আর্মি ( বাবাসাহেব এর তথাকথিত সমর্থক) নেতা
দেখাতে চন বাংলা ভাগের জন্য হিন্দুরা দায়ী। তথ্য পরিবেশনের ধরন একটু বদলে নিয়ে এটা তাঁরা দেখান। এখানে মনে রাখতে হবে ভারত ভাগ হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে। কংগ্রেস মুসলিম লীগ সবাই মেনে নিয়েছিল এটা। অখন্ড বাংলাতে মুসলিমের সংখ্যা ছিল বেশি। তাই ইতিহাসে বলছে বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সুরাবর্দি সাহেব এবং পাকিস্তানের জনক জিন্না দুজনেই চাইছিলেন সমগ্র বাংলা পাকিস্তানে আসুক। কারণ প্রত্যেক দেশ নিজের জন্য বেশি জমি চায়। এই বেশি জমি যাতে পাকিস্তান দখল করতে পারে তার জন্য 1946 সালে direct killing অনুষ্ঠিত হয়। সরকারি উদ্যোগে হিন্দু হত্যা হয় কলকাতাতে। উদ্দেশ্য হিন্দুদের ভয় পাওয়ানো। তারিখ 16 আগস্ট 1946। প্রাথমিকভাবে অনেক হিন্দু আহত ও নিহত হলেও, পরে হিন্দুরা প্রতিরোধ করে এবং মুসলিম লীগের চক্রান্ত ব্যর্থ হয়। আমাদের বিদ্যালয়ের ইতিহাস বইতে এই ঘটনা লেখা থাকে না। আমিও ছোটবেলায় এটা জানতাম না।

যাই হোক মুসলিম লীগের উদ্দেশ্য ছিল সমগ্র বাংলা পাকিস্তান নিয়ে গিয়ে হিন্দুদের সেখান থেকে মেরে তাড়ানো, অথবা ইসলামে ধর্মান্তরিত করা। যেটা ঠিক পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর হয়েছে। 1947 সালে যে পরিমাণ হিন্দু পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশে ছিল, আজ তত নেই। যে কেউ নিরপেক্ষ মিডিয়া থেকে তথ্য যাচাই করতে পারেন। যাই হোক সে কারণেই পশ্চিমবাংলার হিন্দু নেতারা চেয়েছিলেন বাংলাও ভাগ হোক। হ্যাঁ, শ্যামাপ্রসাদ বাবু ঠিকই ভেবেছিলেন। উনি বলেছিলেন সবাই ভারত ভাগ করছে , তাই উনি পাকিস্তান ভাগ করবেন। প্রস্তাবিত পাকিস্তান থেকে পশ্চিমবাংলাকে কেটে তিনি হিন্দু বাঙালির হোমল্যান্ড পশ্চিমবাংলা বানিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা শ্যামাপ্রসাদকে ভুলে গেছি।বাংলা ভাগের প্রসঙ্গ উত্থাপন হবার পর, তৎকালীন বাংলার আইনসভা তে এই বিষয়ের উপর ভোটাভুটি হয়। এই ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হয় 1947 সালের 20 জুন। বাংলা ভাগের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন 58 জন। এনারা সবাই ছিলেন হিন্দু। এনাদের মধ্যে ছিলেন কমরেড জ্যোতি বসু, রতনলাল ব্রাহ্মণ, কংগ্রেসী প্রফুল্ল সেন, শ্যামাপ্রসাদ বাবু তো ছিলেনই। এনাদের মধ্যে জ্যোতি বসু এবং প্রফুল্ল সেনদের ভিটে ছিল পূর্বপাকিস্তানে; পশ্চিমবঙ্গে না। তবুও তাঁরা চেয়ে ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের ভিটেমাটি ত্যাগ করে হিন্দু বাঙালির হোমল্যান্ড পশ্চিমবঙ্গে চলে আসতে।
এটা ঠিক কমিউনিস্ট পার্টি প্রথম দিকে পাকিস্তান প্রস্তাবের পক্ষে ছিল। কিন্তু পরে জ্যোতিবাবু বুঝেছিলেন নিজের ভিটেতে লেনিন, মার্কস এর বস্তাপচা আদর্শ প্রচার করা যাবে না। কারণ ইসলাম রাষ্ট্র কোনোদিন কোথাও মার্কসীয় তত্ত্ব প্রচারকে ভালো চোখে দেখেনি। তাই তিনি শ্যামাপ্রসাদের তৈরি করা হিন্দুপ্রধান পশ্চিমবঙ্গকে নিজের উদ্ভট আদর্শ বিস্তারের আদর্শ জায়গা বলে ভেবেছিলেন। আর তার জন্য বিন্দুমাত্র কৃতজ্ঞতা শ্যামাপ্রসাদের প্রতি তাঁর ছিল না।অন্যদিকে যে 21 জন অবিভক্ত বাংলার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন তারা সবাই ছিলেন মুসলিম লীগের সদস্য এবং ধর্মে মুসলমান। এখন সেক্যুলার দের বক্তব্য বাংলা ভাগের জন্য হিন্দুরাই দায়ী। এই বক্তব্যের উৎস হচ্ছে এই তথ্য যে অবিভক্ত বাংলার পক্ষে ভোট যাঁরা দেন, তাঁরা সকলেই মুসলিম: অন্যদিকে বাংলা ভাগের পক্ষে ভোট যাঁরা দেন, তাঁরা সকলেই হিন্দু !! কিন্তু শুধু এই তথ্য ইতিহাসকে বিচার করবার জন্য যথেষ্ট নয়। বাংলা ভাগের পটভূমি তাঁরা উল্লেখ করেন না। করলে কেন বাংলা ভাগ হয়েছিল সেটা সবাই জানবে এবং সেক্যুলার দের তথ্য পরিবেশনের কারসাজি ধরে ফেলবে।এইবার বিচার করা উচিত বাংলা ভাগ কি ঠিক হয়েছে না ঠিক হয়নি। এটাকে বিচার করতে হবে ভারত ভাগের পরিপ্রেক্ষিতে। ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হয়। প্রথমে আসি আমরা যারা এই বাংলার অর্থাৎ পশ্চিম বাংলার লোকদের কথাতে। বাংলা যদি অখন্ড থাকতো, তাহলে সমগ্র বাংলা প্রদেশ ভারতে নয় , পাকিস্তানে যেত।

