ভারতে গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের রূপকার নেহেরু ?

0
385

© শ্রী তপন কুমার ঘোষ

নেহেরু নেহেরু নেহেরু। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র আমাদের এই ভারতবর্ষ। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর বিশাল অশিক্ষিতের সংখ্যা নিয়ে এদেশে গণতন্ত্রের এরকম শক্ত বুনিয়াদ গঠন করা সম্ভব হল কী করে ? বিশেষ করে যে দেশে হাজার হাজার বছরের রাজতন্ত্রের পরম্পরা ! সেই দেশে গণতন্ত্র চালু করা ও তা টিকিয়ে রাখা – এ তাে প্রায় অসাধ্য কাজ। এই অসাধ্য সাধনই সম্ভব হয়েছে মাত্র একজন ব্যক্তির জন্য। তিনি হচ্ছেন জওহরলাল নেহেরু। এই ধারণা / মতামত ভারতে প্রায় সর্বশিক্ষিতজন স্বীকৃত। নেহেরু উদার মনের মানুষ ছিলেন , গণতান্ত্রিক চেতনায় উদ্ভাসিত ছিলেন। তাই দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টিও তাঁরই অবদান। অনেকেই ভারতেরই মত বিশাল জনসংখ্যাযুক্ত দেশ চিনের সঙ্গে ভারতের তুলনা করেন। চিন পারলাে না , আমরা পেরেছি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে ও তাকে টিকিয়ে রাখতে। 

বাস্তবের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যাক। ১৯৪৭ থেকে যতদিন পর্যন্ত কংগ্রেস দল সরকার গঠন করার মত ক্ষমতাসম্পন্ন ছিল , ততদিন পর্যন্ত কংগ্রেসের পক্ষ থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী পদে শুধু নেহেরুর বংশধরেরাই বসেছেন , অথবা নেহেরু পরিবারের লােকেরাই কংগ্রেসের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী পদের স্বাভাবিক দাবীদার বলে মেনে নেওয়া হয়েছে। নেহেরুর মৃত্যুর পর , লালবাহাদুর শাস্ত্রীর অকালমৃত্যুর পর কংগ্রেসে অনেক যােগ্য নেতা ছিলেন। কিন্তু অনেক জুনিয়র ইন্দিরা গান্ধী-ই মনােনীত হলেন। রাজীব গান্ধীর মৃত্যুর পর অত্যন্ত যােগ্য প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিংহ রাওকে , যিনি বর্তমান মুক্ত অর্থনীতির স্থপতি , কংগ্রেসীরা মেনে নিতে পারে নি । ২০০৪ থেকে ২০১৪ কোন বিশেষ কারণবশতঃ সােনিয়া গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হতে না পারায় একটা রােবটের মত মনমােহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকলেও কংগ্রেসীরা জানতাে যে সােনিয়া গান্ধীই সূত্রধার। আর সিং সাহেব অভিনেতা মাত্র। আর সিং সাহেবও সব সময় তাঁর আচরণে বুঝিয়ে দিয়েছেন কে প্রভু আর কে দাস। প্রিয়াঙ্কা ভড্রার তিন বছরের শিশুপুত্রের সামনে মনমােহন সিং-এর জোড়হাত করা , মাথা ঝোঁকানাে ছবিটা দেশবাসী সহজে ভুলতে পারবে না।

