দলিত-মুসলিম ঐক্যের কান্ডারি: যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল- (দ্বিতীয় পর্ব)

0
272


© পবিত্র রায়

(দ্বিতীয় পর্ব)

    নিম্ন বর্গীয়দের জনপ্রিয় যোগেন বাবুর জনসভা জনতায় পরিপূর্ণ করার জন্য একটা কৌশল গ্রহণ করা হতো ।গণপরিষদ সদস্য শ্রী রাধানাথ দাসমহাশয়ের মুখ থেকেই শোনা যাক। শ্রী রাধানাথ দাস বলেছেন, ' যোগেন বাবুদের সভার আগে প্রচার করা  হচ্ছে, যে সবঅনুন্নত জাতির মানুষ সভায় উপস্থিত হবেন,তারা বিনামূল্যে একখানা শাড়ি পাবেন। তা সত্ত্বেও অনুন্নত ভায়েরা সভায় যোগদান করেন না। সভায় বেশীরভাগমুসলিম লীগের সমর্থক ও মুসলিম 

ন্যাশনাল গার্ডে’র সদস্যরা আসেন।’এবার আরও একজন নিম্নবর্গীয় স্বনামধন্য মানুষের মুখ দিয়ে যোগেন মণ্ডলের এক সভার বর্ণনা শোনা যাক। বঙ্গীয় অনুন্নত জাতি লীগের সভাপতি শ্রী বিরাট চন্দ্র মন্ডলের ভাষায়-‘ সম্প্রতি মি. যোগেন্দ্রনাথ
মন্ডল জলপাইগুড়ি গিয়ে একটি জনসভায় ভাষণ দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু জনগণ তাকে টিটকিরি দিয়ে তাড়িয়ে দেন। ‛৩০ মে ১৯৪৭’এ অমৃতবাজার পত্রিকার খবর ছিল, ‘ তিনি (যোগেন) বারুইপুর ও হরিনারায়ণপুর গিয়েছিলেন সেখানকার তপশীলিরা কালো পতাকা,ঝাঁটা ও জুতো দেখিয়ে মিছিল করে তাঁকে অভ্যর্থনা করেন ।
০৪ জুন,১৯৪৭-যোগেন বাবু এক বিবৃতিতে জানান, ‘পাকিস্তানে তপশীলিদের অধিকার যে যথাযথ ভাবে রক্ষিতহবে, তাতে আমার সন্দেহ নেই।’ যোগেনের বক্তব্যকে ঔজ্জ্বল্য দিতে গিয়ে তপশীলি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক কামিনী প্রসন্ন মজুমদার বলেন, ‘তপশীলি ও মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্যের চেয়ে বড় কোনও স্বাভাবিক ঘটনা পৃথিবীর বুকে নেই ।’

বাবা সাহেব বললেন, “কিছু সংখ্যক মানুষ মনে করে যে, হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপন করাই যথেষ্ট। আমি মনে করি এই চিন্তাধারা সবচাইতে বড় ভূল।” পাঠকগণই এই তিন মহরথীর বক্তব্যের সারবিচার করুন ।

গান্ধী ও নেহরু’কে যোগেন মণ্ডল তপশীলি প্রসঙ্গে জ্ঞানদান করে বললেন, “পাকিস্তানে বসবাসরত তপশীলিদের প্রতিমি . জিন্নাহ্ যেমন সুবিচার করবেন, তারাও যেন ভারতের তপশীলিদের প্রতি তেমন সুবিচার করেন ” (স্টেটসম‍্যান 06.06.1947)।প্রসঙ্গত , যোগেনের হিসেবে ওই সময় সারা ভারতে তপশীলি ছিলেন ৮ কোটি, যার মধ্যে ৫.২ কোটি পড়বে হিন্দুস্থানে ও ২.৮ কোটি পড়বেপাকিস্তানে ।
না, গান্ধী ও নেহরু চরম হিন্দুবিদ্বেষী হলেও যোগেনের অনুরোধ রাখেননি। যোগেন মণ্ডল কলকাতায় ঘটে যাওয়া ১৯২৯, ১৯৩৯, ১৯৪৬’এর দাঙ্গা ছাড়াও কলকাতা তথা সারা ভারতে ঘটে যাওয়া অসংখ্য ছোটখাটো দাঙ্গার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন । মুসলমানদের বিধর্মী বিরোধী উন্মত্ততা ভালো ভাবেই দেখেছিলেন। তাসত্ত্বেও কী হিসেবে জিন্নাহ্ স্তুতি করে যাচ্ছিল সেটা বুঝতে পারা ভগবানেরও অসাধ্য ছিল বোধহয়। অপর দিকে মুসলিম লীগ ও মুসলিম নেতৃবৃন্দ কখনও কিছুই লুকোচ্ছিল না। তারা সোজাসাপটা বলতো পাকিস্তান হবে ‘ইসলামী’ দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন একটি রাষ্ট্র। ইসলামী দৃষ্টিতে সারা পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্, সুতরাং এইপৃথিবীটা মুসলমানদের। ইসলাম ধর্মে কাফের অর্থাৎ মুসলিম বাদে অন্য সেমীয় মতবাদধারীদের জন্য কিছুটা ছাড় দেওয়া
থাকলেও মুশরিকদের কোনও ছাড় দেওয়া হয়নি।মুশরিক কারা ? মুশরিক হলো যারা আল্লাহ্’র সাথে শরিক করে বা বহু দেবত্বে বিশ্বাসী ,যেমন ভারতীয় হিন্দুরা। সুতরাং ইসলাম নিয়ন্ত্রিত পাকিস্তানে হিন্দুদের অবস্থা কেমন হবে তখনই সেটা সহজবোধ্যই ছিল । তা সত্ত্বেও যোগেন মুসলমানের হয়ে নিম্নবর্গীয় হিন্দুদের কাছে ওকালতি করেই যাচ্ছিল। যোগেন কি ইসলাম সম্পর্কে কিছুই জানত না ? অবিশ্বাস্য ।যদি না’ও
জেনে থাকে, ঘটনা প্রবাহ দেখেও কী বুঝবার চেষ্টা করা যেত না ? যোগেন সবই বুঝত । তবুও পাকিস্তানের জন্য লম্ফঝম্প করার কারণ ছিল নিজের উচ্চ ক্ষমতালিপ্সা, তাতে নিজের স্বজাতি
উচ্ছন্নে গেলেও কিছু এসে যায় না।তাই স্বজাতিয়দের কাছে কালো কাপড়,জুতো, ঝাঁটা, টিটকিরি পেয়েও এই ইতরটার লজ্জা ছিল না।
