নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ও এক কুলাঙ্গারের ধর্মবিজয়

0
525

© রাজর্ষী ব্যানার্জি

সংসার ত্যাগী বুদ্ধের মতবাদের প্রচার প্রসার ও পৃষ্ঠপোষকতা করতে গিয়ে মধ্য যুগে বৌদ্ধ নৃপতিরা স্থাপন করেছিল অসংখ্য বৌদ্ধ বিহার। কিছু কিছু বিহার পরে অবাধ জ্ঞান চর্চা করতে ধীরে ধীরে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের খোলস ছেড়ে বহু বছর আগে খ্যাতি পেয়েছিল বিশ্ব বিদ্যালয়ে রূপে। তারমধ্যে অন্যতম বিখ্যাত হলো নালন্দা| পাল রাজাদের আমলে সোমপুর, বিক্রমশীলা ও নালন্দা একই প্রশাসনের অধীনে ছিল। প্রয়োজনে এই তিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক আদান প্রদান চলতো উন্নত শিক্ষার মান বজায় রাখার জন্য। হিউয়েন সাঙ এবং ভারতীয় ইতিহাসবিদ প্রজ্ঞাবর্মণ গুপ্ত রাজা কুমারগুপ্তকে নালন্দা বিশ্ব বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা বলে উল্লেখ করে গেছেন।খনন কার্যে পাওয়া একটা সীলমোহর থেকেও এই দাবীর পক্ষে জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায়।“নালন্দা” শব্দটি এসেছে “নালম” এবং “দা” থেকে। “নালম” শব্দের অর্থ পদ্ম ফুল যা জ্ঞানের প্রতীক রূপে প্রকাশ করা হয়েছে আর “দা” দিয়ে বুঝানো হয়েছে দান করা।তার মানে “নালন্দা” শব্দের অর্থ দাঁড়ায় “জ্ঞান দানকারী”। ৪২৭ থেকে ৪৫০ খ্রীষ্টাব্দের কোন এক সময়ের মধ্যে এটি স্থাপিত হয়ে থাকবে।

নালন্দা তৎকালীন সময়ের বিশ্বে শ্রেষ্ঠ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর মধ্যে অন্যতম সেরা । যে কেউ ইচ্ছে করলেই নালন্দায় লেখা পড়ার সুযোগ পেত না। শিক্ষার্থী সত্যিই নালন্দায় লেখাপড়া করার যোগ্য কিনা তা প্রমানের জন্য প্রবেশ দ্বারে দিতে হত মৌখিক পরীক্ষা। সাফল্যের সাথে এই ভর্তি পরীক্ষায় উতরে গেলে মিলত এখানে বিদ্যা লাভের সুযোগ। পরীক্ষা মোটেই সহজ ছিল না। এতটাই কঠিন ছিল প্রতি দশ জনে মাত্র তিন জন ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারত। তৎকালীন সময়ে নালন্দায় বিদ্যা শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১০,০০০ তাদের শিক্ষাদান করতেন প্রায় আরো ২,০০০ শিক্ষক। গড়ে প্রতি ৫ জন ছাত্রের জন্য ১ জন শিক্ষক ।এই বিশ্ববিদ্যালয়টির বিশাল খরচ চালানোও যেন তেন ব্যাপার ছিল না। অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় যাতে নালন্দার প্রশাসনকে কারো উপর নির্ভরশীল হতে না হয় সেদিক বিবেচনা করে ২০০ গ্রামকে শুধু মাত্র নালন্দার ব্যয় মিটানোর জন্য উৎসর্গ করেছিলেন বিদ্যা উৎসাহী বৌদ্ধ শাসকরা। এই সব গ্রামের করের টাকা থেকেই ছাত্র ও শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় সব খরচ চলতো।

