কেন আমি গান্ধী-নেহেরুদের ঘৃণা করি- তৃতীয় পর্ব

© বিরিঞ্চি বন্দ্যোপাধ্যায়

১৯৪৭ সালের ১৫ আগষ্ট একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে ভারত  আত্মপ্রকাশ করল। তার পূর্বেই ভারত ভাগ হয়ে বিদেশি ইসলামিক শাসক ও তাদের অনুগত ভারতীয়রা একটি পৃথক রাষ্ট্রের স্থাপনা করে ফেলেছিল।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলেন পণ্ডিত জহরলাল নেহেরু বাস্তবিক যিনি ছিলেন মৌলনা জহরলাল। সাধারণত একটি দেশ যখন দীর্ঘকাল বিদেশি শাসকদের অধীনস্হ থাকে সেক্ষেত্রে যখন সেই দেশ স্বাধীন হয় তখন তার প্রধান লক্ষ্য থাকে সেই দেশের হারিয়ে যাওয়া সভ্যতা, সংস্কৃতি পুনরায় প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু মৌলনা নেহেরু সেই পথে না গিয় বরং তিনি ভারতের বুকে নিজের ঠাকুরদাদার ধর্মের একটি সুন্দর প্রতিচ্ছবি প্রতিষ্ঠাতে মনোনিবেশ করলেন। তাই বিদেশি শাসকরা ভারতের বুকে হয়ে উঠলেন আকবরের মতো মহাত্মা, ঔরাঙ্গাজেবের মতো ধর্মভীরু বা শেরশাহের মতো সুশাসক ভাবুনতো একবার যে শেরশাহ মাত্র পাঁচ বছর রাজ্যত্ব করেছিল,যার মধ্যে অধিকাংশ সময় যুদ্ধ করে অস্তিত্ব বাঁচাতে ব্যাস্ত ছিল তিনি নাকি বিরাট রাস্তা বানিয়েছিল, বিরাট সমাজ সংশোধন করেছিল ইত্যাদি ইত্যাদি।  আর হিন্দু বা ভারতীয় সংস্কৃতি যেই অন্ধকারে ছিল মৌলনা নেহেরু বদান্যতায় সেই তিমিরেই রয়ে গেল।

দীর্ঘদিন বিদেশি শাসকের অধীনস্হ থাকবার ফলে ভারতীয় সংস্কৃতি উপর একটি মলিনতার আবরণ পরে গেছিল এইকথা অনস্বীকার্য নয়,বিশেষ করে বৈদিক বর্ণপ্রথাকে বিকৃত করে যে প্রচলিত  বর্ণপ্রথা ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে উঠেছিল তা সবসময় হিন্দু ঐক্যের জন্য নিদারুণ ক্ষতি কারণ হয়ে উঠেছিল, যা সঠিক বেদ শিক্ষার দ্বারা মেটানো যেত কিন্তু স্বাধীনতার পরে সেটা গান্ধী, নেহেরু বা কংগ্রেস কেউই মাটাতে চায়নি বরং হিন্দু সমাজ যাতে বিকৃত বর্ণবাদের দ্বারা ঐক্যবদ্ধ না হতে পারে সেই জন্য তারা আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছে।

জাতিগত বিদ্বেষ এখনো ভারতীয় হিন্দুত্বের ঐক্যের বিনষ্টের অন্যতম কারণ যা স্বাধীন ভারতের আত্মপ্রকাশের সময় বৈদিক জ্ঞানে সংশোধন করা উচিত ছিল কিন্তু যাতে হিন্দু ঐক্যবদ্ধ না হয় সেই জন্য করা হয়নি।

আসুন প্রচলিত বর্ণবাদের মূলচ্ছেদ করা যাক সহজেই।বর্ণবাদীরা বলে থাকেন হিন্দুধর্মের বর্ণপ্রথা বেদবাক্য তাই একে খণ্ডন  করা সম্ভব নয় তাই হিন্দুধর্মে চলবে ব্রাহ্মণ,ক্ষত্রিয়, বৈশ্য,শূদ্র এই বিভাজন নিয়েই। আমিও বেদবাক্য অখণ্ডনীয়  মনে করে তবে বেদ বাক্যের বিকৃত ভাব যা আমাদের কাছে পরিবেশিত তাকে বেদ কথা অনুযায়ী   খণ্ডন করি।

ঋগ্বেদসংহিতার, দশম মণ্ডলের নাম পুরুষসূক্ত যার ৯০ নং সূক্তের ১২ নম্বর মন্ত্রতে বৈদিক বর্ণশ্রমের কথা উল্লেখ আছে যার ভাব বিকৃত করে আমাদের সামনে উপস্থাপন করে হিন্দুদের মধ্যে অনৈক্য তৈরি করা হয়।
মন্ত্রঃ ব্রাহ্মণোহস্য মুখমাসীৎবাহূ রাজন্যঃ কৃতঃ।ঊর তদস্য যদ্বৈশ্যঃপদ্ভ্যাং শূদ্রো অজায়ত।
যার বাংলা করলে এই দাঁড়ায় ব্রহ্মপুরুষের মুখ থেকে ব্রাহ্মণ,বাহু থেকে ক্ষত্রিয়, ঊরু থেকে বৈশ্য এবং পা থেকে শূদ্রের উৎপত্তি। যেহেতু পা থেকে উৎপত্তি লেখা আছে সেহেতু হিন্দু বিরোধীরা শূদ্রকে ছোট করে হিন্দুদের মধ্যে বিভাজনের খেলাটা খেলে কিন্তু এদের বৈদিক সাহিত্য নিয়ে বিন্দুমাত্র জ্ঞান নেই এদের উদ্দেশ্য কেবল হিন্দুদের মধ্যে অনৈক্য স্থাপন।