আজ কংগ্রেস যখন ক্ষমতা থেকে অনেকটা দূরে চলে গিয়েছে ( লােকসভায় বর্তমানে ৪৪ ) তখনও সাধারণ কংগ্রেস কর্মীরা নেহেরু পরিবারের বাইরে কাউকে নেতা হিসাবে কল্পনাও করতে পারছেন না। অথচ ১৯৯৮ সালে অসভ্যের মত সােনিয়া গান্ধী সীতারাম কেশরীর হাত থেকে কংগ্রেসের সভাপতিত্বের পদ কেড়ে নেওয়ার পর থেকে ২০১৪ পর্যন্ত দীর্ঘ ১৬ বছর দলের নেতৃত্ব সােনিয়া গান্ধী ও পুত্র রাহুল গান্ধীর হাতে থাকা সত্ত্বেও ২০১৪-তে কংগ্রেসের এই শােচনীয় পরাজয়ের জন্য , দেশের বহু রাজ্য থেকে কংগ্রেসের অস্তিত্ব মুছে যাওয়ার জন্য কোন কংগ্রেসীই সােনিয়া অথবা রাহুলকে দায়ী করছেন না। কংগ্রেস দলটা স্বর্গে উঠুক অথবা অধঃপতনে যাক – নেতা করতে হবে ওই একটি পরিবার থেকেই। কংগ্রেস দলের মধ্যে এত সুন্দর গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও পরম্পরার ভিত যিনি স্থাপন করেছিলেন , সেই নেহেরু ভারতবর্ষের মত এই বিশাল দেশে গণতন্ত্রের প্রধান স্থপতি ও রূপকার , এই কথা বামপন্থী বুদ্ধিজীবী ও ঐতিহাসিকরা দেশবাসীকে এতদিন বুঝিয়ে এসেছেন। এই তত্ত্বকে প্রশ্ন করার সাহস কারও হয়নি। কোনও সাধারণ মানুষ সেই প্রশ্ন করার দুঃসাহস দেখালে তাকে সাম্প্রদায়িক , মধ্যযুগীয় চিন্তাধারার অধিকারী – আরও কত কি গালাগালির দ্বারা তীরবিদ্ধ করা হয়। আর যদি কোন ঐতিহাসিক , অধ্যাপক , গবেষক এই প্রশ্ন করার দুঃসাহস , দেখান , তাহলেই তিনি হবেন এলিট ক্লাসে একঘরে , UGC , ICHR ইত্যাদি সমস্ত শিক্ষা সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান থেকে চিরতরে নির্বাসিত। মস্কোর নির্দেশে ভারতে বাম ও কংগ্রেসীদের অনৈতিক আতাতের ফলেই এটা সম্ভব হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আমি অন্যত্র লিখেছি।

আর একজন নেহেরু বিশ্বে খুব পরিচিত। তিনি হচ্ছেন সমাজতান্ত্রিক নেহেরু । সেই সমাজতন্ত্রের ‘ সুফল আমরা এখনও ভােগ করছি। নেহেরু নাকি সমাজতান্ত্রিক আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন ! মানুষে মানুষে অর্থনৈতিক ভেদ তিনি বড়ই অপছন্দ করতেন । এই অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে তিনি ভারতে সমাজতন্ত্র আনার চেষ্টা করেছিলেন , যদিও সমাজতন্ত্র শব্দটার সঠিক অর্থ বা ব্যাখ্যা কেউ জানে না। তবে একটা ভাসা ভাসা ধারণা সকলেরই আছে যে সমাজতন্ত্রে খুব বড়লােকও কেউ থাকবে না , অতি গরীবও কেউ থাকবে না। সবাই দু’বেলা পেট ভরে খেতে পাবে আর মানুষের ন্যূনতম চাহিদাগুলাে পূরণ হবে ওই সমাজতন্ত্রের দ্বারা। আরও ধারণা আছে যে এই কাজগুলাে হবে সরকারের দ্বারা এবং সেই সরকারটা হবে সমাজতান্ত্রিক।

নেহেরু ছিলেন আপাদমস্তক সমাজতান্ত্রিক এবং ভারতে সমাজতন্ত্র তিনি তৈরী করেছিলেন। অথবা ভারতে সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা প্রণয়নের জন্য তিনি আন্তরিক চেষ্টা করেছিলেন। স্বাধীন ভারতে সব থেকে বড় পাঁচটি ধাপ্পার মধ্যে এটি অন্যতম : সমাজতান্ত্রিক নেহেরু ও তাঁর দ্বারা রচিত ভারতের সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা।

রাশিয়ায় ১৯১৭ সালে শ্রমিক শ্রেণী পরিচালিত দল দ্বারা প্রচন্ড শক্তিশালী ‘ জার ’ সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করা গােটা পৃথিবীর শিক্ষিত মানুষকে আশ্চর্যচকিত করে দিয়েছিল। আর তার সঙ্গে কমিউনিস্টদের ঘােষণা – আর ধনী দরিদ্র থাকবে না , সমস্ত সম্পদের ব্যক্তি মালিকানা লুপ্ত হয়ে রাষ্ট্রীয় মালিকানা স্থাপিত হবে । যার যতটা ক্ষমতা সে ততটা কাজ করবে , আর যার যতটা প্রয়ােজন সে ততটাই পাবে। এইসব উদার , স্বপ্নিল ঘােষণা বিশ্ববিবেককে উদ্বেল করে তুলেছিল। সেই উদ্বেল আবেগ স্পর্শ করেছিল বিশ্বের প্রায় সমস্ত শিক্ষিত ও সচেতন মানুষকে। আমি নিজে আমার বাবাকে সেই আবেগতাড়িত হতে দেখেছি। এমনকি রবীন্দ্রনাথের মত মানুষও এর থেকে বাদ যাননি । কিন্তু মােহজাল ছিড়ে যাঁদের দেখার ক্ষমতা ছিল তাঁদেরই মধ্যে একজন লেখক জর্জ অরওয়েল রচনা করেছেন ‘ The Animal Farm ‘। বার্নার্ড শ বলেছেন , ৩০ বছরের অধিক বয়সী কেউ যদি ওই সাম্যবাদের প্রতি আকৃষ্ট থাকে তাহলে বুঝতে হবে তার মস্তিষ্ক বস্তুটিতে ঘাটতি আছে।