পাকিস্তানে নিম্নবর্গীয়দের প্রতি পাক
সরকারের যথাযথ ব্যবহার সম্পর্কে যোগেনের সম্পূর্ণ আস্থা থাকায় গান্ধী-নেহরুকে ওইমত উপদেশ দেওয়ায় বুঝা যায় অসভ্যটার কোনওরূপ দূরদর্শিতা ছিল না,বাস্তবজ্ঞানও ছিল না,ছিল শুধু আকাট মূর্খতা- তা সে যতই স্নাতক হয়ে থাকুন না কেন । সৌভাগ‍্যের কথা,তখন কার নিম্নবর্গীয়দের ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল বলে ঝাঁটা-জুতো দিয়ে অভ্যর্থনা করতে পেরেছিল । আর দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা হলো
প্রচারযন্ত্র এখনকার মতো সক্রিয় ছিল না। থাকলে এই ইতরটার ইতরামি সমূলেই বিনাশ হয়ে যেত বিষবাষ্প ছড়ানোর আগেই ।
এবার গান্ধী-নেহরুর কথা একটু বলা
দরকার । আগেই এই যুগলকে হিন্দুবিদ্বেষী বলে উল্লেখ করেছি বলে সে বিষয়ে আর যাব না । যোগেনের উপদেশ মেনে নিম্নবর্গীয়দের প্রতি পাকিস্তানিদের অনুসরণ করে কর্তব্য পালন করতে হলে এদের প্রতি প্রথমেই বিভিন্ন অছিলা সৃষ্টি
করে হত্যা, ধর্ষণ,গৃহদাহন,বিতাড়ন,ধর্মীয় বিশ্বাস পরিবর্তন করিয়ে মুসলমান বানানো দিয়ে নিম্নবর্গীয়দের প্রতি যথাযথ অধিকার রক্ষা শুরু করা উচিত ছিল । না,এই হিন্দুবিরোধীদ্বয় সে পথে হাঁটলেন না।গান্ধী বললেন, ‘ দেশ ভাগের ফলে যেসব হিন্দু ভায়েরা আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে
পড়েছেন, তাদের জন্য হিন্দুস্থানের দরজা খোলা থাকবে।তাঁরা যখনই আসবেন ,ভারত সরকার যথাযথ ভাবে তাঁদের উপযুক্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবে ।’নেহরু কিন্তু তখনকার আর্থিক দৈন্যতা
ও টালমাটাল অবস্থার মধ্যেও সাধ্যানুযায়ী
পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করছিলেন । আর এইমতো ব্যাবস্থা করে এই দুই নেতা ইতর যোগেনের মুখে কষে এক থাপ্পড় মারলেন।
আচ্ছা, যোগেনের হিসেবে হিন্দুস্তানে যে ৫.২ কোটি নিম্নবর্গীয় পড়ে থাকবে, তাদের জন্য যোগেন কী করল ? কোন্ ভরসায় নরখাদক উচ্চ বর্ণের মানুষের কাছে রেখে গেল ? কল্পিত স্বর্গ নামক পাকিস্তানে নিয়ে যেতে না পারলেও একবার অন্তত পাকিস্তানে গিয়ে ,তার নেতৃত্বে ভরসা রেখে শান্তিতে বসবাস করার অনুরোধ তো করতে পারত? না,যোগেন তেমন ধৃষ্টতা দেখানোর চেষ্টা
করেনি। বেইমান কোথাকার!

 বৃটিশ সরকার, হিন্দু ও শিখদের শেষ পর্যন্ত ঘোষিত নীতি ছিল, "ভারত ভাগ হলে পাঞ্জাব ও বাংলা ভাগ হবে।" মুসলিম লীগের নীতি ছিল বাংলা ও পাঞ্জাবকে ভাগ না করে সম্পূর্ণটুকু পাকিস্তানে অন্তর্ভূক্ত করা। যোগেন মন্ডল ও তার 

অনুগামীরা ছিল মুসলিম লীগের নীতির সপক্ষে । যোগেনের বক্তব্য ছিল, ‘ ভারত ভাগ হবে এবং গোটা বাংলা ও পাঞ্জাব পাকিস্তানযাবে।’পরিকল্পনা রচয়িতাগণ যোগেনের শয়তানি বুঝতে পেরে সেটা
নস‍্যাৎ করার জন্য পাঞ্জাব ও বাংলার জন্য ৫ থেকে ৯ নম্বর পর্যন্ত ৫ টি ধারা জুড়ে দেন।এর মধ্যে ৭ নম্বর ধারায় বলা হয়,’ বঙ্গীয় আইন সভার একজনও সদস্য যদি দাবি করেন যে বাংলা কোন্ গণপরিষদে যাবে, তাহলে ইউরোপীয় সদস্যগণ বাদে অন্যান্য সদস্যরা একত্রে বসে প্রথমেই ঠিক করে নেবেন সমগ্র বাংলা তখনকার কার্যকর গণপরিষদে, না কি অন্য কোনও গণপরিষদে যাবে। সেদিন অধিকাংশ এম.এল.এ’রা যদি তখনকার কার্যকর গণপরিষদে যোগ দিত,তাহলে
পশ্চিমবঙ্গের জন্ম তো হতোই না,পুরো বাংলাটাই এক থাকতো- হয়তোবা দেশ ভাগও হতো না।
২০ জুন,১৯৪৭-২৫০ জন সদস্য বিশিষ্ট আইন সভায় ২১৬ জন অংশগ্রহণ করেন। এরমধ্যে ১২৬ জন সদস্য আলাদা গণপরিষদ গঠনের পক্ষে ভোট
দান করেন।সেদিন কমরেড জ‍্যোতি বসু,রতনলাল ব্রহ্ম,রূপনারায়ণ দাস-এই তিন জন প্রথম দফার ভোটে অংশগ্রহণ করেন নি। সবাই বলেন অজ্ঞাত কারণে সেদিন ফজলুল হক ছিলেন কলকাতার বাইরে । আসলে কারণটি ছিল ফজলুল হকের
স্ববিরোধীতা। সারা জীবন সেকুলার সেজে হিন্দুদের ভাওতা দিতে দিতে হঠাৎ করে মুসলিম লীগের কনফারেন্সে পাকিস্তান দাবি উত্থাপন করে নীল শেয়াল তার নীল রং ঝেড়ে ফেলে আসল রং
দেখাল।ভোটাভুটির সময় তাই পলায়ন ।বাংলা ভাগের পক্ষে ভোট দিলে সেকুলার হক সাহেবের গায়ে ‘সাম্প্রদায়িক’ তকমা সেটে যায়, আবার না দিলেও পাকিস্তান প্রস্তাবকদের নিকট বেইমান হয়ে পড়তে হয়।সুতরাং পলায়নই শ্রেষ্ঠতম পন্থা বিবেচিত হলো।এই১২৬ জনের মধ্যে ছিল ১২০ জন মুসলমান ,৫ জন তপশীলি হিন্দু ও ১ জন ভারতীয় খ্রিস্টান । তপশীলিরা হলেন, সর্বশ্রী নগেন্দ্রনারায়ণ রায়(মন্ত্রী), দ্বারিকানাথ বারুরী (মন্ত্রী), ডা.ভোলানাথ বিশ্বাস(সংসদীয়সচিব), হারাণ চন্দ্র বর্মণ (সংসদীয় সচিব)ও গয়ানাথ বিশ্বাস ।
