অগ্নি মন্ত্র

0
638

© মিতালী মুখার্জি


মাত্র কিছুদিন আগের কথা । শ্রীময়ী তাঁর নুতন অফিসের বস আদির কথা জানাল বাবা মাকে । এত তাড়াতাড়ি সিদ্ধ্বান্ত নেওয়ায় একটু অবাকই হলেন ওর বাবা মা । এতদিন বলে বলে রাজি করাতে পারেননি মেয়েকে বিয়ের জন্য । এই তো কদিন হল এই নতুন ব্যাঙ্কে বদলী হয়ে এসেছে শ্রী । যাই হোক মেয়ের মন ঘুরেছে এতেই খুশি বাবা-মা।

বিয়ে হল রেজিস্ট্রি করে। আদির এক বন্ধুর মাধ্যমে। বাবা মা-র বদলে দু পক্ষেই ছিল দুজন করে বন্ধু। শ্রীর বাড়ি থেকে আপত্তি ওঠানয় আদির বক্তব্য ছিল তাহলে বিয়ে পিছিয়ে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। সেদিন রাতেই হনিমুনে যাওয়ার টিকিট কাটা ছিল। ক’জন বন্ধু মিলে একটা হোটেলে পার্টির পর ওরা চলে গেল হনিমুনে নৈনিতাল ।

একসপ্তাহ কাটিয়ে আদি শ্রী কে নিয়ে ফিরল নিজের গ্রামের বাড়ি। আর তখনই মাথায় বাজ ভেঙে পড়ল উচ্চ শিক্ষিত শ্রীময়ীর। আদির আসল নাম শেখ আদিল। এর আগে তার দুটো বিয়ে আছে দুটোই বড়লোকের হিন্দুর মেয়ে। প্রথম বউ বিয়ের একমাসের মধ্যেই মারা যায় (???) এবং দ্বিতীয় বউ পুলিসের সাহায্য নিয়ে ফিরে যায় বাবা মা’র কাছে। হিন্দুঘরে লালিত রোজ দুবেলা পূজাপাঠ করা ঘরের মেয়ে ঐ পরিবেশ দেখে নিজের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। চারিদিকে মাংস আর পেঁয়াজ রসুনের দমচাপা গন্ধ আর তেমনি অশ্লীল এদের হাবভাব আর কথাবার্তা। প্রথম দিনেই সে বুঝতে পারল কী ভীষণ বিপদে পড়েছে সে। নিজেকে চড় মারতে ইচ্ছে করছে এত শিক্ষিত সংস্কারী হয়েও এত বড় ভুল ও কি করে করল! । বাইরের দরজায় তালা । তার ফোন নিয়ে নেওয়া হয়েছে । পরের দিন রাতেই তার ঘরে ঢুকল আদিলের এক বন্ধু বা দাদা । শ্রী রাজী না হওয়ায় তাকে বেঁধে দুজনে মিলে ভোগ করলো সেই রাতে । পরের দিন আরো কয়েকজন । এইভাবে কাটল চারদিন । পাঁচদিনের দিন আর শ্রী এর উঠে দাড়াবার ক্ষমতা ছিলনা । ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে মৃতপ্রায় শ্রী পড়েছিল ঘরের কোনে। সেদিন কোন উৎসব ছিল ।

সকাল থেকেই সবাই তৈরি হয়ে মসজিদ চলে গেল। ঘরে রইল আদিলের চাচি। সে খাবার নিয়ে এসে শ্রী এর অবস্হা দেখে কেঁদে ফেলল। সে জানাল তার সাথেও ঘটেছে একই ঘটনা। হিন্দুর মেয়ে প্রেমের ফাঁদে পড়ে আজ এখানে । অনেকবার পালাবার চেষ্টা করেও ফল হয়নি। ওরা ওর হাত পা ভেঙে দিয়েছিল। তারপর থেকে ওদের একটাই কাজ প্রতিবছর ওর পেটে বীজ ঢুকিয়ে দেওয়া আর সারাদিন গাধার মতো খাটানো । ওর আর ও তিনজন সতীন ছিল । এখন আছে একজন । বাকিরা মরে বেঁচে গেছে । মেয়েটি তার ভরা পেট নিয়ে এক দুঃসাহসীর কাজ করলো। সে তালা খুলে দিল সদর দরজার। বলল যত শিঘ্র সম্ভব পালাও । আমি পারিনি । তুমাকে বাঁচাতে পারলে আমি শান্তি পাবো । শ্রী কোনরকমে উঠে এল বাইরে । পাশেই মাটির উনুনে কাঠের আগুনে কি রান্না হচ্ছে । যেতে গিয়েও থমকে দাড়াল শ্রী । পাশেই কেরোসিনের জার । একবার সে তাকাল বৌটির দিকে । তার মুখে প্রশ্রয়ের হাসি ।

দুই অগ্নি কন্যা দৌড়াচ্ছে মেঠো রাস্তা দিয়ে জলা জঙ্গলের পথ ধরে । আর পিছনে দাউ দাউ করে জ্বলছে পুরো গ্রাম । গায়ে গায়ে ঘর এর এক চাল থেকে আর এক চালে ছড়িয়ে পড়ছে আগুন । বাতাসে বাঁশ ফাটার শব্দ আর পোড়া গন্ধ । দূর থেকে ভেসে আসছে শয়তানদের হাহাকার ছাপিয়ে ঢাকের আওয়াজ। দ্রিম দ্রিম করে বাজছে যুদ্ধ জয়ের দামামা ওদের মনের মধ্যেও ।।অমল শুভ্র কাশফুলের বন দোলা লাগিয়ে ওদের বরণ করে নিচ্ছে। আগমনীর গানের সুর ভেসে আসছে হিন্দু গ্রাম থেকে। ওরা দুজনে দৌড়াচ্ছে এক প্রকান্ড অগ্নিময় চালচিত্র পিছনে ফেলে এক নতুন মুক্তির দিকে। দুই দেবীকন্যা। আকাশ হাসছে মধুর হাসি । আজ সেই ফুটপাথের নাম না জানা মেয়েটা , হাজার ময়না সবার প্রতিশোধ নিল শ্রীময়ী। অসুর নিধন যজ্ঞের চন্ডিকা । এক কঠিন প্রতিজ্ঞা ওর চোখেমুখে । ক্ষতবিক্ষত শরীর সোজা করে সমস্ত মন কে অস্ত্র বানিয়ে যুদ্ধে নেমেছে সে । এই যুদ্ধ নারীর সম্মানের, একটি ম্রিয়মান জাতির উঠে দাড়াবার, আর হাজার হাজার শ্রীময়ীদের বাঁচানর যুদ্ধ। ওদের শিকার সমস্ত নারীদের জয়যাত্রার যুদ্ধ। এক অনাবিল আলোয় দৃপ্ত শ্রী র কপাল যেন তৃতীয় নেত্রের মত উদ্ভাসিত । হাজার নারীর সম্মান রক্ষার শপথ দু’ চোখে নিয়ে পা বাড়াল সে আর একটি অসহায় নারীর হাত ধরে । দূরের গ্রাম থেকে ভেসে আসছে আগমনীর সুর
“জাগো দুর্গা ……

        
We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.