সাধারণ মানুষ তাে দূরের কথা , আজকের ৯৯ শতাংশ শিক্ষিত কমিউনিস্টও NEP কথাটি জানে না । অথচ প্রায়ােগিক সাম্যবাদে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ১৯১৭ সালে রাশিয়াতে ক্ষমতা দখল করেই কার্ল মার্কসের তত্ত্ব অনুসারে লেনিন রাশিয়ার সমস্ত সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানা খতম করে দিয়ে রাষ্ট্রীয় মালিকানা ঘােষণা করে দিলেন। আর কমিউন প্রথা চালু করে দিলেন , যেখানে পুরুষ আর নারী একসঙ্গে থাকবে , সময় মত তারা কাজ করতে যাবে , সন্তান উৎপাদন করবে। কিন্তু সন্তানের মালিক হবে রাষ্ট্র। অর্থাৎ বাচ্চার দেখাশুনার দায়িত্বও হবে রাষ্ট্রের , অর্থাৎ সরকারের , অর্থাৎ কমিউনের। মনে রাখতে হবে , তখন রাশিয়া ছিল কৃষিপ্রধান দেশ । প্রথমবারেই মার্কসের তত্ত্ব ফেল। মার্কস বলেছিলেন , তাঁর কাঙ্খিত বিপ্লব প্রথমে শিল্পপ্রধান দেশে হবে। অর্থাৎ জার্মানী অথবা ইংলন্ডে হবে । তা না হয়ে হল কৃষিপ্রধান রাশিয়াতে । দ্বিতীয়টিও হল কৃষিপ্রধান চিনে। যাইহােক , ১৯১৭ থেকে ১৯২০ মার্কসীয় উদ্ভট অর্থনীতির ফলে রাশিয়ায় ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। লেনিনের সামনে কোন বিরােধী দল নেই । লেনিনের হাতে একচ্ছত্র ক্ষমতা। কিন্তু দেশটা তাে চালাতে হবে ! উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে দেশে হাহাকার। দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে । লেনিনের অবস্থা — ছেড়ে দেমা কেঁদেবাঁচি।তাই ১৯২১ সালে তিনি শুরু করলেন NEP অর্থাৎ New Economic Policy। মার্কসীয় অর্থনৈতিক মডেলকে কুলাের হাওয়া দিয়ে বিদায় করে সম্পত্তিতে ব্যক্তিগত মালিকানা আংশিকভাবে ফিরিয়ে আনলেন। তারপর ভল্গা দিয়ে অনেক জল ব‘য়ে গেছে । লেনিন থেকে শুরু করে গাের্বাচেভ পর্যন্ত কত নেতা , কত নীতি , কত মত , কত পরিবর্তন ! কিন্তু কমিউনিস্ট সােভিয়েত রাশিয়ায় দুটি মাত্র জিনিস পাল্টায়নি । এক ) ডিক্টেটরশিপ এবং দুই ) অনুন্নয়ন । শুধু রাশিয়াই নয় , সমস্ত কমিউনিস্ট দেশগুলাের একই চিত্র – ডিক্টেটরশিপ আর অনুন্নয়ন । চিন বর্তমানে যে একটুখানি উন্নয়নের মুখ দেখেছে , তা মার্কসের নীতি , তত্ত্ব ও মডেলকে ঝেটিয়ে বিদায় করে তবেই সম্ভব হয়েছে – একথা অতি বড় কমিউনিস্টও স্বীকার করবে । তাই শিক্ষিত কমিউনিস্টরা আজ আর লজ্জায় চিনের উন্নয়নের কথা বলে না ।