যখন এঁরা বললেন ভারত ভাগ হবেই এবং সমগ্র বাংলা পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত হবে,তখনই বঙ্গীয় আইনসভা অস্থায়ী ভাবে দু’ভাগে ভাগ হয়ে যায়- পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ আইনসভা ।উভয় সভাতে প্রথমে প্লানের ৬ নং ধারা অনুসারে ভোট
হয়। এই ৬ নং ধারা অনুসারে পশ্চিমবঙ্গ
আইনসভায় ৫৮-২১ ভোটে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়,’বাংলা ভাগ হবে এবং ৮ নং ধারা অনুসারে পশ্চিমবঙ্গ তৎকালীন গণপরিষদে যোগদান করবে ।৫৮-২১ ভোটের মধ্যে ২১ জন সদস্যই ছিল মুসলমান।৫৮ জনের মধ্যে ছিলেন ৪৮ জন ছিল কংগ্রেসি, ৪ জন অ‍্যাংলোইন্ডিয়ান,১ জন ভারতীয় খ্রিস্টান,২ জন কমিউনিস্ট (জ‍্যোতি বসু ও রতন
লাল ব্রহ্ম),ড. শ‍্যামাপ্রসাদ মুখার্জি,শ্রী মুকুন্দ বিহারী মল্লিক এবং বর্ধমানের মহারাজা । এই ৫৮ জনের মধ্যে ২৪ জন ছিল যোগেন বিরোধী অখণ্ড বাংলার বিপক্ষে থাকা তপশীলি ।অর্থাৎ প্রমাণিত
হয়,তপশীলিদের মধ্যেও যোগেন মণ্ডল একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি। শুধুমাত্র মুসলিম লীগের পয়সা খরচ ও প্রচার নিমিত্ত যোগেন মণ্ডল বড় নেতা নামক ফাঁপানো বেলুনে পরিণত
হয়েছিল । মুসলিমদের জন্য পাকিস্তান চেয়ে নেওয়া,বাংলা ভাগ করে পাকিস্তানে নেওয়া যোগেন আলি মোল্লা ভাগ হওয়ার অল্প দিনের মধ্যেই জিন্নাহ্’র কাছে জোর এক থাপ্পড় খেলো।অল্প দিনের মধ্যেই জিন্নাহ্ যখন ক‍্যাবিনেট গঠন করলেন, সমস্ত ক্যাবিনেট মন্ত্রীর ঠাঁই হলো সেই
কমিটিতে- বাদ পড়লো মুশরিক যোগেন নামক স্বজাতিয়দের সাথে প্রতারণা করা ব্যাক্তিটি।না,এতেও লজ্জা হলো না কানকাটা মওলানা যোগেন আলি মোল্লার।
এবার যোগেনের আরও একটি জাতিবিরোধী কাজের নমুনা সর্ব সমক্ষে আনা যেতে পারে । দেশ ভাগ হওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়ে গেলেও হিন্দু প্রধান শ্রীহট্টের ব্যাপারটা ঝুলে রইল । শেষমেশ
গণভোটের মাধ্যমেই ফয়সালা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো । সবাই তথা মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দও জানতো হিন্দু প্রধান শ্রীহট্ট হিন্দুস্তানেই যাবে । এবারও জাতি বিরোধীতা তথা পাকিস্তানের স্বার্থ রক্ষায় অবতীর্ণ হলেন সেই এক এবং অভিন্ন
যোগেন মন্ডল । সিলেট গণভোট অনুষ্ঠিত
হয় জুলাই মাসের ৬ ও ৭ তারিখ।ঐ সময়
সারা সিলেট জেলা জুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সাধারণ মুসলিম লীগের সদস্য ছাড়া ২০০০ মুসলিম ন্যাশনাল গার্ডের সদস্য ও বেশ কিছু মুসলিম উলেমা। এই উলেমারা এক অদ্ভুত বক্তব্য রাখতো।তারা বলত,” মুসলিম লীগের পক্ষে যারা (হিন্দু) ভোট দিচ্ছেন তারা মুসলমান এবং এই
কাজের জন্য তারা বেহেশতে যাবেন।মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে যারা ভোট দেবেন,তারা কাফের।মৃত্যুর পর তাদের স্থান হবে জাহান্নমে ।” এইমত প্রচার কার্য চলা অবস্থায় যোগেন সিলেট গিয়ে নিম্নবর্গীয়দের সংঘবদ্ধ করে মুসলিম লীগের পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানায়,নিম্নবর্গীয়দের একটা বড় অংশ যোগেনের কথা মেনে মুসলিম লীগকে ভোট দেওয়ায় ২,৩৯,৬১৯ ও ১,৮৪,০৪১ ভোট ফলাফলে সিলেট পূর্ব পাকিস্তানে চলে যায় ।মাত্রই ৫৫,৫৩৮ ভোটের ব্যবধানে সিলেট আমাদের হাত ছাড়া হয়। চা বাগানের বিরাট সংখ্যক হিন্দু শ্রমিকদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল । নিম্নবর্গীয়রা যোগেনের কথা না শুনলে,চা বাগানের বিরাট সংখ্যক হিন্দু শ্রমিকদের ভোটাধিকার থাকলে কম পক্ষে লক্ষাধিক ভোটের ব্যাবধানে শ্রীহট্ট আমাদেরই থাকত,সে বিষয়ে কোনোও সন্দেহ নেই ।
২০ জুন,১৯৪৭-শ্রীহট্টে ভোটের আগেই লীগের মহান উদ্দেশ্য সফল করার জন্য যোগেন মন্ডল কলকাতায় এসেছিল। তাঁর উদ্দেশ্য সম্পর্কে বঙ্গীয় প্রাদেশিক অনুন্নত লীগের সাধারণ সম্পাদক শ্রী রাধানাথ দাস বলেন,’ মুসলিম লীগের পুতুল মি.