আসুন এই মন্ত্রের ব্যাখ্যা করা যাক আমাদের দেহের পক্ষে চারপ্রকার অঙ্গ সমভাবে অপরিহার্য্য।দেহের স্বাস্থ্য এবং শক্তিই বড় কথা, মাথা বড় না পা বড় এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বাতুলতা।দেহের পক্ষে যা সত্য সমাজদেহের পক্ষেও তাই সত্য। যে কোনও সসমাজব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে চলতে হলে ধীশক্তি,বাহুশক্তি,ধারণশক্তি এবং চলৎশক্তি  সমান ভাবে দরকার এই চার শক্তির প্রতিনিধিদের জ্ঞান,শক্তি,অর্থনীতি ও শ্রমের সমবেত প্রচেষ্টায় সমাজ চলে এরা হল ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য,শূদ্র যা ব্যক্তির গুণগত অধিকার, বংশগত অধিকার নয়। মানুষ নিজের গুণ বা যোগ্যতায় ব্রাহ্মণ,ক্ষত্রিয়, বৈশ্য,শূদ্র হয় বংশগত অধিকারে নয়। আমি যদি পা দিয়ে চলতেই না পারি,তবে মস্তিষ্ক চালিয়ে হাজারো বুদ্ধি পরিকল্পনা করে আমি কি করব? আমি যদি দু হাত দিয়ে বাইরের বাধাবিঘ্ন সরিয়ে দিতে না পারি,তবে আমার মস্তিষ্কের ঊর্বরতা বা পায়ের সচলতা কি কাজে লাগবে।
আর সবথেকে মজার কথা এইযে বৈদিক সাহিত্যে ব্রহ্মপুরুষ বা ঈশ্বর কোনপ্রকার দেহধারী সত্ত্বা নন তার কোন প্রতিমা নাই,তিনি সর্বব্যাপক সবেতে বিস্তৃত রয়েছেন।তবে তার মাথা,হাত,পা এল কিভাবে?  আসলে বৈদিক বর্ণবাদ একটি উচ্চামার্গের সামাজিক শ্রেণীকাঠামো যাকে পরমপুরুষের দেহের রূপ বলা হয় যেখানে জ্ঞানবাদীদের ব্রাহ্মণ আর কর্মবাদীদের শূদ্র বলা হয়েছে যা কেবল ব্যক্তির গুণদ্বারা নির্ণয় করা হতো বৈদিক যুগে।

পরবর্তী সময়ে বর্ণবাদ বংশানুগত হয়েছে বিকৃতির দ্বারা যা স্বাধীন ভারতের প্রতিষ্ঠা কালে সংশোধন করা উচিৎ ছিল বা সম্ভব ছিল কিন্তু হিন্দুরা যাতে ঐক্যবদ্ধ না হতে পারে তাই করা হয়নি। উল্টে গান্ধী, নেহেরুদের দ্বারা ভারতের বুকে বিকৃত  বর্ণবাদকেই প্রতিষ্ঠা করা হয়।
মনে রাখবেন বেদ বলেঃ- তে অজ্যেষ্ঠা অকনিষ্ঠাস উদ্ভিদো হমধ্যমাসো মহসা বি বাবৃধুঃসুজাতাসো জনুষা পৃশ্নি মাতরো দিবো মর্য্যা আ নো জিগাতন।। ঋগ্বেদ ৫/৫৯/৬
বাংলাঃ- মানুষের মধ্যে কেউ বড় নয়, কেউ ছোট নয় এবং কেউ মধ্যম নয়, তারা সবাই উন্নতি লাভ করেছে।উৎসাহের সঙ্গে বিশেষভাবে ক্রমোন্নতি প্রযন্ত করেছে( মানে নিজের গুণে কেউ ব্রাহ্মণ, কেউ ক্ষত্রিয়,কেউ বৈশ্য বা শূদ্র হয়েছেন)। জন্ম থেকেই সবাই কুলীন।সবাই জন্মভূমির দিব্য মানুষ। তারা আমার কাছে সত্যের পথে আগমন করুক।। 

মানুষ গুণই মানুষের বর্ণ আমরা কেউ ছোট বা বড় নয় আমরা সবাই সমান আমরা ঈশ্বরের পুত্র আর ঈশ্বর আমাদের মধ্যেই থাকেন খালি ব্যক্তি উপলব্ধি কে জাগ্রত কররে হবে।
ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!