হিন্দু জাতির অধঃপতনের নেপথ্য চিত্র- চতুর্থ পর্ব

0
268

© পবিত্র রায়



এরপর ইতিহাসে আর এক ক্ষাত্রশক্তি ও তেজবীর্যপূর্ণ এক পুরুষকে দেখতে পাওয়া যায় তিনিও চন্দ্রগুপ্ত নামধারী,ইতিহাস তাঁকে গুপ্ত।বংশের প্রথম চন্দ্রগুপ্ত বলেই জানে।৩২০ খ্রিস্টাব্দে পাটলিপূত্রে এক স্বাধীন রাজত্ব স্থাপন করেন এই চন্দ্রগুপ্ত। মনে রাখা দরকার প্রথম চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন মৌর্য্য বংশীয়,আর এই দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন গুপ্ত বংশীয়।যোগ্যপূত্র সমুদ্রগুপ্তের হাতে রাজ্যভার তুলে দিয়ে তিনি ৩৩০ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন এই গুপ্ত বংশের রাজাগণ ক্ষাত্রতেজে ছিলেন মহাবলীয়ান।পশ্চিমী ইতিহাসবিদগণ সমুদ্রগুপ্তকে ভারতের নেপোলিয়ান নামে চেনেন। এই চন্দ্রগুপ্তের পূত্র সমুদ্র গুপ্ত,তাঁর পূত্র দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন পিতার কনিষ্ঠ সন্তান।জেষ্ঠ পূত্র ছিলেন রামগুপ্ত এই রামগুপ্তর দিকে তাকালেই ক্ষাত্রতেজের ছন্দপতন ঘটে যায়। রামগুপ্ত ছিলেন ভীরু ও দুর্বল চিত্তের মানুষ।পিতা সমুদ্রগুপ্তের সাথে সম্পূর্ণ বেমানান এক চরিত্র ছিলেন রাম গুপ্ত।অথচ জেষ্ঠ হওয়ার কারণে এই রামগুপ্তই সিংহাসনে বসেন। শক রাজা রামগুপ্তকে তাঁর সুন্দরী স্ত্রীকে নিজের কাছে ভোগের জন্য পাঠাতে বললে কনিষ্ঠ ভ্রাতা দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত গৃহদেবীকে নিজের হেফাজতে নিয়ে নিলেন।চন্দ্রগুপ্ত শক রাজাকে হত্যা করে ফিরে এসে জেষ্ঠভ্রাতাকে খুন করে সিংহাসনে বসেন- গৃহদেবীকেও বিবাহ করেন।এরপর শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠন করে সমস্ত শক রাজাকে পর্যুদস্ত ও হত্যা করেন।একেবারে শেষ পর্যায়ে সত্য সিং’য়ের পূত্র রুদ্র সিং’কে হত্যা করেন।সমুদ্রগুপ্ত কুষাণ সমস্যার সমাধান করেছিলেন চিরদিনের জন্য-দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত করলেন শকমুক্ত ভারত।এরপর বিক্রমাদিত্য উপাধি ধারণ করে রাজধানী উজ্জ্বয়িনীতে স্থাপন করে সেখানেই বসবাস শুরু করলেন।

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত সম্পর্কে ভিনসেন্ট স্মিথ বলেছেন,’আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি জাতি, আদর্শ ও আচরণগতভাবে পার্থক্য গুপ্ত রাজাদের পশ্চিম ভারতে ম্লেচ্ছ রাজশক্তি দমনের ঐকান্তিক ভাবে বিশেষ কারণ জুগিয়েছিল’। বিক্রমাদিত্য চন্দ্রগুপ্ত বৌদ্ধ ও জৈন মতধারীদেরপ্রতি সহনশীল থাকলেও তিনি ছিলেন গোঁড়া হিন্দু তথা বিষ্ণুর উপাসক।আর তার জন্যেই তিনি বলপূর্বক বিদেশী শক্তি তথা শাসকদের উচ্ছেদ করে বিশেষ আনন্দ পেতেন।’ ফা হিয়েন লিখেছেন,’বিক্রমাদিত্যের রাজত্বকালে প্রজাদের সমৃদ্ধি,ধন সম্পদ ও উন্নতি চরম শিখরে পৌঁছেছিল।ক্ষাত্রতেজের স্ফূরণ প্রশাসক হিসেবে সফলতার শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছিল। ৩৫ বছর রাজত্ব করে এই ক্ষাত্রবীর ৪১৪ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন- রেখে যান ভারতবর্ষের বুকে এক বীরগাঁথার ইতিহাস।এই ক্ষাত্রবীর তাঁর রাজ্যের আপামর মানুষের কাছে প্রচন্ড জনপ্রিয় ছিলেন পরাক্রমের জন্য।ক্ষাত্রতেজ তখনও শেষ হয়ে যায়নি।সরকারিভাবে সম্রাট অশোক বৌদ্ধ মতবাদের প্রচার ও প্রসার করে গেলেও ভারতীয় মূল জনমানসে সেটা শিকড় গাঁড়া তো দূরের কথা,প্রভাবও ফেলতে পারেনি বৌদ্ধ মতবাদ সমাজে একটা উটকো বোঝায় পরিণত হয় সম্রাট অশোকের মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই।

