সংখ্যালঘু- অযৌক্তিক সংজ্ঞার পরিবর্তন চাই

0
398

© তপন ঘোষ

ভারতের সংবিধানে সংখ্যালঘুদের জন্য বিভিন্ন প্রকারের সুযােগ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তাদের জন্য সংবিধানের ২৫ ও ২৬ নং ধারা এবং ৩০ ও ৩০ ( এ ) নং ধারায় বিভিন্ন রক্ষাকবচও দেওয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য খুবই মহৎ , যাতে সংখ্যালঘুদেরকে কোনরকম অত্যাচার বা নিপীড়নের শিকার হতে না হয়। কিন্তু সংখ্যালঘু কারা সেকথা স্পষ্টভাবে বলা হয়নি। সংখ্যালঘু বিভিন্ন ধরণের হয় । ধর্মীয় সংখ্যালঘু , ভাষাগত সংখ্যালঘু , জাতিগত ( Ethnic ) সংখ্যালঘু প্রভৃতি। যেমন বিহার ও ঝাড়খণ্ডে বাঙালিরা ভাষাগত সংখ্যালঘু , আবার পশ্চিমবঙ্গে নেপালি ও হিন্দিভাষীরা ভাষাগত সংখ্যালঘু। 
 

কিন্তু মজার ঘটনা হল ধর্মীয় সংখ্যালঘুর ক্ষেত্রে। সংবিধানে স্পষ্ট করে কিছু বলা না থাকলেও সেই ১৯৪৭ সাল থেকে ধরেই নেওয়া হচ্ছে যে ভারতে মুসলমান ও খ্রীষ্টানরা সংখ্যালঘু এবং হিন্দুরা সংখ্যাগুরু। সুতরাং সংখ্যালঘুদের জন্য যাবতীয় সুযােগসুবিধা ও বিশেষ অধিকার পাবে মুসলমান ও খ্রীষ্টানরা এবং তার দায় বহন করতে হবে হিন্দুদেরকে, কারণ হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। যেমন হিন্দুদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যােগ দিতে ট্যাক্স দিতে হবে , ট্রেনভাড়ায় সারচার্জ দিতে হবে। আর সেই টাকা দিয়ে মুসলমানের হজ যাত্রায় বছরে ১৫০ কোটি টাকা , মাথাপিছু ২২ হাজার টাকা ভর্তুকি দেওয়া হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার অপরাধে হিন্দুর মন্দির অধিগ্রহণ করে তার রােজগার সরকার নিজ পকেটে পুরে সেই টাকায় গীর্জার সংস্কার ও ইমামদের মাইনে দেওয়া হবে। আইনের গঠনে ও সরকারের আচরণে এ দেশের হিন্দুদের একথা মনে হতে বাধ্য যে এদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে জন্মগ্রহণ করাটা অভিশাপ। সংখ্যালঘুদের জন্য শুধু আর্থিক দানছত্রই নয় , তাদেরকে এমন বিশেষ বিশেষ অধিকার দেওয়া হয়েছে যে এদেশের প্রায় সব সম্প্রদায়ই নিজেদেরকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে চিহ্নিত করতে চায় । এই প্রবণতা এতদূর বৃদ্ধি পেয়েছে যে , স্বামী বিবেকানন্দ যিনি সগর্বে ঘােষণা করেছিলেন — ‘ আমি নিজেকে হিন্দু বলিতে গর্ব অনুভব করি ’ , তাঁর প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মিশনও কলকাতা হাইকোর্টে আবেদন করেছিল যে তাদেরকে সংখ্যালঘুর স্বীকৃতি দেওয়া হােক । সুপ্রীম কোর্টের বিচারে তাদের সেই আবেদন নাকচ হয়ে যায় । না হলে এতদিনে রামকৃষ্ণ মিশন অহিন্দু হয়ে যেত । 
 

সংখ্যালঘুদের জন্য এই সকল বিশেষ সুযােগসুবিধা ও বিশেষ অধিকার — তাদের রক্ষা ও তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখার জন্য । এতে কোন অন্যায় নেই , এটাই মানবিক । বিশ্বের যে কোন সভ্য দেশই ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের দিকে এটুকু নজর রাখে । কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে এখন একটু রিয়ালিটি চেক করা যাক । নাগাল্যাণ্ড রাজ্যে খ্রীষ্টানরা জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ । হিন্দু ৫ শতাংশ , অন্যান্য ৫ শতাংশ । এই নাগাল্যাণ্ডে কি খ্রীষ্টানদের ধর্মীয় অধিকার ও স্বাধীনতা কোনভাবে বিপন্ন হওয়ার আশংকা আছে ? স্পষ্টতই নেই । বরং সেখানে যারা হিন্দু বা অখ্রীষ্টান , তাদেরই ধর্মীয় স্বাধীনতা বিপন্ন হওয়ার আশংকা । তবু সেখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য নির্ধারিত সমস্ত সুযােগ সুবিধা ও অধিকার খ্রীষ্টানরাই পাবে , হিন্দুরা ও অন্যান্যরা পাবে না । অনুরূপভাবে মিজোরামে খ্রীষ্টানরা ৮৭ শতাংশ । তবুও খ্রীষ্টানরাই সেখানে সংখ্যালঘু , আর হিন্দুরা সংখ্যাগুরু । অর্থাৎ আমাদের দেশের সংবিধান অঙ্ককেও ফেল করিয়ে দিয়েছে । জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যে মুসলিমরা ৭১ শতাংশ , হিন্দুরা ২৭ শতাংশ , বৌদ্ধ ১ শতাংশ । তবু সেখানে মুসলিমরাই সংখ্যালঘুর মর্যাদাপ্রাপ্ত । হিন্দু ও বৌদ্ধরা দুয়ােরাণীর সন্তান ।
   

