হারিয়ে যাওয়া বাগদি রাজার বালিয়া বাসন্তী- শেষ পর্ব

0
219

© অমিত মালী

(প্রথম পর্বের পর)

এরপরেই নতুন কৌশল অবলম্বন করলেন মুসলিম শাসকরা। হজরত শাহ সুফী সুলতানের পরামর্শে হিন্দু সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশ ধারণ করলেন সৈয়দ হুসেন বুখারী। তিনি হিন্দু সন্ন্যাসীর বেশে বালিয়া-বাসন্তী রাজ্যের রাজধানীতে প্রবেশ করলেন। পাহারায় থাকা সৈন্যরা চিনতে পারলেন না যে যিনি হলেন একজন মুসিলম সুফী দরবেশ এবং মুসলিম সৈন্যদের চর। হিন্দু সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে রাজার গড় ঘুরে দেখলেন সৈয়দ হুসেন বুখারী। তিনি লক্ষ্য করলেন এবং অনুসন্ধান করে জানতে পারলেন যে রাজার গড়ে একটি পবিত্র পুকুর আছে এবং সেই পুকুরের অলৌকিক ক্ষমতা আছে। যখনই কোনো আহত সৈনিককে সেই পুকুরে নিক্ষেপ করা হয়, সেই সৈন্যের সমস্ত ক্ষতস্থান শুকিয়ে যায় এবং সমস্ত ক্লন্তি, শ্রান্তি দূর হয়ে যায় এবং সেই সেনা দ্বিগুন শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এটা  দেখার পর সৈয়দ হুসেন বুখারী মনে মনে পরিকল্পনা করেন। তিনি ফিরে যান সুলতানের সেনা শিবিরে। পুরো কথা তিনি জাফর খানকে বলেন এবং এও বলেন যে রাজার গড়ের পুকুরে নাকি অপবিত্র জ্বিন বাস করে এবং তার ফলেই রাজার সৈন্যরা এতো শক্তিশালী। পরেরদিন আবার সেই হিন্দু সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে তিনি হিন্দু রাজার গড়ে প্রবেশ করলেন। কিন্তু এবারে তিনি সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন একটুকরো গরুর মাংস। তিনি  গেলেন রাজার গড়ে এবং একটি গাছের তলায় বসে হাতে জপমালা নিয়ে জপ করার অভিনয় করতে লাগলেন। সৈন্য মারফত রাজা হিন্দু সন্ন্যাসীর খবর পেয়ে তাঁর সৈন্যদেরকে নির্দেশ দিলেন যে যেন ওই সন্ন্যাসীকে খাতির-যত্ন করা হয় এবং ভালো খাবার দেওয়া হয়। সেই নির্দেশ মতো রাজার কয়েকজন সৈন্য সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশ ধারণকারী সৈয়দ হুসেন বুখারীর কাছে নানা রকম খাবার, ফল-মূল নিয়ে গেলেন। কিন্তু তিনি কোনো খাবার গ্রহণ করলেন না। রাজাকে এই কথা সৈন্যরা জানালে, রাজা নিজে ছুটে আসেন এবং জানতে চান যে সন্ন্যাসী কেন খাবার গ্রহণ করছেন না। তার উত্তরে সৈয়দ হুসেন বুখারী বলেন যে তিনি অনেক দূর থেকে আসছেন এবং খুবই ক্লান্ত। তাছাড়া তিনি অনেকদিন স্নান করেননি। তাই তিনি স্নান না করে কোনো খাদ্য গ্রহণ করবেন না। তিনি ওই পবিত্র পুকুরে স্নান করে পুন্য অর্জন করতে চান। আগেই বলেছি যে রাজা খুবই ধর্মপরায়ণ ছিলেন। ফলে এই কথায় সম্মত হলেন রাজা। সৈন্যদের আদেশ দিলেন সন্ন্যাসীকে পবিত্র পুকুরে নিয়ে যাওয়ার। হিন্দু সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশ ধারণকারী সৈয়দ হুসেন বুখারী পবিত্র পুকুরে নামলেন এবং সকলের অলক্ষ্যে পুকুরে গরুর মাংস ফেললেন। তারপর তিনি খাদ্য গ্রহণ করে গড় ত্যাগ করলেন।
(৩)
পরেরদিন নতুন ভাবে যুদ্ধ শুরু হলো। উভয় পক্ষের বহু সৈন্য আহত হলেন। কিন্তু যুদ্ধ শেষে হিন্দু রাজার সৈন্যরা যখন পবিত্র পুকুরে গেলো, তাঁরা দেখলো যে পুকুরে গরুর মাংস ভেসে রয়েছে। ফলে কোনো আহত সৈন্যই সেই পুকুরে নামলো না। পুকুরে গরুর মাংস রয়েছে, এই খবর আগুনের মতো রাজার সেনাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লো। ফলে রাজার সেনাদের মনোবল তলানিতে ঠেকলো।
পরদিন সকালে পুনরায় হিন্দু রাজার সৈন্যদের সঙ্গে মুসলিম সৈন্যদের যুদ্ধ শুরু হলো। কিন্তু সেই যুদ্ধে রাজার সৈন্য পরাস্ত হলো। বহু হিন্দু সৈন্য মৃত্যুবরণ করলেন। কোনো উপায়ন্তর না দেখে হিন্দু রাজা চন্দ্রমোহন গড় ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি সঙ্গে নিলেন কিছু বিস্বস্ত সৈনিককে। রাজার সঙ্গে বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরের রাজার বিশেষ মিত্রতা ছিল। ফলে তিনি বিষ্ণুপুর যাওয়া মনস্থির করেন। সেই উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। কিন্তু চার জন মুসলিম অশ্বারোহী সৈন্য রাজাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে পিছু ধাওয়া করেন। ভোর রাতে ওই চার জন মুসলিম সৈন্য কাগমারী বলে এক গ্রামে হিন্দু রাজার মুখোমুখি হন। রাজার বীর সৈন্যের হাতে মুহূর্তের মধ্যে মারা পড়েন ওই চার মুসলিম সৈন্য। ওই চার জন মুসলিম সৈন্য হলেন- (১) হজরত শাহ সৈয়দ খায়রুর রহমান, (২) হজরত শাহ সৈয়দ তবিবর রহমান, (৩) হজরত শাহ সৈয়দ আবদুর রহমান, (৪) হজরত শাহ সৈয়দ ফয়জুর রহমান। অনেক মুসলিম ঐতিহাসিকের মতে এই চার জন  ছিলেন চার ভাই।  পরে ওই চারজন মুসলিম সৈন্যের মৃতদেহ রাজার গড়ে আনা হয় এবং তাদেরকে কবর দেওয়া হয়।

