শাহজাহান নয়, দিল্লীর লাল কেল্লার নির্মাণ করেছিলেন অনঙ্গপাল তোমার

( মূল লেখাটি ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হয় 28 মার্চ 2014 খ্রিস্টাব্দে www.booksfact. com নামক সাইটে।)

অনুবাদক:
শ্রী সূর্য শেখর হালদার

ভারতের মুঘল শাসকেরা ইতিহাসকে বিকৃত করেছে এবং সবাইকে বিশ্বাস করিয়েছে যে শাহজাহান লাল কেল্লা নামক দুর্গটি নিমার্ণ করিয়েছেন। ইতিহাসে প্রচলিত আছে যে তিনি 1639 থেকে 1648 খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে এই দুর্গটি নির্মাণ করান এবং এই দুর্গ নির্মাণের মুখ্য কারিগর ছিলেন ওস্তাদ আহমেদ লাহৌরি , কিন্তু আসলে তারা যে কাজ করেছিল, সেটা ছিল স্বল্প কিছু পরিবর্তনের কাজ। আসল দুর্গটি কিন্তু তার বহু আগে থেকেই এমনকি মুঘলদের ভারতে প্রবেশের আগে থেকেই বর্তমান ছিল।

লাল কেল্লার অভ্যন্তরে একটি পাথরের ফলক আছে যাতে উল্লিখিত আছে শাহজাহান (যিনি 1628 খ্রিস্টাব্দ থেকে 1648 খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালে রাজত্ব করেন) 1639 – 1648 খ্রিস্টাব্দ সময়কালের মধ্যে এই দুর্গ নির্মাণ করান। এই ফলকটি আধুনিক প্রত্নতত্ত্ববিদগণ নির্মাণ করান। কিন্তু অক্সফোর্ডের Bodleian গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে যে শাহজাহান একজন পার্সিয়ান দূত কে দুর্গের মধ্যে দেওয়ান-ই-আম এর মধ্যে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন। সময়টা হল 1628 খ্রিষ্টাব্দ। ছবির নীচে সাল উল্লেখ করা আছে। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য 1628 খ্রিষ্টাব্দ হল শাহজাহানের রাজ্যভিষেক এর বৎসর। সুতরাং এই ছবি প্রমাণ করে 1628 খ্রিষ্টাব্দে দুর্গটির অস্তিত্ব ছিল। অক্সফোর্ডের Bodleian গ্রন্থাগারে সুরক্ষিত এই চিত্রটি weekly of India নামক পত্রিকাতে প্রকাশিত হয় !(page no 132: 2 march : 1971)। যেহেতু শাহজাহান 1628 খ্রিস্টাব্দে সিংহাসন আরোহন করেন তাই এই চিত্র প্রমাণ করে শাহজাহান এই দুর্গ নির্মাণ করান নি।

লালকেল্লার খাস মহলে (রাজার প্রধান কক্ষে) দেখা পাওয়া যাবে একটি রাজকীয় প্রতীকের। এই প্রতীক বা চিহ্ন হল লালকেল্লা যিনি নির্মাণ করান, সেই রাজা অনঙ্গ পালের। এই প্রতীকটি কিরূপ? এই প্রতীকে রয়েছে দুটি তরবারি যেগুলির হাতল একে অপরের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে। আর তরবারি দুটির বাঁকানো ফলা উপর দিকে উঠে গেছে (একটি দক্ষিণ দিকে, অপরটি বাম দিকে) তরবারি দুটির সংযুক্ত হাতলের উপর রয়েছে সনাতন ধর্মের পবিত্র প্রতীক – কলস, একটি পদ্মের কুঁড়ি এবং সবচেয়ে উপরে ঝুলছে একজোড়া তুলা বা দাঁড়িপাল্লা যা সমতা বা ন্যায় বিচারের প্রতীক। এই খোদাইকৃত প্রতীক গুলির চারপাশে রয়েছে খোদাইকৃত সূর্য যা প্রাচীন ভারতের সূর্যবংশীয় রাজাদের পবিত্র চিহ্ন। আবার তরবারি দুটির অগ্রভাগের নিকট রয়েছে দুটি শঙ্খ যেটিকে সনাতন ঐতিহ্যে শুভ বা পবিত্র বলে মানা হয়। অপেক্ষাকৃত বড় শঙ্খ দেখা যায় নিচে বাম দিকে ও দক্ষিণ দিকে।