শুধু এই রাজ্যওয়ারী চিত্রটাই সব নয় । আসাম রাজ্যে এখনও হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ । কিন্তু সেখানে ধুবড়ি জেলায় মুসলমানরা ৭৪ শতাংশ , হিন্দুরা ২৫ শতাংশ । বিহারের কিষণগঞ্জে মুসলিমরা ৬৮ শতাংশ , হিন্দু ৩১ শতাংশ । এই জেলাগুলিতে যে কেউ গেলেই দেখতে পাবেন যে কাদের ধর্মীয় অধিকার সেখানে বিপন্ন । সকলেই জানে যে হিন্দুদের ধর্মীয় অধিকার , এমনকি অস্তিত্ব রক্ষা করাটাই সেখানে কত কঠিন । তবু সেখানে সংখ্যালঘুর যাবতীয় সুযােগ সুবিধার অধিকারী মুসলিমরা , হিন্দুরা নয় । 
   

জেলাভিত্তিক হিসাবেই এই বৈপরীত্যের শেষ নয় । উদাহরণ নেওয়া যাক পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার । এই জেলায় হিন্দুরা এখনও সংখ্যাগরিষ্ঠ । কিন্তু এই জেলার ভাঙ্গড় ১ ও ২ নং ব্লকে মুসলিমরা ৬৭ শতাংশ , হিন্দু ৩৩ শতাংশ । এই ব্লকের বহু গ্রামে হিন্দুরা প্রকাশ্যে পূজা অর্চনা করতে পারে না । হিন্দু মেয়েরা যখন তখন অপহৃত ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয় । বহু গ্রামে তাদেরকে ( শুধু হিন্দুদেরকে ) গুণ্ডা ট্যাক্স দিয়ে বাঁচতে হয়। বহু হিন্দু এলাকা ছেড়ে পালাচ্ছে । তবু আমাদের সংবিধান ও সরকারের নীতি অনুযায়ী সেখানে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ , সুতরাং কোনরকম নিরাপত্তা ও রক্ষাকবচের অধিকারী নয়। 
 

এইভাবে আজ পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে ১০ টি জেলাতে হিন্দুরা সংখ্যালঘু হয়েও কোনরকম সুরক্ষার দাবী করতে পারে না । আর যদি ব্লকের হিসাব করা হয় , তাহলে শুধু এই দুটি রাজ্যে ১২০ টিরও অধিক ব্লকে হিন্দুরা সংখ্যালঘু , তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা বিপন্ন । সংবিধানের এই অদ্ভুত বিধান এবং সরকারের আচরণ আসাম , পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের একাংশকে দ্রুত ইসলামীকরণের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে । আর উত্তর পূর্বাঞ্চলের মেঘালয় , মিজোরাম ও নাগাল্যান্ডের খ্রীষ্টানীকরণ তাে হয়েই গিয়েছে । এখন মণিপুর , ত্রিপুরা ও অরুণাচল প্রদেশের খ্রীষ্টানীকরণ দ্রুত চলছে । জম্মু – কাশ্মীর রাজ্যের তিনটি ক্ষেত্র ও কাশ্মীর উপত্যকা , জম্মু এবং লাদাখ । এর মধ্যে জম্মু হিন্দুপ্রধান । কিন্তু সেই জম্মুর ৬ টি জেলার মধ্যেও ৩ টিতে হিন্দুরা যথাক্রমে ৪০ শতাংশ ( ডােডা ) , ৩৫ শতাংশ ( রাজৌরী ) ও ৮ শতাংশ ( পুঞ্চ ) । এই তিনটি জেলাই দ্রুত হিন্দুশূন্য হয়ে যাচ্ছে । তবু তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ — কোন নিরাপত্তা কবচের অধিকারী নয় । 
 

সারা দেশের এই একই চিত্র । তাই আমরা হিন্দু সংহতির পক্ষ থেকে দাবী করছি — সংবিধানের এই বৈপরীত্য সমাপ্ত করা হােক । ধর্মীয় সংখ্যালঘুর সংজ্ঞা ও অবধারণা পরিবর্তন করা হােক । সংখ্যালঘুর সংজ্ঞাকে যুক্তিসঙ্গত ও যুক্তিসম্মত করা হােক । 
  আমাদের দাবী –সারা দেশে জাতীয় ভিত্তিতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্ধারণের অযৌক্তিক প্রথা বাতিল করা হােক । সারা দেশে সংখ্যালঘু নির্ধারণ করতে হবে ব্লক ভিত্তিতে । অর্থাৎ প্রতিটি জেলায় যে ব্লকে যে সম্প্রদায় সংখ্যালঘু , সেই সম্প্রদায়কে সংবিধান প্রদত্ত অধিকার , সুযােগ সুবিধা ও রক্ষাকবচ দিতে হবে । নাহলে তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা / অধিকার ও অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়বে । ব্লকভিত্তিক সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু নির্ধারণের এই দাবী সম্পূর্ণ যুক্তিপূর্ণ ও বাস্তববাচিত । অন্যথায় ভারতবর্ষ তথা হিন্দুস্থানে হিন্দু ধর্মের অস্তিত্ব লােপ পাবে । আমাদের দাবী , অবিলম্বে সংবিধান সংশােধন করে সংখ্যালঘুর সংজ্ঞা পরিবর্তন করে সংখ্যালঘু তােষণের ভােট রাজনীতির ধ্বংসাত্মক খেলা বন্ধ করা হােক । আমাদের এই দাবীকে সর্বস্তরে সমর্থন করে দেশকে বাঁচান — এই আমাদের আবেদন ।

(লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় স্বদেশ সংহতি সংবাদের অক্টোবর ২০০৯ সংখ্যায়।)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.