এরপরই আলোচনা করতে হয় বিক্রমাদিত্য চন্দ্রগুপ্তের যোগ্য উত্তরসূরি কুমার গুপ্তর কথা।খুবই দূরদর্শী ছিলেন এই কুমারগুপ্ত।কুমারগুপ্তের সময়েই ভারতে হুণ আক্রমণ ঘটে।হুণেরা মধ্য এশিয়ায় ধ্বংস সাধন করে।শুধু তাই নয়-রাশিয়া, পোল্যান্ড, জার্মানি,ফ্রান্স সব জায়গাতেই আক্রমণ ও ধ্বংসলীলা চালিয়েছে। তখনও হুণেরা ভারতে হানা দেয়নি।কুমারগুপ্ত তাঁর দূরদর্শিতায় বুঝতে পেরেছিলেন মধ্য এশিয়া ও ইউরোপ ধ্বংসকারী হুণ অপশক্তি একদিন না একদিন ভারতে আছড়ে পড়বেই।তাই তিনি এক সুশিক্ষিত ও সুগঠিত তথা ক্ষাত্রতেজে বলীয়ান এক সেনাবাহিনী প্রস্তুত রেখেছিলেন।বৈদিক কুমারগুপ্ত চাণক্য নিয়ম মেনে শস্ত্রবলকে সজাগ রেখেছিলেন।গান্ধার প্রদেশেই প্রথম হুণ আক্রমণ আছড়ে পড়ল।কুমারগুপ্ত খবর পেয়েই স্বীয়পূত্র ক্ষাত্রবীর স্কন্দগুপ্তকে সেনাপতি পদে বসিয়ে চতুরঙ্গ সেনাবাহিনীসহ গান্ধার পাঠিয়ে দিলেন।স্কন্দগুপ্তের বাহিনী দিনের পর দিন ধরে একটা একটা করে হুণ বাহিনী পর্যুদস্ত ও হত্যা করতে থাকল। কমবেশি একবছর ধরে হুণদের শায়েস্তা ও উচ্ছেদ করে রাজধানী পাটলিপূত্রে প্রত্যাবর্তন করেন স্কন্দগুপ্ত।

এরপর কুমারগুপ্তের মৃত্যু হলে স্কন্দগুপ্ত সম্রাট।হলেন।স্কন্ধগুপ্তকে নিয়ে আলোচনার আগে একটি রোমান কাহিনী নিয়ে আলোচনা করার প্রাসঙ্গিকতা অনুভব করছি।রোমান সাম্রাজ্যের গৌরবময় যুগে জনৈক রোমক সম্রাট সম্পর্কে একটি কৌতুহলজনক কাহিনী প্রচলিত আছে।সেই সম্রাট যখন রাজপ্রাসাদে মৃত্যুশয্যায় মৃত্যুর সাথে লড়ছেন,তখন হঠাৎ একদিন উঠে দাঁড়িয়ে তরবারি হাতে নিলেন।পরিচর্যাকারীরা রোগীকে বিকারগ্রস্ত মনে করলেন।সম্রাট তাঁদের সরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘রোমক সম্রাটের মৃত্যু কখনও বিছানায় শুঁয়ে হতে পারে না।তাঁর মৃত্যু হবে রণসজ্জায় সজ্জিত হয়ে ও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।’ অদ্ভুত ভাবে স্কন্দগুপ্তের জীবনীর সাথে এক জায়গায় রোমক উপকথার অদ্ভুত মিল দৃষ্ট হয়।