এই সনাতন রাজকীয় প্রতীক আসলে দিল্লির লালকেল্লা নির্মাণকারী, সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী এক রাজার প্রতীক। এটি এখনও লালকেল্লার খাস মহলে বর্তমান আছে। কিন্তু দৃশ্যমান এই প্রমাণকে ইচ্ছা করে ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে। একে অপরের সঙ্গে জুড়ে থাকা দুটি বিপরীত দিকগামী তরবারির হাতল এবং বক্রভাবে উত্থিত দুটি তরবারির ক্রমশ শুরু হতে থাকা ফলাকে ইসলামের পবিত্র চিহ্ন – চন্দ্ররেখা বা অর্ধচন্দ্র বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই ব্যাখ্যা করেছেন স্থানীয়, অজ্ঞ গাইডবৃন্দ, প্রত্নতত্ত্ববিদগণ এবং ঐতিহাসিকগণ। সনাতন ধর্মের পবিত্র চিহ্ন কলসকে লক্ষ্যই করা হয়নি। কলসের উপর প্রতিস্থাপিত পদ্মকুঁড়ি রাজকীয় সমৃদ্ধির প্রতীক। সেটাও দৃষ্টির অন্তরালে রয়ে গেছে । একজোড়া তুলা যা নিরপেক্ষ বিচারের প্রতীক, সেটারও কোন ব্যাখ্যা নেই।

আবার লাল কেল্লার একটি খিলানের ছবিতে দেখা যাচ্ছে যে সনাতনীদের কাছে পবিত্র জলন্ত সূর্য দেবের প্রতীক খোদিত রয়েছে ওই খিলানে। সূর্য ইসলামের প্রতীক নয়: বরং সূর্যবংশীয় ভারতীয় রাজাদের প্রতীক। খিলানে সূর্যের পাশেই খোদিত হয়েছে সনাতন ধর্মের পবিত্র শব্দ – ‘ওঁ্ ‘ । এর নিচেই খোদিত হয়েছে সনাতনী রাজার রাজকীয় প্রতীক। এই কারুকার্য বুঝিয়ে দেয় ‘লালকেল্লা শাহজাহানের নির্মাণ’- এই দাবি কতটা শূন্যগর্ভ। মুঘলরা এই প্রতীক গুলির মধ্যে মধ্যে উর্দু অক্ষর খোদাই করেছে।

লাল কেল্লার দিল্লি দরওয়াজার দুপাশে দুটি বৃহৎ হাতির মূর্তিও সন্দেহাতীতভাবে সনাতন ধর্মের ঐতিহ্য বহন করছে। এই মূর্তি দুটি বুঝিয়ে দেয় যে লাল কেল্লা নির্মাণ করান রাজা অনঙ্গ পাল 1060 খ্রিস্টাব্দে: কখনোই শাহজাহান নন যেটা ভুলক্রমে বিশ্বাস করা হয়ে থাকে। আমরা যদি গোয়ালিয়র, উদয়পুর কোটা এইসব স্থানের দুর্গ গুলিকে পরীক্ষা করি, তাহলে দেখব এইসব দুর্গের দ্বারেও হাতির মূর্তি নির্মিত আছে । বাড়ি, দুর্গ, প্রাসাদ ও মন্দিরকে হাতির মূর্তির দ্বারা সুসজ্জিত করা সুপ্রাচীন সনাতন সংস্কৃতির অঙ্গ । সনাতন ধর্মালম্বীদের কাছে হাতি শক্তি, বীরত্ব ও সমৃদ্ধির প্রতীক।

আবার লালকেল্লার খাস মহলের অন্দরে প্রতিটা দরজায় হাতির পিঠে উপবিষ্ট এক মাহুতের মূর্তি খোদাই করা আছে। এটা সম্পূর্ণরূপে একটি সনাতন সংস্কারের অঙ্গ। অন্য বৃহৎ আকৃতির প্রস্তর নির্মিত যেসব হাতির মূর্তি সঙ্গীত মহলের দরজাকে সুসজ্জিত করছিল সেগুলি বহিঃশত্রু আক্রমণে ভেঙে যায়। ভাঙ্গা টুকরোগুলো এখনো খাস মহলের পাতালঘরে জমা করা আছে যে কেউ সেগুলি দেখতে পারে।