বাইরের কোন ঝামেলা যাতে শিক্ষার পরিবেশকে নষ্ট না করতে পারে সেজন্য উঁচু লাল ইটের পাঁচিল দিয়ে ঘেরা ছিল সমগ্র বিশ্ব বিদ্যালয় চত্বর। মোট কথা সমগ্র নালন্দা ছিল নিখুত পরিকল্পনায় গড়া একটি শিক্ষা স্বর্গ। বৌদ্ধ ধর্মের পাশাপাশি বেদ, বিতর্ক, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, ব্যাকরণ, সাহিত্য, গণিত, জ্যোতিষ বিদ্যা, শিল্প কলা, চিকিৎসাশাস্ত্র সহ সকল শাখায় শিক্ষা দেওয়া হত| সুদূর তিব্বত, চীন, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, পারস্য, গ্রীস তুরষ্ক থেকে ছুটে আসত বিদ্যার্থীরা। ছাত্রদের প্রয়োজনীয় বইয়ের অভাব দূর করতে এবং ভিন্ন ভিন্ন শাখার জ্ঞানের সমাবেশ ঘটাতে তৈরী করা হয়েছিল তিনটি বিশাল লাইব্রেরী। বিশ্ব বিদ্যালয় পরিচালনার দায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পালন করেছিলেন বাংলাদেশের সন্তান শীল ভদ্র। বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলার চান্দিনাতে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তার জন্ম| নালন্দার সাথে জড়িত আরেকজনের নাম না বললেই নয়, তিনি হলেন ঢাকার বিক্রমপুরে বজ্রযোগিনী গ্রামে জন্ম গ্রহণ করা অতীশ দীপঙ্কর। বর্তমানে অতীশ দীপঙ্করের বাসস্থান “নাস্তিক পন্ডিতের ভিটা” নামে পরিচিত।

শত শত বছর ধরে অবদান রেখে আসা একটি সভ্য, উন্নত জাতি তৈরীর লক্ষে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ১১৯৩ খ্রষ্টাব্দে ইসলামী ইতিহাসের অনেক ‘কুলাঙ্গার’ এর মত আর এক ‘কুলাঙ্গার’ তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী আক্রমন করে ধ্বংস করে ফেলে। সেই আক্রমনের বর্বরতা এত ভয়াবহ ছিল যে সম্পর্কে পারস্য ইতিহাসবিদ মিনহাজ তাঁর “তাবাকাতে নাসিরি” গ্রন্থে লিখেছেন :“হাজার হাজার বৌদ্ধ ভিক্ষুকে আগুনে পুড়িয়ে ও গলা কেটে হত্যা করে সেখানে ইসলাম প্রচারের চেষ্টা করেন খিলজী”, এরপর আগুন লাগিয়ে দেন লাইব্রেরীগুলোতে। লাইব্রেরীতে বইয়ের পরিমান এত বেশী ছিল যে কয়েক মাস সময় লেগেছিল সেই মহা মূল্যবান বই গুলো পুড়ে ছাই ভষ্ম হতে(জনশ্রুতি আছে ছয় মাস) খিলজী শুধু নালন্দাকে পুড়িয়ে ছাই করে নি, একই সাথে পুড়িয়ে ছাই করেছিল একটি জাতির সভ্যতা, ইতিহাস, প্রাচীন জ্ঞান বিজ্ঞানের অমূল্য বই যা থেকে আমরা জানতে পারতাম সে যুগের ভারত বর্ষের শিক্ষার কাঠামো, তৎকালীন সামাজিক-সাংষ্কৃতিক অবস্থা ও প্রাচীন জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা সম্পর্কে। এই কুলাঙ্গারের এই অপকীর্তি একটা জাতি হিসাবেও আমাদের পিছিয়ে দিয়েছে অনেক অনেক বছর।

তার ধারালো তরবারির আঘাতে ফিনকি দিয়ে ছোটা রক্ত বন্যার স্রোতে ভেসে যাওয়া নিরস্ত্র মানুষের আর্ত চিৎকারে ও জীবন্ত মানুষ পোড়া গন্ধের সাথে বাতাসে ভেসে আসা বাচঁতে চাওয়া ঝলসানো সাধারণ মানুষ গুলোর করুণ আর্তনাদে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল একটি সভ্য জাতির অগ্রযাত্রা !

খিলজীর এই পাশবিক নিষ্ঠুর বর্বরতাও পরিচিতি
পায় মুসলমানের এক ধর্ম-বিজয় হিসাবে…….

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here