যোগেন মন্ডল আবার কলকাতায় এসেছেন, বাংলা ভাগ নস্যাৎ করার জন্য তিনি এম. এল. এ’দের প্রলুব্ধ করছেন ।”
১৮ জুন,১৯৪৭, বুধবার – বিকেলে কলকাতার ভারত সভা হলে অনুষ্ঠিত একটি সভায় তৎকালীন এম. এল. এ তথা গণপরিষদ সদস্য শ্রী প্রমথ রঞ্জন ঠাকুর খুলনা জেলা, তৎ সংলগ্ন গোপালগঞ্জ,
বরিশাল ও ফরিদপুরের হিন্দু প্রধান এলাকা নিয়ে নতুন পশ্চিমবঙ্গ গঠনের জোর দাবি জানান । কে এই প্রমথ রঞ্জন ঠাকুর ? ইনি হলেন মতুয়াদের ইষ্টদেব শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর, তাঁর পুত্র শ্রী শ্রী
গুরুচাঁদ ঠাকুর, যিনি নমঃশূদ্র শ্রেনীর সংস্কারক,
এঁদেরই বংশধর । এঁনার পূর্ব পুরুষ অবতীর্ণ হয়েছিলেন নমঃশূদ্রদের অজ্ঞানতা থেকে উদ্ধার করে জ্ঞানের আলোকে আলোকিত করতে । ইনি চাইলেন জন্মভূমিতেই থাকার অধিকার আদায় করতে। হায়রে,নমঃশূদ্রগণ!তোমরা তোমাদের উদ্ধারণ কর্তার রক্তগুণ’কে চিনতে ভুল করে তোমাদেরই শত্রুর পা চাটা মানুষের পেছনে দৌড়লে!
১৯৪৭-১৫ আগস্ট পার হয়েছে।পৃথিবীতে দুটো নতুন দেশের জন্ম হয়েছে।দেশ দুটো হলো ভারত ও পাকিস্তান। মুসলমানরা তাদের সাধের পাকিস্তান পেয়ে গিয়েছে, সুতরাং মারামারি, খুন
খারাপি’র ইতি হওয়ারই কথা। না,সেটা কিন্তু হলো না।আগে বৃটিশ শাসনে পুলিশ মোটামুটি কার্যকর ব্যবস্থাই গ্রহণ করত।পাকিস্তানে মুসলমানরা পূর্ণ ক্ষমতা পেয়েইএক তরফা আক্রমণ চলতে থাকলো হিন্দু দের ওপর ।না, পাকিস্তান সৃষ্টির হিন্দু নায়ক মওলানা যোগেন আলি মোল্লা’র নিম্নবর্গীয়রাও ছাড় পেল না। যোগেন পড়ল মহা বিপদে । অবশ্য মাথায় ঠিক বুদ্ধি এসে গেল । ইং ০৯.১০.১৯৪৭ তারিখে সিন্ধু প্রদেশের তৎকালীন চীফ সেক্রেটারী মি.ফারুকি এবং করাচির কিছু তপশীলি নেতাকে নিয়ে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিলেন, ” তপশীলিরা ঘরের বাইরে কাজকর্ম করতে গেলে সবুজ কাপড়ের ওপর চাঁদ-তারা প্রতীক ও ‘ডিপ্রেসড’ ক্লাস লেখা ব্যাজ পরে যাবে(মর্নিং নিউজ ১৩.১০.১৯৪৭)।” কতবড় জঘন্য অপমান নিম্নবর্গীয়দের প্রতি, সেটা একবার ভেবে
দেখেছেন ? এই গাড়োলটার হিসেব ছিল না যে সিদ্ধান্ত মোতাবেক তাঁর নিজেকেও ঐমত একটা ব্যাজ পরে থাকতে হবে।
এইমত খবর পেয়ে ভারতবর্ষের বহু রাজনীতিক,বুদ্ধিজীবী ও গান্ধীজি এইঘৃণ্য সিদ্ধান্তের নিন্দা করলেন।যোগেনের উত্তর শুনবেন ? যোগেনের পুত্র জগদীশ মন্ডলের লেখা ‘ মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ’নামক পুস্তক থেকেই জানাচ্ছি । গান্ধীজিকে উদ্দেশ্য করে যোগেন বলল,’ এই ব্যাজ পরা নিয়ে কোনও প্রকার মন্তব্য দরকার নেই গান্ধীর।যেসব গরীব তপশীলি শ্রমিক
কাজের জন্য বাইরে যায়, তাদের জন্য এটা প্রয়োজন ।”
এসব দেখে বাবা সাহেব আম্বেদকর ক্যাবিনেট ডিসিশনের তোয়াক্কা না করেনিজের দায়িত্বে ‘ফ্রি প্রেস জার্নাল’এ বিবৃতি দিলেন, ‘ যে সকল তপশীলি পাকিস্তানে আটকা পড়েছেন,তাঁরা যে কোনও উপায়ে ভারতে আসুন।দ্বিতীয় কথাটি আমি বলতে চাই তা’হচ্ছে পাকিস্তান বা হায়দরাবাদে আটকে পড়া তপশীলিদের পক্ষে মুসলমান বা মুসলিম লীগের ওপর বিশ্বাস রাখা মৃত্যুতূল‍্য হবে।’আরও বললেন, ‘ বিপদ এড়াবার উপায় হিসেবে কেউ যেন মুসলমান হয়ে যাওয়ার মতো সহজ পথ অবলম্বন না করেন । ইতিমধ্যেই যারা মুসলমান হয়ে গেছেন, তাঁরা নিজধর্মে ফিরে আসুন । আমি হায়দরাবাদের তপশীলিদের বলছি,ওখানকার নিজাম ভারতের শত্রু । তার সাথে সহযোগিতা করে নিজের সম্প্রদায়কে কলঙ্কিত করবেন না'(২৮.১১.১৯৪৭-ফ্রি প্রেস জার্নাল)।যোগেন এবং বাবা সাহেবের পার্থক্য পাঠকগণ তথা যোগেন অনুগামীরা বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারছেন বলে আশা রাখি ।

 বাবা সাহেব খুব সম্ভববত কোরান পড়েছিলেন । মুসলমানদের দর্শন সম্পর্কে ভালোরকম ধারণা অর্জন করতে পেরেছিলেন তিনি । 1948'এ প্রথম কাশ্মীর যুদ্ধে নারায়ন সিং,ব্রিগেডিয়ার রাজেন্দ্র সিং'দের সাথে কাশ্মীরের হিন্দু রাজা হরি সিং'এর মুসলিম সৈন্যরা বিশ্বাসঘাতকতা করার বহু আগেই বাবা সাহেব বলেছিলেন, ' কাশ্মীরের মুসলমান 

ও মুসলমান সৈন্যরা হিন্দু সরকারকে মেনে চলবে না।’ খুব সম্ভবতঃ রাজা দাহিরের ইতিহাসটাও খুব ভালো ভাবেই জানতেন আম্বেদকরজী। তাই কোনরূপ মুসলমানী চতুর রাজনীতি তাঁকে গ্রাস
করতে সক্ষম হয়নি।মেরুদণ্ডটা তাই সোজা রাখতে তাঁর কোনও অসুবিধা হয়নি। তুলনামূলক ভাবে যোগেনের দিকে তাকালে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে,ইসলামী দর্শন সম্পর্কে যোগেনের সম্যক কোনও ধারণাই ছিল না ।