সেদিন থেকে চিরতরে হারিয়ে গেল বালিয়া বাসন্তী। বালিয়া বাসন্তীর নাম হলো ‛ফুরফুরা শরীফ’। মুসলিম সেনাদের তরবারির মুখে ইসলামে ধর্মান্তরিত হলেন বহু মানুষ। কিছু হিন্দু টিকে রইলেন। ধ্বংস হলো বাগদি রাজার কালী মন্দির। তবে এখনও বাগদি রাজার সেই কালী পূজা টিকে রয়েছে। স্থানীয় হিন্দু মানুষজন অর্থাৎ যারা বাগদি রাজার প্রজাদের বংশধররা  প্রতিবছর সেই কালী পূজা নিষ্ঠাভরে করে থাকেন। সেই পূজা ‛ধাড়া মায়ের পূজা’ নামে বিখ্যাত। স্থানীয় মানুষদের কথায়- বাগদি রাজার নাম ছিল ‛চন্দ্রনাথ ধাড়া’। তিনি মা কালীর ভক্ত ছিলেন।
তথ্যসূত্র:-
১) দরবারে আউলিয়া দাস্তানে ফুরফুরা শরীফ- শেখ মোঃ ইয়াকুব সাহেব ও মোঃ খুরশিদ আনোয়ার।
২) ফুরফুরা শরীফের ইতিবৃত্ত- মোঃ মোবারক আলী রহমানী।
৩) স্থানীয় লোককথা।

(ছবি পরিচিতি: উপরের ছবিটি ধাড়া মায়ের। বাগদি রাজার প্রজার বংশধররা সে পূজার ঐতিহ্য এখনও ধরে রেখেছেন। প্রতি বছর ফুরফুরা শরীফের উজ্জ্বল মোড়ের কাছে মন্দিরে ধুমধাম করে সে পূজা হয়। )

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here