আবার লালকেল্লার মধ্যে যে তথাকথিত মোতি মসজিদ রয়েছে তার ফটকের ভেতরে দিকে যেসব খোদাই করা চিত্র রয়েছে, সেগুলিও সন্দেহজনক। বাইরে প্রত্নতাত্ত্বিকগণের প্রতিষ্ঠিত যে ফলক রয়েছে তাতে লেখা আছে মসজিদটি তৈরি করেন আওরঙ্গজেব। ইনি ছিলেন শাহজাহানের পুত্র এবং উত্তরাধিকারী। আওরঙ্গজেবের মসজিদ তৈরির দাবিটিও ভিত্তিহীন কেননা প্রথমত এই মসজিদের ফটক মন্দির আকৃতির। দ্বিতীয়তঃ দুটি গম্বুজের মধ্যেকার খিলানে কলার ছড়ার প্রতিকৃতি রয়েছে। মনে রাখতে হবে কলার ছড়া লাগে সনাতনীদের পূজাতে। তৃতীয়তঃ খিলান এর উপরে দুই ধারে রয়েছে পাঁচটি করে ফল রাখা থালা। সনাতন ধর্মে থালায় পাঁচটি ফল সাজিয়ে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয়। অন্যদিকে মুসলিমদের মসজিদে ফলের প্রতিকৃতি রাখা নিষিদ্ধ। চতুর্থত কোন প্রাসাদের নাম মূল্যবান রত্নের নামে রাখা (মোতি কথার অর্থ মুক্ত) হল সনাতনী ঐতিহ্য। যদি শাহজাহানই দুর্গ তৈরি করে থাকেন, তাহলে তিনি নিজেই এখানে একটা মসজিদ তৈরি করলেন না কেন? সর্বোপরি সনাতন সংস্কৃতির ঐতিহ্য মন্ডিত ছোট, সমকোনে বাঁকানো ভ্রমণ করার রাস্তা প্রাসাদের বাম পাশে এখনো বর্তমান। দেওয়ালের পিছনে অবশ্য বেশ কিছু পরিবর্তনের চিহ্ন রয়েছে।

দিল্লির লাল কেল্লার নদী তীরবর্তী রংমহল এর দেওয়ালের গঠনও প্রমাণ করে দুর্গ শাজাহানের পূর্বে নির্মিত হয়েছে। এখানে দেখা যায় যে দুটি লাউ আকৃতির গম্বুজ দুদিকে রয়েছে মধ্যিখানে রয়েছে একটি চূড়া যার শীর্ষদেশে একটি ছাউনি রয়েছে। সাধারণত এরূপ কারুকার্য মন্দিরের সম্মুখে দেখা যায় । তাই এই নির্মাণ অবশ্যই এই বক্তব্যের একটি জোরালো প্রমাণ যে শাহজাহানের পূর্বেই লালকেল্লা নির্মিত হয়। এমনকি রংমহল নামটাও সনাতনী পরম্পরার নাম। এই প্রাসাদেই আরো একটি খোদাই দেখা যায় যা সনাতনী রাজবংশের সঙ্গে লালকেল্লার যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করে। সেটি হলো এই প্রাসাদের মেঝেতে নির্মিত একটি অসাধারণ সুন্দর প্রস্ফুটিত পদ্ম ফুল যেটি ঝরণার জল নির্গত হবার গর্ত রূপে নির্মিত হয়েছে। মুসলিম শাসকরা দেওয়াল ও মেঝের গঠনে এত কারুকার্য দেখান নি। তাঁদের মেঝে বা দেওয়াল সমতল। যে ছাউনি আমরা রংমহলে দেখতে পাই, সেটা সনাতন ধর্মের বিভিন্ন বেদীর উপরেও দেখা যায় । এর নিচে রাখা কলস সনাতন সংস্কৃতিতে ঈশ্বরের প্রতীক হিসাবে গণ্য হয় ।

তোমার বংশের রাজা 736 খ্রিস্টাব্দে লাল কোট নামে একটি দুর্গ প্রতিষ্ঠা করেন। পৃথ্বীরাজ রাসো (পৃথ্বীরাজ চৌহান এর সভাকবি চাঁদ বরদৈ এর দ্বারা লিখিত কাব্য) লাল কোট এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে অনঙ্গপাল
তোমারের নাম উল্লেখ করেছেন। কোট কথার অর্থ দুর্গ বা কেল্লা তাই লাল কোট যে লালকেল্লা হতে পারে এ কথা বলা বাহুল্য মাত্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!