মার্চ, 1948-লিয়াকত আলী খান পাকিস্তান গণপরিষদে একটি বিল আনে।বিলে বলা হয়, ‘ ইসলামে বর্ণিত গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সাম্য, সহিষ্ণুতা ও সামাজিক ন্যায় বিচারের ভিত্তিতে পাকিস্তানের
সংবিধান রচনা করা হবে । সেদিন পাকিস্তানের আইন মন্ত্রী হিসেবে হিন্দুদের জন্য ‘ বিষ’সম ওই প্রস্তাবের আইনগত বৈধতা দেওয়ার দায়িত্ব ছিল যোগেন মন্ডলের ওপর এবং যোগেন ওই প্রস্তাবের
আইনি বৈধতা দিয়েছিল সন্তুষ্ট চিত্তে ও পূর্ণ সুষ্ঠ ভাবে । মনে রাখা দরকার,11.08.1947’এ বিশ্ববাসীকে ধোঁকা দেয়া বিখ্যাত ভাষণের মালিক তথা পাক গণপরিষদের সভাপতি কায়েদ ই আযম
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্’র সরাসরি পূর্ণ সমর্থন ছিল এই প্রতি । ইসলামী গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সাম্য, সহিষ্ণুতা ও সামাজিক ন্যায় নিয়ে বিশদে আলোচনার অবকাশ থাকলেও আলোচনা করব না।লেখাটি যোগেন মন্ডল’এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখব।
এবার ছয়জন বর্ণহিন্দুর কথা না বললে লেখক হিসেবে নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না । যোগেন মণ্ডলের আইনি বৈধতা দেওয়া আইনে হিন্দু নির্যাতনের স্পষ্ট ইঙ্গিত এঁরা বুঝতে পেরেছিলেন । এঁরা ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান আইন সভার বিরোধী দলনেতা । এঁরা লিয়াকত আলী খান’এর কাছে হিন্দু নির্যাতনের প্রতিকারের জন্য স্মারকলিপি প্রদান করলেন । কারা এই ছয় জন ? এই ছয় জন ছিলেন বসন্ত কুমার দাস,গণেন্দ্রনাথ
ভট্টাচার্য, মণীন্দ্র চন্দ্র ভট্টাচার্য, মণীশ চন্দ্র ভট্টাচার্য, হারাণ চন্দ্র ঘোষ চৌধুরী ও বাবু মনোরঞ্জন ধর মহাশয় । না,কোনও তপশীলির উপস্থিতি দেখা যায়নি হিন্দু অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে ।
এ প্রসঙ্গে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কে নিয়ে একটু আলোচনা না করে পারছি না। নমঃশূদ্র শ্রেনীর লোকজন সদা সর্বদা বলে বেড়ায় তাদের সমাজের শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নয়নের মূল কারিগর শ্রী শ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর । কথাটা সর্বাংশে সত্য নয়। শ্রী শ্রী ঠাকুরের আন্তরিক প্রয়াস এবং প্রচেষ্টা পূর্ণরূপে অবশ্যই ছিল, ছিল না উদ্দেশ্য পূরণের জন্য
উপযুক্ত অর্থ বল। এই নিম্নবর্গীয়দের শিক্ষার জন্য শুধু মাত্র গুরুচাঁদ ঠাকুরই চিন্তা করেন নি।উঁচু
বর্ণ বলে কথিত, যাঁদের উঠতে বসতে গাল পাড়তে থাকত আম্বেদকর ও যোগেন মন্ডল এবং এখনও গালি দেয় বেশ কিছু যোগেন অনুগামী, সেই বর্ণ হিন্দুরাই প্রথম ভেবেছিল এই জাতিকে জ্ঞানের আলোতে উত্তরণ ঘটাতে হবে । এঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বর্ধমানের মহারাজ উদয়চাঁদ মহতাব ,এন.সি. চ্যাটার্জি, খুলনা’র জমিদার শৈলেন্দ্রনাথ ঘোষ, চন্দ্রকান্ত বসু,রমেন মল্লিক প্রমুখ ব্যাক্তিগণ। 1944 সালে এদেরই প্রচেষ্টায় ফরিদপুর জেলার
নমঃশূদ্র অধ্যুষিত অঞ্চলের ‘রামদিয়া’ গ্রামে একটি কলেজ স্থাপিত হয়।এইকলেজ স্থাপনে অঙ্গাঙ্গী- ভাবে জড়িত ছিলেন শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের বংশধর,সমাজ সংস্কারক শ্রী প্রমথ রঞ্জন ঠাকুর ।
এরপর আরও একটি কলেজ করার চিন্তা শুরু করেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি । সেই কলেজটি করতে জায়গা স্থির করা হলো বরিশাল জেলার ‘লড়া’ গ্রামে। এই কলেজটি স্থাপন করার জন্য সবচাইতে বেশী অর্থ দিতে স্বীকার করেছিলেন
বর্ধমানের মহারাজ উদয়চাঁদ মহতাব। তাই
গ্রামের লোকেরা আনন্দে নিজেদের গ্রামের নাম পাল্টে নতুন নামকরণ করে নাম রাখল ‘ উদয় নগর’।এবার খবর এলো একটা নির্দিষ্ট দিনে ওই গ্রামে শ্যামাপ্রসাদ আসছেন । সঙ্গে আসছেন
বর্ধমানের মহারাজ উদয়চাঁদ মহতাব । শোনা গেল হিন্দু মহাসভার সাধারণ সম্পাদক এন.সি.চ্যাটার্জি ও খুলনা’র জমিদার শৈলেন্দ্রনাথ ঘোষ মহাশয় সহ
আরও অনেকেই সাহায্যের হাত উদার ভাবে বাড়িয়ে দিয়েছেন। লোকজন শ্যামা বাবুর সভায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করেছে । এলাকার সমস্ত গ্রামে সাড়া পড়ে গেল । শ্যামা বাবু ও বর্ধমানের মহারাজকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য
সমস্ত প্রকার ব্যাবস্থা নেওয়া হলো । বিধি বাম। না,হলো না কলেজটি।যোগেনের সহযোগী মুসলিমরা তিনদিন আগে একটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধিয়েছিল,আর তার জন্য উক্ত স্থানে 144 জারি করা হয়েছিল ।নির্দিষ্ট দিনে দু’টি বড় বড় লঞ্চে করে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি, উদয়চাঁদ মহতাব,