ফিরে আসি সােভিয়েত রাশিয়ার কথায় । অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে বাধ্য হচ্ছি , রবীন্দ্রনাথও সেই সত্য দর্শন করতে পারেননি যা সৈয়দ মুজতবা আলী পেরেছিলেন । অসাধারণ এক রম্যরচনায় মুজতবা আলী সােভিয়েত রাশিয়ার অবস্থা ব্যঙ্গ করে বলেছেন – সেখানে কমরেডরা রকেটে চেপে যাচ্ছে কোন এক জায়গায় কাঁচালঙ্কার খোঁজ পাওয়া গেছে বলে । অর্থাৎ প্রচারে রকেট , বাইবে কাঁচালঙ্কারও অমিল । কিন্তু সােভিয়েত রাশিয়ায় ধনী-দরিদ্র সমান করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে আবেগে ভাসছে পৃথিবীর বহু লােক । আমাদের জওহরলাল নেহেরুও তার মধ্যে একজন । এজন্য নিশ্চয় তাঁকে খুব বেশী দোষ দেওয়া যায় না । কিন্তু কয়েকবার মস্কো যাতায়াত করে এবং রাশিয়ার শাসকদের সঙ্গে ভাবের আদানপ্রদানের ফলে নেহেরু বুঝলেন যে কমিউনিজম বা সমাজতন্ত্রকে তিনি যতটা মিষ্টি ভেবেছিলেন , এটা তার থেকেও বেশী মিষ্টি । এই নীতিতে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূর যা করবে তা করবে , কিন্তু রাশিয়ার শাসকদের সঙ্গে আঁতাত তাঁকে ক্ষমতার আসনে নিরঙ্কুশ করে দেবে । গল্প সেই নেতাজীর আর সাইবেরিয়ার ! নেতাজীকে আটকে রেখে অথবা চিরতরে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়ে ভারতে নেহেরুর গদীকে নিষ্কন্টক করে দেওয়া । তাই রাশিয়ার গুণগান , সমাজতন্ত্রের জয়গান । তাই রাশিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্ব । আসলে যা এক অনৈতিক আঁতাত ও ষড়যন্ত্র ।

স্বাধীন ভারতের অর্থনীতির বুনিয়াদ তৈরী করতে হবে । প্রথমেই নেহেরু তাঁর উন্নয়নের দর্শন বা নীতিবাক্য বলে দিয়েছেন । তাঁর উক্তি , ‘ বােকারাে স্টীল প্লান্ট , ভাকড়া নাঙ্গাল ড্যাম , ইত্যাদি বৃহৎ সরকারী উদ্যোগগুলি হবে আধুনিক ভারতের মন্দির ’ । আমি পাঠকদেরকে একটি অন্য দেশের ইতিহাসে নিয়ে যেতে চাই । হিটলারের অমানবিক স্বৈরতান্ত্রিক , সাম্রাজ্যবাদী নীতির ফলে দ্বিতীয় বিশ্বমহাযুদ্ধ শেষে উন্নত জার্মানী দেশটা এক বিস্তীর্ণ ধ্বংসস্তৃপে পরিণত হয়েছে । কোনদিন আর মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে , এ কল্পনা করাও যেন অসম্ভব ছিল । জার্মান জাতির ঔদ্ধত্য চিরতরে নষ্ট করার জন্য দেশটাকে ভেঙে দু’ভাগ করে দেওয়া হল । পূর্ব জার্মানীর দখল নিল সােভিয়েত রাশিয়া । পশ্চিম জার্মানী গেল আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে । পশ্চিম জার্মানীর চ্যান্সেলর হলেন হিটলারের আমলে লাঞ্ছিত কোলােন শহরের প্রাক্তন মেয়র কনরাড অ্যাভেনাওয়ার । বিধ্বস্ত পশ্চিম জার্মানীর চ্যান্সেলর হয়েই তিনি ঘােষণা করলেন , “ যদিও আজকের এই সার্বিকভাবে বিধ্বস্ত জার্মানীর সর্বক্ষেত্রেই ( শিক্ষা , স্বাস্থ্য , কৃষি , শিল্প , অর্থনীতি প্রভৃতি ) পুনর্গঠন প্রয়ােজন , তবুও আমি গুরুত্ব দেবাে আমার জাতির আত্মিক বা আধ্যাত্মিক পুনর্গঠনে ( Spiritual reconstruction ) ‘ ।

