সিপিএম, গণতন্ত্র এবং জরুরী অবস্থা

0
252



   © তপন কুমার ঘোষ

পশ্চিমবঙ্গে আজ চলছে জঙ্গলের রাজত্ব। কলকাতা শহরের ট্রাফিক সিগন্যালের সঙ্গে মাইকে তারস্বরে রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজছে । দিদি বড় ভালােবাসেন। কিন্তু সেই আওয়াজে চাপা পড়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার মানুষের আর্তনাদ। টুকটুকি মন্ডলদের মা-বাবার আর্তস্বর । সেদিকে মমতা ব্যানার্জী কান দিতে পারবেন না। তাঁকে সযত্নে মুসলিম ভােটব্যাঙ্ক রক্ষা করতে হবে। তাই উস্তি , কালিগঞ্জ, সমুদ্রগড় , পঞ্চগ্রামে হিন্দুদের বাড়িঘর দাউ দাউ করে জ্বলে গেলেও মমতার প্রশাসন হিন্দুদের প্রতি মমতাহীন। গােটা রাজ্যে সংখ্যালঘুর তাণ্ডবলীলা চলছে। দুর্বল দরিদ্র হিন্দুর পাশে দাঁড়ানাের কেউ নেই। 
 

এসবের ফলে বহু এলাকাতেই হিন্দুদের মধ্যে মমতা ব্যানার্জী দ্রুত জনপ্রিয়তা হারাচ্ছেন। এ রাজ্যের বিজেপি আইনশৃঙ্খলার অবনতির প্রতিবাদে কিছু আন্দোলন করার ভান করছে। কিন্তু সবাই জানে তা নিষ্ফলা। কারণ (১) বিজেপিতে কোন সাহসী লড়াকু নেতৃত্ব নেই , (২) বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামাে এখানে খুবই দুর্বল, (৩) কেন্দ্রে বহুচর্চিত মােদী – মমতা আঁতাত । 
 

এই পরিস্থিতিতে ঘাপটি মেরে বসে আছে সিপিএম। মমতার জনপ্রিয়তা হারানাের সব লাভটাই তারা ফোকটে পেয়ে যাবে বলে আশা করছে। আর মুখে গণতন্ত্র বাঁচানাের কথা বলছে। তাদের ৩৪ বছরের শাসনে এ রাজ্যে তারা কতটা গণতন্ত্র রক্ষা করেছে তা এখনও কেউ ভােলেনি। কিন্তু আমি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই ১৯৭৫-৭৭ সালে ভারতের গণতন্ত্রের সেই অন্ধকারময় দিনগুলিতে সিপিএমের ভূমিকার কথা। সেদিন ইন্দিরা গান্ধী জরুরী অবস্থার নামে দেশে স্বৈরতন্ত্র চালু করেছিলেন । ইন্দিরা গান্ধীর সেই স্বৈরতান্ত্রিক জরুরী অবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে যখন জয়প্রকাশ নারায়ণ , মােরারজি দেশাই , বাজপেয়ী , আদবানী থেকে শুরু করে প্রফুল্ল সেন , সুশীল ধাড়া , বিষ্ণুকান্ত শাস্ত্রী থেকে শুরু করে বরুণ সেনগুপ্ত , গৌরকিশাের ঘােষ থেকে শুরু করে আমার মত কলেজ ছাত্রকে পর্যন্ত ইন্দিরা-সিদ্ধার্থরা জেলে ঢুকিয়েছিল , তখন সিপিএমের একজন নেতাকেও জেলে ঢােকানাে হয় নি। সুরজিত , জ্যোতি বসু , বুদ্ধ ভট্টাচার্য্য , প্রমােদ দাশগুপ্ত , অনিল বিশ্বাস , বিমান বসু — একজনও সিপিএম নেতাকে ইন্দিরা-সিদ্ধার্থরা জেলে ঢােকাননি। কেন ? আজকের অশিক্ষিত কমরেডরা জানে না। ওই তাবড় তাবড় বিপ্লবী নেতারা সেদিন ইন্দিরার কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করেছিলেন। ইন্দিরা তাদেরকে বলেছিলেন , প্রতিদিন সকালে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের পা ধােয়া চরণামৃত পান করতে। জ্যোতিবাবু-প্রমােদ দাশগুপ্তরা তাই করতেন। তাই তাদেরকে জেলে ঢুকতে হয়নি। এরা দু’কান কাটা। তাই এখন এত বড় বড় কথা বলছে। গােটা পৃথিবী এই মাকুদেরকে জঞ্জালের আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। তাদের সাধের রাশিয়া ভেঙে টুকরাে টুকরাে হয়ে গিয়েছে। সেখানকার মানুষ লেনিনের মূর্তিকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। লেনিনগ্রাদের নাম পাল্টে পুরানাে নাম সেন্ট পিটার্সবার্গ ফিরিয়ে এনেছে। রাশিয়া ও চীন দুদেশই মাকর্সবাদকে কুলাের হাওয়া দিয়ে বিদায় করে দিয়েছে। চিন পুঁজিবাদী তত্ত্বের কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করেছে। কিন্তু এখানকার ৩৪ বছর ধরে কামিয়ে খাওয়া অশিক্ষিত কমরেডরা এসব কথা জানে না বলে আলিমুদ্দিনের দোকান এখনাে চলছে। আর বেশিদিন চলবে না। কমরেড, তােমাদের বিদায় হয়ে গিয়েছে। ৩৪ বছরে তােমরা শ্রমিক আমদানি করা রাজ্য থেকে শ্রমিক রপ্তানি করা রাজ্যে পরিণত করেছে। বাংলা আর তােমাদের গ্রহণ করবে না। তােমরা দেওয়ালের লিখন পড়তে পারছো না।
   