শৈলেনবাবু, এন. সি.চ্যাটার্জি সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি হাজির হলেন । পুলিশ এঁদের নামতে দিল না। তবে মাটিভাঙা বাজারের রঞ্জন বিশ্বাসের বাড়িতে দুপুরের আহারের জন্য তাঁদের যেতে দেওয়া হয়েছিল ।শ্যামা বাবুর সভা বানচাল করার জন্য তিনদিন আগে পাশ্ববর্তী এলাকায় যোগেনও একটা
সভার আয়োজন করেছিল । এই কলেজ করার বিরোধিতায় ছিলেন যোগেন মন্ডল ও তথাকথিত অসাম্প্রদায়িক মুসলিম নেতা আবুল কাশেম ফজলুল হক।যোগেনের ভয় ছিল শ্যামাবাবুর এইমত শূদ্র উন্নয়ন প্রকল্প চলতে থাকলে আপন ভূমিতেই স্বজাতিদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন তিনি । হক সাহেবের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন । ওপর ওপর ভালোমানুষী দেখালেও হিন্দুদের কোনও রকম ভালো তিনি চাইতেন না ।শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ফরিদপুরের ‘কদমবাড়ি’তে আরও একটা কলেজ করতে চেয়েছিলেন । মন্ত্রী যোগেন আলি মোল্লা’র বিরোধিতার ফলে সেই কলেজটিও প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি ।নিম্ন বর্ণ বিরোধী বলে যাঁকে অহরহ গালিগালাজ করেন কিছু নিম্নবর্গীয়, তাঁরা তাদের স্বজাতি যোগেনের সাথে একবার তুলনা করে দেখবেন কি, আসলে আপনাদের শত্রু তথা অমঙ্গলকারী কে ?অবশ্য শ্যামা বাবুর সাথে ‘মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ’ এর তুলনা করা উচিত নয়, কারণ যোগেনকে তাহলে সামান্য হলেও ‘শুভ’ আত্মা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়ে পড়ে ।
জাতপাতের কতটা বিরোধী ছিলেন শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি ? যোগেন আর আম্বেদকর ভারতবর্ষ জুড়ে ‘নীচু’ জাতের জন্য চিৎকার করে বেড়াচ্ছেন।বারবার ‘উঁচু বর্ণ’র দিকে আঙ্গুল তুলে নিম্নবর্গীয় দের বুকে ঘৃণার আগুন জ্বালিয়ে চলেছেন। হিন্দু সমাজের ফাটল বেশ ভালো রকম ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে । না,শ্যামা বাবুর মুখে জাতিগত ভাবে কখনও বক্তব্য শোনা যায়নি।শ্যামা প্রসাদের রাজনৈতিক গুরু ছিলেন বিনায়ক দামোদর সাভারকার । দূরদৃষ্টি সম্পন্ন এই ব্যক্তিত্ব আম্বেদকর-যোগেনদের কু’কর্মের সুদূর প্রসারী ফল সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। এই মারাঠী ব্রাহ্মণ নিজে ছিলেন ‘জাতপাত’ প্রথার সম্পূর্ণ বিরোধী।তিনি বলতেন ভারতবর্ষে এক এবং অদ্বিতীয়
শুদ্ধ রক্তের ধারা বইছে আমাদের শরীরে।এই মহামানব নিয়ে বেশী কিছু লিখব না।আমার বন্ধুগণ তাঁর লেখা ‘হিন্দুত্ত্ব’ নামক বই খানা কষ্ট করে একটু পড়ে নেবেন ।
যাহোক,যোগেন-আম্বেদকরদের হিন্দু সমাজ বিভক্তি করণের বিপরীতে সমাজকে একত্র করণে মনোনিবেশ করলেন।চালু করলেন ‘পংক্তি ভোজ’।হিন্দু সমাজের সমস্ত শ্রেণীর মানুষ সেথা এক সাথে বসে আহার গ্রহণ করতেন ।নাথুরাম গডসে নামক আরও এক মারাঠী ব্রাহ্মণ তাঁর পরিবারের নিষেধ অমান্য করে ঐ পংক্তি ভোজনে অংশ গ্রহণ করতেন ।ইনি সেই নাথুরাম, পরবর্তী কালে যিনি নিজের ফাঁসির সম্ভাবনা উপেক্ষা করে জাতির শত্রু করমচাঁদ গান্ধী’কে গুলি করে হত্যা করেন ।
সাভারকরের অনুগামী শ্যামা বাবু গুরু’কে অনুসরণ করে বাংলাতেও চালু করলেন ‘পংক্তি ভোজন’।এই পংক্তি ভোজনের উদ্দেশ্য ছিল বাংলা থেকে অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ । অনেকেরই হয়তো
মনে আছে ওই অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ আন্দোলনের নাম ছিল ‘ জলচল ‘। অর্থাৎ যে কোনও হিন্দু ব্যাক্তির পক্ষে যে কোনও হিন্দুর ছোঁয়া বা রান্না করা খাবার বা জল গ্রহণ করা বৈধ । এরফলে হিন্দুদের মধ্যে বর্ণ ভেদ প্রথা কমতে থাকে অতিদ্রুত ।যোগেনের পক্ষে হা-করে দেখা ছাড়া গতি ছিল না । মুসলিম লীগ এই আন্দোলনে
প্রমাদ গুনল । এতদিন হিন্দুদের মধ্যে বিভেদের ফসল তুলেছে যথেচ্ছ ভাবে ।এই জাত একত্রিত হলে সেটা সম্ভব হবেনা বুঝে এই ঐক্য বানচালের প্রচেষ্টা শুরু করে দিল।মুসলমানরা সামনে এগিয়ে নিয়ে এলো আম্বেদকর ও যোগেনকে।এরা প্রচার শুরু করল। বলতে শুরু করল,”নমঃশূদ্র তথা তপশীলিরা হিন্দু নয়। তারা এক পৃথক জাতি ।মুসলমানদের পাকিস্তানের মতো তাদেও প্রয়োজন
‘অচ্ছুতস্থান’।” যোগেনের বক্তব্যে কখনওই