স্কন্দগুপ্তের আমলে খিখিল নামক এক হুণ।সেনাপতি দ্বিতীয়বারের জন্য ভারত আক্রমণ করে।স্কন্দগুপ্ত যখন খিখিলের মোকাবিলা করে উৎখাত করতে ব্যস্ত,তখন খবর পেলেন তাঁর সৎ ভাই পুরগুপ্ত বিশ্বাসঘাতকতা করে সিংহাসনের দখল নিতে চাইছে।সিংহাসন ধরে রাখার জন্য স্কন্দগুপ্ত কিন্তু রাজধানীতে ফিরে এলেন না সিংহাসন উপেক্ষা করে তিনি হুণ উৎখাতেই নিয়োজিত রইলেন।শত্রুকে ধ্বংস ও উৎখাত করলেনও।মৃত্যুবরণ করলেন যুদ্ধ শিবিরেই দেশভক্তি ও কর্ত্যব্যের এমন নজির সত্যিই বিরল অপদার্থ পুরগুপ্তের সময় খিখিল আবার ভারতে হানা দিতে শুরু করে।খিখিলের পর তোরমান হানা দিয়ে কম্বোজ,গান্ধার ও পঞ্চনদ প্রদেশে হানা দিয়ে ধ্বংসলীলা চালাতে থাকে।তক্ষশীলার বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংস সাধন করে অমূল্য সব পুস্তকে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর ৫১১ খ্রিস্টাব্দে তোরমান উজ্জ্বয়িনী দখল করে নেয়। তোরমানের পর মিহিরগুল ভারতের রুদ্রদেবের পূজারী হয়ে উঠল।মিহিরগুল ছিলেন প্রচন্ড বৌদ্ধ বিরোধী।বহু বৌদ্ধস্তুপ, বিহার ধ্বংস করেছিলেন-তার সাথে লুট করে নিয়েছিলেন বৌদ্ধদের বহু ধনরত্ন ও সম্পদ।

উজ্জ্বয়িনীর সিংহাসনে তখন প্রবল পরাক্রমশালী মিহিরগুল।বিক্রমাদিত্যের আসনে আসীন মিহিরগুল দিকে কারও আঙুল তোলার সাহস নেই । এই সঙ্কটময় কালে মালব প্রদেশের এক ক্ষুদ্র রাজা নিজের কাঁধেই সমস্ত দায়িত্ব তুলে নিলেন।এই ক্ষুদ্র সাম্রাজ্য নাম ছিল যশোধর্মা।ইনি প্রথমে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যগুলিকে একত্রিত করে শক্তি সংহত করলেন।মগধের বালাদিত্যও এই প্রয়াসকে সমর্থন করলেন।এরপর যশোধর্মার নেতৃত্বে একযোগে চারিদিক থেকে হুণদের বিরুদ্ধে অভিযান চালান হলো। অমিত শক্তিশালী মিহিরগুলের হুণ বাহিনী বিধ্বস্ত হলো রণক্ষেত্রে।এবার সরাসরি মিহিরগুলের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালালেন যশোধর্মা। ৫২৮ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে ‘মান্দসৌর’এর প্রান্তরে উভয় বাহিনী মুখোমুখি হলো।প্রচন্ড এক সংঘর্ষের পর মিহিরগুল যশোধর্মার হাতে বন্দী হলেন।মগধরাজ বালাদিত্য যশোধর্মার হাত থেকে নিজের হেফাজতে মিহিরগুলকে নিয়ে অতি উদারতা দেখিয়ে মুক্ত করে দেন।যশোধর্মা কিন্তু মিহিরগুলের প্রাণদণ্ডের আদেশ দিয়েছিলেন পরবর্তীতে এই মিহিরগুল কাশ্মীরে গিয়ে হুণদের গোপনে সংগঠিত করে শক রাজাকে হত্যা করে। এরপর রাজা হয়ে গান্ধার আক্রমণ করে জয় করেন,তার সাথে বৌদ্ধদের উপর শুরু করল অত্যাচার। বৌদ্ধ মঠ,বিহার ধ্বংস করতে থাকল।বৌদ্ধরা বদলা নেওয়া তো দূরের কথা,প্রতিরোধ করার চেষ্টাও করল না।৫৪০ খ্রিস্টাব্দে মিহিরগুলের স্বাভাবিক মৃত্যু হলে বৌদ্ধরা বীরত্ব প্রকাশ করল।কী ভাবে বীরত্ব প্রকাশ করা হলো? বৌদ্ধ পুরাণে লেখা হলো,মিহির গুল নরকে গিয়েছে। পরিস্কার ভাবে লেখা হল,’যখন এই হুণ রাক্ষস মিহিরগুল মারা যায়, তখন বুদ্ধের প্রতি ঘৃণা পোষণের জন্য শাস্তি ভোগ করতে অনন্ত নরকে গেল এবং সেখানে তীব্র নির্যাতন ভোগ করতে থাকল।সেই সময়ে সেই আঘাতে পৃথিবী দ্বিধা বিভক্ত হলো।যতসব পশু-পাখি আছে, আশ্রয়ের নিমিত্ত পালাতে শুরু করল।আরও অনেক দ্বৈব দুর্বিপাক দেখা দিল।’ অপূর্ব বীরত্বই বটে! বীরত্ব দেখিয়ে নরকে পাঠিয়ে যন্ত্রণা ভোগ করাল,পৃথিবীকে দ্বিধা বিভক্ত বানাল,পশু পাখিকে ভীত সন্ত্রস্ত বানাল- বৌদ্ধ বীরত্বের বাহার বৈ কি! মিহিরগুলের মৃত্যুর পর ভগবান বুদ্ধ আর অহিংস থাকতে পারলেন না।মিহিরগুলের উপর ভগবান বুদ্ধের যত ক্রোধ ও হিংসা আছে,সবটাই আবর্তিত হলো। নরকে নিয়ে গিয়ে অনন্তকাল যন্ত্রনা দিতে থাকলেন মিহিরগুলকে।সুতরাং বলা যেতে পারে ‘ভগবান বুদ্ধ’ নিজেই সম্পূর্ণ অহিংস নন-অহিংসা ওনার মুখোশ,হিংসা হলো মুখ।