জরুরী অবস্থার সময় সিপিএম যখন রাশিয়ার মধ্যস্থতায় ইন্দিরা গান্ধীর কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে নিজেদের বিপ্লবী সত্তার আসল পরিচয় দিয়েছিল, তখন একজন ব্যতিক্রম ছিলেন। তিনি তৎকালীন ডায়মন্ড হারবারের সিপিএম এম.পি — জ্যোতির্ময় বসু। তিনি পার্টির নির্দেশ না মেনে জরুরী অবস্থার বিরােধিতা করেছিলেন। তিনি একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন। আর সবাই পার্টির বাধ্য ছেলে। কেউ সেই জরুরী অবস্থার বিরােধিতা করেন নি। কেউ ইন্দিরা গান্ধীকে স্বৈরতান্ত্রিক বলেন নি। সিপিএম গণতন্ত্র রক্ষার লড়াইতে যােগ দেয়নি। তারা জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলনেও যােগ দেয়নি , নিজেরাও কোন আন্দোলন করেনি। তাই ইন্দিরা সেদিন সিপিএম-কে বিপজ্জনক বলে মনে করেন নি। সুতরাং সিপিএম নেতাদের গ্রেপ্তারও করেননি। 
  কয়েকজন বামপন্থী যুক্তি দিয়েছে — সিপিএম জরুরী অবস্থাকে সমর্থন করলে তারপর জনগণ ১৯৭৭ সালে আবার ওই পার্টিকে ভােট দিয়ে ক্ষমতায় আনল কেন ? প্রশ্নটা সঠিক। উত্তরটাও জানা দরকার।
   

১৯৭৭ সালে জানুয়ারি মাসে ইন্দিরা গান্ধী লােকসভা নির্বাচন ঘােষণা করলে সিপিএম গর্ত থেকে বেরিয়ে এল। আদি কংগ্রেস নেতা প্রফুল্ল সেনের হাত ধরে নির্বাচনী প্রচারে নামল। জনতা-পার্টির সঙ্গে পূর্ণ নির্বাচনী আঁতাত করল। তখন আমি আর এস এসের নবীন প্রচারক। সেই ঐতিহাসিক লােকসভা নির্বাচনে আর এস এসের নির্দেশে আমি তমলুক লােকসভা কেন্দ্রে জনতা পার্টির প্রার্থী সুশীল ধাড়া-র হয়ে পাঁশকুড়া পূর্ব ( কোলাঘাট ) বিধানসভা কেন্দ্রের পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে প্রচারের কাজ করেছি । জরুরী অবস্থার জন্য জনগণ ছিল ক্ষিপ্ত। মার্চ মাসে নির্বাচনে কংগ্রেস হারলাে। এমনকি অকল্পনীয়ভাবে ইন্দিরা গান্ধী ও তার যুবরাজ পুত্র সঞ্জয় গান্ধীও হেরে গেলেন। ইন্দিরা হেরে যাওয়ার পর চরম দক্ষিণপন্থী নেতা মােরারজী দেশাই-এর নেতৃত্বে কেন্দ্রে জনতা সরকার গঠিত হল। মােরারজী বিভিন্ন রাজ্যের কংগ্রেসী সরকারগুলাে ভেঙে দিলেন। পশ্চিমবঙ্গেও। জুন মাসে এখানে বিধানসভা নির্বাচন হল। লােকসভা নির্বাচনের আঁতাত বিধানসভা নির্বাচনে থাকল না। জনতা দলের প্রফুল্ল সেন সিপিএম-কে তাদের দাবিমত আসন দিতে রাজী হলেন না। সুতরাং পশ্চিমবঙ্গে ত্রিমুখী লড়াই হল। কংগ্রেস, জনতা ও বামফ্রন্ট। জনতা পার্টি ছিল অগােছাল ও চরম বিশৃঙ্খল। কংগ্রেস পর্যুদস্ত। সিপিএম গােছানাে অবস্থায়। তাই সেই নির্বাচনে সিপিএম জিতল। 
   

