সংগঠনই কী শক্তি? সংঘের প্রার্থনা কী বলে?

1
11


© তপন ঘোষ
   অনেকেই বলেন , মুসলমানরা খুব সংগঠিত , আর হিন্দুরা অত্যন্ত অসংগঠিত । তাই হিন্দুরা সংখ্যায় অনেক বেশী হলেও মুসলিমের হাতে মার খায় । হিন্দুদের প্রধান রােগ অসংগঠিততা । এই রােগ দূর হলেই হিন্দুরা শক্তিশালী হবে ; আত্মসম্মান , আত্মমর্যাদা ফিরে পাবে । সত্যিই কি তাই ? একটু বিচার করা যাক । 
 

‘ সংগঠন ’ জিনিসটা তাে একটা দেবত্বের গুণসূচক বা আধ্যাত্মিক বস্তু । আমাদের শাস্ত্রে ‘ সংগচ্ছধ্বম্ ’ ইত্যাদি শ্লোক তাে আছেই । তার থেকেও বড়কথা হল , আমাদেরও পৃথিবীর সর্বোচ্চ দর্শন অদ্বৈত । তারই বড়বহিঃপ্রকাশ হল সংগঠন । বহুর মধ্যে একের উপলব্ধি অদ্বৈত । সংগঠনেও সকলের মধ্যে একেউপলব্ধিকিছুটা হয় । আমাদের ধর্মের সর্বোচ্চ রূপ এই একত্ব । আধ্যাত্মিকতারও চূড়ান্ত পর্যায় এই একত্ব । তাহলে মুসলমানরা হিন্দুদের থেকেও বেশী আধ্যাত্মিক , বেশী ধার্মিক , বেশী অদ্বৈতবাদী ! অর্থাৎ তারা হিন্দুর থেকে শ্রেষ্ঠ ? না , তা হতে পারে না । এই তত্ত্বে কোথাও ভূল আছে । দেখা যাক সেই ভুলটা কোথায় । 
 

যেখানে একশ শতাংশ হিন্দুর বাস , সেখানে নিজেদের মধ্যে লড়াই ঝগড়া মারামারি বেশী , না যেখানে একশ শতাংশ মুসলমানের বাস সেখানে বেশী ? নিশ্চয় দ্বিতীয়টা । তাহলে মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য কোথায় ? ওরা শুধু হিন্দুকে মারা আর লুট করার সময় এক । অর্থাৎ এটা প্রকৃত ঐক্য নয় । এটা শুধু আক্রমণ ও লুট করার ঐক্য । প্রকৃত ঐক্য হলে যেখানে শুধু মুসলমান আছে সেখানেও থাকত । আরও দুটি উদাহরণ । দেশভাগের পর পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অনেক হিন্দু রিফিউজী ভারতে এসেছে । এপারের স্থানীয় ও ওপারের রিফিউজীদের মধ্যে ঈর্ষা , দ্বন্দ্ব , মনােমালিন্য , প্রতিযােগিতা আছে । কিন্তু রক্তক্ষয়ী লড়াই কোথাও হয়নি । আর ভারত থেকে পাকিস্তানে চলে যাওয়া মুসলমানরা , যাদেরকে মােহাজির বলে , আজও ওখানের মুসলমানের সঙ্গে মিশে যেতে পারেনি । করাচীতে এখনও তাদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী লড়াই হয় । এটা নিশ্চয় ঐক্যের নমুনা নয় । ৯ / ১১ – র পর আমেরিকা প্রথমে আফগানিস্তান ও পরে ইরাকের উপর আক্রমণ করল । বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের হিরাে সাদ্দাম হােসেনকে ফাঁসি দিল । বিশ্বে ৫৭ টি মুসলমান শাসিত রাষ্ট্র আছে । আফগানিস্তান বা ইরাক বা সাদ্দামকে বাঁচাতে এগিয়ে এল না কোনাে দেশ । এখন গাজা পট্টিতে ইজরায়েলের আক্রমণে ৯০০ – র বেশী প্যালেস্টিনীয় মুসলিম নিহত হয়েছে । তাদের রক্ষায় এগিয়ে আসেনি কোন মুসলিম দেশ । এই কি ঐক্যের নমুনা ? 
 