যশোধর্মার আক্রমণের পর হুণেরা একেবারেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বহু মারা যায়। এরপরও যাঁরা বেঁচেছিলেন,তাঁদের বেশিরভাগ বৈদিক হিন্দুধর্ম গ্রহণ করে ভারতীয় ভাষা,রীতিনীতিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।হুণদের আর কোনও অস্তিত্বই রইল না।সম্পূর্ণটাই হিন্দুত্বে বিলীন হয়ে গেল।যশোধর্মার তেজের কাছে বিশ্ব কাঁপানো হুণ শক্তি পরাজিত ও বিলীন হওয়ায় বহুদিনের জন্য ভারত বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে নিরাপদ ছিল।এ সম্পর্কে ভিনসেন্ট স্মিথ’ই সবচাইতে সঠিক কথা বলেছেন।তিনি বলেন,’মিহিরগুলের পরাজয় ও অক্ষি নদীর হুণ রাজশক্তির রাজসত্তা নাশ হওয়ার ফলে ভারতের ওপর পরবর্তী পাঁচশো বছরের মধ্যে কোনও বৈদেশিক আক্রমণ হয়নি।’ মি. স্মিথ একদিকে সঠিকই বলেছেন। কারণ,এই সময়ের মধ্যে মুসলিম আক্রমণ হলেও সেটা সীমিত ছিল ভারত বর্ষের পশ্চিম এলাকার সামান্য এক অঞ্চলের মধ্যে।ভারতের মূল ভূখণ্ডে সেইসব আক্রমণ পৌঁছানো তো দূরের কথা,অনেকে সেই খবর জানতেও পারেনি।এই সময়ের হাজার বছর পূর্বে যদিও বৌদ্ধ ও জৈন মতবাদ এসে গিয়েছিল,তা সত্ত্বেও ভারতের ক্ষাত্রশক্তিকে পুরোপুরি বিনাশ করা সম্ভব হয়নি।কিছুকালের জন্য সামান্য স্তিমিত হলেও পরবর্তীতে ক্ষাত্র রাজশক্তি বিপুল উদ্যমে ফিরে এসে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করেছে।হুণ সাম্রাজ্য ধ্বংসের পর ভারতের সীমানা হয় উত্তরে কুরু,মধ্য এশিয়ার কোটানের এলাকা পর্যন্ত হিন্দুদের হাতে আসে।বহু ঐতিহাসিকের মতে রাজা শিলাদিত্য গজনীতে রাজত্ব করতেন।এই পর্যন্তই আমাদের প্রাচীন ইতিহাস ও সেই সাথে আমাদের অবক্ষয়ের প্রাচীন ঘটনাবলী।সপ্তম শতাব্দী থেকে আমাদের আধুনিক ইতিহাস।

( ক্রমশঃ)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.