অর্থাৎ একটি জড়বাদী বস্তুতান্ত্রিক দেশের নেতা তাঁর জাতির আধ্যাত্মিক পুনর্গঠনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন , আর ভারতের মত লক্ষ বছরের আধ্যাত্মিক দেশের নেতা জড়বাদকে মন্দির করতে বলছেন । এর ফল কী হয়েছিল বুঝিয়ে বলতে হবে ? এখনও মহারাষ্ট্রের লাতুরে ট্রেনে করে পানীয় জল পাঠাতে হচ্ছে । এখনও ভারতের বহু গ্রাম পাকা রাস্তা দেখেনি , বিদ্যুতের আলাে দেখেনি । বহু গ্রামে এখনও কন্দমূল বছরের কয়েক মাসের খাদ্য । আসলে অবস্থা এর থেকে আরও অনেক অনেক বেশী ভয়ঙ্কর ছিল । ১৯৯০ সালে নরসিংহ রাও – এর হাতে ক্ষমতা আসার পর তিনি ভারতের অর্থনীতিতে সমাজতন্ত্রের মরণফাঁস আলগা করার পর এবং বাজপেয়ীর আমলে অ-সমাজতান্ত্রিক উদার অর্থনীতি অনুসরণ করার পর থেকে এখনও পর্যন্ত সেই অ-নেহেরুবাদী , অ-সমাজতান্ত্রিক পথ ধরে রাখার ফলে অবস্থা বেশ কিছুটা শুধরেছে । দেশবাসীর মন থেকে পাপী নেহেরুর প্রভাব যত দ্রুত ক্ষয় পাবে , দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা তত শুধরাবে ।

নেহেরু সম্বন্ধে আমার এই উক্তিগুলাে যাদের কাছে খুব কঠোর বা অসত্য বলে মনে হচ্ছে , তাদেরকে আমি অনুরােধ করবাে কয়েকটি তথ্য জেনে নিতে । আজ থেকে ৩৫ বছর আগে একটা বাজাজের ভেস্পা স্কুটার পেতে নাম লিখিয়ে কতদিন অপেক্ষা করতে হত জানেন ? কমপক্ষে পাঁচ বছর। এবার আমাদের ১৪ ফেব্রুয়ারী সভায় এসেছিলেন বর্তমান আমেরিকা নিবাসী বালাগুরু মাদ্রাজে একটা ভেস্পা স্কুটারের জন্য নাম লিখিয়ে আট বছর অপেক্ষা করেছিলেন। আমি নিজে ১৯৭৪ সালে কলকাতা থেকে কেনা একটা নতুন অ্যাম্বাসাডর গাড়ীতে করে নাগপুরে তৃতীয় বর্ষ আর এস এস ট্রেনিং ক্যাম্পে গিয়েছিলাম। একটি কোম্পানী গাড়ীটা কিনে বম্বে নিয়ে যাচ্ছিল । বম্বেতে তখন অ্যাম্বাসাডর গাড়ি পাওয়া যেত না আর দেশে তখন ২ টা মাত্র গাড়ি ছিল। ফিয়াট আর অ্যাম্বাসাডর। ১৯৭৭ সালে আমি কয়েক মাস বাঁকুড়ায় আর এস এসের প্রচারক ছিলাম । সেখানে দেখেছিলাম গ্রামের রাস্তাকে কুলি বলা হয়। কুলি মানে বর্ষাকালে যেখান দিয়ে জল যায় , আর অন্য সময় লােক যায়। অর্থাৎ আলাদা করে রাস্তার কনসেপ্টই ছিল না । আর বিশ্বের সমস্ত শিক্ষিতজনেরা জানতাে, ভারতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের হার ও GDP বৃদ্ধির হার সব সময়েই ৩ শতাংশের কাছাকাছি বা কম। দিল্লি স্কুল অব ইকনমিক্স – এর একজন সেকু-মাকু ভারতীয় অর্থনীতিবিদ রাজ কৃষ্ণ প্রায় নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ সূত্র আবিষ্কারের মত আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন যে , ওই বার্ষিক ৩ শতাংশ উন্নয়নের হারটা আসলে হচ্ছে ‘ হিন্দু রেট অফ গ্রোথ ‘। গােটা পৃথিবীকে আমাদেরই দেশের বেজম্ম মাকু অর্থনীতিবিদগুলাে বুঝিয়েছিল যে হিন্দুরা এতই শ্লথ যে তারা ৩ শতাংশের বেশী উন্নয়ন বৃদ্ধি করতে পারেনা । অথচ এখন তাে অবলীলাক্রমে আমাদের দেশ ৬-৭-৮ শতাংশ পর্যন্ত GDP গ্রোথ করছে । শুধু মােদী আমলে নয় , এর আগে বাজপেয়ী , মনমােহন আমলেও হয়েছে । তাহলে দেশে কি এখন ‘ হিন্দু রেট অফ গ্রোথ ’ – এর বদলে মুসলিম রেট অফ গ্রোথ চালু হয়ে গেল ? না কি সােনিয়াজীর করুণায় “ খ্রীস্টান রেট অফ গ্রোথ ” চলছে ?