সুতরাং , মুসলমানরা হিন্দুর থেকে বেশী সংগঠিত , এটা মেনে নেওয়া যায় না । তাহলে হিন্দু মার খায় কেন ? আমার মতে , সেটা সংগঠনের অভাবে নয় । অন্য কোন কিছুর অভাবে । বিশ্বের বৃহত্তম হিন্দু সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ হিন্দুদের মধ্যে সংগঠনের প্রয়ােজনীয়তার সম্ভবতঃ সব থেকে বড় প্রবক্তা । সেই সংঘের যে প্রার্থনা আছে সংস্কৃত ভাষায় , তাতে সংগঠনের প্রয়ােজনের কথা কিন্তু খুব বেশী গুরুত্ব দিয়ে বলা হয় নি । এই প্রার্থনায় নিজেদের পরিচয় দিতে গিয়ে মাত্র একবার ‘ আমরা’শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে — বয়ং রাষ্ট্রাঙ্গভূতা । এই ‘ আমরা’শব্দটির মধ্যে হয়ত কিছুটা সংগঠন খুঁজে পেতে পারেন । তারপর শেষের দিকে ১৭ নম্বর লাইনে ‘ সংহতা কাৰ্য্যশক্তির ’ শব্দদুটির মধ্যে সংঘের কার্যের স্বরূপ সম্বন্ধে বলা হয়েছে যে এটা সংগঠিত কার্যশক্তি । অর্থাৎ , কার্যশক্তির পরিচয় দিতে গিয়ে তার বিশেষণরূপে মাত্র এই ‘ সংগঠিত ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে । ২০ লাইনের সংঘ প্রার্থনায় আর কোথাও সংগঠনের কথা বলা হয় নি । বরং , কার্যশক্তির সঙ্গে বিশেষণ আকারে যেখানে ‘ সংগঠিত ’ ( সংহতা ) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে , ঠিক তার আগেই আর একটি বিশেষণ ব্যবহার করা হয়েছে । ‘ বিজেত্রী ’ , অর্থাৎ বিজয়শালিনী বা বিজিগীষু । অর্থাৎ সংঘকার্যের দুটি স্বরূপ , বিজিগীষু ও সংগঠিত । এছাড়া উক্ত প্রার্থনায় একাধিকবার দেশভক্তি ও দেশের প্রতি সমর্পণের কথা বলা হয়েছে । অনেক বেশী গুরুত্ব দিয়ে  ‘শক্তি’ চাওয়া হয়েছে যা হবে বিশ্বের অজেয় । শুদ্ধ চরিত্র ও জ্ঞান চাওয়া হয়েছে , এবং কেন চাওয়া হয়েছে । তা ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে । বেশ গুরুত্ব দিয়ে অক্ষয় আদর্শনিষ্ঠা চাওয়া হয়েছে । তার থেকেও বেশী গুরুত্ব দিয়ে সাহস ( বীরব্রত ) চাওয়া হয়েছে । সেখানে বলা হয়েছে যে ইহলােক ও পরলােকে উৎকর্ষপ্রাপ্তি এবং মােক্ষলাভ — এ তিনটের জন্যই একমাত্র উপায় উগ্র বীরব্রত বা চরম সাহস । 
 

এখন এই সমস্তগুলােকে ছেড়ে দিয়ে , অর্থাৎ , শক্তি , বুদ্ধি ( জ্ঞান ) , চরিত্র , সাহস , আদর্শনিষ্ঠা , বিজিগীষা — এগুলােকে বাদ দিয়ে শুধু ‘ সংগঠন সংগঠন ’ জপ করা — অন্ততঃ সংঘ প্রার্থনার প্রতিপাদ্য বিষয় নয়।সংঘ প্রার্থনার text সংগঠনের প্রয়ােজনীয়তার কথা সম্ভবতঃ একবারও বলেনি । সংঘকার্যের স্বরূপের বিশেষণ রূপে মাত্র একবার উল্লেখ করেছে । অথচ অন্য গুণগুলাে সরাসরি ভগবানের কাছে চাওয়া হয়েছে । 