কিন্তু,আমরা যারা অনাদিকাল ধরে পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা, তারা কেন পাকিস্তানে যাব ? ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ ছিলেন এই বঙ্গের নেতা। উনি আমাদের সেন্টিমেন্ট ধরতে পেরেছিলেন। আমরা কখনোই পাকিস্তানের মতো ইসলামিক রাষ্ট্রে মুসলমান শাসনের অধীনে শাসিত হতে চাই না। এখনও চাই না, তাই হিন্দুত্ব বাদী দর্শনে বিশ্বাস করি। আর যেসব হিন্দু বাংলাদেশে ছিল, তাদের কথা যদি ধরা হয়, তাহলেও দেখা যাবে যে তারা মুসলমান শাসকের অধীনে থাকতে পারেনি। এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যোগেন মন্ডল। এই নমঃশূদ্র নেতার নাম ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা হয়। কারণ এনার কথা জানলে দলিত মুসলমান ঐক্যের যে আবহ ভারতের বুকে সেকুলাররা তৈরি করার চেষ্টা করছেন, সেটা পুরোপুরিভাবে বিধ্বস্ত হয়ে যাবে। যোগেন বাবু মনে করতেন উচ্চবর্ণের হিন্দুরা তপশিলি হিন্দুদের ওপর খুব অত্যাচার করে। তাই মুসলিম লীগের সঙ্গে এক হয়ে পাকিস্তানে যান। এমনকি সুরাবর্দী সাহেবের direct killing অভিযানে যাতে বেশি করে হিন্দুরা নিহত হন, সেজন্যে নমসুদ্র হিন্দুদের তিনি হিন্দুদের পক্ষ নিতে বারণ করেন। তিনি পাকিস্তান গঠন সমর্থন করেন ।পাকিস্তানের প্রথম আইনমন্ত্রী যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল। কিন্তু মাত্র তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর, (হ্যাঁ তপশিলি হিন্দুদের উপরেও ) মুসলমান দের অত্যাচার, পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস দেখে উনি ভারতে ফেরত আসেন!!! উনার পদত্যাগপত্র পড়লে বোঝা যাবে পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দুদের উপর কিভাবে অত্যাচার করা হয়েছিল, এমনকি কমিউনিস্ট দের উপরেও। এই সময় আর একজন নমঃশূদ্র নেতা ছিলেন। তিনি নমস্য প্রমথ নাথ ঠাকুর। ইনি কিন্তু হিন্দু বাঙালির হোমল্যান্ড পশ্চিমবঙ্গ করার পক্ষে ছিলেন।

যাই হোক হিন্দুদের উপর যে অত্যাচার পূর্বপাকিস্তানে এবং পরবর্তী বাংলাদেশ হয়েছে তা সারা বিশ্ব জানে। এর থেকে এই সিদ্ধান্ত করা যেতে পারে যে সমগ্র বাংলা যদি পাকিস্থানে যেত, তাহলে শুধু বাংলাদেশের লোকেদের নয় যাদের ভিটে এই বঙ্গে ছিল, তাদেরও উদ্বাস্তু হয়ে বিহার বা ঝাড়খন্ড যেতে হতো। পাকিস্তানেও হিন্দুর সংখ্যা কমেছে। হিন্দু ছাড়া অন্য ধর্মের মানুষরাও পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ এই দুই দেশে থাকতে পারে না। তাই বৌদ্ধ ধর্মের চাকমা শরণার্থীরা ভারতের দিকে চলে আসে। তাহলে এইসব কথা মাথায় রেখে আমি মনে করি বাংলা ভাগ সঠিক সিদ্ধান্ত। শ্যামাপ্রসাদ বাবু ঠিক কাজ করেছিলেন। জ্যোতিবাবু সেদিন প্রাক্টিক্যালিটি দেখিয়েছিলেন বাংলা ভাগ কে সমর্থন করে। যদি ভারত না ভাগ হতো তাহলে বাংলা ভাগের প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু ভারত ভাগ যখন ধর্মের ভিত্তিতে হয়েছে,তখন ধর্মের ভিত্তিতে বাংলা ভাগ সঠিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে সেক্যুলারিজমের চাপে আমরা যারা হিন্দু হিসাবে বাঁচতে চাই, ইসলামে ধর্মান্তরিত হতে বা ভিটেমাটি ছেড়ে উচ্ছেদ হতে চাই না ( যেমন বাংলাদেশী হিন্দুরা হয়েছে) তাদের আরো বেশি করে হিন্দুত্ববাদী দর্শনকে আঁকড়ে ধরা উচিত। এই পশ্চিমবঙ্গের বুকে হিন্দুত্ববাদী সরকার প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ করা উচিত, সেটা না হলে আমাদের আবার উদ্বাস্তু হওয়া সময়ের অপেক্ষা মাত্র।

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.