নেহেরু সমাজতন্ত্রের গালভরা বুকনির আড়ালে দেশকে যে ধাপ্পাটা দিয়েছেন , তা হচ্ছে এই যে , অর্থনীতিতে পুঁজিপতিদের নিয়ন্ত্রণ আটকাতে সরকারী নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করা। তার জন্য লাইসেন্স – পারমিট রাজ চালু করা । সেটা দিয়ে উৎপাদনে প্রতিযােগিতা হতে না দিয়ে কতিপয় বাছাই করা শিল্পপতিকে প্রােটেক্টেড মার্কেট দিয়ে দেওয়া । বিড়লা ( অ্যাম্বাসাডার গাড়ী ) ও বাজাজ – রা ( স্কুটার ) তারই উদাহরণ । কিন্তু প্রতিযােগিতা না থাকলে দক্ষতা বাড়ে না , টেকনােলজি উন্নত হয় না , দাম কমে না । সার্বিক পরিণাম- অর্থনীতি এগােয় না। এই হচ্ছে নেহেরুর সমাজতন্ত্রের ধাপ্পা ।

সুতরাং সত্যটা হল এই যে নেহেরুর সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির ধাপ্পায় , লাইসেন্স – পারমিট রাজের দমবন্ধ করা নীতিতে ভারতের অর্থনীতি এগােতে পারছিলাে না। ভারতবাসী তার স্বাভাবিক ক্ষমতার , দক্ষতার ও প্রতিভার পরিচয় দিতে পারছিলাে না। ঐ বজ্রমুষ্টি আলগা হতেই ভারতের অর্থনীতি তর তর এগিয়ে চলেছে। গােটা বিশ্ব তাকে স্বীকৃতি জানাচ্ছে । Hindu Rate of Growth ( 3 % ) এর কলঙ্ক মুছে গিয়েছে। আজ গােটা বিশ্বে নরেন্দ্র মােদী যে গুরুত্ব পাচ্ছেন তা শুধু মােদী – ক্যারিশমা নয় , তা এই ভারতের দক্ষতা , প্রতিভা ও সার্বিক অর্থনৈতিক শক্তির জন্য। মােদীজী তা বারবার সর্বত্র বলছেন।

নেহেরুর সমাজতান্ত্রিক ধাপ্পা পুরােটা এখানে উন্মােচন করতে পারলাম না। এই ধাপ্পার আর একটা বড় স্তম্ভ ছিল সােভিয়েত রাশিয়ার অনুকরণে যােজনা কমিশন ও পঞ্চবার্ষিকী যােজনা ( Planning Commission & Five Year Plan )। মোদীজী এসে ও দুটোকেই কুলাের হাওয়া দিয়ে বিদায় করেছেন । দু’টো নেহেরু পাপ গেছে। যে নীতিতে চলে সােভিয়েত রাশিয়ার অর্থনীতি খােলা হয়ে গিয়েছিলাে, শুধু তাই নয় গােটা দেশটাই ভেঙে খান খান হয়ে গেল , সেই নীতি অনুসরণ করার কোনাে যুক্তি আছে কি ?

গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক নেহেরুর একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় এখানে দিলাম। প্রকৃতপক্ষে এটি আদৌ লাঞ্চ বা ডিনার নয় । এটি অ্যাপেটাইজারের ভূমিকা পালন করলে আমি খুশী হব। আমার থেকেও অনেক বেশী বিদ্বান ঐতিহাসিক ও অর্থনীতিবিদরা এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ গবেষণা করে বই লিখলে তবেই আমার এই প্রচেষ্টা সার্থক হবে।

(লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ‛স্বদেশ সংহতি সংবাদ’-এর মে, ২০১৬ সংখ্যায়)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.