স্বাধীনতার কথা থাকত না,থাকত শুধু উঁচু বর্ণ তথা বর্ধিষ্ণু হিন্দুদের বিরুদ্ধে জেহাদ। ভারতবর্ষের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির প্রধান হলেই কারও বিগত দিনের কু-কর্ম ঢাকা পড়ে যায় না।আম্বেদকর তাড়াহুড়ো করে তপশীলি জাতি
ফেডারেশন গড়ে, সংগঠনের উদ্বোধনী সভায় ঘোষণা করলেন, ‘ তপশীলিরা হিন্দু নয়,তারা আলাদা জাতি।’ যোগেনের মুখে ও ছিল সমসুর।আম্বেদকরও ধোঁয়া তুলসী পাতা নয়।

        1949 এর আগস্ট থেকে 1950 এর 18 মার্চ পর্যন্ত সরকারি মদতে হিন্দুদের ওপর একতরফা সংগঠিত আক্রমণ চলতে থাকে ।1949এর আগস্ট মাসে সিলেট জেলার বিয়ানি বাজার ও বরলেখা থানা এলাকায় একতরফা ভাবে হিন্দু নিধন শুরু হয় ।প্রসঙ্গত এই সিলেট জেলা কিছুদিন আগেই যোগেনের একান্ত সহযোগীতায় মুসলিম লীগ পাকিস্তানে হাসিল করতে সক্ষম হয় ।অবস্থা চরমে পৌঁছয় '50 এর ফেব্রুয়ারিতে। ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় তখন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ।পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক ভাবে হিন্দু হত্যার পরিকল্পনার কথা জানতে পেরে মুখ্যমন্ত্রী   রাজ্যের মুখ্যসচিব সুকুমার সেন(আই সিএস) কে ঢাকা প্রেরণ করেন পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা খতিয়ে দেখার জন্য । ফেব্রুয়ারি মাসের 6 এবং 7 তারিখে রেডিও পাকিস্তান থেকে বারবার ঘোষণা করা হতে থাকে, ' ভাইসব,আপনারা শুনছেন পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতে আমাদের মুসলমান ভাইদের ওপর অমানবিক অত্যাচার করা হচ্ছে ।আপনারা কি প্রস্তুত হবেন না ? আপনারা কি শক্তি সঞ্চয় করবেন না ? 10.02.1950 - ঢাকা সেক্রেটারীয়েটে পাকিস্তানের মূখ্য সচিবের সাথে সুকুমার সেনের আলোচনা চলছে । এমন সময় ঢাকা সেক্রেটারীয়ের কর্মরত কিছু মানুষ এক মহিলাকে সামনে রেখে হিন্দু অত্যাচারের প্রতীক বানিয়ে শ্লোগান দেওয়া শুরু করে।বেশ কয়েকজন শ্রী সেন'কে ঘিরে ধরে লাঞ্ছনা করে,ভারত বিরোধী ও হিন্দু বিরোধী শ্লোগান দিতে থাকে । সম্পূর্ণ ঘটনাটি ঘটে পূর্ব পাকিস্তানের মূখ্য সচিব আজিজ আহমেদের সামনে । আজিজ আহমেদ কোনও বাধা প্রদান করেনি। এরপর শুরু হয় ভয়ংকর এক তরফা হিন্দু নিধন। ঢাকা থেকে ট্রেন কলকাতা পৌঁছলে পুরো ট্রেনের মধ্যে পাওয়া যায় চাপ চাপ রক্ত, ভাঙা চুড়ি, শাঁখা প্রভৃতি । শান্ত প্রকৃতির বিধান রায়'ও উতলা হয়ে উঠলেন।দিল্লিতে ফোন করে নেহরু'কে জানালেন,'এভাবে হিন্দু হত্যা চলতে থাকলে আমার পক্ষে চুপ থাকা সম্ভব হবে না ।' পাঠকগণ বুঝতেই পারছেন, কিভাবে পরিকল্পনা করে পাকিস্তান সরকার হিন্দুদের হত্যা করণ চালাত।তপশীলিদের মসীহা 'মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ' এই সরকারের আইন মন্ত্রীর পদ অলংকৃত করে বসেছিলেন ।
    যোগেন মন্ডল ঘুরে ঘুরে হত্যাকান্ডও ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করলেন । পাশবিক ধর্ষণের কথাও শুনলেন।বহু পরে তিনি তাঁর সেই দিনের অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেছিলেন, তিনি তখন ভেবেছিলেন, ' সকল হিন্দুই বুঝি দেশ ছেড়ে চলে যাবে'। মন ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হলেও যোগেন 

কিন্তু ভেঙে পড়ল না।সহজে ক্রয়যোগ্য যোগেনকে গ্রাস করে নিয়েছিল ‘মন্ত্রীত্ব’।বিবেক বর্জিত যোগেন অনুশোচনায় পদত্যাগ করল না। বরং পাকিস্তান সরকারের নির্দেশে গ্রামে-গঞ্জে সভাকরেজনগণ’কে উৎসাহ দিয়ে বলতে শুরু করে ‘আপনারা দেশত্যাগ করবেন না,সাহসের সাথে ভিটে মাটিতে থাকুন’। শুধু কি তাই ?1950এর 7সেপ্টেম্বর করাচিতে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বিবৃতি দিয়ে বললেন,’ যেভাবে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে তা প্রশংসনীয় ।’ ভাবুন একবার ! ফেব্রুয়ারি মাসে হিন্দু নিধন দেখে যার বুকফেটে যাচ্ছিল,সেপ্টেম্বরে
সেই আবার ভিন্ন সুরে গান ধরল। এই সময় গ্রামে গ্রামে সভা করে একটি বিখ্যাত উবাচ প্রদান করে বেড়াত যোগেন।উবাচটিতে যোগেন বলত, ‘আপনাদের দেশত্যাগ করে চলে যেতে হবে না। যেতে যদি হয় আপনাদের পাঠিয়ে দিয়ে আমি যাব শেষ গাড়িতে।’তার নিজের জেলার নাজিরপুর থানার খুব নামডাকওয়ালা মানুষ ‘ঠাকুর রাধাচরণ পাগল’এর বাড়িতে সভা করে গলা ফাটিয়ে ঘোষণা করলেন, ‘ আপনারা কেউ দেশ ছেড়ে যাবেন না।যদি একান্তই যাওয়ার প্রয়োজন হয়, আমিই সেটা বলে দেব।আপনারা যাবেন আগে, আমি যাব শেষ গাড়িতে।আর তখন যদি ভারত আমাদের জায়গা না দেয়,তবে পৃথিবীর অন্যত্র জায়গা খুঁজে নেব।’ কি অসীম শয়তান হলে এইমত ভাষণ দেওয়া যায়!