  সুতরাং , হিন্দু সমাজের মার খাওয়ার কারণ শুধুমাত্র সংগঠনের অভাব নয় । প্রার্থনায় উল্লেখিত উপরােক্ত গুণগুলি যদি আমরা অর্জন না করি , তাহলে শুধু সংগঠন করে আমরা হিন্দুসমাজকে মার খাওয়া , অপমানিত হওয়া , বিলুপ্ত হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে পারব না । হিন্দু সমাজের শুধু সংগঠনেরই প্রয়ােজন আছে , আর কিছুর প্রয়ােজন নেই — এই ধারণা ঠিক নয় । সংগঠন তাে হিন্দু সমাজের মধ্যে অনেকটা আছেই । এর প্রমাণ আমরা পাই , ইংরেজ অল্প চেষ্টাতেই যেমন হিন্দু – মুসলমান ফাকটা ( যা আগে থেকেই ছিল ) অনেকটা বাড়িয়ে দিতে পারল , অনেক চেষ্টা করেও হিন্দু সমাজের ভিতরে ভাঙন ধরাতে পারল না । হিন্দু সমাজের মধ্যে নিজস্ব অন্তর্নিহিত ঐক্য না থাকলে এটা সম্ভব হত কি ? 

  তাই হিন্দুসমাজের হৃত সম্মান ফিরে পেতে , পায়ের নীচের মাটি বাঁচাতে ( কাশ্মীরে বাঁচেনি ) , ধর্মস্থান ও মা – বােনের সম্মান রক্ষা করতে সংগঠনের সাথে সাথে আরও বেশী করে চাই শক্তি , সাহস , উদ্যম , তৎপরতা , জ্ঞান , বুদ্ধি , চরিত্র ও দেশভক্তি । অনেকে বলবেন , আরে — শক্তি মানেই তাে সংগঠন , আর সংগঠন মানেই তাে শক্তি । না , আমরা ভিন্নমত পােষণ করি । প্রাণীজগতে বাঘ বা সিংহের শক্তি তাদের দলবদ্ধতার উপর নির্ভর করে না । আবার ছাগল বা ভেড়ার শক্তিও তাদের দলবদ্ধতার উপর নির্ভর করে না । ২০০ ভেড়ার একটি পাল থেকে যদি একটা নেকড়ে একটা ভেড়ার টুটি ধরে টেনে নিয়ে যায় , তাহলেও সংঘবদ্ধ ১৯৯ টা ভেড়া তাকে বাঁচাতে তাে পারবেই না , এমনকি বাঁচাতে যাবেও না । সুতরাং , বাঘ সিংহ দলবদ্ধ হয়ে না থাকলেও তার শক্তির অভাব হয় না , আবার ছাগল ভেড়া দলবদ্ধ হয়ে থাকলেও তাদের শক্তি নির্মাণ হয় না । তাই সংঘ প্রতিষ্ঠাতা ডাক্তার হেডগেওয়ারের হাতে যে একটা লাঠি থাকত , তার মাথায় একটা পিতলের গর্জায়মান সিংহ ও তার নীচে ‘ স্বয়মেব মৃগেন্দ্রতা ’ কথা দুটি লেখা থাকত । ডাক্তারজীর সারা জীবনকে দেখলে তাকে এক সিংহসদৃশ পুরুষ বলেই বােঝা যায় । ওই ‘ স্বয়মেব মৃগেন্দ্রতা ’ ই ডাক্তারজীর স্বরূপ , তাঁর জীবনের বাণী । হিন্দুসমাজের মধ্যে তিনি সিংহের মত পরাক্রম ও বিজিগীষু মনােবৃত্তি তৈরী করতে চেয়েছিলেন । তাই সংঘ প্রার্থনায় সংগঠন বা দলবদ্ধতার থেকেও শক্তি , সাহস ইত্যাদির বেশী গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে । আজ ব্যক্তি হিন্দুকে এবং সমূহ হিন্দুকে শক্তি , সাহস , জ্ঞান , উদ্যম ও তৎপরতারও চর্চা বা অভ্যাস করতে হবে । এগুলােকে এড়ানাের চেষ্টা আত্মপ্রবঞ্চনা এবং সত্য ও বাস্তব অবস্থা থেকে মুখ ঘুরিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই নয় । তাই এই গুণগুলিকে অর্জন করতেই হবে । নানা পন্থা বিদ্যতে অয়নায় ।

(লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় স্বদেশ সংহতি সংবাদ পত্রিকায়। জানুয়ারি, ২০০৯)


We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here