এর জন্য সিপিএমের সাংগঠনিক দক্ষতার প্রশংসা করতেই হবে। বিশেষ করে সেই সময়ের অসম্ভব সংগঠন দক্ষ প্রমােদ দাশগুপ্ত-র অবদান বিরাট। কিন্তু এটাও স্বীকার করতে হবে যে, ১৯৭২ সালে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের মার খেয়ে সিপিএম কাপুরুষের মত গর্তে ঢুকে গিয়েছিল। তারপর রাশিয়ার মাধ্যমে ইন্দিরার কাছে নতিস্বীকার করে গুপ্ত আঁতাত করে নিজেদের চামড়া বাঁচিয়েছিল। তারপর সুযােগ বুঝে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ১৯৭৭ সালে নির্বাচনের আসরে। শেষ জয় -১৯৭৭ সালের জুন মাসে বিধানসভা নির্বাচনে এই বামেদেরই হয়েছিল। তাদের সাংগঠনিক দক্ষতা, ঝড়ের সামনে মাথা নীচু করার বাস্তব বুদ্ধি এবং মেরুদণ্ডের নমনীয়তার জন্যই এটা সম্ভব হয়েছিল। 
   

পরের ইতিহাসটাও জানা দরকার। চরম দক্ষিণপন্থী মােরারজী দেশাই-এর সরকারের জন্য চরমভাবে বিঘ্নিত হল সােভিয়েত রাশিয়ার স্বার্থ। নেহেরু নিজেও ছিলেন বর্ণচোরা বামপন্থী, মাকু। তার উপর, নেতাজীকে গুপ্ত হত্যা করে রাশিয়া নেহেরুর গদিকে নিষ্কন্টক করে দিয়েছিল। আর তার বিনিময়ে কিনে নিয়েছিল নেহেরু ও নেহেরু পরিবারকে। তাই তাে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায় পাক্কা কমুনিষ্ট কৃষ্ণ মেনন, নুরুল হাসানকে স্থান দিয়েছিলেন নেহেরু। অন্যদিকে মার্কসবাদী অর্থনীতি অনুসরণ করে ছিবড়ে হয়ে যাওয়া রাশিয়া নেহেরুকে ব্ল্যাকমেল করে (নেতাজী হত্যার কথা বলে দেব, আজাদ হিন্দ ফৌজের গুপ্ত ধনভাণ্ডারের কথা বলে দেব) ভারতকে প্রচণ্ডভাবে আর্থিক শােষণ করে চলেছিল। যখন আন্তর্জাতিক বাজারে রুবলের মূল্য পঞ্চাশ পয়সা দাঁড়িয়েছে, তখন রাশিয়া ভারতের কাছে বিনিময় মূল্য নিত ১ রুবলের জন্য ৩০ টাকা। রাশিয়ার তখনকার অবস্থা জানতে হলে বিখ্যাত লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী – র লেখা “ দ্বন্দ্ব – মধুর ” বইটা পড়ে দেখুন । 
   

১৯৭৭ সালে কংগ্রেস ও নেহেরু পরিবার ক্ষমতা থেকে চলে গেলে রাশিয়ার স্বার্থ চরমভাবে বিঘ্নিত হল। তাই রাশিয়া তার খেলা শুরু করে দিল। সাংবাদিকদের মধ্যে বামপন্থীদের প্রভাব ছিলই। তারা প্রচার শুরু করে দিল — জনতা পার্টি মানেই জনসংঘ, আর জনসংঘ মানেই আর এস এস(RSS)। ফ্যাসিবাদী আর এস এস ভারতটাকে দখল করে নিল। এই ফ্যাসিবাদকে রুখতে হবে। তখন পাঁচমিশেলী জনতা দলে যেসব রাশিয়ার অর্থপুষ্ট সােস্যালিস্ট নেতারা ছিলেন তাদেরকে দিয়ে মাত্র আড়াই বছরের মধ্যেই জনতা সরকারকে ভেঙে দিল রাশিয়া। ৬ নম্বরী স্যোসালিস্ট নেতা পিলু মােদী রাশিয়া থেকে ঘুরে এসেই বায়না ধরলেন জনসংঘের সব সদস্যকে আর এস এস থেকে পদত্যাগ করতে হবে। দ্বৈত সদস্যপদ চলবে না। বাজপেয়ী – আদবানী ইত্যাদি নেতারা মানলেন না। সেই অজুহাতে জনতা পার্টি ভেঙে দেওয়া হল। আর এস এস – কে রােখার অজুহাতে আবার রাশিয়ার তাবেদার নেহেরু পরিবারকে দিল্লীর ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা হল।
   

এই হল কাহিনী। এর মধ্যে অনেক উপ-কাহিনী আছে। সেগুলাে সময় সুযােগ মত বলব। আজকের সিপিএমের অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত ক্যাডার-সমর্থকরা এসব ইতিহাস জানে না। তাদেরকে মূর্খ করে রাখাই সিপিএমের কৌশল। মূর্খ ক্যাডার – সমর্থকই সিপিএমের সম্পদ। সিপিএমের রাজত্ব মানে অজ্ঞতার প্রসার, অন্ধকারের বিস্তার। ৩৪ বছরের সেই অন্ধকার থেকে পশ্চিমবঙ্গ এখনাে মুক্তি পায়নি।

(লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ‛স্বদেশ সংহতি সংবাদ’ পত্রিকার আগস্ট, ২০১৫ সংখ্যায়)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.