ভারতবর্ষে অবস্থান করা আরও এক দলিত নেতা, বাবা সাহেব ভীম রাও আম্বেদকর ক্যাবিনেটের তোয়াক্কা না করে পাকিস্তানে আটকে পড়া অমুসলিমদের,বিশেষত হিন্দু ও শিখদের যে কোনও ভাবে ভারতে আসার উদাত্ত আহ্বান
জানাচ্ছেন,আর যোগেন নির্বিকার ভাবে ভূল বুঝিয়ে চলেছে স্বজাতিকে । আচ্ছা, যোগেন ‘ভারত যদি জায়গা না দেয়’ জাতীয় উক্তি করেছিল কেন ? ভারত কি কখনও বলেছিল যে নির্দিষ্ট সময়ের পর ভারতে এলে যোগেন তথা নমঃশূদ্রদের জায়গা দেওয়া হবে না ? বরং গান্ধী’র
মতো হিন্দু বিরোধীও পাকিস্তানের হিন্দুদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, তাঁরা যখনই ভারতে আসবে, ভারত সরকারকে তখনই তাদের জন্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে । তা ছাড়া আম্বেদকরজী তো
ছিলেনই ! তা সত্ত্বেও যোগেন কি শুধুই আবেগ বশতঃ এইমত কথা বলেছিল ?না,যোগেন তখন অনেকটাই আবেগ ছেড়ে বাস্তবের জমিতে পা রাখতে শুরু করেছে।এইরূপ কথা বলার কারণ ছিল ’50 এর হিন্দু গণহত্যার পর পূর্ব পাকিস্তানের বেশী র ভাগ হিন্দু যোগেনের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে দেশত্যাগ করার জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুতি নিয়ে ফেলছিল । যোগেন জানত,তার স্বজাতিরা বৃহৎ সংখ্যায় দেশ ত্যাগ করলে তার রাজনৈতিক গুরুত্ব হ্রাস পাবে। তাই যোগেন নমঃশূদ্রদের মধ্যে ভারত না যাওয়ার পরামর্শ দিত, এটা না হয় মেনে নেওয়া যায় ব্যাখ্যা হিসেবে ।তা বলে ‘জায়গা না দেওয়া’র ব্যাখ্যা কি হতে পারে ? এরও ব্যাখ্যা দেওয়া যেতে
পারে । যেমন,যোগেন খুব সম্ভবতঃ নিজের কৃতকর্মের ফল নিয়ে চিন্তা ভাবনা শুরু করেছিল । ধারণা করেছিল, সারাজীবন বর্ণ হিন্দুর বিরোধিতা করে গালি গালাজ করা,জীবন বাঁচানোর পরিবর্তে বেইমানি করা,হিন্দুদের মধ্যে বিভেদের বীজ জিইয়ে রাখা,পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে পাকিস্তান আদায় করে সেদেশের আইন মন্ত্রী হওয়া, বেইমানির মূর্ত প্রতীক এই যোগেনকে বেইমানির মাসুল হিসেবে তার স্বজাতিসহ তাকে ভারতবর্ষে বসবাস করার অধিকার ভারত সরকার দেবে না। এখানেও উন্মাদটা ভুল করে বসল।ভুলে ভরা যার জীবনটাই,ভুল ছাড়া সে কি তিষ্ঠতে পারে ? ভুল’কে
পরিত্যাগ করলে সে যে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে! যোগেন একবারও ভাবল না,বর্ণ হিন্দুরা তার মতো অবিবেচক নয়। তাঁরা ভালো করেই জানতো,এই নিম্নবর্গীয়দের মধ্যে একটা বড় অংশই বাংলা ভাগের পক্ষে মতামত দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের স্থাপনায়
দান রেখেছে । যোগেনই একমাত্র নিম্নবর্গীয়দের নেতা নয়,সেটা উচ্চবর্ণীয়রা ভালোভাবেই জানতো । সেই হিসেবে এদেশে পাকিস্তান থেকে আগত নমঃশূদ্রদের ঠাঁই পাওয়াটা নিশ্চিতই ছিল। আর যোগেনের ঠাঁই? সেটাও নিশ্চিত ছিল, যেটা পরবর্তীকালে সফল ভাবে প্রমাণিত । যোগেনের মস্তিষ্ক সম্পর্কে বর্ণ হিন্দুরা নিশ্চিত ছিল যে এটা একটা নিরেট মূর্খ।বেইমানি এটার জাতস্বভাব
হলেও বেশীকিছু করে উঠতে পারবে না।সুতরাং ওটাকেও এখানে জায়গা দাও,হাজার হোক, হিন্দু তো! পরবর্তী কালে প্রমাণ হয়ে গিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে এসে যোগেন আর কিছুই করে উঠতে পারেনি। উল্টে মৃত্যুর পূর্বে একপ্রকার নিঃসঙ্গ
হয়ে পড়েছিল।গোবরডাঙা স্টেশনে একা একা বসে থাকতো এক কালের দোর্দণ্ড প্রতাপ মুসলিম লীগ পন্থী ‘ মওলানা যোগেন আলি মন্ডল ‘।
(তৃতীয় অংশ আগামীতে)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here